সাদা কবুতর

প্রকাশিত: ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০১৮

সাদা কবুতর

– জেসমিন মুননী
এ কী চেহার হইছে বুজির? মাথার উপর বাজ পড়ে। মানুষের মুখে শুনছি খারাপ অবস্থা। তাই বলে এতো খারাপ! তিনমাস আগে বুজি বাড়ি থেকে ঘুরে গেল। দিব্যি সুস্থ। কয়েকদিন আগে অবশ্য আবিদ ফোনে বুজির অপারশনের সময় দেকভাল করবার কথা বললে, তেমন গরজ দেখাই নাই। বুজির তো আল্লায় দিলে মানুষের অভাব নাই। এদিকে গোয়ালের গরুটা বাজ পরে মরলে বাছুরটা আলাদা যতœআতিœ লাগে। হাঁসের ছাওগুলা কেবল ফুটে বের হইছে, দুইডা মুরগি তাও দিতে বসছে। পুকুর পাড়ের আম গাছগুলানে বইল আসছে। হুট করে যেতে বলতে তোর আর যাওয়া যায় না। অবশ্য বাড়ি থেকে ঘুরে যাবার পর বুজির জন্য মনডা কেমন যেন হু হু করত। গাঙ্গে গাঙ্গে দেখা হয় বোনে বোনে দেখা হয় না-মার কথাডা মনে পড়ত। কোরবানির সময় বুজি নাতি-নাতনি নিয়া বাড়ি আসল। নিজ হাতে মাংস বিলাল, কত মানুষরে খাওয়ালো। ঈদের পরের দিন ছোটভাই স্বপনের মেয়ের বিয়েতে কত ফুর্তি। গান-নাচ কত কী! মনে হচ্ছিল বুজির বয়স কমে গেছে। ছোটবেলার খেলার সাথী জরি, জীবন, সবাই ইচ্ছা মতো হলুদ লাগাল। বুজির কাউরে ছাড়ল না। তয় হঠাৎ হঠাৎ বুজির চেহারায় কেমন যেন একটা বিষাদের ছায়া। শরীরে কোনো ব্যথা মুখের কোনে স্পস্ট হলে চাপা দিয়ে মুখটাকে যদ্দুর সম্ভব সতেজ রাখবার প্রচেষ্টা। ব্যপারটা কারো নজরে না পরলেও আমি ঠিকই বুঝতাম। ও বুজি, তোমার শরীরডা কী খারাপ? এমন দেখায় ক্যান?’
মৃদু হাসি দিয়ে বুজি ব্যপারটা গোপন করতে চাইলো। চেহারার মধ্যে সেই অহমিকার ছাপ। বুজির সবকিছু ভালো লাগলেও এই অহমিকাসম্পন্ন দৃষ্টি মনকে ছোট করে দিত। যেন প্রভুর দয়ায় বেঁচে থাকা ভৃত্য। আমার আষ্টে-পৃষ্টে কেমন জ্বলন ধরে। ভাগ্নির বিয়াতে বুজির খুব মনোযোগ ছিল তাও না। বিয়ে বাড়িতে শুভর কানে ঝুমকা, হাতে মেহেদী, গায়ে হলুদ, পায়ে আলতা, ত্রিকোনাকৃতি রঙিন কাগজ, কলাগাছের পাতা ছাওয়া স্টেজ, নকশা হাড়ি, আত্মীয়- দাইয়াদিগো গায়ে নতুন কাপড়, কক মুরগির বিরিয়ানি কিছুই বুজিরে আকৃষ্ট করছিল না। দুপুরে তাতিয়ে ওঠা রোদে সবাই দেখল বুজির হাসি হাসি মুখখানা।
