সভ্য যুগেও আমাদের সভ্য রুপ নেই

প্রকাশিত: ৯:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০২১

সভ্য যুগেও আমাদের সভ্য রুপ নেই

কুড়ি লাখ বছর বা তার চেয়েও বেশি আগে আদিম মানুষ বাস করতো অন্ধকার পাহাড়ের গুহায়। কারণ তাদের ঘর-বাড়ি ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কবলিত কষ্টকর জীবন যাপনে অনেকেরই আয়ুস্কাল ছিল সীমিত। খাদ্য বলতে ছিল বনের ফলমূল, রান্না করার কৌশল না জানায় খেতো কাঁচা বা আগুনে পোড়ানো মাংস। বস্ত্র ছিল না বিধায় উলঙ্গ ছিলেন তারা, তারপর লজ্জা নিবারণে লতাপাতা দিয়ে শরীরের বিশেষ বিশেষ স্থানগুলো ঢেকে নিতে শিখেছিল। আমরা তাদের বলি আদিম মানুষ। অনেকে বলেন অসভ্য যুগ।

 

আজ আমরা অসভ্য থেকে সভ্য হয়েছি। তাই পাহাড়ের গুহা নয়, ঘর-বাড়ি, হোটেল-মোটেলে রাত কাটাতে পারি। কৌশল জানা থাকায় আগুনে ঘর-বাড়ি, মন সব পোড়াতে জানি। এমন কি পশুর মাংস ছেড়ে মানুষের মাংসও পুড়িয়ে খেতে শিখেছি। আজ লতাপাতায় শরীরের বিশেষ অংশ ঢাকার দরকার পরে না, বস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে আদিম যুগের উলঙ্গ দেহটাই যথাযথ মনে হয়। আমরা এখন সভ্য হয়েছি বলে উলঙ্গ শরীরে দল বেঁধে নৃত্য করতে হয় না, এককভাবেও পছন্দমতো নৃত্য করা যায়। পুরনো সেই হুক্কা ছেড়ে আমরা ব্র্যান্ড নেইম মদ-গাঁজা খেতে শিখেছি। বলা যায়, অনেকটাই সভ্য-আধুনিক যুগে পৌঁছেছি।

 

আদিম যুগ সভ্যতার বাহিরে ছিল বলেই তারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রকৃতি বা বণ্য পশুর থেকে নিজেকে আলাদা করে বা অন্য মানুষদের থেকে নিজেকে উন্নত প্রাণি হিসাবে ভাবতে পারেনি। তাই বর্বরতারও শেষ ছিল না। আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতায় একবিংশ শতাব্দির শূন্য দশকে দাঁড়িয়ে আমরা মানুষ-মানবতা, বিবেকবোধকে ধ্বংস করে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় একই বর্বরতার প্রামান রেখে যাচ্ছি।

 

সভ্যতাকে যা দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করা হয়, তার একটি হল-জীবন ধারণের পদ্ধতি ও উন্নতি । সমাজবিজ্ঞানী আরনন্ত্র টয়েনবির মতে, সভ্যতা বলতে নীতি, ধর্মীয়, ঐতিহ্য এবং আদর্শের এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে বুঝায় যা এক বা একাধিক সমাজকে প্রভাবিত করে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নতি ও পরিবর্তন এসেছে। জীবন ধারণের পদ্ধতিতে ব্যাপক চিন্তা-ভিন্নতার প্রসার ঘটেছে, সেটা নিজ স্বার্থে- নিজ প্রয়োজনে অবশ্যই। আমরা অন্যের স্বার্থে নিজেকে বা নিজের জীবন যাত্রার ধরণ কখনো বদলেছি, এমন উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। তবু, আমরা অন্যকে নিজের মত করে দেখতে চাই সব সময়।

 

সভ্য যুগেও আমাদের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনার খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। আমাদের জীবনযাত্রায় পোশাক-আশাক ফ্যাশনে লং ড্রেসে হাফ প্যান্ট পড়া, কিংবা উন্মুক্ত পিঠে বুকের স্তনযুগল উন্মুক্ত করাও স্বাভাবিক। আবার সেই আমরাই হিজাব পরিহিতা অন্য কারো পোশাক-স্তনযযুগল নিয়ে সমালোচনা করি, তাকে অপদস্থ করি। এটাই সভ্য-আধুনিক যুগের স্বাভাবিক প্রবর্তন কি? (রিয়্যালি?) । আড়ালে কারো বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে বলব, ‘সে তো স্বামীর ঘর করতে পারেনি, তার তো এটা দ্বিতীয় বিবাহ’, প্রতারণা-কৌশলে কাউকে কুপুকাত করে অন্যের কৃতিত্বে নিজে উপাধী অর্জন করে জনপ্রিয় হয়ে যাবো, সেটাও কি ব্যক্তির সভ্য-আধুনিক যুগের আদর্শ বা নৈতিকতায় পরে?

