সাংবাদিক নির্যাতনের নেপথ্যে ?

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩, ২০১৮

সাংবাদিক নির্যাতনের নেপথ্যে ?

মাহমুদ এইচ খান: সাংবাদিক নির্যাতনের পর এক সাংবাদিক নেতা থানায় গেলেন। ‘ স্যার ভয়ের কোন কারণ নেই ওই যাকে পিটাইছেন তার কোন শেল্টার নেই। আমি দেখছি ওঠা আপনি চিন্তা করবেন না। সে বড় কোন সাংবাদিক না।’

‘আচ্ছা সেদিন যে জায়গাটার দখল উচ্ছেদ করে দিতে বলেছিলাম তা কি হলো স্যার’? এই বলে তেলমর্দন শুরু করলেন নেতা। শুরু হল পেশাগত রাজনীতির খেলা। প্রতিপক্ষ সাংবাদিক গোষ্ঠিকে তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য।

অত:পর বুকেপিঠে সাহস নিয়ে ওই ওই পুলিশ কর্মকর্তা খুঁজতে লাগলেন আর কোন সাংবাদিক আছে যে তাকে তেল মারে না উল্টো অনিয়ম করলে রিপোর্ট লিখে দেয়। সেই তালিকায় পড়ে গেলাম আমি কিংবা আরো দু’একজন!

এমন বাস্তব চিত্র দেশের সাংবাদিক অঙ্গনে। ছোটমুখে বড় কথা বলছি হয়তো। যার পরিনতি আমার জন্য অপেক্ষা করছে সাংবাদিক নেতাদের উস্কে দেয়া ‘পুলিশ কর্তৃক ইয়াবা ব্যবসায়ী কিংবা চোর বানিয়ে নির্যাতন’ করা। তা মেনে নিতেই হবে নেতার দেয়া উপহার হিসেবে। তবে কথাটা মিথ্যা নয় তার প্রমাণ পেয়েছি এই লেখার ইন্ট্রো-টা ফেসবুকে প্রকাশ করে। অনেক জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা এর পক্ষে মত দিয়েছেন। কেউ ইনবক্সে আর কেউ প্রকাশ্যে কমেন্ট বক্সে।

আমাদের দেশে যে পরিমান সাংবাদিক নির্যাতন হয়েছে গত বছরের তার ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে সিনিয়র সাংবাদিকদের ইন্ধন পাওয়া গেছে। এখানে দু’টো কারণ রয়েছে। প্রথমতো তাদের আনুগত্য না করা। দ্বিতীয়ত দুর্নীতি নিয়ে লেখার ফলে তাদের ভাগে ভাটা পড়া। এখানে বলে রাখা ভাল যে সবাই এরকম নয় কিন্তু। আমার সাংবাদিকতায় যেমন পাচাটা সাংবাদিক পেয়েছি তেমনই স্পষ্টবাদী অনেককে পেয়েছি। এখনো তাদের নিয়ে শান্বিত হওয়া যায়।

বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক এই পেশায় যেমন বেড়েছে হলুদ সাংবাদিকদের সংখ্যা তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকতা। এক্ষত্রে হলুদ সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য যেহেতু ভিন্ন সুতরাং তাদের প্রশাসনের প্রয়োজন খুব। অপরাধ ঢাকা দিতে যেহেতু সাংবাদিক পরিচয় বহন করছেন সেহেতু তারা তেলিবাজিতে এগিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী তাদের যেসব শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার কথা ছিল তা প্রয়োগ করা হচ্ছে মূলধারার সাংবাদিকদের উপর। এর কারণ এরা পাচাটা ‘জ্বি স্যার’ হতে পারেনা। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার ধৃষ্টতা রেখে পথ চলে। যার জন্য এরাই অপরাধীদের আতঙ্ক। আর আতঙ্ককে দমানোর জন্য তাদের জন্য পালটা আতঙ্ক তৈরি করা গেলে তা ভাল কাজ দিবে। এমন ধারণা থেকে পুলিশ কিংবা বিভিন্ন অপঅপরাধী কর্তৃক সাংবাদিক নির্যাতন বাড়ছে। কিন্তু প্রকৃত পেশাদারিত্ব নিয়ে যারা সাংবাদিকতা করেন তাদের কাছে আগ থেকেই ‘সত্য প্রকাশের পরিণতি’ স্পষ্ট থাকে। তাদের ধমানো যায়নি,যাবেও না।

সত্য প্রকাশে সাংবাদিক কেন সাংবাদিকের বাধা তা স্পষ্ট হয়ে গেছেন আপনারা। তবে সাংবাদিক নির্যাতনে সাংবাদিক নেতাদের ইন্ধন কেন থাকছে? এমন প্রশ্নের জবাব একটাই যে স্বার্থ। আমাদের দেশের অধিকাংশ সাংবাদিক নেতারা নানা ব্যবসা বাণিজ্য করেন তা ভাল। কারণ মফস্বলে পেশাদার সাংবাদিকদের কষ্টকর দিনাতিপাত করতে হয়। এর জন্য কর্পোরেট মিডিয়াগুলোর কর্মী বৈষম্য দায়ি। সে প্রসঙ্গে না আসি। সেই সাংবাদিক নেতারা যখন তাদের ব্যক্তিগত কাজ করতে পুলিশের শরণাপন্ন হচ্ছেন নিজের স্বার্থ হাসিলে পুলিশকে ব্যবহার করছেন তখন পুলিশকেও সহযোগিতা করা তার কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সে কর্তব্য কি? পুলিশের ঘুষ,নির্যাতন, চোরাচালান, মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অপকর্ম প্রকাশ না করা। বিনিময়ে পার্সেন্টেজ পাচ্ছেন সাংবাদিক নেতারা। কিন্তু যখন কোন আপোষহীন ব্যক্তিত্ব সেই সব জায়গায় খুঁচা দেয় তখন পুলিশের মাথা খারাপ। পুলিশের মাথা খারাপ মানে সাংবাদিক নেতার ব্যর্থতা। কারণ তিনি সাংবাদিকদের তা প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

যখন নেতা দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ তখন তার নানা কাজে পুলিশের সহযোগিতা ও অবৈধ কাজের পার্সেন্টেজ বন্ধ। তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত দু’জনই। তখন প্রথমে সত্য খুঁজে বের করা সাংবাদিককে অর্থের লোভ দেখানো। আগ থেকে যদি জানেন যে সে সৎ আপোষ করবেনা। তাহলে সোজা তাকে ফাঁসিয়ে দেয়া। নতুবা হাড্ডি ভেঙ্গে দেয়ার পরিকল্পনা এমনকি হত্যা করার কথা ভাবেন। সাংবাদিক নেতার অভ্যন্তরীণ সহযোগিতায় বুক ভরা সাহস নিয়ে পুলিশ তার অমানবিক চেহারা নিয়ে লেগে পড়ল সাংবাদিকের পেছন। ফলাফল দাড়ালো ইয়াবা ব্যবসায়ী সাজিয়ে অপমান ও বন্ধি করা। সংবাদ প্রকাশের সময় ‘গুপ্তচর’ তকমা দিয়ে কথিত আইনে তাকে মামলা দিয়ে হয়রানী করা। গ্রেফতার করে নির্যাতন করা। নতুবা তাকে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেয়া।

সাংবাদিকতাকে জাতির বিবেক বলা হয়। কিন্তু সেই বিবেককে কাজে লাগানোর সুযোগ কমছে দিনকে দিন । যখন কেউ সত্য সংবাদ প্রকাশ না করে বসে থাকছে তখন সে ভাল সাংবাদিক। আর যে অপকর্ম নিয়ে কলম ধরবে সে হবে অপরাধী। প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন পুলিশকে ম্যানেজড করে। সেখানে আপনি সত্য বলবেন তা মানতে পারবে আশপাশ? যেখানে খারাপের সংখ্যা বেশি সেখানে আপনার করা ‘ভাল কাজ’ তাদের কাছে খারাপ হয়ে যাচ্ছে আর আপনার প্রচার সেভাবে বেড়েছে ‘খারাপ সাংবাদিক বলে’ নতুনা অখ্যাত কোন সাংবাদিক। আর যিনি ঘি মর্দনের পারদর্শী তিনি সর্বজন প্রিয় এবং খ্যাতিমান, তাদের সবাই জানে ভাল।

