শুভ পঞ্চাশ সৌমিত্র দেব

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২১

শুভ পঞ্চাশ সৌমিত্র দেব

নব্বইয়ের দশক, বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাবতে ভালো লাগে যে বিশশতক, অর্থাৎ কবিতার স্বর্ণ যুগের প্রধান তিনটি পাপড়ির একটি হলো এই দশক। এর আগে তিরিশ ও পঞ্চাশ। আমার কথা শুনে যারা চোখ বাঁকা করে তাকাচ্ছেন, দু’চার বছর পরে তারাই এই দশকের কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। যুগে যুগে কবিতার বাঁক ও নতুন কাজকেই প্রধান্য় দেয়া হয়েছে, নতুন কাজগুলো থেকে গেছে, আলোকিত করেছে। এই সময়েও যে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, বিশ্বকবিতার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবার যে শক্তি সঞ্চিত হয়েছে তা থেকে যাবে। আলোকিত করবে, আনন্দ দেবে, আগামী প্রজন্মকে সামনে যাবার প্রেরণা যোগাবে।

সুখের বিষয়, এই দশকের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কবিই ইতিমধ্যে পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। যারা পেরোননি, তারাও আগামী দু’তিন বছরের ভেতর এই সংখ্যাটি ছুঁয়ে দেবেন। দুঃখিত, চার বছর আগে আমিই এই পথটি অতিক্রম করেছি প্রথম, অন্তত ‘নব্বই দশকের নির্বাচিত কবিতা’ সংকলনের কবি পরিচিতি তেমনই বলছে। একে একে বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, রহমান হেনরী, টোকন ঠাকুর, শামীম রেজা, আলফ্রেড খোকন, মজনু শাহ প্রমুখ এই সংখ্যাটি অতিক্রম করেছেন। আজ পেরিয়ে গেলেন আমাদেরই সতীর্থ সৌমিত্র দেব। তাঁকে অভিনন্দন। আগামী দু’তিন বছরের ভেতর পেরোবেন নাজনীন সীমন ও কবির হুমায়ুনসহ আরো কেউ কেউ। এঁদের সবাইকেই আমার অন্তরের গভীর থেকে অভিবাদন জানিয়ে রাখছি। অভিবাদন জানাচ্ছি শুধু পঞ্চাশ পেরোনোর জন্যেই নয়, কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন বাঁক নির্মাণ ও সেই পথে নিয়মিত হেঁটে তাকে প্রশস্ত করার জন্যে, কবিতাকে জীবনের অংশ করে তোলার জন্যে।

সৌমিত্র দেবের সাথে কবে কোথায় প্রথম দেখা হয়েছিলো আজ আর তা মনে নেই। শুধু মনে আছে যে আমরা দীর্ঘদিন একই ধ্যান ও জ্ঞানে একই উদ্দেশ্যে, একটি ভালো কবিতা নির্মাণের পথ তৈরি করতে নিয়মিত হেঁটে চলেছি এবং কবিতা দিয়েই একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠেছি। অন্তত আমার জেনারেশনের কবিদের কবিতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যাদেরকে বন্ধু হবার যোগ্য মনে করেছি, দেশে ও দেশের বাইরে যাদের কবিতা সংকলনভুক্ত হওয়ার আবশ্যিকতায় প্রানিত হয়েছি, যেমন ‘বিশশতকের বাংলা কবিতা’ কিম্বা ‘কনটেম্পোরারি বাংলাদেশী পোয়েট্রি’, সৌমিত্রকে তাদের একজন হিসেবে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হতে পেরেছি। অন্তত, আমার কাছে একেকটি ভালো কবিতা পাঠ মানে একেকটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন। সেই উন্মোচনের আনন্দ থেকে আমার এই প্রিয় বন্ধুটি আমাকে বঞ্চিত করেননি। ছন্দে, মাত্রায়, বহুমাত্রিকতায় ইত্যাদিতে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন।