 

কারো পোশাক বা জীবন যাপন পদ্ধতি নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। তবে ‘অন্যের জীবন-যাপন, আদর্শ’ নিয়ে কটাক্ষ করাতে আমার বেশ এলার্জী। আমাদেরকে অন্যের ধর্ম, বিশ্বাস,সংকৃতিতে সন্মান জানাতে হবে। আড়ালে কারো ব্যক্তি জীবন বা আদর্শ নিয়ে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়। এই সভ্য যুগে অসভ্যদের কিন্তু অভাব নেই।

 

এই যুগেও একে অন্যকে পদতলিত করে উপরে উঠার প্রতিযোগীতা বিদ্যমান। মেধা-জ্ঞান পিছনে ফেলে এখন খ্যাতি পেতে বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে সখ্যতাই আসল(কিছু ক্ষেত্রে )। কাজ হাসিল করতে কারো চাটুকারীতা করতে যেয়ে প্রকৃত মানুষটাকে হেনস্থা করতেও আমরা পিছ পা হই না। নিজেকে বিকশিত করার মত কোন সত্যের সন্ধান আমরা অনেক ক্ষেত্রে অন্যকে দিতে প্রস্তুত নই। আমরা ভাবি, ‘যদি যেই ব্যক্তি আমার থেকে বেশী সাফল্য পেয়ে যায়!’ যদি কেউ আমাদের থেকে বেশী ঝলকানি দেয়, তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাকে অপদস্থ করে রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। এক সময় আমরা ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে চলে যাই যা নিজের জন্য, পরিবার, পরিবেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এই যে আমাদের ভিতর এত দ্বন্দ্ব, এটাকে কি বলা যায়? সভ্য যুগের মানসিক সঙ্কট?

 

সভ্য যুগে আমরা এতটাই সভ্য হয়েছি যে বিবেকবোধ, মানবতা বিসর্জন দিয়ে আজ অজ্ঞতা ও শিক্ষার অভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন একটি শিশুর জন্মকে “অভিশাপযুক্ত বা পাপের ফসল” বলে নাট্যচিত্র করতেও দ্বিধাবোধ করছি না। দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে সম্প্রতি এমনই একটি নাটক নির্মান করেছেন পরিচালক রুবেল হাসান। নাটকের নাম ‘ঘটনা সত্য’, পরিচালক রুবেল হাসান, চিত্র নাট্যকার মাইনুল শানু এবং বাবা ও মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো ও মেহজাবিন চৌধুরী।

 

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু একটি ব্যাপক অর্থ নির্দেশক শব্দ। ‘ক্লিনিক্যাল ডায়াগনস্টিক স্পেশাল নিড’ শব্দটি এমন একজন ব্যক্তির অক্ষমতাকে বর্ণনা করে যার ক্রিয়ামূলক বিকাশে সহায়তা ও সাহায্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। সেটা হতে পারে চিকিৎসা, মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর গড় মান সাধারণ মানুষের থেকে বেশি, আবার কমও হতে পারে। সহজ ব্যাখ্যায়, ইন্দ্রিয় ক্ষমতা, বুদ্ধি বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে যেসব শিশুর বিশেষ শিক্ষা, বিশেষ চিকিৎসা বা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়, সেসব শিশুকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু বলা হয়।

 

 

