সময় এখন সময় তখন

প্রকাশিত: ৫:৫১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০২১

সময় এখন সময় তখন

 

 

শেলী সেনগুপ্তা

 

জ্যোতি জানালার পাশে বসে আছে অনেক আগে থেকে। প্রতিদিন সে খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু আজকে আরো আগে জেগেছে। রাত তিনটার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।ঘুমের মধ্যে মনে হচ্ছিলো অনেক দূর থেকে বাঁশির শন্দ ভেসে আসছে। সুরটা যেন ওর চারপাশে বেজে বেজে হারিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। কেমন

যেন একটা সুখময় বেদনার মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।গায়ের কম্বল সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে এলো। তারপর থেকে বসে আছে জানালার পাশে। সুর্য উঠি উঠি করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সোনালি আলোতে ভরে যাবে চারদিক।

জ্যোতি গতদু’দিন ব্যঙ্গালুরুতে আছে। এসেছে সার্ক সাহিত্য সম্মেলনে। বাংলাদেশের দশ সদস্যের একটা দল এসেছে। জ্যোতি সে দলের একজন। কবি হিসেবে তার এদলে তার অন্তর্ভুক্তি। আজকে সে কবিতা আবৃত্তি করবে। কাল রাতে তিনটা কবিতা বেছে রেখেছে। পড়া হয়নি একবারও। ইচ্ছা করছেনা। আসলে এসব

অনুষ্ঠানের জন্য সে তেমন একটা প্রস্তুতি নেয়না। ওর ধারনা যেভাবে যখন তার মধ্যে কবিতা আব্ররত্তি বের হয়ে আসবে,সে সময়ের জন্য সেটাই সঠিক। রজত তার স্বামী ,তাকে অনেকবার তাকে এই মনোভাব থেকে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু জ্যোতি একইভাবে চিন্তা করে। এবারও সে পড়বেনা, একেবারেই মঞ্চে

উঠে আবৃত্তি করবে। এবার রজত ওর সাথে এসেছে। সে সাধারণত দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে। আর বাইরে কোথাও গেলেতো কথায় নেই। তাকে তো আর জাগানোই যায় না, যেন সে ঘুমাতেই বিদেশে এসেছে। কিন্তু জ্যোতি বাইরে আসলে বেশ আগেই ঘুম থেকে উঠে আর জানালার পাশে বসে সূর্যোদয় দেখতে ভালবাসে, আজও তাই করছে।

 

গ্রিক পাথরের মূর্তির মতো জালানার পাশে বসে আছে, দৃষ্টি বাইরে। কেউ দেখলে ভাববে সে কিছু দেখছে, আসলে কিছুই সে দেখছে না। সে নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে সে ফিরে গেছে দশ বছর আগে।

 

জ্যোতির বয়স তখন প্রায় ত্রিশ। সেবারও ছিলো এমন একটা সাহিত্য সম্মেলন। সেটাও ছিলো ব্যঙ্গালুরুতে । দুইদিনের অনুষ্ঠান। বাংলদেশ থেকে তিনজন কবি এসেছিলো জ্যোতি ছিলো তাদের একজন।দু’জন বিখ্যাত কবি, আর জ্যোতি। উঠেছিলো এমনই একটা হোটেলে। পাঁচতারা হোটেলে। একা একটা রুম। ওর কেমন যেন ভয় ভয় করছিলো।

ওরা অনুষ্ঠানের একদিন আগেই চলে আসেছে। হোটেলের লবিতে বসে গল্প করছিলো অন্য দেশ থেকে আসা কবিদের সাথে। জ্যোতি একটু আগেই ঢাকায় ফোন করে করে রজতের সাথে কথা বলেছে,তাই মনটা একটু ফুরফুরে ছিলো। রজত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। জ্যোতির সব অনুষ্ঠানে রজত সাথে থাকে কিন্তু এবার

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা চলছে বলে এবার আসা হলো না। কিন্তু জ্যোতির খুব একটা খারাপ লাগছেনা। একটু যেনই ভালোই লাগছিলো এভাবে একা আসতে পেরে। মনে হচ্ছিলো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। মনে হচ্ছে এভাবে একা আসাটা দরকার ছিলো।

 

লবিতে গল্প করতে করতে মনে হলো কেউ ওকে দেখছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে খুব কাছে থেকে কেউ ওকে দেখছে। ঘাড় ঘোরাতেই চোখ চলে গেলো তিন চার হাত দূরে একটা সোফাতে বসা এক যুবকের দিকে।মুগ্ধ চোখে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পরতেই সে দৃষ্টি নত করলো অনেকটা সম্ভ্রমে। কিছুক্ষণ পর জ্যোতি আবার তাকালো, একইভাবে যুবকটা জ্যোতিকে দেখছে।এবার আর চোখ নামালো না। মৃদু হেসে সম্ভাষন জানালো। জ্যোতি হেসে জবাব দিয়ে আবার সবার সাথে গল্পের মধ্যে ডুবে গেলো।

 

