সমাজ উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভুমিকা

প্রকাশিত: ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০১৮

সমাজ উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভুমিকা

সৌমিত্র দেব
সমাজে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম । তথ্য জগতে মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে গণমাধ্যম। মানুষ জানতে চায়, মানুষ সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। আর সেখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা। নীতিনির্ধারক, আইনসভাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ঘটাতে ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয় দেশের চালচিত্র ।
গণমাধ্যম গণমানুষের কথা বলে । গত ৪১ বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম অনেক সংগ্রামের সঙ্গে তার স্বাধীনতা টিকিয়ে রেখেছে। মার্কিনিদের মতো গণমাধ্যম নির্বাচনে প্রভাব না ফেললেও, বাংলাদেশের গণমাধ্যমও ভূমিকা রাখছে জনমত গঠনে। প্রেস মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন গণমাধ্যম। ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এই মাধ্যম তথ্যকে নিমিষেই ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা বিশ্বে। অনলাইন মাধ্যম মানেই অবাধ ও দ্রুতগামী তথ্য প্রবাহ করা। আর এই অনলাইন মাধ্যমকে ব্যবহার করে যে সাংবাদিকতার চর্চা হচ্ছে আমরা তাকে অনলাইন সাংবাদিকতা বলি। অনলাইন সাংবাদিকতার সংবাদ প্রিন্ট মিডিয়ার থেকে খুব আলাদা কিছু নয়। এর রচনাকৌশলটা একই রকম। সেখানে প্রতিবেদন রচনায় উল্টা পিরামিড পদ্ধতি অনুসরন করা হয়। ফিচার রচনায়ও প্রিন্ট মিডিয়ারই অনুকরণ। তবে সম্পাদকীয় বা উপ-সম্পাদকীয় বলে তেমন কিছুই থাকে না। তবে কেউ চাইলে সেটা রাখতেও পারেন। কোন কোন অনলাইনে মতামত বিশ্লেষণ বিভাগ থাকে। প্রিন্ট মিডিয়ার দৈনিক সংবাদপত্রের মত অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলা, বিনোদন, পর্যটন, মফস্বল বিভাগ প্রভৃতি বিষয়ের আলাদা পাতা। এছাড়া প্রচ্ছদ পাতা তো আছেই। সেখানে পুরো পত্রিকার স্বাভাবিক চেহারার একটা ছাপ তুলে ধরা হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মত অনলাইন সাংবাদিকতায় ইলেকট্রনিক সংবাদ বা ভিডিও ফুটেজ জুড়ে দেওয়া সম্ভব। তবে বাংলাদেশে ইন্টারনেটে স্পিড কম থাকায় এসব ছবি বা ফুটেজ লোডিং-এ সমস্যা হয়। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াই একটি সংবাদের জন্য সীমাবদ্ধ স্পেস থাকে। কিন্তু অনলাইন সংবাদে অসীম স্পেস থাকায় ইচ্ছামত লেখা ও ছবি সেখানে সংযোজন করা যায়। অনলাইন সাংবাদিকতার জনপ্রিয়তার কারনেই প্রিন্ট মিডিয়ার জাতীয় দৈনিকগুলো বেশিরভাগই এখন অনলাইন সংস্করণ বের করছে। যেমন: প্রথম আলো, ইত্তেফাক, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, সমকাল, ডেইলি ষ্টার, ইনডিপেনডেন্ট প্রভৃতি। পিছিয়ে নেই ইলেকট্রনিক মিডিয়াও। এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই, একুশে টিভি, আর টিভি, এন টিভি, বাংলা ভিশন, বৈশাখী টিভি, দেশ টিভি, মাই টিভি, মোহনা টিভি সহ প্রায় সবগুলো চ্যানেলেরই অনলাইন সংস্করণ আছে। সংবাদপত্র একটি প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প। যদিও এর শুরু হয়েছিল মুখে মুখে। তারপর হাতে লেখা সংবাদপত্র এসেছে। মুদ্রণ মাধ্যম আবিস্কৃত হবার পর বিপ্লব ঘটে যায়। মুদ্রণ যন্ত্রটিও নানা বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়েছে। বিকশিত করেছে প্রযুক্তিকে। লেটার প্রেস থেকে অফসেট প্রেস, হাতের কম্পোজ থেকে ফটো কম্পোজ, তারপর কম্পিউটার কম্পোজ হয়ে প্রযুক্তি এখন সংবাদপত্রকে নিয়ে গেছে অনলাইনে। একুশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে আসে অনলাইনের ঝোঁক। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে আগে থেকেই এর যাত্রা শুরু হলেও বাংলাদেশে এটি আসে বিশ শতকের শেষের দিকে। ছাপাখানা, কাগজসহ নানাবিধ ব্যয় থেকে মুক্তি লাভ করে সংবাদপত্র। এমনকি মধ্যস্বত্ত্বভোগী হকারদের কাছে বিড়ম্বনা থেকেও রেহাই পায় পত্রিকা মালিক। লোকবল কম লাগে। সবার আগে সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশের সুযোগ করে দেয় এই মাধ্যম। একই সঙ্গে একটি সংবাদ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবার পথও করে দেয়। অনলাইনের এই জনপ্রিয়তার কারণে দেশের প্রধান সব দৈনিক পত্রিকা অনলাইন সংস্করণ বের করছে। শুধুমাত্র অনলাইন নির্ভর সংবাদপত্রও বের হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও উৎকর্সের সুবাদে একুশ শতকে এসে দ্রুতই বদলে যাচ্ছে মানব সভ্যতার দৃশ্যপট। নতুন সহস্রাব্দের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রচলিত ধারণা ও কৌশলগুলোতে এসেছে নানা পরিবর্তন। অনলাইন সাংবাদিকতায় নারীদের মধ্যে সামনের সারিতে চলে এসেছেন অনেকেই।বর্তমানে আমাদের দেশে প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক,কমিউনিটি মিডিয়ার সাথে যুগপৎভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে অনলাইন মিডিয়া। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৫ সালের পরে এটাই হবে আমাদের দেশের মূল ধারার গণমাধ্যম। যদিও অনেকে একে এখনই বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে মনে করছেন।

