ঢাকা ২৪শে জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৭ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্ট : গন্তব্য কি গলিপথ?

redtimes.com,bd
প্রকাশিত জুলাই ১০, ২০২৪, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ
সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্ট : গন্তব্য কি গলিপথ?

 

সরওয়ার আহমদ
শুভ উদ্যোগ কিভাবে অশুভের খপপরে পড়ে বিতর্কিত এবং দিকভ্রান্ত হয় তার জল্ন্ত উদাহরণ বোধহয় সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্ট।দেশের কর্ম্মরত সাংবাদিকদের আর্থিক দূরবস্থার কথা চিন্তা করে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন এবং তার অনুকূলে বরাদ্দ নিশ্চিত করণকে অবশ্যই শেখ হাসিনা সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ বলতে হবে।
নেশাকে পেশা হিসেবে গণ্যকরে যারা সাংবাদিকতার মতো বন্ধুর পথ পরিক্রমণকে ব্রত হিসেবে ধরে নিয়েছেন,তাদের জীবনে প্রাপ্তি অপ্রাপ্রাপ্তির যোগ বিয়োগ খতিয়ে দেখার অবকাশ ক’জনার আছে? বিশেষতঃ মফস্বলে যারা এই পেশার আদর্শিক পথ অবলম্বন করেছেন,বেলাশেষে তাদের ভান্ড হাতড়ালে অশ্বডিম্ব ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা কম।একজন কায়িক শ্রমিক তার পরিশ্রমের বিনিময়ে দিনশেষে নির্ধারিত মজুরী নিয়ে ঘরে ফিরে।পক্ষান্তরে একজন সংবাদকর্ম্মী দিনের পর দিন দৌড়ে মাসশেষে কি পেলো এবং তাদিয়ে তার খরপোষ কিভাবে চলে তা খতিয়ে দেখার অবকাশ কি নিয়োগদাতা পক্ষ বা অন্যকারোর আছে? ভারবাহী হিসেবে সংবাদকর্মীকে পেছনথেকে খোঁচা মেরে পথ চলার নিরন্তর প্রয়াশের বিপরীতে প্রাপ্তিয়োগতো যৎসামান্য।পথ চলার গতি যদি শ্লথ হয়ে যায় তাহলে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়ার রেওয়াজ এখানে মুখ্য।কিন্চিৎ ব্যতিক্রম সাপেক্ষে মফস্বল সাংবাদিকদের এটাইতো ললাট লিখন।
নেশার বশে আচরিত পেশার তকমা ধারণ করে স্ত্রীর শ্লেষবাক্য সন্তানদের অপ্রাপ্তিজনিত ভৎসনা এবং অমোচনীয় অভাবের বেষ্ঠনির মধ্যে নিজেকে অসহায় গণ্যকরার প্রতিচ্চবির নামই হচছে মফস্বল সাংবাদিক।এমতাবস্থায় অস্বচ্ছল রোগাক্রান্ত এবং অক্ষম সাংবাদিকদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষে গঠিত সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্ট একটি ভরসাস্থল হিসেবে গণ্য হবার কথা।কিন্তু দশচক্রে ভগবান ভুতের সমাজব্যবস্থার কারণে ঘি হয়ে যায় বিষ এবং অমৃত হয়ে উঠে গরল।এহেন প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্ট সরল সোজা পথ ছেড়ে গলিপথ ধরলে আশ্চর্য্য হবার কি আছে?