একটি শিশু কেন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, তার সম্পূর্ণ সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। প্রতিবন্ধকতার ভিন্ন ভিন্ন ধরণ রয়েছে, সাথে ভিন্ন কারণও যুক্ত হচ্ছে নিত্য। তবে, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অকালে বা স্বল্প ওজনে জন্ম, প্রসবোত্তর ড্রাগ, অ্যালকোহল বা তামাকের ব্যবহার, গর্ভাবস্থায় দরিদ্র পুষ্টি অর্থাৎ পুষ্টিকর খাবার, ভিটামিন, প্রোটিন বা খাদ্যের মধ্যে আয়রন ইত্যাদির অভাব, মা বা সন্তানের দ্বারা উচ্চ স্তরের পরিবেশগত বিষের প্রকাশ (যেমন সিসা), গর্ভাবস্থায় শুরুর দিকে বা শিশু বয়সে সংক্রমণ হওয়া, ট্রমা এবং স্ট্রেসজনিত সময়কাল…ইত্যাদি বিষয়গুলো জড়িত ‘থাকতে পারে।’

মন্ট্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে এবং সেন্টার হসপিটালিয়ার ইউনিভার্সিটি সায়েন্ট-জাস্টিনের গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণায় দেখা গেছে যে, মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের সাথে যুক্ত জিনের একটি গ্রুপে মিউটেশন প্রায়ই বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে।

 

বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এখনো প্রতিবন্ধকতার কারণ নির্ণয়ে অনুসন্ধান করেই যাচ্ছেন। সব প্রতিবন্ধকতায়ই জিনগত-এমন প্রমান এখনো পাওয়া যায়নি।

 

আজ একবিংশ শতাব্দীর শূন্য দশকে দাঁড়িয়ে সভ্য-আধুনিক যুগের মানুষ হিসাবে গর্বের সাথে আমরা বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতিতে একজন আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিবন্ধী শিশুকে বাবা-মায়ের ‘অভিশাপ’ হিসাবে সমাজে প্রদর্শন করছি। এতে করে আমরা এও বুঝে নিচ্ছি যে, খ্যাতি পেতে বা বিখ্যাত হতে আজকাল ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা’র কোন দরকার নেই। অসভ্য আদিম যুগে মানুষ কৌশল জানতো না বলে আগুনে পোড়ানো মাংস খেত, আজ সভ্য যুগে আমরা কৌশল জানি বলে আগুনে পুড়িয়ে মানবতা-বিবেকবোধ খাই। এখানেই মূলত সেকাল-একালের পার্থক্য; কৌশল বদল। বাকি সব একই রয়ে গেছে।

 

একেক জনের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনটা একেক রকম। জীবনের অর্থ হয়তো আমি বুঝি সরল রেখায়, অন্য কেউ তা নাও বুঝতে পারেন। তাদের কাছে আমার দৃষ্টিকোণ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। প্রত্যকেই স্বীয় চেতনা হতে জীবনকে উপলদ্ধি করেন। কারো ভাবনার সাথে কারো যোগসূত্র নেই! আমরা যদি জীবন সম্পর্কে একটি ইতিবাচক বা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারতাম, বসবাসের জন্য পৃথিবী আরো উন্নত জায়গা হত। অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা পৃথিবীকে দেখি, তবে ঝগড়া, বিবাদ, হিংসা, এবং যুদ্ধ এড়ানো যেত।

 

পুরো লিখাতে আমি কিছু আলোচনা, উ্দাহরণ ও পার্থক্য টেনেছি নির্দিষ্ট কিছু বা কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ বা কটাক্ষ কারার জন্য নয়, বরং আমাকে, আমাদের চিন্তা-ধারণার ভুলটুকু তুলে ধরতে। আমাদের ভিতরের-বাহিরের অজ্ঞতা, দ্বন্দ্বটুকু শোধরাতে পারলে আমাদের চিন্তা-চেতনা, বদলাবে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নতা নিয়ে প্রসারিত হবে। আর যখন চিন্তা-দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, তখন আমাদের আচরণ, জীবন-যাপন পদ্ধতি অনেকটাই বদলে যাবে এবং আমরা একটি সভ্য যুগের বাসিন্দা হিসাবে ভাল থাকতে পারব, অন্যকে ভাল রাখতে পারব। শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমাদের উচিৎ সভ্য রুপ ধারণ করা, সভ্যতার উপাদান গুলো সঠিক ভাবে ব্যবহার করা, আদিম প্রাচীন মানুষদের মন্দ দিকগুলো বর্জন করে তাদের ভাল গুণগুলো গ্রহন করা ।

 

ছড়িয়ে দিন