আমার বুজির নাম আপর্ণা। সিনেমার নায়িকা অপর্ণা সেনের মতো দেখতে না হলেও সুন্দরী। মাঝারি গড়ন। রঙটা তার বৃষ্টি ভেজা আকাশের মতো। পুত পবিত্র। আব্বার অনেক আদরের ধন। বিয়া দিছিল বড় ঘর বড় চাকরীওয়ালা ভদ্রলোকের সঙ্গে। গ্রামে ও শহরে দুলাভাইর অঢেল সম্পত্তি। বছর বছর গ্রামে আসে। ঈদে যাকাত- ফেতরা নিয়মিত দিলেও ঠিক ঐদিনটাতে গ্রামে আসত না গ্রামেও একটা দিত বলে। এবার হঠাৎ করে প্রতি বছর ঢাকা শহরে কোরবানি করার প্রথা ভেঙ্গে দিল। গ্রামে কোরবানি দেবার তত্ত্বাবধানে ছিল বুজির ছোট দেবর শহীদ। শহীদও প্রস্তুত ছিল না। সবাই বাড়িতে উপস্থিত হলে কেয়ার টেকার ইলিয়াস নির্ধারিত গরুর পাশাপাশি আরেকটার ব্যাবস্থা করতে হ্যাদানিপ্যাদানি ছুটে গেল। পরিবারে জামাই- বৌ নাতি-নাতনি নিয়ে কোরবানি করাটা ছিল আকষ্মিক। দুইডা গরু কোরবানি দিয়া সব মাংস বিলায় দিল। নিজ হাতে রান্না করে সবাইরে ঈদের দিন খাওয়াইল।
সেই আশির দশকে দুলাভাই ঢাকা শহরে বাড়ি করে। তখন ভিড়-ভাট্টার বালাই ছিল না। তাও আবার উত্তরায়। বিশাল দোতলা বাড়ি। মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। মিরর পলিশ মোজাইক। উত্তরা শহর থেকে দূরে হলেও যাতায়াতে ততো বেগ পাইতে হতো না। দুলাভাই সরকারি আমলা হওয়াতে গাড়ি ছিল নিত্যসঙ্গী। কত যাওয়া আসা, খাওয়া-দাওয়া। রাত বারোটার পর ঢাকা শহরে সব হোটেল বন্ধ হয়ে গেলেও বুজির হোটেল বন্ধ হইত না। বলে না খাজা বাবার দরবারে কেউ ফেরে না খালি হাতে। উত্তরায় বাড়ি করার পেছনে কারণ ছিল বিশ্ব এস্তেমা। মুসাফিরদের খাওয়ালে সোয়াবের অন্ত নাই। আব্বার স্বভাবের সবটাই বুজি পাইছিল। মানুষ খাওয়াতে ও দান করতে সে ছিল দাদা হাতেমতাইর মত। সেই বুজিরে কীভাবে খেদমত না কইরা পারি। বুজি ছাড়া আমার অস্তিত্ব কোথায়? সব পিছুটান সরিয়ে বুজির দেখভাল করতে এসে প্রথম যে হসপিটালে উঠলাম তার অবস্থান তুরাগের তীরে। তুরাগের ওপারে বিস্তৃত মাঠে এস্তেমার প্রস্তুতি চলছিল। বাঁশের খুটি দিয়ে পাটের ছালার ছাউনি।
হসপিটালের বিছানায় শুয়েও বুজির মুখের হাসি লেপটে ছিল সারাক্ষণ। বুজির স্বভাবটা ছিল ভাঙ্গবে তবুও মচকাবে না। নিজেকে যতটা পারছিল যুদ্ধে যাওয়া সৈনিকের মতো প্রস্তুত করে রাখত। তাকে যে পুনরায় উঠে দাঁড়াতে হবে এমনটাই আমারে সুযোগ পেলে বলত। বুজির সঙ্গে একান্তে কথা বলার উপায় ছিল না ভিজিটরদের যন্ত্রণায়। তাদের নানান প্রশ্ন, সবই তো ঠিক ছিল! হঠাৎ কী হলো? অসুখটা ঠিক কোথায়? উত্তর দিতে দিতে হাপিয়ে উঠছিলাম। বিশেষ করে পেটের ডানদিকে কলোস্টমির ব্যাগটা নিয়া। জানা পৃথিবীর এখনও অনেককিছু আমার কাছে অজানা। বুজির পেটে সেট করা ব্যাগটাতে আমারও যত কৌতুহল। ভালো মতো কাউকে পাইও