আবার সংশপ্তক

প্রকাশিত: ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ, মে ১৪, ২০২০

আবার সংশপ্তক

কাওসার চৌধুরী

করোনাকালের একটি ভালো দিক হল-
শুধুমাত্র এই ‘সর্বনাশীর’ কারনে আমরা আবারো বাংলাদেশ টেলিভিশনের অসাধারণ কয়েকটি নাটক দেখার সুযোগ পাচ্ছি। আবারো প্রদর্শিত হচ্ছে- সংশপ্তক, এইসব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই-এর মত নাটকগুলো। পত্রপত্রিকাতেও দেখি- এসব নাটকের পুণঃপ্রচার নিয়ে লিখতে গিয়ে একটি বিশেষণ জুড়ে দিয়েছে- ‘সেই সময়ের জনপ্রিয় নাটক’ শিরোনামে! আমিও একমত এই বিশেষণের সাথে। তবে নাটকগুলো দেখবার পর মনে হয়েছে- নাটকগুলো কি শুধুমাত্র ‘জনপ্রিয়’-ই ছিল কেবল! আর কিছু নয়!

নাটকের কাহিনী, নাট্যকারের জীবনবোধ, জীবন জিজ্ঞাসা, শিল্প-জিজ্ঞাসা, সমাজ ভাবনার মত বিষয়গুলো কি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ছিল না! শুধু উল্লেখিত কয়েকটি নাটকই মাত্র নয়, বরং ওই সময়ের অনেক নাটকই ধারাহিকভাবে আমাদের সমাজকে, মানুষকে নাড়া দিয়েছিল ভীষণভাবে; এমন কি রাষ্ট্রকেও (হুমায়ূন আহমেদের ‘তুই রাজাকার’-এর বিষয়ে উল্লেখ করেছিলাম ক’দিন আগে)! শুধু কি হুমায়ূন আহমেদই নাড়া দিয়ে গেছেন মাত্র! তা তো নয়। আরো অনেক অনেক নাট্যকার, প্রযোজক পরিচালক, অভিনেতা অভিনেত্রী, নেপথ্য-কুশলী তাঁদের নিজ নিজ অবস্থানে মাইলফলক তৈরি করে গেছেন তাঁদের কর্ম দিয়ে। পুনরায় আজ আমি তাঁদের প্রণতি জানাই।

সংশপ্তক নিয়ে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম আজ।
সংশপ্তক- সেই লড়াকু মানুষেরা, যারা বিজয়ের লক্ষ্যে মৃত্যু অব্দি লড়াই করে যায়। তাদের কাছে- ‘হয় বিজয়, না হয় মরণ’। এর মাঝামাঝি কোন অবস্থান নেই।

সংশপ্তক শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস। ১৯৬৪ সালে রচিত এই উপন্যাসটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটির প্রথম নাট্যরূপ দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। ১৯৭১ সালে সংশপ্তক ‘ঢাকা টেলিভিশন’ থেকে প্রচারিত হয়েছিল। মার্চ মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে চারটি এপিসোডের পর নাটকটির প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার অনেক পরে ১৯৮৮ সালে সংশপ্তক নাটকটি পুনরায় প্রচার শুরু হয়। দেশব্যাপী বন্যার কারনে সেবারেও নাটকটি পুরোপুরি প্রচার করা সম্ভব হয়েছিল কী না আমার স্মরণে আসছেনা। আপনাদের জানা থাকলে জানাবেন প্লিজ, আমি শুধরে দেবো আমার লেখায়।

’৮৮ সালে বিটিভিতে পুণঃপ্রচারের সময় শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস থেকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন ইমদাদুল হক মিলন। প্রযোজনায় ছিলেন তিনজন। প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে আরো দু’জন প্রযোজক ছিলেন- আল মনসুর এবং প্রয়াত আবু তাহের। অভিনয় করেছিলেন এক দল অসাধারণ শিল্পী। প্রত্যেকের নাম এই মুহুর্তে মনে আসছেনা বলে ক্ষমা চাইছি। তবে যতটা মনে করতে পারছি তারমাঝে- ফেরদৌসি মজুমদার, হুমায়ূন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সুবর্না মুস্তাফা, মামুনুর রশিদ, খলিল উল্লাহ, রওশন আরা হোসেন, শিরিন বকুল, মুজিবুর রহমান দিলু, লিয়াকত আলী লাকী, শায়লা নাসের, মুজিবুর রহমান পাঠক, এস এম মোহসিনসহ আরো অনেকেই।

