সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব থাকা উচিত

প্রকাশিত: ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২১

সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব থাকা উচিত

সম্প্রতি ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ও ইউনেসকোর মহাপরিচালক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ছাত্র-শিক্ষক সবার টিকাপ্রাপ্তি বা সংক্রমণ শূন্যে নামার অপেক্ষায় না থেকে স্কুল খুলে দেওয়া প্রয়োজন এবং মহামারির জন্য বন্ধের ক্ষেত্রে সবার শেষে এবং আবার খোলার ক্ষেত্রে সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব থাকা উচিত। তাঁদের পরামর্শ মাথায় রেখে মনে হয় আর দেরি না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার লক্ষ্যে এখনই কাজ শুরু করা উচিত। যে যাই বলুন না কেন , আর বোধহয় দেরি করা ঠিক হবে না ।

 

বর্তমান করোনা পরিস্থিতি কিছুটা কমে এলে দয়া করে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো খুলে দিন । আগেও লিখেছি এখনও লিখছি অন্তত পক্ষে সপ্তাহে একদিন করে হলেও একেক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শ্রেনি কক্ষে ফিরিয়ে নেয়ায় ব্যবস্থা করুন। যে সমস্ত এলাকায় করোনার প্রকোপ কম আছে সেই এলাকাকে প্রথমে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তাতে অন্তত শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কিছুটা হলেও দূরীভূত হবে। আমরা আসলেই এক আচানক জাতি সারা বিশ্বে যেখানে ২২২ টি দেশ করোনায় আক্রান্ত হলো এবং এর মধ্যে মাত্র ১৯ টি দেশ পুরো সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে আর এই ১৯ টির মধ্যে আমরা একটি দেশ যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ করে আছি। আমাদের দেশে মাদ্রাসা খোলা ছিল। যদিও খোলা থাকার কারণে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ বা এতে জীবনহানির পৃথক তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে মহামারীর ব্যাপক প্রভাব যে তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পড়েনি তা হয়তো বলা যায়, অন্যথা হলে খবর প্রচারিত হতো এবং আমাদের দৃষ্টিগোচর হতো। তবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিশু-কিশোর ও তরুণদের ব্যাপক মানসিক, শারীরিক ও শিক্ষাগত ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

 

একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা যাচ্ছে ১৫ জুন পর্যন্ত ১ বছরে ১৫১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৫ ভাগ বেশি। এতে বলা যেতে পারে তারা করোনা-বন্ধের মানসিক সমাস্যর শিকার। যার ফলে করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি ঠেকানোর প্রয়াস যে সফল হয়নি, তা হয়তো বলা যায়। এ ছাড়া আমরা যারা অভিভাবক তারাও কি যন্ত্রনায় আছি তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সারাদিন বাসায় বসে থাকতে থাকতে এরা ইন্টারনেট এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। রাতের একটি বড় সময় তারা জেগে থাকে আর দিনভর ঘুমিয়ে কাটায়। ফলে শারীরিক এবং মানসিকভাবে আরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। ভাল কথা ভাল্ভাবে নিচ্ছে না। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঠিকমতো মিশতে না পেরে আরও সমাস্যার মধ্যে আপতিত হচ্ছে। এতো গেল শিক্ষার্থীদের কথা। কিন্তু শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেনি পেশার মানুষ পড়েছেন অবর্ণনীয় দুঃখ কস্টের মধ্যে। তাঁদের অনেকেরই আয়ের একমাত্র উপায় ছিল শিক্ষার সাথে জড়িত। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক, শিক্ষক, স্টাফ, বাড়ির মালিক, শিক্ষা উপকরণ বিক্রেতা বেশ নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে জীবন পার করছেন। তাঁদের সাথে কথা বললে বুঝা যায় কেমন করে ধার দেনা করে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে আছেন। তাদের জন্যও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার মত যথেষ্ট যুক্তি দাঁড় করানো যায়।

 

 

শিক্ষাবিদসহ সমাজের সচেতন মানুষজন বলছেন, করোনায় শিক্ষার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং সুদূরপ্রসারী। এই ক্ষতি সহজে পুষিয়ে নেবার মত নয়। তাই আর দেরি নয়। লালনের গানের কলি বিধৃত করে বলি ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। তাই আর দেরী নয় । প্রয়োজনে এ কাজের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ এবং নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ করার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতোই বিশেষজ্ঞদের নিয়ে শিক্ষাবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তাঁরা প্রয়োজনে যে কারও কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন । অনেক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়েছেন যে প্রয়োজনে শিক্ষাবর্ষ এক বৎসর পিছিয়ে ২০২২ সাল থেকে শুরু করা যেতে পারে। তাহলে ২০২১ সাল কোন পাবলিক পরীক্ষা থাকলো না। ২০২১ সালে পাবলিক পরীক্ষা গুলো যথানিয়মে মার্চ থেকে শুরু করা যেতে পারে। ৫ কোটি শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে কথা। জাতির ভবিষ্যৎ বলে কথা ২ /৩ টা ব্যাচ যদি এভাবে ঝড়ে পড়ে তবে পরবর্তীতে দেশ পরিচালনায় শূন্যতা দেখা দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের কথা, তাঁদের সাথে সংশ্লিষ্টদের কথা এবং সর্বোপরি জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে যুগোপোযুগি সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। করোনার মানুষ মৃত্যুর ক্ষতির চেয়ে এই ক্ষতি কম নয়। এখনি ব্যবস্থা না নিলে একদিন আমাদের ঠিকই হয়তো অনুশোচনায় করতে হতে পারে।

 

আনোয়ার ফারুক তালুকদার, অর্থনীতি বিশ্লেষক

ছড়িয়ে দিন