না যে জিজ্ঞাস করব। বুজিরে ঘুম পরাবার পর গাও গোসল কইরা খাইতে বসে ভাবি ফাহাদরে জিজ্ঞেস করব। ফাহাদও ব্যাগের মধ্যে জমে ওঠা বর্জ পরিষ্কার করে হ্যাক্সিসল দিয়ে হাত ক্লিন করে খাইতে বসলে জিজ্ঞাস করতে যাব অমনি বুজি বলবে, পানি খাব। আবিদের নির্দেশ, মার সামনে কেউ রোগটার ব্যাপারে ডিসকাস করবেন না। ঠিকই তো কী দরকার এতো কিছু জানার। তয় একটু আধটু আমিও কম শুনি নাই। আমি ছাড়াও মামাতো ভাইয়ের ছেলে ফাহাদ, বুজির পুরানো ভৃত্য হাকিম এই তিনজন সার্বক্ষণিক বুজির সেবাশুষ্্রায় নিয়োজিত ছিলাম। বুজির দেবরের ছেলে তম্ময়, আপন মামাতো ভাই বাদশা, ও ভাইগ্না বাবু এরা নিজেগো কাজ সাঙ্গ করে রাতে আসত। পুরানা ড্রাইভার দুলাল ও বুজির ড্রাউভার জসিম করত খাবার আনানেওয়া। বুজির সন্তানেরা আবিদ বাদে সবাই বড় বড় চাকরী করে। মাকে সব সময় টেক কেয়ার করার মতো সময় তাদের কই। সন্ধ্যার পর সবাই এক সঙ্গে হসপিটালে হাজির।
বিশাল হসপিটালটা একেবারে নতুন। এখনও গায়ে পুরানো গন্ধ লাগেনি। এ্যাপোলো ইউনাইটেডের মতো না হলেও তার কাছাকাছি বললে সম্মান হারাবে না। দূরে বিশ্ব এস্তেমার ভির ক্রমশ বাড়তে থাকলে ভিজিটরও বাড়ে। বুজির ছোটবেলার বান্ধবী পুতুল আসলে গল্প যেন শেষ হয়না। বিশেষ কইরা মার গল্প। মার চুলের গল্প। আমারা তখন ধানমন্ডি গার্লস স্কুলে পড়ি। বুজি এইটে আমি সিক্সে।
পুতুল আপা বলত, হইছে কী, বন্ধুরা যুক্তি করলাম অপর্ণা প্রায় ওর মার চুলের কথা বলে, চল ওদের বাড়িতে ছান মারি। তুই সেদিন কী কারণে যেন স্কুল আসিস নাই। ভাবলাম আজকেই মোক্ষম সময়। যেই বলা সেই কাজ। টিফিন ব্রেকে হেড স্যারকে তোকে দেখতে যাবার নাম করে সোজা বাড়িতে উপস্থিত। আলেয়া, শামীমা, রোজিনা সবার চোখে মুখে উত্তেজনা। রৌদজ্জ্বল দিন। ভাগ্যটা সেদিন তোর পক্ষেই ছিল। গোসল সেরে সবে মাত্র চুলের আলনায় চুলগুলো মেলেছিল বোধয় খালাম্মা। এতো মিষকালো চুল! হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছিল মনে হয়। কাপড়ের আলনা আছে জানতাম কিন্তু চুলের আলনা! কিশোর বয়সের কৌতুহল। কতবার যে খালাম্মার চুল হাতিয়ে দেখলাম। পা অবধি লম্বা। তুই জ্বর থেকে উঠে এসে ইতস্তত করছিলি। কোথায় বসাবি? কী খাওয়াবি? আমরা সমানে চুল আর চুলের আলনা নিয়ে ব্যস্ত। খালাম্মাকে নানা প্রশ্ন। ঠোঁটের কোণ মৃদু হাসি দিয়ে বলল, আমার বাবা সেই বরিশাল থেকে কাঠমিস্ত্রি দিয়ে আলনাটা বানিয়ে পাঠিয়েছে। সেই কথা ভোলা যায়?’