দুপুরে সবাই ডাইনিং এ খেতে এলো। বুফে লাঞ্চ। জ্যোতির পাশেই সে যুবক।এবার ওদের কথা হলো।যার যার খাবার নিয়ে একই টেবিলে বসলো খেতে খেতি গল্প। যুবক এসেছে শ্রীলংকা থেকে,কবি, নাম অমৃত। নাম শুনেই জ্যোতি হেসে দিলো। অমৃত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। খেতেই ভুলে গেলো। বিড়বিড় করে কি যেন আউড়ে গেলো। জ্যোতির মনে হলো কবিতা কিন্তু বুঝতে পারলো না। অমৃত জানালো সে কবিতা আবৃত্তি করেছে।

 

অমৃত’র চোখে সে মুগ্ধতা দেখেছে। ছোটবেলা থেকে জেনেছে সে সুন্দরী,অনেকের মুখে শুনেছে। কিন্তু এরকম নিরব মুগ্ধতা এর আগে আর কারও চোখে দেখেনি। হঠাৎ করে খুব ভালোলাগায় মন ভরে গেলো। ভালোলাগাটাকে সে সাথে নিয়ে ফিরে যেতে যায় নিজের দেশে। তাই সে একটা দিন অমৃত’র সাথে কাটাতে চায়।

এই দু’টো দিন সে তার ভালোলাগার সিন্ধুকে ভরে নিয়ে যাবে।

 

দিনটা প্রায় একসাথে কাটালো। বিকালে চা এর টেবিলেও অনেক গল্প হলো। বেশির ভাগ গল্পই শ্রীলংকার সাহিত্য,জ্যোতি বাংলা কবিতা নিয়েও কথা বললো।

তারপর একরাশ ভালোলাগা নিয়ে যার যার রুমে ফিরে গেলো।অমৃত জ্যোতিকে রুমের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলো। দুজনের গল্পএর কথাগুলো ভাবতে ভাবতে জ্যোতি ঘুমিয়ে পরলো।

 

পরদিন জ্যোতির ঘুম ভাংলো অনেক ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বিছানা ছাড়লো।জানালার পর্দা সরিয়ে আকাশ দেখলো। রাস্তার লোকজন গাড়ি দেখে দেখে এককাপ কফি বানিয়ে নিলো। অনেক সময় নিয়ে কফি খেতে খেতে বাগান দেখলো আর ডাইরীতে দুচার লাইন কবিতা লিখে নিলো।

 

হঠাৎ ঘড়ি দিকে চোখ পরতেই ব্যস্ত হয়ে গেলো। আটটা বেজে গেছে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার নেয়া নিতে শুরু করলো। ব্রেকফাস্ট করেই অনুষ্ঠানে যোগ দেবে।জামদানি শাড়ি পড়বে আজকে। জ্যোতি সবসময় ‘ষোলআনা বাঙালিআনা’তে রীতিতে চলে। ঘাড়ের উপর হাতখোঁপা করে একটা গোলাপ কুড়ি গুঁজে নিলো। আচঁলে

সুগন্ধি ছড়িয়ে নিজেকে আয়নাতে দেখে নিলো। সারা শরীরে মুগ্ধতা আবেশ নিয়ে রুম থেকে বের হলো। বেশ অবাক হয়ে গেলো। একটু দূরে করিডোরে লাজুক হাসি দিয়ে ওমৃত দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোতিকে হাসি যেন আরো বিস্তৃত হলো।

অবাক জ্যোতি প্রশ্ন করলো

ঃ কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন?

ঃ ছ’টা থেকে।

ঃ এতো সকালে ? কেন?

ঃ আপনার সাথে ব্রেকফাস্ট করবো তাই!

ঃ দরজায় নক করলেন না কেন?

ঃ এখানে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে দেখছিলাম।

ঃ কীভাবে সম্ভব,বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরের মানুষকে দেখা সম্ভব।

ঃ সম্ভব,বাইরের মানুষকে যদি ভেতরে নিয়ে আসা যায়।

জ্যোতি চমকে উঠে অমৃত’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। অমৃত তাড়া দিলো ডাইনিং এ যাওয়ার জন্য।

 

ওরা গল্প করতে করতে ডাইনিং এ চলে এলো। অমৃত ওকে খাবার তুলে নিতে সাহায্য করলো। এক টেবিলে খেতে বসলো। খাওয়ার চেয়ে গল্পে আগ্রহ বেশি।

গল্প করে আর জ্যোতির দিকে তাকিয়ে থাকে। সে যেন চোখ ফেরাতে পারছে না।

 

কবিতা পাঠের আসরেও একই অবস্থা। অমৃত’র সব কবিতা যেন জ্যোতির জন্য। প্রতিটা লাইন যেন অমৃত’র মুখ থেকে বের হয়ে জ্যোতির পায়ে লুটিয়ে পরছে।

 

