সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করছে নারী উদ্যোক্তারা

প্রকাশিত: ৯:০২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০২০

সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করছে নারী উদ্যোক্তারা

এ এইচ এম মাসুম বিল্লাহ

আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুকঃ ট্রেন্ডস ২০১৮’ রিপোর্ট অনুসারে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নারী কর্মসংস্থানের হার ৩৫ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে পুরুষ কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে ১১ শতাংশ। নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পেছনে দেশে দ্রুত বিকাশমান শিল্পখাতের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে পোশাক শিল্পখাত ও সেবাখাতের ভূমিকা অপরিসীম। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কৃষিখাতে এখনও নারী জনসংখ্যার বিরাট একটি অংশ জড়িত রয়েছে। শুধু তাই নয় ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারীরা সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। এমনকি, আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের মোট একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় এদেশের নারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন।

শিল্পখাতে গত এক দশকে নারী কর্মসংস্থানের হার ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিকভাবে নারী কর্মসংস্থানের পরিমাণ এখনো পুরুষ কর্মসংস্থানের তুলনায় বেশ কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বড়ো উদ্যোগ গ্রহণ ও পরিচালনা ও রপ্তানিমুখী ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখছেন।

জাতীয় শিল্প নীতিমালা ২০১৬ অনুসারে, একজন নারী উদ্যোক্তা হলেন এমন একজন নারী যিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হয় এমন একটি ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের মালিক অথবা রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ এন্ড ফার্মসের অন্তর্ভুক্ত একটি কোম্পানির কমপক্ষে ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক। জাতীয় অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ অনুসারে, বর্তমানে কুটির শিল্পসহ মোট ৭৮ লক্ষ ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্যে ৭.২২ শতাংশ নারী উদ্যোক্তারা পরিচালনা করছেন।

দেশের নারী উদ্যোক্তারা সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, চামড়া, ঔষধ শিল্প, শিক্ষা পরামর্শ, স্বাস্থ্য, কৃষি, বস্ত্রখাতসহ অন্যান্য উৎপাদন ও সেবা খাতে কাজ করছেন। দেশের নারী উদ্যোক্তাদের পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যাদের একটি বড়ো অংশ নারী। তবে অনেকে নারী উদ্যোক্তা এখন তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স খাতে কাজ করার উৎসাহ প্রদর্শন করছেন। বিশেষ করে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ হতে রপ্তানি পণ্যসমূহের মধ্যে রয়েছে পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, চিংড়ি, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ইত্যাদি। তবে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এবং রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে কুটির শিল্পখাতে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীসহ আমাদের সংস্কৃতির কৃষ্টি, কালচার ঐতিহ্য উপস্থাপন করে এমন ধরনের পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই সকল শিল্পখাতের উৎপাদন কার্যক্রমের আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পুরুষ উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তারাও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

সাম্প্রতিক সময়ে কুটিরশিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বেশ চোখে পড়ার মতো। সরকারের পক্ষ হতে নারী উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা প্রদান ও তাদের অনুকূলে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করার ফলে এসকল গুণগত পরিবর্তন এসেছে বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত। নারী উদ্যোক্তারা যাতে দেশের অর্থনীতির সকল

 

 

খাতে ভূমিকা রাখতে পারেন সেজন্য শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তর বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য দেশে উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশীয় পণ্যের অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানসহ সরকার বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এরই অংশ হিসেবে রপ্তানি বাণিজ্যে কারিগরি বাধা অপসারণ, জাতীয়মান কাঠামো উন্নয়নসহ বিশ্ববাজারে দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে পারস্পরিক স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড। সরকারের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকাও প্রশংসার দাবি রাখে।

আন্তর্জাতিক বাজার তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকল উদ্যোক্তাকে এখানে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ পুরুষ উদ্যোক্তাদের তুলনায় অনেকটা বেশি। সামাজিক ব্যবস্থার কারণে ঘর হতে বাইরে আসার ক্ষেত্রে নারীরা বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। তাছাড়া, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে গড়ে নারীরা এখনো পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন।

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তির দিক থেকেও নারী উদ্যোক্তারা পুরুষদের জন্য কিছুটা পিছিয়ে আছেন বলে সমীক্ষায় জানা যায়। পর্যাপ্ত মূলধনের ঘাটতিও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আরো একটি বড়ো বাধা। ব্যাংক হতে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে পিতা বা স্বামীর পক্ষ হতে গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হয়। নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষে এ ধরনের গ্যারান্টি যোগাড় করা অনেক সময় দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। পণ্য ও প্যাকেজিংয়ের মানে ঘাটতিও একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ।

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন নতুন সফল নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির করতে তাদের জন্য ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে বিনিয়োগের আগে এবং পরে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণদাতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে কাউন্সেলিং সেবা প্রদান ও তদারকি করা প্রয়োজন। ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সংখ্যা কমানোসহ ঋণদানের প্রক্রিয়া সহজ করা হলে সেটি নারী উদ্যোক্তাদের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে এগিয়ে আসতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করবে। এছাড়া আমদানি ও রপ্তানি খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনার জন্য বিশেষ দক্ষতা ও জ্ঞান প্রয়োজন। এ বিষয়ে নারী উদ্যোক্তাদের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে অ্যাক্রেডিটেশনের গুরুত্ব ও ব্যবস্থাসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে সকল উদ্যোক্তার সম্যকভাবে অবহিত হওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন।

সরকার গৃহীত এসকল কার্যক্রম ও সুবিধা কাজে লাগালে দেশীয় পণ্যের মান বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের চাহিদা আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা যায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com