তোর সঙ্গে বন্ধুতার সম্পর্ক কোনদিন নষ্ট হলো না। নানা কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমি মাঝে মধ্যে ভুলে গেলেও তুই মনে রেখেছিস ঠিকই। মাঝে স্বামীর কর্মক্ষেত্রের কারণে ২০-২৫ বছর দেশের বাইরে থাকলেও তুই ঠিকই খুঁজে বের করলি। সম্পর্ককে যতœ করে ধরে রাখবার কৌশল তোর কাছে শিক্ষা নেয়া উটিত।
‘আসলে বন্ধুত্ব বলিস আর সংসারের সম্পর্ক বলিস সব কিছু রক্ষা করার জন্য চর্চা করতে হয়। প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে থাকে নির্ভরতা, কমিটমেন্ট, বিশ্বাস, ভালোবাসা, লাবন্য-সব কিছু। চাইলেই এক লহমায় সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় না। আমি বিশ্বাস করি না।’
বুজি কথা বলা সময় তার মুখটা বিকেলের রোদে কেমন মায়াময় লাগে। গলার স্বরে মাধুর্য। বিছানায় বসা বুজির গভীর চেহারায় স্মৃতি কাতরতা। বুজি কী তার রোগটার ব্যপারে জানে! যদিও বা জানে তার পরিধি কতটুকু বিস্তৃত সেটা কী জানে! আক্রান্ত তুরাগে ওপাশে মাঠে সন্ধ্যার আলোগুলো জ্বলে ওঠলে হসপিটালটাটা যেন একটা রহস্যময় প্রাসাদের মতো। অভিসপ্ত রাজা আটকে রেখেছে কোনো রাজ কন্যাকে। যে অপেক্ষা করে আছে রুপার কাঠির সোনার কাঠির স্পর্শের।
রুমের ভিতরে গাঢ় অন্ধকার ঢেকে ছিল। প্রচলিত রহস্যময় গল্পের মতো হসপিটালটায় রহস্যময় রোগীর আনাগোনা। গতকালও পাশের ওয়ার্ডে ১৭বছরের একটা মেয়ে রুপারকাঠি সোনারকাঠির স্পর্শ না পেয়ে মারা গেল। সুদুর চট্টগ্রাম থেকে এসেছিল। টনসিল পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পরল ব্লাড ক্যানসার। টসটসা মেয়েটার চেহারা মুখ থেকে সরাতে পারছিলাম না। প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেবারও উপায় নেই। রোগের যন্ত্রনায় রোগীরা জানালা দিয়ে প্রায়শ লাফ নিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে জানালা সিলগালা করা। অবশ্য বড় মেয়ে কেকা অন্য রকম ভৌতিক কিছু বলতে যাচ্ছিল অমনি ডিউটি ডাক্তার আসলে চুপ হয়ে গেল। গল্পটা আজানা রয়ে গেল। পরে অবশ্য কয়েকটা ভুতের গল্প শুনেছিলাম। অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস নাই তবে সাদা কবুতরটাকে উপেক্ষা করব কীভাবে?
‘এখনও লাইট জালান নাই বলে, ফাহাদ সুইচ অন করলে সবার সম্বিত ফিরে আসে। চট জলদি নামাজ পড়ে বুজিরে ওয়ে প্রোটিন সেক বানিয়ে কর্নফ্লেক্স অথবা আটার রুটি খাওয়াই। ইদানীং চিতয় পিঠায় মজা পাচ্ছে। শীত নামায় চিতই বুজির প্রধান খাবার। সঙ্গে মুরগী অথবা কবুতরের স্যুপ, মুরগির ডিম কুসুমসহ একটা কুসুম ছাড়া চারটা। প্রথম ক্যামো দেওয়ার পর বুজির শারীরিক তেমন সমস্যা দেখা দিল না। মানসিকভাবে দিগুণ শক্ত ছিল। ভিজিটর আসলে বুজি এমনভাবে কথা বলত যেন বুজি কালকেই সুস্থ হয়ে যাবে। বিষয়টাতে আমার ভীষণ কষ্ট হতো।
বুজির ক্যামো শেষ হলেও কালকে থেকে এস্তেমা দেখে বাসায় যেতে পারবে না রাস্তায় ভিড়ের কারণে। তাতে বুজি বিন্দুমাত্র অস্থির হলো না। চোখে মুখে পবিত্র একটা ভাব নিয়ে বললো, ভালোই হলো মোনাজাতটা করতে পারব।’
আমিও উৎফুল্ল ছিলাম। আমার জন্য এতো কাছ থেকে এস্তেমা দেখা ছিলো রোমাঞ্চকর। সন্ধ্যার পরে বয়ান শুরু হলে গ্লাস আটকানো বলে শুনতে পেতাম না। বুজি ঘুমালে ডেস্কে বসা নার্সদের অনুরোধ করলে জানালা খুলে দিতো। জুমার দিন। লাখ লাখ মানুষের ভিড়। বুজির জন্য দোয়া চাইলাম। কী দোয়া চাইব, জীবনের সঙ্গে জীবন অদল-বদল!
