শেখ হাসিনার চল্লিশ বছর কতটা অর্থবহ

প্রকাশিত: ২:০৩ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২১

শেখ হাসিনার চল্লিশ বছর কতটা অর্থবহ

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

রবিবারের এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিচারে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেদিন ছিল ১৯৮১ সালের ১৭ মে। দিল্লি-ঢাকা এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট জওহরলাল নেহরু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মাকে দাড়িয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাক্ষ্য বহন করতে সেদিন। এই ‘সানডে ফ্লাইট’ দিল্লি থেকে সেদিন ঢাকায় নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে। এই রবিবারটিও ছিল অন্য রকমের। দুপুরের আকাশে ছিল কালো ভারী মেঘ। শেষ বিকেলে অন্ধকার আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ভারী বর্ষণ। সেই সাথে ঝরো বাতাস, দমকা হাওয়া। বিকেল চারটা পর ‘সানডে ফ্লাইট’টিকে দেখা গিয়েছিল ঢাকার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে। জনতার ঢলে এসময় নেমে এসেছিল স্বস্তি ও গগনবিদারী জনতার শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এর দিনটি। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটটি টার্মাকে যখন প্রবেশ করে তখন জনতার ভীর এতটাই যে রানওয়ের কোন প্রটোকলই আর বজায় থাকলো না। শুধু এয়ারপোর্টেই না সেই জনতার স্রোত বনানী পর্যন্ত। নেতাকর্মীদের অপেক্ষার পালা শেষ হলো যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে রাখলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর যেখানে থমকে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের চাকা ১৭ মে ১৯৮১ সেই চাকা আবার ঘুরতে শুরু করে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। আজ চল্লিশ বছর পার হয়ে গেল শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের। শেখ হাসিনার এই চল্লিশ বছর আজ কতটা অর্থবহ তার কাছে, বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য সদস্যদের কাছে, বাংলাদেশের জনগনের কাছে এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে? চার দশকের সুদীর্ঘ অধ্যায়ে প্রবেশের পূর্বে ঐতিহাসিক ‘সানডে ফ্লাইট’ নিয়ে কিছু কথা না আলোচনা হলে আমরা সেদিনের অনেক কিছু অনুমান করতে ব্যার্থ হবো হয়তো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন ইউরোপে। হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যদের পাশে দাড়িয়েছিলেন। হত্যার পর পরই হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন জার্মানীতে। শেখ হাসিনা কিছুদিন পর ইউরোপ থেকে ভারতে চলে আসেন। এখানেই প্রায় ছয় বছর তিনি ভারত সরকারের আশ্রয়ে থাকার পর ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। বাংলাদেশে ফিরে আসার বিষয়টি শেখ হাসিনার জন্য কোন ভাবেই নিরাপদ ছিলনা। কারন, পৃথিবীর বিভিন্ন স্হানে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের চলাফেরা ছিল বেশ নিরাপদে। এছাড়াও ছিল নানারকমের রাজনৈতিক চাপ। কিন্ত লন্ডনেই এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এর বিষয়টি। সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। দিল্লি থেকেই কড়া নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। ঢাকায় নেমেই শেখ হাসিনা দেখতে পেলেন বাংলাদেশের মানুষের শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ভালোবাসা ও রাজনৈতিক সমর্থন। বাংলাদেশের মানুষ যেনো এই ‘সানডে ফ্লাইট’টির জন্যই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলেন। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র আশা ভরসার স্হান সেটা প্রমানিত হয়েছিল তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে। আর সেদিনই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের অঙ্গীকার দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা জনতাকে। এয়ারপোর্ট থেকে তিনি গিয়েছিলেন ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে। এই বাড়ির চাবি দিতেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে বেশ অনীহা ছিল। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার হাতে বাড়ির চাবি হস্তান্তর করা হয়েছিল। পরদিন ১৮ মে শেখ হাসিনা জাতীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে গিয়েছিলেন। এবং বিকেলে চলে গেলেন গোপালগঞ্জে টুঙিপাড়া যেখানে চিরশায়িত রয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে এর তেরোদিন পর হত্যা করা হলো ৩০ মে ১৯৮১ সালে। এক সামরিক শাসকের পর বাংলাদেশে শুরু হলো আরেক সামরিক স্বৈরাচার শাসকের শাসনামল। ক্ষমতায় এলেন অতঃপর লেঃ জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। দীর্ঘ নয় বছর জেনারেল এরশাদের শাসনামলে শেখ হাসিনার উপর চলতে থাকে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও অত্যাচার। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দলের সভাপতির দ্বায়িত গ্রহনের পর গনতন্ত্রের মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। গনতন্ত্রের লড়াই শেখ হাসিনার জন্য মোটেও সহজ সরল পথ ছিলনা। বারবার তাকে রাষ্ট্রের মদদে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল। প্রায়ই তার রাজনৈতিক কাজ রাষ্ট্রের শাসকশ্রেনীর দ্বারা বাঁধার মুখে পরে। দেশে ঘুষ-দূর্নীতি-লুটেরা-কালোবাজারীদের দাপটে এক বেহাল দশা এসময়। গনতন্ত্রের নাম লেশ ও নেই দেশে। চারদিকে নৈরাজ্য আর হানাহানি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই বন্ধ থাকতো ছাত্র সংঘর্ষের কারনে। সেশন জটে উচ্চ শিক্ষার অবস্থা নাজুক। নির্বাচনে চলতো হরিলুট, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বলে কিছুই ছিলনা। এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য দেশের জনগনকে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্ত সংসদে ইনডেমনিটি বিল পাস করার মধ্য দিয়ে বিএনপি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার রহিত করে রেখেছিল বেশ কিছু বছর। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা এই বিলটি বাতিল করেন। এদেশের মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে অবশেষে। বিচারের রায়ও কার্যকর করেছে শেখ হাসিনার সরকার। দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি শক্তিশালী অর্থনীতি সৃষ্টির জন্য শেখ হাসিনা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর গ্রামীণ অর্থনীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যার ফলে বাংলাদেশের জিডিপি আজ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামরিক সরকারের আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ভঙুর। বাংলাদেশ ছিল দরিদ্র সীমার নিচে। বাংলাদেশের সেই সূচকের পরিবর্তন ঘটেছে শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও চলমান গনতন্ত্রের কারনে। বিদ্যুত খাতে বাংলাদেশ অনেক অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে।