আজকেও অনুষ্ঠান শেষে একসাথে সময় কাটালো।ব্যাঙ্গালুরু শহর দেখতে বের হলো। জ্যোতি শহর দেখছে আর অমৃত দেখছে জ্যোতিকে। জ্যোতি এর আগেও অনেক মুগ্ধতা দেখেছে ,মানুষের মধ্যে দেখেছে ওর কাছে আসার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু অমৃত’র দৃষ্টিতে পূজার অর্ঘ্য যা এর আগে সে কোথাও পায়নি। মনটা ভরে গেল।

 

জ্যোতি কেনাকাটা করতে চাইছে। অমৃত তাকে সাথে নিয়ে মার্কেটে গেলো। রজতের জন্য শার্ট পছন্দ করে দিলো। শাড়ি কিনতে সাহায্য করলো। তারপর ওরা ব্যঙ্গালুরু দেখতে বের হলো। জ্যতির পছন্দ মন্দির আর মিউজিয়াম, অমৃত’র পছন্দ স্টেডিয়াম আর বাগান। অনেক সময় নিয়ে বেড়ালো। জ্যোতি ওর ছোট বেলার গল্প করছে , পোষা বেড়াল এমনকি ওর শখের কথাও বললো। অমৃত নিরব শ্রোতা হয়ে শুনছে। এত গভীর মনোযোগী শ্রোতা জ্যোতি আর পায়নি কখনো।

 

দ্বিতীয়দিনের প্রোগ্রাম শেষ হলো। পরদিন সকালে ওরা ফিরে যাবে যার যার দেশে। সবাই নিজের মত গুছিয়ে নিচ্ছে। অমৃত ও জ্যোতি যেন একটু বিষন্ন। ওদের কথা কমে গেছে।চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে দুচারটা কথা আর দীর্ঘ সময় নিরবতা। এভাবেই তাদের রাতের খাওয়া শেষ হলো। এখন রুমে ফেরার পালা।

প্রতিদিন অমৃত জ্যোতিকে রুমে পৌঁছে দিয়ে আসে। আজকে জ্যোতি ওকে পৌঁছে দিয়ে আসতে চাইলো। অমৃত খুব খুশি হলো। রুমের সামনে এসে আর ফিরতে ইচ্ছা করছে না ,মনে হচ্ছে কি এক মহা মূল্যবান বস্তু ফেলে যাচ্ছে। অমৃত ওকে এককাপ কফি খেতে অনুরোধ করলো। সে রাজি হয়ে গেলো রুমে ঢুকেই অবাক হবার

পালা। টেবিলের উপর কত বই সাজানো। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলী থেকে শুরু করে পি ভি শেলী পর্যন্ত। দেখে খুব ভালো লাগলো। অমৃত দু’কাপ কফি বানালো,কফির কাপ হাতে নিয়ে ওর পাশে এসে বসলো।নিজের কাপে দীর্ঘ চুমুক দিলো।জ্যোতি ছোট ছোট চুমুকে কফি খাচ্ছে। নিরবতার মধ্যে একসময় কফি শেষ হলো। জ্যোতি

রুমে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালো,ধীর পায়ে দড়জার দিকে এগোলো। দড়জায় দাঁড়িয়ে বিদায় নেয়ার জন্য হাত তুলে পেছন ফিরতেই দেখে অমৃত নিজের জায়গাতে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে আছে আহ্বানের ভঙ্গিতে। জ্যোতি জানে না হঠাৎ ওর কি হয়ে গেলো।প্রায় ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো অমৃত’র বুকে,শরীরের সবটুকু শক্তিতে

জড়িয়ে ধরলো ওকে। অমৃত ওকে বলিষ্ঠ হাতে ধরে রেখেছে। মুহূর্তেই সারাটা পৃথিবী ওদের চোখের সামনে থেকে সরে গেলো। এ রুমটাই হয়ে গেলো ওদের পৃথিবী। এ পৃথিবীতে ওরা দু’জন মানুষ,একজন নর ও আরেকজন নারী।

কতসময় কেটেছে জ্যোতি জানেনা। একসময় ফিরে এলো নিজের রুমে। আর ঘুমালোনা।ব্যাগ গুছিয়ে নিলো।তারপর জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলো। ওর চোখের সামনে সূর্য উঠলো। একটু একটু করে সূর্য উঠছে আর ওর সামনে থেকে গতকালের রাতটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

হোটেলের গাড়ি বাইরে অপেক্ষা করছে। জ্যোতি বের হয়ে এলোরুম থেকে। গেটের কাছে দঁড়িয়ে আছে ওর দুই সফরসঙ্গী।বারবার ঘড়ি দেখছে।জ্যোতি এলেই রওনা হবে।

গাড়িতে ওঠার সময় দেখে গেলো হোটেলের সামনে এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন বলাবলি করছে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা একজন শ্রীলংকার ডেলিগেট গতরাতে মারা গেছে। কেন কীভাবে তা কেউ জানেনা।

জ্যোতিদের গাড়ি এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হলো আর এম্বুলেন্স গেলো উলটো পথে হাসপাতালের দিকে, লাশের পোষ্টমর্টেম করতে হবে।।

 

ছবি ঃ নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা

ছড়িয়ে দিন