সম্প্রীতির ফেরিওয়ালা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রকাশিত: ৫:৫৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১

সম্প্রীতির ফেরিওয়ালা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের পটভূমি নিয়ে ২০০৩ সালে নির্মিত সিনেমা ‘আধিয়ার’-এ এক জমিদারকে দেখেছিলাম। সেবার প্রথম আমি সচেতনভাবে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পর্দায় দেখি। সিনেমাটি ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হলেও আমি সম্ভবত ২০০৬ সালে এটি দেখেছিলাম।

 

আশির দশকের এই অভিনেতাকে এর আগেও হয়তো পরিবারের সদস্যদের সাথে সাদাকালো স্ক্রিনে দেখেছি, কিন্তু তাতে সচেতনভাবে তাকে চেনা হয়নি বা সেই বয়সও ছিল না আমাদের। বিশেষ করে ‘নব্বই দশকের আমারা’ সিনেমা বুঝতে শুরু করেছি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে।

 

পরবর্তীতে ‘আমার আছে জল’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘গেরিলা’ ও ‘মৃত্তিকা মায়া’য় আমি পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে এসেছি। এভাবে তার ভক্ত হয়ে উঠি। সময়ের সাথে আমার জানার সুযোগ হয় একজন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণাঢ্য জীবনী।

 

২০১৮ সালে তাঁর সাক্ষাৎ পাই আমি। তখন তিনি সম্প্রীতি বাংলাদেশ নিয়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন সভা-সেমিনার করছিলেন। আমি তখন মৌলভীবাজারে সাংবাদিকতা ও সংগঠন করি। অক্টোবরের কোনো এক তারিখে রেডটাইমস সম্পাদক জনাব সৌমিত্র দেব এর সুবাদে আমি জানতে পারি মৌলভীবাজারে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছেন। শোনা মাত্র আমি রওয়ানা করে উপস্থিত হই শিল্পকলা একাডেমিতে।

 

কথা প্রসঙ্গে জানালেন তিনি ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নিয়ে দেশব্যাপী কাজ করছেন। ২০১৬ সাল থেকে ‘হিউম্যান ফার্স্ট মুভমেন্ট’ নামে একই ধারার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলাম আমরা সেটি উনাকে জানালাম। বেশ খুশি হয়ে আমাকে বললেন ‘শুনে ভালো লাগলো, আমরা একসাথে কাজ করতে পারি’। একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব আমার মতো মফস্বলের সাধারণ এক সংগঠক ও সংবাদকর্মীকে যে মূল্যায়ণ দেখিয়েছিলেন সেদিন আমি তাতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই মুগ্ধতার রেষ কাটেনি আজও।

 

উনার সাথে সাক্ষাতের কিছুদিন পর পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় রীতিমতো আমার পাঠ্য বিষয়ে উঠে আসেন। হাতে নিলাম তাঁর রচিত সমকালীন উপন্যাস ‘কমলা রঙের মেয়ে’। এভাবে আবিষ্কার করলাম একাধারে একজন বেতার, মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রের দাপুটে অভিনেতা, আবৃত্তিকার, সংগঠক, ও লেখক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

 

একজন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহস ও দৃঢ়তা আমাকে এখনও ভাবিয়ে তুলে। নিজের আদর্শ ও চেতনাবোধ থেকে শত বিপত্তিতেও তিনি পিছু হটেননি। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিয়ে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর্য লাভ করেন। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁকে তখন আচ্ছন্ন করেছিল। সেই আদর্শ ধারণ করে মাথা উঁচিয়ে চলেছেন অদ্যাবধি।

 

বাংলাদেশে যখন বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল তখন পীযূষরা আপোষ করেননি। টেলিভিশন নাটক, সিনেমায় যখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল তখন তিনি সাহসিকতার সাথে উচ্চারণ করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম।

 

আমার আরেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি প্রখ্যাত সাংবাদিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের যোদ্ধা আবদুল গফফার চৌধুরীর সাথে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন নাটকে। ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটক নির্মাণ ও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটকটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও মুখোশ উন্মোচন করা হয়। নাটকটি তখন লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে একাধিকবার মঞ্চায়িত করা হয়। যা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিকে দেশ বিদেশে জোরালো করে তুলে। একই সাথে নাটকটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত করে মানুষকে। ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটকটি তাঁর অভিনয় জীবনের এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

 

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মী বিষবাষ্পকে পায়ে চেপে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়  উজ্জীবিত ছিলেন সবসময়। জীবনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে ধর্ম নিরপেক্ষবাদ ও মানবতাবাদ। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি প্রাণপণ লড়েছেন। সর্বশে ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়েছেন তিনি। একঝাঁক অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষকে একত্রিত করে দেশব্যাপী মানুষকে সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর বিরোধকে তুঙ্গে তোলার চেষ্টা হয়েছে তখন শান্তির বার্তা নিয়ে আগুয়ান হয়েছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

 

স্বার্থান্বেষী ধর্মজীবীদের ষড়যন্ত্রের উঠোনে যখন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় মই দিয়েছেন তখন বাধাও এসেছে অনেক। সাম্প্রদায়িক শক্তির রোষানলে পড়েছেন বহুবার। নানা সময়ে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক ও ঢাকায় একাধিকবার তাঁর জীবননাশের চেষ্টা করা হয়। তবুও থেমে নেই এই পথচলা। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনার বিস্তারে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন অনবরত।

 

 

আমার মনে পড়ে, প্রথম সাক্ষাতে তিনি মৌলভীবাজার শিল্পকলা একাডেমির মিন্টু ভাইয়ের রুমে বসে আমাকে বলেছিলেন- ‘ধরো, বাংলাদেশের একটা গ্রামে যদি ১০০ পরিবার থাকে আর সেখানে ১০ পরিবার বাদে বাকি সবাই  মুসলমান। তাহলে সেই গ্রামে যদি মুসলমানরা হিন্দুদের পূঁজোতে বাধা দেয়, তখন কি ওই ১০ পরিবার হিন্দু  পারবে পূঁজো করতে?’ আমি বললাম না। তিনি বললেন ‘একদম তাই। আসলে আমাদের সাম্প্রদায়িক বিষয়গুলো ওই পর্যায়ে নেই যে করো ধর্ম পালনে কেউ বাধা দিবে। তাহলে আমরা যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেখি সেটি আসলে কী?’ তিনিই তখন আমাকে বললেন ‘এসবে ধর্মকে ব্যবহার করে গুটিকয়েক স্বার্থবাদী মানুষ নিজেদের ফায়দা হাসিল করে। ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি অসাম্প্রদায়িক। আমাদের অতীত ঐতিহ্যর কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। যারা আজকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে তারা কেন এটি করছে সেটি মানুষকে বুঝাতে হবে।’ এই কথাগুলো পরবর্তীতে আমি উনার রেফারেন্স দিয়ে অনেক সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সভা-সমাবেশে মানুষকে বলেছি। এভাবে আমি হয়তো পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধারণ করতে শুরু করেছি। জানি না!

 

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার কাছে একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, তিনি আমার কাছে একজন সম্প্রীতির ফেরিওয়ালা। তিনি আমার কাছে একটি আদর্শ। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার কাছে আমার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশ। ৭১ বছর বয়সে চিন্তাশক্তি ও সাহসে চিরতরুণ পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের আলোর দিশা। জন্মদিনে এই গুণী মানুষের প্রতি অগণিত শ্রদ্ধা জানাই।

 

লেখক- সাংবাদিক ও মানবতাবাদী সংগঠক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ছড়িয়ে দিন