সময় গড়িয়ে যাচ্ছে নিজের মতন

প্রকাশিত: ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৮

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে নিজের মতন

রোকসানা লেইস

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে নিজের মতন। দেখতে দেখতে আট দিন হয়ে গেল। এই ক’দিন আমার সময় আর আগায় না, এক জায়গায় থমকে গেছে। আমার মা আর খায় না, চলে না, ফিরে না। কথা বলে না। শীত গ্রীষ্মের উপলব্ধি ব্যক্ত করে না। মায়ের কোন কষ্ট নেই। মায়ের শরীর কোন অন্ধকার মাটির ঘরে একা।
দুচোখ ঝাপসা হয়ে থাকে প্রতি মূহুর্ত। ঘুম আসে না। তন্দ্রা থেকে জেগে উঠে বসি ধরফর করে কি যেন হয়েছে। মায়ের মুখ মনে পরে। তন্দ্রা হারিয়ে যায়। দুচোখ জ্বালা করে। শরীর জুড়ে ক্লান্তি। চারপাশ ঘিরে মা এর মুখ। এত ক্লান্তি এত ভাড়, অনেকদিন অনুভব করিনি । এ ভাড় বওয়ার শক্তি নাই ।
এক সময় ভাবি মায়ের আর কোন বাধা নেই কোথাও যাওয়ার। নিমিশে যার কাছে যেখানে যেতে ইচ্ছে করে চলে যায় এখন। এই যেমন আমার পাশে বসে আছে এখন হাসি মুখে। তারপর আবার ঘিরে ধরে শূন্যতা। পৃথিবীর কোথাও আর আমার মা নেই। হাহাকার চারপাশে । মায়ের সাথে মিলনের জন্য পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে যেতে হবে আমাকে। সে কতদিনের অপেক্ষা কে জানে।
মায়ের ফোন নাম্বারটা ঘুরেফিরে দেখি। এই নাম্বারে আর কখনো কথা হবে না তোমার সাথে। আর কখনো বলবে না তোর লেখাটা পড়েছি, খুব ভালোলেগেছে। জন্মদিনে সবার আগে তোমার ফোনটা আর কখনো বেজে উঠবে না। এই আফসোস এ জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হবে।
এত তাড়া কি ছিল মা। আরো কটাদিন না হয় থাকতে এই পৃথিবীতে। সাহস আর শক্তির কথা বলতে আমাকে। ভালোবাসায় সব কিছুর জন্য দোয়া পড়তে। যা ছিল তোমার একমাত্র আশ্রয়। সবার জন্য দুহাত তুলে শুধু মোনাজাত আর দোয়া করে গেছো। কখনো কিছু চাইলে না শুধু দিয়ে গেলে ভরপুর করে। বুক ভরা স্নেহ, এগিয়ে যাওয়ার সাহস। অর্থ, সম্পত্তি দিয়েই গেলে শুধু । কিছুই করতে পারলাম না তোমার জন্য কখনো।
ঘুরতে খুব পছন্দ করতে। পৃথিবীটা দেখার আনন্দ ছিল তোমার উপভোগ করতে খুব। কত দেশে আমরা ঘুরেছি এক সাথে। আরো ইচ্ছে ছিল, অনেক জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাওয়ার। সুযোগ দিলে না আর।
যতই নিজেকে প্রবোধ দিতে চাই তুমি অনেক শান্তিতে ঘুমিয়ে পরেছো। যেমন চেয়েছো সারা জীবন কখনো কারো উপর নির্ভর করে বাঁচতে চাওনি। ঠিক সে ভাবেই কাউকে অশান্তি না করে, নিজে চলাফেরা বোঝা অবস্থায় যেন তুমি, চলে যাওয়ার সময়টাকে নিজে পছন্দ করে নিয়েছো।
যেমন চেয়েছো ভালোবাসা, সম্মান মর্যাদার সাথে চির শান্তির ঘুমে ঘুমিয়ে পরেছো।
সবাইকে নাকচ করে দিয়ে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছো আবার আমেরিকা ফিরে না যাওয়ার। নিজ বাড়িতে, নিজ বিছানা থেকে ঘুমিয়ে যাবে চিরতরে চির সঙ্গীর সাথে মিলনের জন্য যাত্রা করবে, পনের বছর বাদে আবার।
সব দেখা সব কিছু দায় দায়িত্ব পালন শেষ করে হাসি মুখে ঘুমাতে গেছো।
সব খুব সুন্দর, খুব শান্তির । তোমাদের দুজনের আনন্দময় হাসি দেখি আমি যেখানে আর কোন সমস্যা নেই, আমাদের কারো কিছু নিয়ে ভবার প্রয়োজন নেই।
সব ঠিক আছে।
কিন্তু তারপরও …তোমাকে ছাড়া সব কিছু বড় বিরান লাগে মা।
পনের বছর বাবাহীন সময়ে তুমি পাশে ছিলে। তোমার কষ্ট জানাওনি কখনো। শক্তি হয়ে থেকেছো পাশে। এখন কে থাকবে তেমন করে।