শ্যামনগরে মন্দিরে মোদী বিক্ষোভ হেফাজতের

প্রকাশিত: ১২:১২ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২১

শ্যামনগরে মন্দিরে মোদী বিক্ষোভ হেফাজতের

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে প্রান দিয়েছে পাঁচ হেফাজত কর্মী। ২৬ মার্চ নরেন্দ্র মোদীর সফর শুরু হলেই ঢাকা-চট্রগ্রাম-ব্রাক্ষনবাড়ীয়াতে ধর্মীয় সংগঠন হেফাজত-ই ইসলাম মোদী বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। জুম্মার নামাজের পরপরই বায়তুল মোকাররম মসজিদে হেফাজত কর্মীরা সাম্প্রদায়িক আবেগে ফুঁসে ওঠে এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। ঘটনার জের ধরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতেও হাজার হাজার হেফাজত কর্মীরা সংঘর্ষে নেমে পরে। পুলিশের গুলিতে সেখানেই মৃত্যু হয় চার হেফাজত কর্মীর। এই ঘটনার জেরে ব্রাক্ষনবাড়ীয়াতে একটি রেল স্টেশনে আগুন জ্বালিয়ে দেয় হেফাজত-ই ইসলামের কর্মীরা এবং শহর জুড়ে সংঘর্ষে ছড়িয়ে যায়। সেখানে এক কর্মীর মৃত্যুর পর হেফাজত-ই ইসলাম দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঁচিশ বছর ও পঞ্চাশ বছরের উৎসব ও উদযাপনের মধ্যে গতকালের সংঘর্ষের কারনে লক্ষ্য করা গেলো বড় মাপের পার্থক্য। ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতার পঁচিশ বছরে ঢাকা সফরে এসেছিলেন দক্ষিন আফ্রিকার কিংবদন্তী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের পিএলও সভাপতি ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেল। ২০২১ সালে বিশ্ব করোনা মহামারীর কারনে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ উৎসব পালনে রক্ষনশীলতার পথ বেছে নেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মিত্র শক্তি ভারতের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশ। নরেন্দ্র মোদীর সফরকে কেন্দ্র করেই মোদী বিরোধী ও ভারত বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো হেফাজত-ই ইসলাম ও বাম রাজনীতির ছাত্র সংগঠনগুলো। নরেন্দ্র মোদী যখন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরে ষোড়শ শতকের যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরে পূঁজো করছেন তখন দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেয় হেফাজত-ই ইসলাম বাংলাদেশ। হিন্দুত্মাবাদ চেতনার প্লাটফর্ম বিজেপির তৃতীয় সরকার প্রধান নরেন্দ্র মোদী শ্যামনগরের পূঁজো শেষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধীস্হল টুঙিপাড়ায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পূর্বে সেখানে আরেকটি প্রাচীন মতুরা মন্দিরে পূঁজো করবেন। আমার বন্ধু ভারতীয় সাংবাদিক সায়েম ভাট একসময়ে নরেন্দ্র মোদীর খুব ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন এবং এক যুগ আগে তিনি বলেছিলেন ভারতের ইতিহাসে নরেন্দ্র মোদী হলেন একটি বড় ‘মিথ’। লক্ষ-কোটি বছরের প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্মাবাদের চেতনায় আজ প্রায় গোটা ভারতবাসীই নবজাগরনের নবযাত্রায় উজ্জীবিত। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যা আজও ধর্মের মূল্যবোধে নির্ভরশীল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেপথ্যে ধর্মের মূল্যবোধ প্রান্তিক মানুষের দাবি অথবা লক্ষ্য হিসেবে কখনোই পরিগণিত হয়নি, আমাদের স্বাধীনতার নেপথ্যে মূল বিষয়বস্ত ছিলো পাকিস্তানের অপশাসনের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সাম্য-অধিকারের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর সেই অগ্রযাত্রা যেহেতু অব্যাহত ছিলোনা সেহেতু সামরিক শাসনামলে বাংলাদেশের জনসমাজে সংবিধান থেকে শুরু করে অনেক ইতিহাসের বিকৃতিকরনের পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছিলো। যেহেতু বাংলাদেশের মাটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধীনে সেহেতু ধর্মীয় অনুভূতিকে ভোট বাক্সের কাজে লাগিয়ে এমন একটি শ্রেনীর সৃষ্টি করা হয়েছে যার কারনে আজও বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মূল চেতনায় প্রত্যাবর্তন করতে পারছে না। এজন্যই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসেও বাংলাদেশের জনসমাজে বিভ্রান্তির বিভিন্ন জাল বিস্তার লাভ করে চলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে সরকারে ছিল আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর একজন ঘনিষ্ঠ কূটনীতিবিদ ওয়ালিউর রহমানের সাথে আলোচনার সময় রজত জয়ন্তীতে আমন্ত্রিত অতিথিদের সম্পর্কে একদিন জানতে চেয়েছিলাম। তিনি নেলসন ম্যান্ডেলাকে আমন্ত্রণ জানাতে দক্ষিন আফ্রিকার শহর প্রিটোরিয়া গিয়েছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলা যখন কারাগারে ছিলেন তখন শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। প্রিটোরিয়া শহরে নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে যখন ওয়ালিউর রহমানের সাক্ষাত হলো তখন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘ হোয়াই ইউ কিল্ড শেখ মুজিব’। এরপর, নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশের আমন্ত্রণ পেয়ে ঢাকা এসেছিলেন। ইয়াসির আরাফাত এসেছিলেন। সুলেমান ডেমিরেল এসেছিলেন। কিন্ত জনসমাজে সেদিন কোন বিক্ষোভ ও সংকটের সৃষ্টি হয়নি। তাহলে আজ কেনো এতো ক্ষোভ ও সহিংসতা। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে ওঠা একটি সমাজে কেনো আজ সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটে চলেছে। সেই প্রশ্নতো প্রান্তিক মানুষের। কারা বাংলাদেশকে সংঘর্ষ, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভারত বিরোধী আন্দোলনের নামে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর মুরালে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবসে কারা বঙ্গবন্ধুর মুরালে অগ্নিসংযোগ করতে পারে তাহলে। তারা কি ভারত বিরোধীতাই করছে শুধু নাকি অন্তরালে এদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে তাদের অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পঁচিশ আর পঞ্চাশের এই পার্থক্যের মাঝে আজ স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে দেশদ্রোহীদের ভোটকা নিঃশ্বাস। দুর্গন্ধময় পিঁচাশের শরীরের গন্ধটি। তারা এদেশের স্বাধীনতা চায়নি, উন্নয়ন চায়নি, মুক্তি চায়নি, সংবিধান চায়নি, গনতন্ত্র চায়নি, পতাকা চায়নি। তাই অসাম্প্রদায়িক দেশে তারা সাম্প্রদায়িকতার স্বপ্ন দেখেছিল। তাই নরেন্দ্র মোদী যখন যশোরেশ্মরী-মতুরা মন্দিরে তখন তারা ক্ষোভে-দূঃখে ব্যাকুল। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ওড়াকান্দিতে হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পূঁজো করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে চিত্র এঁকে যাবেন সেটাই হোক প্রান্তিক মানুষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতিক। উলুধ্বনী আর আজানের সুর একই সাথে বয়ে যাক বাংলার বাতাসে হাজার-কোটি বছর।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক।

 

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com