সরকারকে হুমকি দিয়েছেন ডক্টর কামাল হোসেন

প্রকাশিত: ২:২৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০১৮

সরকারকে হুমকি দিয়েছেন  ডক্টর কামাল হোসেন

সরকারকে হুমকি দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ডক্টর কামাল হোসেন।
সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সাত দফা দাবি সরকার মেনে না নিলে ভবিষ্যতে ‘বিচার’ করবেন তারা ।

শনিবার চট্টগ্রামে এই নতুন জোটের দ্বিতীয় জনসভায় এ কথা বলেন তিনি । কামাল হোসেন বলেন , “আজকে জনগণ ৭ দফার পক্ষে হাত উঠিয়ে গণরায় দিয়েছে। সিলেটেও গণরায় দিয়েছে। সরকারকে বলব , সময় থাকতে ৭ দফা দাবি মেনে নিন। না হলে এটা অমান্য করার জন্য বিচার হবে।”

নির্বাচন সামনে রেখে গত ১৩ অক্টোবর কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়, যার সঙ্গে আছে আসম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য।

সংসদ ভেঙে, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে ‘নিরপেক্ষ’ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি রয়েছে এই সাত দফার মধ্যে, যার একটিও মানা হবে না বলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

কামাল হোসেন বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ২০১৫ সালে আরেকটা নির্বাচনের কথা থাকলেও সরকার সেটা করেনি। এটাকে ‘ঘোরতর অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে এজন্য জবাবদিহি আদায় করা হবে বলে মন্তব্য করেন এই সংবিধান প্রণেতা।

তিনি বলেন, “ইনশাল্লাহ এবার আমাদের ৭ দফা দাবি না মানলে এটা অমান্য করার জন্য বিচার হবে। ২০১৪ সাল থেকে সংবিধান লঙ্ঘন করার জন্য যে জবাবদিহিতা সেটাও জনগণ আপনাদের কাছ থেকে আদায় করে ছাড়বে।”

সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এই ৭ দফা দাবি আদায় করে তবেই আমরা ঘরে ফিরব । ”

বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে হাজার হাজার মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করে ফখরুল বলেন, “আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এসব করে লাভ হবে না, জনগণ জেগে উঠছে।

“সবাই এগিয়ে আসুন, আন্দোলনের দিকে আমরা এগিয়ে যাই। ইনশাল্লাহ বিজয় আমাদের হবেই হবে।”

নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা

# অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।

# গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

# বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

# কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল করতে হবে।

# নির্বাচনের ১০ দিন পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্য্ন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে।

# নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ভোট কেন্দ্র, পোলিং বুথ, ভোট গণনাস্থল ও কন্ট্রোল রুমে তাদের প্রবেশের ওপর ওপর কোনো ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ না করা এবং নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উপর যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে।

# তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা এবং নতুন কোনো মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

নুর আহমেদ সড়কে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোগে ৭ দফা দাবিতে এই সমাবেশ হয়। সড়কের এক পাশে ফুটপাতে ছোট মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জনসভায় মানুষের সমাগম ঘটে। বেলা ২টায় শুরু হওয়া এই সমাবেশ শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৫টায়।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এটি দ্বিতীয় জনসভা। প্রথম জনসভা হয় গত ২৪ অক্টোবর সিলেটের রেজিস্টারি মাঠে।

জনসভার মঞ্চে লেখা ছিল- “অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি’। মঞ্চের পাশে টানানো হয়েছে ‘খালেদা জিয়া ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মুক্তি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রায় বাতিলের দাবি’ সম্বলিত ডিজিটাল ব্যানার।

জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে আসা নেতা-কর্মীদের কারো কারো হাতে রয়েছে কারাবন্দি খালেদা জিয়া, যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী, মহানগর সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, ভারতের মেঘালয়ে বন্দি সালাহ উদ্দিন আহমেদসহ স্থানীয় নেতাদের ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড। দাবি আদায়ে জনসভা হলেও নেতা-কর্মীদের হাতে ধানের শীষের ছড়াও দেখা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, “আমাদের ৭ দফা মানা ছাড়া, আমাদের সাথে আলাপ করা ছাড়া তফসিল যদি ঘোষণার করেন, তাহলে বুঝব যে, আপনি ও আপনার সরকার নির্বাচন বানচাল করতে চান। আমরা নির্বাচন করতে চাই, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে চাই।

