সরকারের অস্থিতিশীল সিদ্ধান্তে ভোগান্তিতে শ্রমিকরা

প্রকাশিত: ৩:০৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২১

সরকারের অস্থিতিশীল সিদ্ধান্তে ভোগান্তিতে শ্রমিকরা

মাহমুদ এইচ খান, ঢাকা:


৫ আগস্ট পর্যন্ত কলকারখানা বন্ধ রেখে কঠোর লকডাউন পালনের কথা জানিয়েও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে ঠিকে থাকতে পারেনি সরকার। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের চাপের মুখে বিধিনিষেধের মধ্যে রোববার থেকে গার্মেন্টসহ রপ্তানিমুখী সব শিল্পকারখানা খুলে দেয়ার কথা বলা হয়।

 

এর ফলে যারা কলকারখানা বন্ধের ঘোষণা পেয়ে ঈদে বাড়ি ফিরেছিলেন তারা কঠোর বিধিনিষেধে ঢাকায় ফিরছেন। পথে পথে নানা সংকটে কর্মস্থলে ফেরার জন্য ভোগান্তিতে পড়েছেন শ্রমিকরা। বিধিনিষেধের মধ্যে রাজধানীতে ফেরা মানুষকে পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি, সেই সঙ্গে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। কারখানা খোলার খবরে শুক্রবার রাত থেকেই ঢাকামুখী হয়েছেন মানুষ।

 

আজ শনিবার (৩১ জুলাই) সকাল থেকে সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের প্রবেশপথ ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজে বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকাপভ্যানে এসে নামছেন মানুষ।  রিকশা ও পিক-আপ ভ্যানে করে মানুষ রাজধানীতে ঢুকছে। দলে দলে হেঁটেও ঢাকায় ঢুকছে মানুষ।

হেঁটে-রিকশা-ভ্যানে এখনো ঢাকায় ফিরছে মানুষ

 

রাজধানীর খিলক্ষেতে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন রাজু মিয়া। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (১ আগস্ট) থেকে গার্মেন্টস খুলবে। অফিস থেকে বলে দেয়া হয়েছে যেকোনো ভাবে কাজে ফিরতে নতুবা চাকরি থাকবে না। এই চাকরি চলে গেলে না খেয়ে মরতে হবে তাই বাধ্য হয়ে লকডাউনের মধ্যেই ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে। তাই রাস্তায় বাস নেই। ছোট ছোট গাড়িতে ভেঙে ভেঙে এসেছি। ভাড়া তো বেশি দিলামই তারপরও সকাল থেকে কত পথ হাঁটতে হয়েছে হিসেব নেই।’

 

একটি গার্মেন্টসে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন ফরিদপুরের আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন- ‘আমাদের নিয়ে কারোর নির্দিষ্ট ভাবনা নেই। মালিক তো কোনোদিন আমাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ভাবে না, সরকারও ভাবে না। লকডাউন শেষের আগেই গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হলো। সাধারণ শ্রমিকেরা কীভাবে ফিরবে? সেটা সরকার চিন্তা করল না। আমার ঢাকায় ঢুকতে টাকা খরচ হয়েছে ১৯ শ টাকা। এই টাকা আমি ঋণ করে নিয়ে বের হয়েছি। আমার তা আয় করতে ১ সপ্তাহ শ্রম দিতে হবে।’

 

দুপুর ২ টার দিকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে সাইনবোর্ড থেকে যাত্রাবাড়ীর দিকের সড়কে মানুষের সারি দেখা গেছে। লেগুনা, রিকশা ও ভ্যানে মানুষ যাত্রাবাড়ীর দিকে আগাচ্ছেন। যানবাহনের অভাবে বেশিরভাগ হেঁটেই যাচ্ছেন গন্তব্যে।

 

আসফাক জামিল হবিগঞ্জ থেকে ঢাকা ফিরেছেন। তিনি রেডটাইমসকে বলেন- ‘আমাদের বলা হয়েছিল আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। আমাদের ঈদের ছুটিতে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। এখন সবকিছুতে লকডাউন রেখে কারখানা খুলে দেয়া হলো। রাস্তায় গাড়ি নেই আমরা ঢাকায় ফিরব কিভাবে? আমাদের ভোগান্তি নিয়ে কারো চিন্তা নেই কেন? কেন বারবার এই অব্যবস্থাপনায় আমাদের বিপদে ফেলা হচ্ছে?’

 

 

জনস্রোতে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি:

খবর নিয়ে জানা গেছে করোনার কারণে সরকার ঘোষিত লকডাউনে লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকায় বাংলাবাজার ঘাট থেকে ফেরিতে চড়ে শিমুলিয়া ঘাটে আসছে যাত্রীরা। বাংলাবাজার ঘাট থেকে ছেড়ে আসা ফেরিতে গাড়ির তুলনায় মানুষই বেশি আসছে। এতে উপেক্ষিত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি।

 

মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক সালাউদ্দিন জানান, লকডাউনে ফেরি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও যাত্রীদের চাপে এই নৌরুটে চলাচল করছে ৮ টি ফেরি। এই ফেরিগুলোতে যানবাহনের চেয়ে যাত্রীদের চাপ কয়েকগুণ বেশি।

 

এছাড়া ঢাকায় ঢুকার প্রত্যেক সড়কে জনস্রোত দেখা গেছে। যানবাহনের অভাবে গাঁয়ে গাঁ লাগিয়ে মানুষ হেঁটে রওয়ানা হচ্ছেন গন্তব্যে।

 

সাইনবোর্ড চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) আয়ান মাহমুদ দীপ বলেন, ‘এত মানুষের ভিড় আর দেখিনি। আজ ঢাকাগামী মানুষের ঢল নেমেছে। কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। আমাদেরও কিছু করার থাকছে না! এত মানুষ কীভাবে আটকাবো! এরা সবাই গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক।’

 

রাজধানীতে কৌশলে প্রবেশ করছে মানুষ

 

অস্থিতিশীল সিদ্ধান্তের কারণ-

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমাতে ঈদের পর ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৪ দিন সব ধরনের শিল্প-কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। শুরুতেই এই সিদ্ধান্তের দ্বিমত জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

 

কারখানা বন্ধ হতে পারে এমনটা টের পেয়ে আগেই ১৫ জুলাই মন্ত্রীপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করে পোশাক কারখানা খোলা রাখার অনুরোধ জানান ব্যবসায়ীরা। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে চিঠিও দেন তারা।

 

তার দুইদিন পর আবারও গার্মেন্টসসহ সব ধরনের শিল্পকারখানা খুলে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ জানায় ব্যবসায়ী নেতারা। সচিবালয়ে মন্ত্রীপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর অনুরোধ জানান তারা। তারপরও ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৪ দিন সব ধরনের শিল্প-কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

 

এমতাবস্থায় বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) বিধিনিষেধের মধ্যে শিল্প-কারখানা খুলে দিতে সরকারের কাছে আবারও অনুরোধ জানান মালিকরা। সচিবালয়ে মন্ত্রীপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ অনুরোধ জানান তারা। এসময় তারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করেন।

 

এর পর শুক্রবার (৩০ জুলাই) আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে রপ্তানিমুখী সব শিল্প প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার কথা বলা হয়।

 

এতে বলা হয়, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রোববার অর্থাৎ ১ আগস্ট ভোর ৬টা থেকে রপ্তানিমুখী সব শিল্প ও কলকারখানা আরোপিত বিধিনিষেধের আওতা বহির্ভূত রাখা হলো।

 

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930