শুধু চালকের ভুলে দুর্ঘটনা হয়না ঃ আইন মন্ত্রী

প্রকাশিত: ১২:১৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০১৯

শুধু চালকের ভুলে দুর্ঘটনা হয়না ঃ আইন মন্ত্রী

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, প্রচলিত আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনতা ও শিক্ষার সমন্বয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে, মাইন্ডসেটের পরিবর্তন আনতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনগণকে বুঝাতে হবে যে, শুধু চালকের ভুলে দুর্ঘটনা হয়না অন্যান্য কারণেও হয়।
আজ রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাগো বাংলা ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘নিরাপদ সড়ক : আইনের প্রয়োগ ও জনসচেতনতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন দুর্ভাগ্যই যে, সরকারের এত উন্নয়ন সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নিরাপদ করা সম্ভব হয়নি আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলো। সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহাণি হয়েছে এবং হচ্ছে। সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণ আমাদের সন্তানদের জীবন প্রদীপ অকালে নিভে যাচ্ছে যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হয়ে।
তিনি বলেন, নিরাপদ সড়ক-আমাদের সবারই প্রত্যাশা। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবির প্রতি বর্তমান সরকারও শ্রদ্ধাশীল। আমাদের সন্তানতুল্য তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে সে দাবিই উচ্চকিত করে তুলেছে। আমরা চাই প্রতিটি সড়ক নিরাপদ হোক। সে বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই আমাদের সরকার এ সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে যে, ৩৫ বছর আগের একটি পুরনো আইন দিয়ে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই গত বছর (২০১৮) আমাদের সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস করেছে। পরিবহন খাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ অধিদপ্তরসমূহ। বলেন, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিতকরণের মতো জরুরী কাজগুলো যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরসমূহ কাজ করছে।
তিনি বলেন, নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আইনই যে যথেষ্ঠ নয়। আইন থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিনি। কারণ আইন মেনে চলার মতো একটি সুস্থ সংস্কৃতি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা ছাড়া শুধু আইন প্রণয়ন করে আমরা একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবো না। এ ক্ষেত্রে আমাদের সকলেরই সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।
বলেন,সড়ক পরিবহনে শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সড়কের কারিগরি ত্রুটি যেমন দূর করতে হবে, তেমনই গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিক তথা গাড়ির চালক, হেলপার, যাত্রী এবং পথচারীসহ সকলের মিলিত প্রয়াস এবং সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা খুবই জরুরী। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় যে বিপুল জনস্ফীতি, যে বিপুল সংখ্যক যানবাহন-সে তুলনায় ট্রাফিক সংখ্যা অপ্রতুল। ট্রাফিক ব্যবস্থার আরও উন্নতি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহনের চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দায়িত্বশীল ও চাপমুক্ত রাখতে হবে।
আরো বলেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আমরা সবাই যদি সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি, তবেই গণপরিবহনে সুশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং সড়কগুলো হয়ে উঠবে অধিকতর নিরাপদ। পরিবহন মালিক সমিতি, ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন সংস্থা সম্মিলিতভাবে সড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কাজ করবে-এটা সকলেরই প্রত্যাশা। যুগের প্রয়োজনে আধুনিক কারিগরি ব্যবস্থাপনার সহায়তায়, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের সড়ক-মহাসড়কের বিদ্যমান ত্রুটিসমূহ দূর করা যাবে-এ ব্যাপারে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
তিনি বলেন, যে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ সালে আমরা প্রণয়ন করেছি তা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই করেছি। তবে এই আইনের সুফল পেতে হলে তা যথাযথভাবে কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরী বলে বিবেচনা করি। এই আইন যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা যায় তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। যানবাহনে গতিনিয়ন্ত্রক যন্ত্র বসানো গেলে বেপরোয়া গাড়ির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকদেরও আন্তরিক এবং সদিচ্ছা থাকা চাই। দায়িত্ব পালনেও সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কেন না আমরা যদি এ সত্য মনে রাখি যে, আধুনিক গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় মানুষের অধিকার এবং মর্যাদা সমান। সুতরাং আইনের প্রয়োগও সবার জন্য সমান হতে হবে।
নিরাপদ সড়ক আর নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরী। বিআরটিএ-সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। দেশের জনগণকে সচেতন করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্কুল পর্যায়ে শিশুদেরকে সড়কে চলাচলের নিয়ম এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা বিষয়ে সচেতন করে তোলা যেতে পারে। সামাজিক দায়িত্ববোধ আর আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আসুন আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে একযোগে পরস্পরের সহযোগী শক্তি হিসেবে আত্মনিয়োগ করি, নিশ্চিত করে তুলি নিরাপদ সড়ক। আর যারা গাড়ি চালায় তাদের জন্য অনুকূল এবং সুন্দর একটা পরিবেশ গড়ে তুলি।
মন্ত্রী বলেন, সড়ক পরিবহন আইন উন্নত বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে করা হয়েছে। এখানে পয়েন্টের ব্যবস্থা আছে এবং সর্বোচ্চ ১২ পয়েন্ট এর ব্যবস্থা আছে। কোন ড্রাইভার ভুল করলে তার পয়েন্ট কাটা যাবে।
তিনি বলেন, একজন ড্রাইভারকে এই বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে যে, তার গাড়িকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিরাপদে নিয়ে যেতে হবে। এটা না বুঝলে হবে না। একজন ড্রাইভার শিক্ষিত হলেই কেবল তিনি তা বুঝতে পারবেন। বলেন, শহরের মধ্যে ফুট ওভার ব্রিজগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি নাসির আহমেদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিসিটি অভ বাংলাদেশ এর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী, বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভুঁইয়া, সাংবাদিক অজয় দাস গুপ্ত বক্তৃতা করেন।