সংশপ্তকের কাহিনী হিসেবে এই উপন্যাসটির (বই) ফ্ল্যাপে লেখা আছে- “সংশপ্তক বিগত যুগের কাহিনী। সংশপ্তক এ যুগের দর্পন। সংশপ্তক ভাবীকালের কল্লোল। সংঘাতে বেদনায় ক্ষুব্ধ যে কাল সে কালের মানুষ- দরবেশ, ফেলু মিয়া, জাহেদ, সেকান্দার মাস্টার, রামদয়াল, অশোক, রমজান আর মোজাদ্দেদী সাহেব। জীবন সংগ্রামে আজো যারা হাল ছাড়ে নি তাদেরই প্রতিভূ লেকু-কসির-হুরমতি। আর যারা ধরা পড়েছে যুগের দর্পনে, হার মেনেছে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অথবা ভাস্বর অগ্নি ঝলকে- সেই রাবু, আরিফা, রানু, রিহানা, কিংবা মালু, এরা সবাই মুখর ক্রান্তিলগ্নের উত্থান-পতনে, জীবন জিজ্ঞাসার যন্ত্রণায়। যুগধারার ত্রিবেণী-সঙ্গমে এই নায়ক নায়িকারা কেউ অসাধারণত্বের দাবীদার নয় কিন্তু এরা সবাই অনন্যসাধারণ। এরা ইতিহাস।”

আসলে পৃথিবীর ইতিহাস তো- নিরীহ মানুষের ওপরে শক্তিধর শ্রেণির শোষণ আর নির্যাতনের ইতিহাস। সে নির্যাতন- আর্থিক, সে নির্যাতন শারীরিক-মানসিক, সে নির্যাতন সহিংস এবং যৌনতার! সৃষ্টির আদি থেকে এটা চলছে- অন্ত পর্যন্ত চলবেই; এ থেকে কোন মুক্তি নেই!

গত পরশু রাত প্রায় সাড়ে আটটার দিকে খাবার টেবিলে বসে কী যেন একটা কিছু খাচ্ছিলাম। বসার ঘরে টেলিভিশন চলছিল। হঠাৎ একটি মিউজিক কানে আসতেই নড়েচড়ে উঠি! খুব চেনা চেনা লাগছিল। খাবারের প্লেটটি হাতে নিয়েই টিভির সামনে গিয়ে দেখি- ‘সংশপ্তক’ শুরু হয়েছে বিটিভিতে; তারই টাইটেল মিউজিক চলছে। ’৮৮ সালে এই নাটকটি যখন নিয়মিত প্রচার হত- সেটা দেখবার জন্য আড্ডা বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতাম!

গত পরশু দিনের এপিসোডের একটি সিকোয়েন্সের ঘটনা বলি। রাতের অন্ধকারে, মিয়ার বেটার (খলিল উল্লাহ) পালিত চামচ রমজান (হুমায়ূন ফরীদি) গেছে হুরমতির (ফেরদৌসী মজুমদার) ঘরের দরজায়। হুরমতি সাহসের সাথে বেরিয়ে আসে রমজানের সামনে। রমজান কুৎসিত প্রস্তাব দিয়ে হুরমতিকে বশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু হুরমতি অনড় অবিচল তার ব্যক্তিত্ব আর সতীত্ব নিয়ে।রমজান নাছোড় বান্দা! সে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে হুরমতির ওপরে। হুরমতি বাধ্য হয়ে লোক ডেকে রমজানকে এই অবস্থায় ধরিয়ে দেবার হুমকী দেয়। অতঃপর রমজান রণেভঙ্গ দেয়।কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে পুড়তে থাকে সে। মিয়ার বেটার কাছে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বানিয়ে-টানিয়ে অনেক কথা বলতে থাকে হুরমতির বিরুদ্ধে। হুরমতির কয়েক পাকি জমি আর তার দেহের প্রতি মিয়ার বেটার নজর বহুদিনের। রমজানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবারে মওকা পেয়ে যায় মিয়ার বেটা।

পরদিন হুরমতির বিরুদ্ধে- ‘বেপর্দা, বে-ইজ্জতি, হুজ্জতি আর বেয়াদবী’র বানানো অপরাধে সালিশ বসে মিয়ার বেটার কাছারি ঘরের উঠানে। গ্রামের গন্যমান্য সবাই উপস্থিত সেখানে। স্কুলের মাষ্টার (মামুনুর রশিদ), যুবক লেদু (রাইসুল ইসলাম আসাদ), মাদ্রাসার মৌলভী (এস এম মোহসীন), বিশিষ্ট আলেম (দরবেশ) মোজাদ্দেদী সাহেব (পাঠক মুজিবুর রহমান)সহ আরো অনেই আছেন ওখানে। উপস্থিত হয়েছেন গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের একাংশ। মিয়ার বেটার দু’পাশে শোভা বর্ধন করছে তার অন্যতম চামচ রমজান (হুমায়ূন ফরীদি) আর দেহরক্ষী কালু (লিয়াকত আলী লাকী)।

মিয়ার বেটা তার নির্ধারিত আসনে উপবিষ্ট। বাকীরা যে যার ‘তপকা’ অনুযায়ী আসন পেয়েছেন। হুরমতি একপাশে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে গাছের নিচে!