“সরকারকে বলব, নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করবেন না। তফসিল ঘোষণা আলোচনা না করে করলে, দেশের ১৬ কোটি মানুষকে যদি সংকটের ভেতরে ঠেলে দেন, এর সমস্ত দায়-দায়িত্ব আপনাদের বহন করতে হবে।”

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “ওরা (সরকার) বলে তোরা যতই দাবি দিস, ৭ দফা ১১ দফা- আমরা মানবো না। আর আমরা চট্টগ্রামে বলতে এসেছি, দাবি মানতে হবে। ওরা বলছে, আমাদের অধীনেই নির্বাচন হবে, আমরা সরকারে থাকবো, আমাদের কেউ পরিবর্তন করতে পারবো না। আর আমরা বলতে এসেছি, তোমাদের অধীনে নির্বাচন হবে না।

“আমরা সমস্ত জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তোমাদেরকে গদি থেকে নামিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করব। এই আন্দোলনের আহ্বান জানাতে আমরা এখানে এসেছি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সরকার জাতীয় ঐক্য ও জনগণকে ভয় পায়। আজকে যে ক্রান্তিকাল তা থেকে উত্তরণের নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে হবে। বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্ররা বলেছেন, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে।

“দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপিসহ বিরোধী দল ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না।”

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, “এই ঐক্যের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করব সংলাপে বসার জন্য এবং সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন একটা নিরপেক্ষ সরকার করে তার অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা নাহলে দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে।”

মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে ও জেলার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এসএম সাইফুল আলম ও বিভাগীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশীদের পরিচালনায় জনসভায় বিএনপির মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, আমানউল্লাহ আমান, ফজলুর রহমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, সুকোমল বড়ুয়া, গোলাম আকবর খন্দকার, এসএম ফজলুল হক, মাহবুব উদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, আওম শফিকউল্লাহ, একেএম জগলুল হায়দার আফ্রিক, জানে আলম, জেএসডির তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, বেলাল আহমেদ, শফিক উদ্দিন স্বপন, গোলাম জিলানী, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, সোহরাব হোসেন, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর আহমেদ ও আবম মোস্তফা আমিন বক্তব্য দেন।

গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ২০ দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, সাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) আহসান হাবিব লিংকন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাবেক সাংসদ জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, শাহজাহান চৌধুরী, ওয়াদুদ ভুঁইয়া, লুৎফর রহমান কাজল, গাজী শাহজাহান জুয়েল, ম্যামা চিং, রেহানা আখতার রানু, নুরে আরা সাফা, সাকিলা ফারজানা, কোরবান আলী, আবু সুফিয়ান, ভিপি নাজিম উদ্দিন ও শাহ আলমও বক্তব্য দেন।

জনসভায় উপস্থিত ছিলেন খেলাফত মজলিসের এমএ রকিব, মাওলানা মজিবুর রহমান, বিকল্পধারা একাংশের মহাসচিব শাহ আহমেদ বাদল, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা শওকত আমীন, গণফোরামের মোশতাক আহমেদ, নাগরিক ঐক্যের জাহিদুর রহমান, গণফোরামের রফিকুল ইসলাম পথিক, বিএনপির ফরহাদ হালিম ডোনার, মামুন আহমেদ, সানাউল্লাহ মিয়া, দীপেন দেওয়ান, নাজিমউদ্দিন আলম, শামীমুর রহমান শামীম, মীর হেলাল উদ্দিন, কাদের গনি চৌধুরী, রফিক শিকদার, আনোয়ার হোসেইন, নুরুল ইসলাম খান নাসিম, চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান ও শামসুদ্দিন দিদার ।