মোনাজাত শেষে বুজির বাসায় আসলে দেখি, বাড়িতে মানুষে গমগম। আবিদের বউ ও সোহানের বউ বুজির শূণ্যতা পুরনে আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ। রুনু-ঝুনু মার শোকে আধমরা। অথচ বুজি একহাতে এসব সামলাত।
২১ দিন পর ২য় ক্যামো দিয়ে কয়েকদিন ভালো কাটল। ভালোমত খাইল। ছাদে বাগানে গেল। মনে হচ্ছিল গাছ-গাছালিগুলা বুজিরে দেখে খল খল করে হাসছে। বুজির হাসি আমার অন্তরটা ছুঁয়ে দিল। আহা! জীবন তুই এতো ছোট ক্যানে।
দ্যাখ দ্যাখ খিরসাপাত আমগাছে কেমন বইল আসছে, এবার মনে হচ্ছে অনেক আম হবে। ঐযে পুর্বদিকের গাছটায় এইবার বইল না আসলে হাকিমরে দিয়া কাটাই ফেলব।’
তাড়াহুড়া কিসের, দেখনা এবার আসে কিনা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুজি বলে, বড় বৌর অপছন্দ?
কী যে কও, গাছে আবার কী সমস্যা? একটু অপেক্ষা কর।
অপেক্ষা!…
আচ্ছা বুজি তোমার কবুতরগুলা কই? মনে আছে আব্বা ছোটবেলায় একজোড়া কবুতর এনে দিল। একটা ধবধবা সাদা আরেকটা সাদা-কালো মিশেল। তুমি সাদাটা রাইখা অন্যটা আমারে দিলা। প্রথমে একটু রাগ হইলেও পড়ে অবশ্য মায়া বইসা গেছিল।’
‘আশ্চর্য! আমার কবুতরগুলা কই যে গেল? তোর দুলাভাই মরে যাবার পর থেকে যতেœর অভাবে সব উড়ে গেল।’
‘আমি না সেই সাদা কবুতরটারে এখনও দেখি। তোমার হসপিটালের জানালায়।’
কী বলিস? সেই কবুতর কোথা থেকে আসবে?’
মা, অনেক হয়েছে, এবার নিচে চল। আবিদ এসে ফাহাদ আর আমার কাছ থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে পাজা কোলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। আবিদের ব্যাবহার সময়তে কেমন অচেনা মানুষের মতো। অবশ্য এর কারণ আছে। ওর ভাষ্য, খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ক্যান আসলাম না। আরে, জগতের পিপড়াঁওতো সংসার আছে। বলছিলাম একটু গোছাই রাইখা আসব। খালুডা তোদের হার্টের রোগী।
আস্তে হাঁট, পইরা যাবি।’
আপনার চিন্তার কোন কারণ নাই, চোয়াল শক্ত করে আবিদ জবাব দিলে ওর জন্য করুণা হয়।
মা সব সময় বলত, খালার গায়ে মায়ের গন্ধ আসে। অল্প বয়সে বুজির বিয়ে হলে কলেজে ওঠার আগে আবিদের জন্ম। দুলাভাইর সঙ্গে দেশের বাইরে গেলে ওদের আমিই দেখে রাখতাম। সেই আবিদের ব্যাবহারে রাগ না কইরা ক্ষমা করি। অসহায়ের মতো পিছু পিছু নামি। মা যে বেচারাদের ক্ষণিকের অতিথি ভেবে কষ্টেগুলো হালকা হয়ে যায়।