……বিচারের শুরুতে মিয়ার বেটার তর্জন গর্জন শুরু হয় হুরমতির বিরুদ্ধে।অতঃপর হুরমতিকে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে দোররা মারার হুকুম দেন মিয়ার বেটা। কিন্তু পাতানো খেলায় গ্রামের পাতি নেতা আর মাদ্রাসার তথাকথিত মোল্লারা তাতে বাধ সাধে।তথাকথিত ফতোয়াবাজ ইমাম মোজাদ্দেদী সাহেব (পাঠক মুজিবর রহমান) বলেন- ‘হুজুর, যেহেতু হুরমতি মেয়ে মানুষ, সে কারনে তাকে সবার সামনে বিবস্ত্র করে দোররা মারাটা একটু অন্যরকম হয়ে যায়! তার চাইতে তার ‘ক্ষমাহীন অপরাধের’ জন্য তার কপালে গরম তামার দাগ দেয়া হোক। তাতে, একদিকে যেমন তার ‘উচিৎ শাস্তি’ হবে, অন্যদিকে, তার কপালের এই দাগ- আগামীতে গ্রামের সবাইকে সতর্ক করবে এই ধরণের ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ থেকে বিরক্ত থাকতে! মিয়ার বেটার পালিত জীবগুলো জ্বী হুজুর বলে তাতে সমর্থন জানায়।

এতে, বিকট দাঁত বার করে আকর্ণবিস্তৃত হাসি দেয় রমজান (হুমায়ূন ফরীদি)। দেহরক্ষী/গুণ্ডা কালু (লিয়াকত আলী লাকী) হাত বাড়ায় রমজানের দিকে। রমজান তার ‘অঙ্গরখা’র (ফুতুয়া ধরণের জামা) পকেট থেকে বড়ো একটি তামার মুদ্রা বার করে কালুর হাতে দেয়। আগে থেকে আয়োজন করা চুলায় জ্বলে ওঠে আগুন। লক লক করে বাড়ে আগুনের শিখা। তাতে একটি লম্বা চিমটি (ফোরসেপ) দিয়ে কালু ধরে রাখে তামার মুদ্রাটি। আগুনের তাপে লাল হতে থাকে তামার মুদ্রা।

এরমাঝে ‘একপেশে বিচারে’ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে ওঠে লেদু (রাইসুল ইসলাম আসাদ)।সাথে যোগ দেন স্কুলের মাষ্টার মশাই (মামুনুর রশিদ)। কিন্তু কোন লাভ হয় না তাতে। মিয়ার বেটার পালিত জীবগুলোর শারীরিক চাপে কোণঠাসা হয় মাষ্টার আর লেদু। ওদের দু’জনকে আটকে রাখে মিয়ার বেটার দলের লোকজন।

এদিকে, টকটকে আগুনের মত লাল হয়ে যায় তামার মুদ্রাটি। একটি গামছা পেঁচিয়ে চিমিটি’টি ধরে কালু। তার আগায় তপ্ত মুদ্রাটি ধরে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় হুরমতির দিকে। রমজানের মুখে ক্রুর হাসি। মোজাদ্দেদী সাহেব ভন্ডামীর চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে যান। উচ্চকন্ঠে তিনি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে কালুকে সাহস দিতে থাকেন।

এরমাঝে মিউজিক দ্রুতলয়ে উচ্চকিত হয়। মিউজিকের পর্দা ‘উদারা’ ‘মুদারা’ ছাড়িয়ে ‘তারায়’ পৌঁছে! তৈরি হয় অন্য এক পরিবেশ। পর্দায় একদিকে হুরমতির অবিচল মুখ, অন্যদিকে তপ্ত মুদ্রা হাতে কালুর এগিয়ে আসা। অনেকটা প্যারালাল একশানের মত যেন। একদিকে ক্লোজ-আপে হুরমতির মুখ, অপরদিকে আগোয়ান তপ্ত মুদ্রা! একদিকে মিয়ার বেটার হাসি হাসি তৃপ্ত মুখ, অন্যদিকে রমজানের ক্রুর হাসি! অবশেষে আগুনে পোড়া মুদ্রাটি কালু সজোরে চেপে ধরে হুরমতির কপালে! বুকফাটা চীৎকার দেয় হুরমতি- আল্লা রে………! হুরমতির জ্বলতে থাকা কপালের ওপরে ফ্রিজ হয় এপিসোডের শেষ দৃশ্য। বেজে ওঠে ‘এন্ড টাইটেল’ মিউজিক।পর্দায় ভেসে ওঠে সকল নেপথ্য কলাকুশলীর নাম।

কাওসার চৌধুরী ঃ অভিনেতা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

November 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930