প্রাসঙ্গিক যে সরকারি সদিচছাকে এদেশে বিতর্কিত করার নজির আছে অনেক। সরকার বয়স্ক ও বিধবা ভাঁতা প্রবর্তনের পর তানিয়ে খেলার কমতি হয়নি।প্রাথমিকভাবে বয়স্ক ও বিধবা চিহ্নিত করার দায় যাদের উপর বর্তে ছিলো তারা বয়স্ক ও বিধবা খুঁজতে গিয়ে নিজের খেশকুটুম্ব ও সমর্থককে চিহ্নিত করেছিল প্রকৃত হকদারকে দূরে ঠেলে দিয়ে।ভাতার কিয়দংশও নিজেদের পকেটস্থ করেছিলো।সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্টের গুণধররা সেপথ অনুসরণ করলে লাভ বৈ ক্ষতি কিসে?এলিট এ ট্রাষ্ট নিয়ে ঘাটাঘাটিতো হবেনা ,এটাই তাদের ধারণা।তার পরও প্রশ্ন আসবে।কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান কি বিধি মোতাবেক হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাব হয়তো মিলবেনা।তবে কোন কিছুই অনুসন্ধানের বাইরে নয় এবং তাতে খোলনলচে পরিস্কার হয়ে উঠে।
সাংবাদিক কল্যানকে কার্য্যকর করার নিমিত্তে একটি পৃথক সংস্থা গঠিত হয়েছে একজন এম ডির নেতৃত্বে।অনুদান নিশ্চিতের জন্য তথ্যমন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি কমিটীও গঠন করে দেওয়া হয়েছে।অনুদান প্রত্যাশীদের জন্য নির্দিস্ট ফরমেটও আছে।ফরমেট অনুযায়ী আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট জেলা কিংবা উপজেলা প্রেস ক্লাবের অথবা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বা সম্পাদকের এবং জেলা প্রশাসকের সুপারিশ সহ আবেদন করে থাকেন।বলা বাহুল্য মিডিয়া এবং সাংবাদিকের আধিক্যহেতু অনুদান প্রত্যাশীদের আবেদন জমা পড়ে হাজার হাজার।এগুলো খতিয়ে দেখার অবকাশ কি কল্যাণ ট্রাস্টের আাছে? এমতাবস্থায় মুখ চিনে মুগের ডাল বন্টনের নীতি এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
কল্যাণ ট্রাস্টের এম ডি হিসেবে এখানে নিয়োগ পেয়েছেন অজ্ঞাত কূলশীল এক চন্দ।অভিযোগ আছে -অনুদানের ক্ষেত্রে তিনি নীজ গোত্র বা জ্ঞাতিকেই প্রাধান্য দেন এবং খুঁজে বেড়ান।চামড়া রক্ষার্থে জাতীয় প্রেসক্লাবের আড্ডা ও তোষামোদকেই প্রাধিকার দিয়ে আসছেন।অন্যদিকে যাচাই বাছাই কমিটীতে আছেন বিভিন্ন সাংবাদিক ইউনিটের ২/৩ জন নেতা।যারা দেশের না হলেও বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতৃত্বে রয়েছেন। উল্লেখিত ৪/৫ জনই অনুদান নিশ্চিতের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন।অনুদানের ক্ষেত্রে এম ডির তালিকা এবং নেতাদের তালিকাই অনুমোদিত হচ্ছে বলে গুন্জন রয়েছে। এখানে দরখাস্ত আহব্বান হচছে আইওয়াশ সমতুল্য।আবেদন হামাগুড়ি খায় অফিসের সেল্ফে।
উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় এম ডির গোত্র এবং নেতাদের চয়েসম্যান ব্যতীত প্রত্যন্ত অন্চলের সাংবাদিকদের ভাগ্যে বরাদ্দ কতটুকু জুটছে?জেলা কিংবা বিভাগীয় কোটা কতটুকু অবলম্বিত হচছে? আমার জানা মতে সিলেট বিভাগে এপর্য্যন্ত দশজন সাংবাদিকও অনুদান পাননি। অন্যদিকে আরও একটি বিষয় নিয়ে কৌতুহল ডানা মেলেছে।বরাদ্দ নিশ্চিতের জন্য অজ্ঞাত ফোন থেকে দরকষাকষিও হয়।হবিগন্জের শোয়েব চৌধুরী এবং আমার নিকটও এধরণের ফোন এসেছিলো। তাতে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসে -দরকষাকষি এবং অগ্রীম কমিশনের ভিত্তিতেই কি বরাদ্দ নিশ্চিত হচছে?
ট্রাষ্টের লুকোচুরির ব্যাপারে এখানে নিজের একটি অভিজ্ঞতার প্রসংগ টানতে হচছে।গত বছরের শেষ দিকে গিয়েছিলাম পি আই বি অফিসে।ডিজি জাফর ওয়াজেদ আমার বন্ধুজন। আমার লিখা “জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তি যুদ্ধে মৌলভী বাজার ” শীর্ষক গ্রন্থটির ২য় সংস্করণটি তার হাতে তুলে দেওয়াটাই ছিলো মুখ্য উদ্দেশ্য। বই দেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন পাশের সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের এম ডি কেও একটি বই দেওয়ার জন্য।সেমতে এম ডি সুভাষ চন্দ বাদলকে নিজ পরিচয় ব্যক্ত করে একটি বই দেই।তিনি আমার স্বাস্থের খবর নিলেন।