অনলাইন মাধ্যম বলতে আমরা কী বুঝি? সেই ধারণাটি একটু স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখন চার ধরণের অনলাইন মাধ্যম কাজ করছে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে প্রচলিত মূল ধারার গণমাধ্যম যেমন দৈনিক পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন প্রভৃতির অনলাইন সংস্করণ। প্রচলিত গণমাধ্যমের প্রচারের ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে অনলাইন সংস্করণে তার অবসান ঘটেছে। অনলাইন সংস্করণের মাধ্যমে এর পাঠক, দর্শক বা শ্রোতা পৃথিবীর যেকোন স্থানের হতে পারেন। দ্বিতীয়ত আছে সংবাদ সংস্থা ও শুধু অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। এই মাধ্যমে মুদ্রণ বা রেডিও, টেলিভিশনের চেয়ে দ্রুত গতিতে খবর পরিবেশন করা সম্ভব হচ্ছে। এটি পরিবেশ বান্ধব। কোন কোন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে পাঠক তাতক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করতে পারেন। তৃতীয়ত,আছে ব্লগ, সেখানে কোন বিধি নিষেধ নেই। সেই সত্য যা রচিবে তুমি। ব্লগের মাধ্যমে সিটিজেন জার্নালিজমের বা নাগরিক সাংবাদিকতার ধারণাটিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে সেই ব্লগ গুলিরও এডমিন প্যানেল আছে, নীতিমালা আছে। কবিতায় যেমন ছন্দ থাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভেতরেও তেমনি কিছু প্রচ্ছন্ন নীতিমালা থাকে। না হলে সে তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। চতুর্থত আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যেমন- ফেইসবুক, টুইটার, লিংকডইন, হাই-ফাইভ, ভাইভার প্রভৃতি। অনলাইন গণমাধ্যম এখন সারা বিশ্বে একটি স্বতন্ত্র গণমাধ্যমের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশেও সরকারি পর্যায়ে এই মাধ্যমটি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। বিশেষ করে গণমাধ্যম বান্ধব হিসেবে পরিচিত রাজনীতিবিদ হাসানুল হক ইনু তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরে ১৭ অক্টোবর ২০১২ সালে সংবাদপত্র মালিক সংগঠন, টেলিভিশন মালিক সংগঠন ও অনলাইন মিডিয়া এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। এর আগে, আমলাদের তৈরি অনলাইন নীতিমালা-২০১২কে প্রত্যাহার করে তিনি অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠনের ব্যাপারে জোর দেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের উন্নয়ন ও স্বাধীন সাংবাদিকতা বিকাশের লক্ষে বহু পদক্ষেপ নিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী নিয়েছেন এ সংক্রান্ত আরও কিছু উদ্যোগ। এসবের মধ্য দিয়ে আমাদের গণমাধ্যম এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে যাত্রা পথকে কন্টকাকীর্ণ করে তুলে কিছু সংখ্যক দুর্নীতিবাজ আমলা ও কায়েমী স্বার্থবাদী মহল। অনলাইন গণমাধ্যমের বিপক্ষে যারা কাজ করেন তারা ডিজিটাল বাংলাদেশ চান না। সরকার এবং বিরোধী দল সবাইকেই স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে কাজ করতে হবে। না হলে ব্যাহত হবে ২০১৫ উত্তর উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনার রূপায়ন। বিশ্ব গণমাধ্যমের বীর সৈনিক এডওয়ার্ড স্নোডেন বলেছিলেন ‘কতদিন বেচেঁ থাকব,সেটা ব্যাপার নয়। কিন্তু বৈষম্যের পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাব।’ স্বাধীন সংবাদিকতার জন্য বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের সংগ্রাম চলছে, চলবে। সরকার সম্প্রতি অনলাইন নীতিমালার ওপর জোর দিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী বলেছেনÑ খুব শিঘ্রই অনলাইন নীতিমালা ঘোষণা করা হবে। আমরা আশাকরি সেই নীতিমালা হবে অনলাইন গণমাধ্যম বিকাশের পক্ষে। সহজ লভ্যতার কারণে অনলাইন গণমাধ্যমে অনেক আগাছার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কিন্তু পেশাদারী মনোভাব ছাড়া কারো পক্ষে গণমাধ্যমে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আগামী দিনের বাংলাদেশে অনলাইন গণমাধ্যমই হবে মূলধারা। এটা যত সহজে বুঝা যাবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল।
সৌমিত্র দেব: প্রধান সম্পাদক, রেডটাইমস বিডি ডটকম নির্বাহী সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন মিডিয়া এসোসিয়েশন।