সৌমিত্র এবং উল্লিখিত অন্যান্য কবিরা নানাবিধ স্বীকৃতি পেয়েছেন, দেশে বিদেশে। অনূদিত হয়েছেন ইংরেজিসহ অন্যান্য বেশ কিছু ভাষায়। বিশ্ব কাব্যাঙ্গনে কারো কারো উচ্চারণ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নির্মাণের কারিগরেরা পঞ্চাশ পেরিয়েও রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি পাননি। এঁদের কবিতা পড়ে একাডেমিতে ঘুমিয়ে থাকা জ্ঞানপাপীদের ঘুম ভাঙেনি। আর, রাষ্ট্র এঁদের কবিতা পড়েনি। রাষ্ট্র আদতে কবিতা পড়ে না, শোনে। রাষ্ট্র শোনে কবিতার নামে গরুর রচনা, উঠতি বয়সী যুবক যুবতিদের প্রেমের চিঠি, ও কিচ্ছা কাহিনী। এগুলো আবৃত্তি করে রাষ্ট্রপালিত আবৃত্তিকারেরা, যাদের সিংহভাগ ব্যস্ত থাকে ষাটের পচা আবর্জনা নিয়ে। ফলত, যেখানে পশ্চিমবঙ্গে উঠতি বাচাল, কিম্বা পিউবিক হেয়ার না-জন্মানো কবিদের পুরস্কারের পর পুরস্কারের মালা পরিয়ে আইকন করে তোলার প্রক্রিয়া চলে, সেখানে বাংলাদেশের এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের রাষ্ট্র উপেক্ষা করে যায়। একাডেমি ঘোষণা দেয়, অন্তত নিজ কানে একজন পা-চাটা মহাপরিচালককে বলতে শুনেছি, “আমাদের বলে দেবেন না কাকে পুরস্কৃত করতে হবে। আমরা জানি কাকে পুরস্কার দেবো।“ কী ভয়াবহ এই উচ্চারণ, এ যে স্বৈরাচারী একনায়কদের হার মানায়! একাডেমি যেখানে ভালোকে খুঁজে বের করার জন্যে বিজ্ঞজনদের সাহায্য চাইবে, প্রকারান্তরে ওই উচ্চারণের মাধ্যমে বলে দিচ্ছে, “আমরা সবজান্তা, সাহিত্যের মোড়ল!“ ফলত, এ নিয়ে বেশি কিছু বলার থাকে না। শুধু বলি, মোড়লদের জয় হোক! মাত্র ৫২ বছর বয়সে জীবনানন্দ চলে গিয়েছিলেন, তখন কোন কোন মোড়ল হাহুতাশ করেছিলেন! আজ কারা কারা তাঁর কবিতা পড়ে মাথা নত করে দাঁড়ান! এ নিয়ে একটু ভাবুন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রতি বছর চমক সৃষ্টি করে অকবিদের মূল্যায়নের ভেতর দিয়ে। দেখে মনে হয় এই মন্ত্রণালয়ের কাছে কাজী ফালতু ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু রাষ্ট্র এতোটা অন্ধ হয়ে যাবে সেটা তো মেনে নেয়া যায় না। তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্ত তো সেই স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে দেয়নি।

সৌমিত্র দেবের পথ চলা, নব্বইদশকের কবিদের পথ চলা অব্যাহত থাকুক। “লাইফ স্টার্টস এট ফিফটি”, ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত এই বাক্যকে স্মরণ করে আমরা আরেকটু আনন্দ করি। আরেকটু এগিয়ে যাই। কবিতার সাথে থাকি। নতুন নতুন কবিতা নির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখি। শুভ পঞ্চাশ সৌমিত্র!

লেখক- কবি হাসানআল আব্দুল্লাহ, সম্পাদক- শব্দগুচ্ছ

ছড়িয়ে দিন