বলেছিলাম ,অন্যান্য উপসর্গ তেমন কাবু করতে না পারলেও দাঁত নিয়ে সমস্যায় আছি। তার কারণ ব্যক্ত করতে গিয়ে ফিরে যাই ৭১ সনে। ৭১ সনের জুলাই মাসে কলেজ (কলেজে তখন ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থাকায় অস্থায়ী ভাবে ক্লাস হতো সরকারি উচচ বিদ্যালয়ে )থেকে ফিরে আসাকালে আমরা ৬/৭ জন ছাত্রকে সামরিক ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় কুলাউড়া রোড সংলগ্ন আশ্রাকাপন ব্রীক ফিল্ডে।তখন ব্রীক ফিল্ড থেকে ইট সরবরাহ করা হচ্ছিল বাংকার নির্মানের জন্য।ট্রাকে আরও মানুষজন তখন কাঁধে বোজা নিয়ে ইট ভরছিলো। আমাদেরকেও বলাহলো একটি ট্রাকে বোজা দিয়ে ইট ভরার জন্য। উর্দুতে কথা বলতে পারিনা বিধায় পান্জাবী সুবেদারকে ইংরেজীতে বলেছিলাম ষে -আমরা এ কাজে অভ্যস্থ নই। পারলে অন্য কাজ দেও।সুবেদারকে ইংরেজী বলায় সে ভেবেছিলো তাকে গালিগালাজ করছি। অমনি সপাং করে মুখে চারটি ঘুষি এবং কোমরে লাথি। সহ্য করতে নাপেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।ভাগ্যিস ,ঐসময়ে এক জেসিও এসেছিলো ফিল্ড পরিদর্শনে। অবস্থা বিবেচনা করে সে আমাদেরকে গাড়ীতে তুলে ফিরে আসার পথে মনুব্রীজে নামিয়ে দিয়েছিলো। তখনও আমার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিলো। নিকটবর্তী একটি ফার্মেসীতে গিয়ে ডেটল সংযোগে পানি দিয়ে কুললী করে প্রয়োজনীয় ঔষধ গ্রহন করেছিলাম। নি র্ঘাত মৃত্যুর চেয়ে ঘুষিকে তখন অনেক ছোট মনে হয়েছিলো।। ডাক্তার বলেছিলেন -এ দাতের আয়ু কমে গেছে ঘুষির প্রকোপে।এখন বুঝতে পারছি অবস্থা। উপরের পাটী উঠে গেছে। নীচের পাটীর ৭ টি দাতও পড়ে গেছে। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দাত প্রতিস্থাপন করলেও তা টেকসই নয়।উন্নত মানের দাত বাঁধাতে হবে। চন্দ বাবু আমার এ অতীত ঘটনা শুনে বলেছিলেন -ঠিক আছে ,আমরা এ ব্যবস্থা নেবো। আপনি কলাণ ট্রাস্টের বরূবরে আবেদন করুন।
মৌলভী বজারে ফিরে এসে নিয়ম মাফিক আবেদন করেছিলাম। আমার সাথে শ,ই, সরকার জবলুও একটি আবেদন করেছিলো।পাঁচ মাস পরে আবেদনটির খবর জানতে চাইলে বাদল চন্দ বলেছিলেন ,আগের আবেদনের ফয়সালা হয়েগেছে। যারা পাবার তারা পেয়ে গেছে। ২০ মে তারিখের ভেতরে নতুন ভাবে আবেদন করুন ,চেষ্টা করে দেখব।এবার জুন মাসের মধ্যেই বন্টন নিশ্চিত হয়ে যাবে।চন্দের ফাঁন্দে পড়ে এই বুড়া বয়সে ললিপপের লোভে আবার আবেদন করলাম।এবার আর ডাকযোগে নয় ।জবলু তার আবেদন সহ আমারটি সরাসরি ধরিয়ে দিয়ে আসলো সুভাষ চন্দ বাদলের হাতে। এখন অপেক্ষার পালা।জুনের ২০ তারিখের পর চন্দ বাবুকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন বরাদ্দের চেক পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রত্যেক জেলার ডি সির নিকট। ডি সি অফিস জানালো, এবারে জেলা থেকে ২১ টি আবেদন গিয়েছিলো।কারো ভাগ্যে জুটেনি। আগের বার গিয়েছিলো ষাটটিরও অধিক। সেবারও ছিলো একই দশা। জবলু অতিমাত্রিক আবেগী। সে বলেছিলো -আর কেউ পাক না পাক ,আপনি পাবেনই। সাংবাদিকতা ছাড়াও আপনার বাড়তি একটি যোগ্যতা আছে এবং সেটি হচ্ছে মুক্তি যুদ্ধ নিয়ে ঘাটাঘাটি।তার কথা শুনে হেসেছিলাম। বলেছিলাম ,আমার মতো আরেক বুড়া আছে সিলেটের আ ফ ম সাঈদ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারও ঘাটাঘাটি আছে অনেক। আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইও আছে। তাঁর ভাগ্যেও ট্রাস্টের বরাদ্দ জুটেনি আবেদন করার পরও।
এখানেতো আবেদন খতিয়ে দেখার কোন বালাই নেই। বরাদ্দ নিশ্চত হয় তদবির এবং চ্যানেল ভিত্তিক
তাই যোগ্যতা যথার্থতা এবং প্রাধিকার হামাগুড়ি দেয় অনীহার অন্ধকারে।। এই অনিয়ম এবং অনাচারের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত না হলে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট প্রকৃত এবং ভুক্ত ভোগী সাংবাদিকদের নিকট নির্লজ্জ পরিহাস হয়েই থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031