বিদ্যুত এর উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে। শিক্ষার মান ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। বেড়েছে স্বাস্থ্য সেবা। প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির সুযোগও বৃদ্ধি হয়েছে। কৃষির যুগান্তকারী পরিবর্তন এর ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবন বদলে গিয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। এসব দিক বিবেচনা করে বলতে হবে শেখ হাসিনার রাজনীতির এই চল্লিশ বছর বেশ অর্থবহ। তিনি বিচার বিভাগকে স্বাধীন ভূমিকা পালনে সহায়তা করেছেন। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে পরিনত করা। সেই চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যেই মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশ তার শর্ত পূরণ করেছে। এজন্যই শেখ হাসিনার রাজনীতি আজ বাঙালীর জাতীয় জীবনে বেশ অর্থবহ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্ত ও চার লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে। স্বাধীনতার পরও জুলফিকার আলী ভুট্টোর ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশকে একটি কনফেডারেশন স্টেট হিসেবে দেখতে। জুলফিকার আলী ভুট্টো এজন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ১৯৭২ সালে সুইজারল্যান্ডে ছিলেন তখনও ভুট্টো সাহেব ফোনে তার স্বপ্ন ও ইচ্ছার কথা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন। সেখানের হেড অব মিশন ছিলেন রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান। তিনি এসব কথা পরবর্তীতে অবহিত করেছিলেন। বাংলাদেশকে অবশ্যই এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সবসময়ই বিবেচনা করতে হবে। ভুট্টো-পাকিস্তান-সিআইএ’র তদানীন্তন পরিকল্পনাগুলো সেসময় যদি বাস্তবায়ন হতো তাহলে আমরা আজকের বাংলাদেশে বসবাস করতে পারতাম না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যর্থ করার জন্য। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে সেসময় ফিরে না আসতেন তাহলেও কি বাংলাদেশ আজকের এখানে পৌঁছাতে পারে এই প্রশ্ন নিয়েও এখন আমরা ভাবতে পারি। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। আজ চল্লিশ বছর পর সেদিনের প্রস্তাব এর মূল আদর্শিক দিকটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এজন্য একটি জাতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে চল্লিশ বছর। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ বদলে গিয়েছে। লন্ডনেই ঠিক হয়েছিল শেখ হাসিনাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদিকে পিতার অঙ্গীকার যেমন রক্ষা করেছেন জনগনের কাছে তেমনই নেতাকর্মীদের স্বপ্নের জালটিও বুনে দিয়েছেন বাংলাদেশকে উন্নয়ন এর পথে এগিয়ে দিয়ে। আওয়ামী লীগ এই মহামারীতে মানুষের পাশে দাড়িয়েছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের মূল মন্ত্র পাঠ করে। আওয়ামী লীগ আজ কৃষকের পাশে দাড়িয়েছে, কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের লাখ লাখ কর্মীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছে। দুর্যোগ ও দূঃসময়ে জনসেবাকে নিশ্চিত করেছে। সূ-প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটি ১৯৫২ সালে, ১৯৫৪ সালে, ১৯৬৯ সালে, ১৯৭০ সালে ও ১৯৭১ সালে জনগনের নেতৃত্ব দিয়েছে এদেশের স্বাধীনতার জন্য, সংবিধান রচনার জন্য, পতাকার জন্য, একটি মানচিত্রের জন্য। বাহাত্তর বছরের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের চল্লিশ বছরের ইতিহাস শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ইতিহাস। এই ইতিহাসই বাংলাদেশের এগিয়ে চলার ইতিহাস ও গনতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ইতিহাস। সে কারনেই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস বাঙালীর জীবনে ও আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সবচেয়ে অর্থবহ একটি অধ্যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক।

ছড়িয়ে দিন