শিশু সাহিত্যে কাজী ইমদাদুল হক

প্রকাশিত: ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০২৩

শিশু সাহিত্যে কাজী ইমদাদুল হক

প্রকাশ ঘোষ বিধান

বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যেসব বাঙালি মুসলমান মননশীল গদ্য লেখক বিশিষ্টতা অর্জন করেন, কাজী ইমদাদুল হক তার মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী গদ্যলেখক। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর তৎকালীন মুসলমান সমাজে তিনি এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভার অধিকারী হয়ে সাহিত্য অঙ্গন আবির্ভূত হন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক।
সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক ১৮৮২ সালের ৪ নভেম্বর খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কাজী ইমদাদুল হকের পিতা আতাউল হক। তিনি প্রথমে আসামে জরিপ বিভাগে চাকরি করতেন এবং পরবতৃীতে খুলনার ফৌজদারি আদালতের মুক্তার নিযুক্ত হন।
কাজী ইমদাদুল হককে ১৮৯৬ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস করেন। ১৮৯৮ সালে কলকাতা মাদরাসা থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯০০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় র্উত্তীণ হন। এর দীর্ঘকাল পরে ১৯১৪ সালে তিনি বিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। ১৯০৩ সালে তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯০৬ সালে তিনি আসামের শিলং বিভাগে শিক্ষাবিভাগের উচ্চমান সহকারী হিসেবে যোগ দেন। ১৯০৭ সালে বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ ঢাকা মাদ্রাসার শিক্ষক হন। ১৯১১ সালে এই শিক্ষাবিদ ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভূগোলের অধ্যাপক হন।১৯১৪ সালে বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ ঢাকা বিভাগে মুসলিম শিক্ষা সহকারী স্কুল পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন।১৯১৭ সালে তাকে কলকাতা ট্রেন্যিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।১৯২১ সালে বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ ঢাকা বোর্ডের সুপারিন্টেনডেন্ট হন।
কাজী ইমদাদুল হক ছাত্রজীবনে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তার সাহিত্য জীবনে সূত্রপাত ঘটে কবিতা রচনার মধ্যে দিয়ে।সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই তিনি প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন পত্রপত্রিকায়। শিশু-কিশোর রচনায় তার দক্ষতা অসামান্য।তার শিশু সাহিত্যে শিশু-রজ্ঞিনীতে- সীসার মূল্য,খুতখুতে ও সু আর কু, রহস্যে- ভালোবাসা, সমস্য্, কদাকারের দৃষ্টান্ত ও শিক্ষাকের বোঝানো বনাম ছেলের বোঝা, বোগদাদী গল্পে- কবির চালাকি ও তিনটি প্রশ্ন স্থান পেয়েছে। তিনি শিশুদের উপযোগী শিশুতোষ গ্রন্থ নবী-কাহিনীর রচয়িতা, ১৯১৭ সালে নবী-কাহিনী শিশুতোষ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।তার নবী কাহিনী কিশোর পাঠ্য বই। বাংলা ভাষায় এটি একটি অসামান্য বই। এতে তিনি হজরত মোহাম্মদ(দ.)থেকে কোরআন শরিফে যে সব নবী-পয়গম্বরের কথা আছে যেমন হজরত আদম, হজরত নুর, হজরত ইবরাহিম, হজরত হুদ, হজরত সালেহ, হজরত ইউসুফ, হজরত মুসা, হজরত আইযুব, হজরত দাউদ, হজরত সোলায়মান, হজরত ইউনুস, হজরত ঈসা ও বিবি রহিমা সম্বন্ধে প্রাজ্ঞল ভাষায় তাদের নীতিশিক্ষার কথা বর্ণনা করেছেন।
কাজী ইমদাদুল হক কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। ছাত্রজীবনে ১৯০০ সালে তার প্রথম সাহিত্যকর্ম ৯টি কবিতা সংগ্রহে ছোট কবিতার পুস্তিকা আঁখিজল প্রকাশিত হয়। তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে মোসলেম জগতে বিজ্ঞান চর্চা, ভূগোল শিক্ষাপ্রণালী (দুই খ-), নবীকাহিনী,সরল সাহিত্য,প্রাথমিক জ্যামিতি, প্রবন্ধমালা, কামারের কা-, আলেক্সান্দ্রিয়ার প্রাচীন পুস্তকাগার, আবদুর রহমানের কীর্তি, ফ্রান্সে মুসলিম অধিকার, আল-হামরা,মোসলেম জগতে বিজ্ঞান চর্চা, পাগল খলিফা ছিলো অন্যতম। তার স্মরণীয় সাহিত্যকম একমাত্র উপন্যাস আবদুল্লাহ।
১৯০৪ সালে খুলনা শহরে মৌলভী আব্দুল মকসুদ সাহেবের জ্যেষ্ঠ কন্যা সামসন্নেসা খাতুনকে বিয়ে করেন। কাজী ইমদাদুল হকের চার পুত্র ও ২ কন্যা,কাজী আনারুল হক, কাজী সামছুল হক, কাজী আলাউল হক, কাজী নুরুল হক এবং কন্যা জেবুন্নেছা ও লতিফুন্নেছা।
তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক। তিনি নবনূর ও মাসিক শিক্ষক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯০৩ সালের সূচনালগ্ন থেকে নবনূর প্রবাসী ও ভারতী পত্রিকাসহ প্রভৃতি পত্রিকায় তার কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯১৮ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এ সমিতির মুখপত্র বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক মাসিক পত্রিকা শিক্ষক প্রকাশ করেন।
শিক্ষা বিভাগে বিভিন্ন কাজে অসামান্য দক্ষতা, গভীর দায়িত্ববোধ ও উদ্ভাবনী শক্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৯১৯ সালে খান সাহেব উপাধিতে ভূষিত করেন ও ১৯২৬ সালে তাকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। খ্যাতিমান সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক ১৯২৬ সালের ২০ মার্চ মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট