সাইবার অপরাধ ও অনলাইন মিডিয়া

প্রকাশিত: ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০১৭

সাইবার অপরাধ ও অনলাইন মিডিয়া

সৌমিত্র দেব

অনলাইন মিডিয়ার আরেক নাম সাইবার মিডিয়া । আর এই মিডিয়াকে ঘিরে যে অপরাধ হয় সেটাই সাইবার অপরাধ । সেই আলোচনায় যাবার আগে অনলাইন মিডিয়া নিয়ে একটু কথা বলি । প্রেস মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন গণমাধ্যম। ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এই মাধ্যম তথ্যকে নিমিষেই ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা বিশ্বে। অনলাইন মাধ্যম মানেই অবাধ ও দ্রুতগামী তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত হচ্ছে । আর এই অনলাইন মাধ্যমকে ব্যবহার করে যে সাংবাদিকতার চর্চা হচ্ছে আমরা তাকে অনলাইন সাংবাদিকতা বলি। অনলাইন সাংবাদিকতার সংবাদ প্রিন্ট মিডিয়ার থেকে খুব আলাদা কিছু নয়। এর রচনাকৌশলটা একই রকম। সেখানে প্রতিবেদন রচনায় উল্টা পিরামিড পদ্ধতি অনুসরন করা হয়। ফিচার রচনায়ও প্রিন্ট মিডিয়ারই অনুকরণ। তবে সম্পাদকীয় বা উপ-সম্পাদকীয় বলে তেমন কিছুই থাকে না। তবে কেউ চাইলে সেটা রাখতেও পারেন। কোন কোন অনলাইনে মতামত বিশ্লেষণ বিভাগ থাকে। প্রিন্ট মিডিয়ার দৈনিক সংবাদপত্রের মত অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলা, বিনোদন, পর্যটন, মফস্বল বিভাগ প্রভৃতি বিষয়ের আলাদা পাতা। এছাড়া প্রচ্ছদ পাতা তো আছেই। সেখানে পুরো পত্রিকার স্বাভাবিক চেহারার একটা ছাপ তুলে ধরা হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মত অনলাইন সাংবাদিকতায় ইলেকট্রনিক সংবাদ বা ভিডিও ফুটেজ জুড়ে দেওয়া সম্ভব। তবে বাংলাদেশে ইন্টারনেটে স্পিড কম থাকায় এসব ছবি বা ফুটেজ লোডিং-এ সমস্যা হয়। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াই একটি সংবাদের জন্য সীমাবদ্ধ স্পেস থাকে। কিন্তু অনলাইন সংবাদে অসীম স্পেস থাকায় ইচ্ছামত লেখা ও ছবি সেখানে সংযোজন করা যায়। নতুন সহস্রাব্দের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রচলিত ধারণা ও কৌশলগুলোতে এসেছে নানা পরিবর্তন। অনলাইন সাংবাদিকতায় নারীদের মধ্যে সামনের সারিতে চলে এসেছেন অনেকেই। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক,কমিউনিটি মিডিয়ার সাথে যুগপৎভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে অনলাইন মিডিয়া। ২০১৫ সালের পরে এটাই হবে আমাদের দেশের মূল ধারার গণমাধ্যম। যদিও অনেকে একে এখন ও বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে মনে করছেন।

অনলাইন মাধ্যম বলতে আমরা কী বুঝি? সেই ধারণাটি একটু স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখন চার ধরণের অনলাইন মাধ্যম কাজ করছে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে প্রচলিত মূল ধারার গণমাধ্যম যেমনÑ দৈনিক পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন প্রভৃতির অনলাইন সংস্করণ। প্রচলিত গণমাধ্যমের প্রচারের ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে অনলাইন সংস্করণে তার অবসান ঘটেছে। অনলাইন সংস্করণের মাধ্যমে এর পাঠক, দর্শক বা শ্রোতা পৃথিবীর যেকোন স্থানের হতে পারেন। দ্বিতীয়ত আছে সংবাদ সংস্থা ও শুধু অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। এই মাধ্যমে মুদ্রণ বা রেডিও, টেলিভিশনের চেয়ে দ্রুত গতিতে খবর পরিবেশন করা সম্ভব হচ্ছে। এটি পরিবেশ বান্ধব। কোন কোন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে পাঠক তাতক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করতে পারেন। তৃতীয়ত আছে ব্লগ, সেখানে কোন বিধি নিষেধ নেই। সেই সত্য যা রচিবে তুমি। ব্লগের মাধ্যমে সিটিজেন জার্নালিজমের বা নাগরিক সাংবাদিকতার ধারণাটিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে সেই ব্লগ গুলিরও এডমিন প্যানেল আছে, নীতিমালা আছে। কবিতায় যেমন ছন্দ থাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভেতরেও তেমনি কিছু প্রচ্ছন্ন নীতিমালা থাকে। না হলে সে তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। চতুর্থত আছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যেমন- ফেইসবুক, টুইটার, লিংকডইন, হাই-ফাইভ, ভাইভার প্রভৃতি। অনলাইন গণমাধ্যম এখন সারা বিশ্বে একটি স্বতন্ত্র গণমাধ্যমের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশেও সরকারি পর্যায়ে এই মাধ্যমটি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।
এ অবস্থায় এই সাইবার মিডিয়াকে কেন্দ্র করে যে সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তা নিয়েও আমাদের ভাবনার সময় এসেছে ।
অনলাইন মিডিয়া পরিচালনার জন্য ডোমেইন এবং হোস্টিং নিতে হয় । এই কাজে বরাবরই হোস্টিং কম্পানির কাছে নাজেহাল অনলাইন মিডিয়ার মালিক ও সম্পাদকেরা । এ ব্যাপারে কোন সুষ্ঠু নীতিমালা না থাকায় এই সেক্টরটি জিম্মি হয়ে আছে অই সব কোম্পানির কাছে । প্রচলিত আইনে এদের বিরুদ্ধে কিছু করা যায় না । এ রকমই একজন কুখ্যাত সাইবার অপরাধী শরিফ মাসুম। হোস্টিং করতে গিয়ে প্রথমেই ক্লায়েন্টের ডোমেইন নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায় সে । তারপরেই সেই ডোমেইন জিম্মি করে টাকা আদায় করে । তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় জিডি করা হয়েছে । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে করা হয়েছে লিখিত অভিযোগ । তবু তআর কিছু হয় নি । এ ভাবে আরো অনেক শরিফ ও মাসুম তাদের সুন্দর নামের আড়ালে এই কুৎসিত ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে ।
অনলাইন মিডিয়ার নীতিমালা পাশ করা হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয় নি । এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু সাইবার অপরাধী অনলাইন মিডিয়ার নামে মিথ্যা তথ্য,অপপ্রচার ও চরিত্র হননের কাজে লিপ্ত হয়েছে । এ সব অনলাইনের গায়ে পূর্ণ থিকানা থাকে না । অথচ সে মিডিয়ার নামে তার এ সব মিথ্যা সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করছে । এদের ব্যাপারেও আমাদের সজাগ থাকতে হবে । সাংবাদিকরা তাদের নৈতিকতার কাছে দায়বদ্ধ । কিন্তু অপরাধীদের কোন দায় থাকে না ।

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের জন্য সরকারও উদ্যোগ নিয়েছেন । তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে উদ্যোগ চলছে তাকে নিরাপদ করতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে এবং আগামী শীতকালীন অধিবেশনেই এটি উত্থাপন করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সৌমিত্র দেব: প্রধান সম্পাদক, রেডটাইমসডটকম ডট বিডি , সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ অনলাইন মিডিয়া এসোসিয়েশন