কলোস্টমির ব্যাগ ততক্ষণে গ্যাস বর্জ জমে ফ্রেমসহ আলগা হয়ে গড়িয়ে পড়ে। আবিদ কোলে করে বুজিকে বিছানায় শোয়ায়। সবার এদিকে দিশেহারা। অবস্থা বেগতিক দেখে চিৎকার দিলে সবাই যারযার দরজা খুলে লাফিয়ে বের হল। আবিদ বুজিরে সোজা শুয়ে দিল। যদিও তাড়াহুড়োর মধ্যে কিছুই হাতের কাছে পাচ্ছিল না। আমি শুধু উপুর হয়ে থাকা আবিদ আর ফাহাদকে দেখতে পাচ্ছিলাম। তাদের পিছনে আমি অভিযুক্ত আসামীর মতো স্থির দাঁড়িয়ে নির্ণিমেষ তাকিয়ে ছিলাম। এতো দিনে এমনটা কখনো দেখি নাই।
‘কতদিন হইছে এখানে আছেন? দাড়াই না থেকে হাত লাগান। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা থেকে ছুটি পেয়ে ওদেরকে ডিঙ্গিয়ে বিছানার উপর উঠে বুজির মাথার নিচের বালিস, গায়ের ফতুয়া ব্যস্ত হয়ে ঠিক করছিলাম। প্রায় সপ্তাহখানেকের মধ্যে এমনটা তো দেখি নাই।
আবিদ বলল, টিস্যু ছিঁড়ে দেন। হন্তদন্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে টিস্যুর রোলটা ধরে দিলে আবিদ কটমট করে চাইল। ফাহাদ আমার হাত থেকে নিয়ে ছোট ছোট করে টুকর করে স্টুল মুছলে সঙ্গে সঙ্গে লাল টকটককে কিছু একটা দেখে আমার মাথায় চক্কর। ভাগ্যভালো রুনু পেছন থেকে ধরে ফেলল। অপারেশনের পর বুজির পেটে ব্যাগের কথা শুনছি কিন্তু ভেতের দৃশ্য আজই প্রথম দেখলাম। বুজির নাতনি আরিবা বিষয়টা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলে কী হবে! আমার মাথায় কিছুই ঢুকতো না। শেষ মেষ বুঝলাম, এ রোগের ঐতিহ্যবাহি অপারেশন হচ্ছে রেকটাম বা মলাশয়ে ও মলদার কেটে ফেলে দিয়ে পেটে নাভির ডান দিকে কলোস্টমি বা কৃত্রিম মলদ্বর তৈরি করে দেয়া। সেখানে পেটের ডানদিকের ওয়ালে লাগিয়ে রাখা ব্যাগ বিশেষ। সেখানে খাবার ও গ্যাস জমে। মোদ্দা কথা বুজির কোলন থেকে টিউমার অপশরণ করে পেটের বাম দিকে অপারেশন করে স্বাভাবিকভাবে টয়লেট করার পদ্ধতি বন্ধ করে দিয়েছে। ডানদিকে ছিন্দ্র করে কোলনের আরেকটি মুখ স্টুল পাসিংয়ের জন্য উন্মুক্ত করে ব্যাগ সেট করে দিয়েছিল। ওহ! আল্লাহ এইডা তুমি কী শুনাইলা! কী দেখাইলা!