আমার এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। মাস ছয় আগের কথা। পরিবেশ দূষণ ও নদী পাড় কাটছেন প্রভাবশালী মহল। আর অবৈধভাবে এসব মাটি নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটাগুলোতে। এমন তথ্যে ভিত্তিতে সংবাদ সংগ্রহে জন্য সেখানে যাই। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এক ইটভাটার মালিকের কাছে যাই তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের ব্যাপারে মন্তব্য নিতে। প্রথমে বেশ ভদ্রভাবে আমাকে গ্রহণ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর বেশ সাহসীক কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। আমার হাউজের পরিচয় দেয়ার পর উনি প্রশ্ন করলেন আপনি স্টাফ রিপোর্টার না জেলা প্রতিনিধি? আমি বললাম জেলা প্রতিনিধি। এবার উনি বেশ উপহাস করে বললেন ‘অমুক পত্রিকার তমুক মিয়া স্টাফ রিপোর্টার। চিনেন তাকে? তিনি আমার ক্লোজ মানুষ’। আমি তাকে ভাল করে চিনি ও জানি সেই হিসেবে এবার আমি বললাম ‘ভাই উনাকে আমি ভয় পাই। খবরদার তাকে বলবেন না যে আমি এখানে রিপোর্ট করতে আসছি,নইলে শহরে ঢুকতে পারবনা আমার হাত পা ভেঙে দিবেন’ আমার এই বেঙ্গাচি উত্তরে উনি আরো সাহস নিয়ে আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বললেন। এর আগে হাওরে একটি রিপোর্ট করতে গিয়ে দু’জন পরিচ্ছন্ন সাংবাদিককে একই মানুষের নাম শুনতে হয়েছে। সেখানকার মৎস চাষীরা লোনের সুদ মৌকুফ ও ইজারার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রতিবছর মাছের ভাল উৎপাদন হচ্ছেনা বলে টাকা দিয়ে রিপোর্ট করান ওই স্টাফ রিপোর্টারকে দিয়ে। আমাদের সাংবাদিকিতা এই পর্যায়ে চলছে।

এমন অপকর্ম ঢাকা দিতে একের পর এক সাংবাদিককে নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে আর তাতে সরাসরি ইন্ধন দিচ্ছেন কিছু সংখ্যক সাংবাদিক। এসব কাজে সাংবাদিক থেকে শুরু করে দলীয় নেতারা জড়িত। নিজেদের আখের গুছাইতে পথের কাটা সাংবাদিকদের সরিয়ে দিতে চান তারা। যার পরিণতি আজকে ধারাবাহিক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা। এর বাইরেও সাংবাদিক নির্যাতনের কারণ থাকতে পারে তবে সেক্ষেত্রে আবার সাংবাদিকদের নিরব ভূমিকা হতাশ করে আমাদের। সুতরাং সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ করতে হলে আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অবসান করতে হবে। লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকতা ও পেইড রিপোর্টিং বন্ধ করতে হবে। পুলিশ থেকে শুরু করে অপরাধী গডফাদারদের বিরুদ্ধে সমন্বিত লেখনি চালিয়ে যেতে হবে। যাতে একজন শুধু বলির পাটা না হয়। সাংবাদিকরা ঐক্যবোধ লালন না করলে সর্বশেষ হবিগঞ্জে সাংবাদিক সিরাজুলের মতো আরো অনেককে পাষণ্ড নির্যাতনের শিকার হতে হবে। আর অসাধু সাংবাদিক চক্রকেও মাথায় রাখতে হবে যে যখন তখন তীর ঘুরে নিজেরাই বিদ্ধ হতে পারেন। তাই আসুন পেশাদারিত্বকে পোষণ করে অন্যায় রুখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাই…

 

লেখক: সাংবাদকর্মী ও সংগঠক
ই-মেইল: mahmud.press@gmail.com

Calendar

February 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28  

http://jugapath.com