দিনে ৩-৪ বার ব্যাগ পরিষ্কারের দায়িত্ব ছিল ফাহাদের। সামনে থাকলে আবিদই করে। শুয়ে থাকতে বুজির অস্বস্তি লাগছিল। আবিদ কোমল স্বরে বলছিল, এই তো আর অল্পেট্টুক্ষণ। দেখলাম, ওর নরম ও অনুনয়ী আচারে চারিদিকটা শান্ত হয়ে গেলে বুজির চোখে ঘুম নেমে এলো। লাভার মতো ছড়িয়ে পড়া বর্জ টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করে নতুন একটা ব্যাগ বসিয়ে দিল। পুরো পক্রিয়াটা দেখার পর নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কী এখনও বুজির মতো হতে চাই? কলোস্টমির ব্যাগ বসান হয়ে গেলে যুদ্ধ বিজয়ী আবিদ ঘামে যবুথবু। ঘুমালে মাকে ডিসটার্ব করবেন না বলে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।
সেদিন সকালের আলোতে বুজির অবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। সার্টিনের ভারী পর্দার জন্য ঘরের মধ্যে আলো-ছায়ার খেলা। গভীর ঘুমে বিভোর বুজি। বিছনার কোনে বসাবস্থায় সুন্দর একটা সাইড ফেস দেখতে পাচ্ছিলাম। টিকুদাদা সেইবার বুজির কতগুলা সাইড ফেস তুলল। মামা বিলেত থেকে প্রথম রঙ্গিন ক্যামেরা আনছিল। টিকুদাদা বুজির সর্ট নিয়েই যাচ্ছে আমি যে একজন মানুষ কোন খেয়াল নাই। আহা! আমি ক্যান বুজি হইলাম না। বুজির সব কিছু আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। বুজি যখন রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটা আবৃত্তি করত মনে হতো উপেনের মতো হাত জোড় করে বুজির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বুজি রাজার মতো ক্রুঢ় হাসির শব্দে আমাদের কাঁঠাল বাগানের বাসাটা সত্যি ঁেকপে উঠত। বুজির কন্ঠে সে কী দম্ভ। অথচ দু’চোখে আহারে কী মায়া! বিয়ের পর বুজির সমস্তু শরীর উপচে যেন কস্তুরী ঘ্রাণ। তখনও কী আমি বুজির সঙ্গে জীবন এক্সচেঞ্জ করতে চাইতাম! চেতন অবচেতন মনে বুজিতে রূপান্তরিত হতাম! কিন্তু কেন? নিজের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল। ঘর সংসার, স্বামীর অসুস্থতা, অভাব অনটন, অযোগ্য সন্তান, বাড়ি ঘর সব কিছুতে বিতৃষ্ণা। বুজির সুখ দেখে আমি তো নিজে চেয়েছিলাম জীবনের রূপন্তর। ছোটবেলার সেই সাদা কবুতর কিংবা বুজি।
একটু আগে আবিদ ঘরটাতে এ্যায়ার ফ্রেসনার দিয়ে গেছে। আমার নাকে বুজির সেই ঘ্রাণ ভেসে আসে। আবছা আলোয় এসি রুমটাতে কাত হয়ে শোয়া বুজির দেহ অবয়ব ভঙ্গুর। কোথায় হারিয়ে গেল সেই দৈহিক সৌন্দর্য?
চোখের জল মাটিতে গড়াবার আগে শুনি, কীরে কাঁদছিস কেন? আমি এতো সহজে যাচ্ছি না। নে উঠে আমারে বসা।’
‘ও বুজি, তোমার কিছু হইলে আমার কী হবে।’ বুকের ভেতর উগলে ওঠা কান্না চাপা পড়ে যায় পাছে আবিদ ও সোহান চোখ গরম করে। ওদের মায়ের সামনে রোনা- ধোনা বন্ধ। সেবক হিসাবে আমি এখানে নিয়োজিত।
‘চিন্তা করিস না। এবার সুস্থ হওয়ার পর তোর ঘরটা ঠিক করার ব্যবস্থা করব। আবিদরে বলছি জলিলের চিকিৎসার টাকা আর খোকনরে একটা চাকরীর ব্যাবস্থা করে দিতে।’
আসস্ত হয়ে বুজির পিঠের নিচে হাত দিয়ে আলগোছে উঠে বসাই। দুপুরে বুজিরে গরম পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে কাপড় পাল্টে দেই। এরই ভেতর শরীফা দুপুরের খাবার নিয়ে আসে। কবুতরের ক্লিন স্যুপ, গ্রাম থেকে আনা শিং মাছের ঝোল, পেঁপের সবজি, ঘন মুসুরের ডাল, চিনিগুড়া চালের জাউভাত ও গাজরের জুস। আজকে বুজির কোনকিছু মুখে রোচে না। বুজির রান্নার দায়িত্ব মামাতো বোন শরীফার উপর। আবিদ এসে ঘুরে গেল। আজকে বাইরের কিছু গেস্ট আসবে বলে বেশ ব্যস্ত মনে হলো। শরীফা চেষ্টা ব্যর্থ হলো। শুধু স্যুপটা খেল।
‘ও,বুজি দাদার জমি-জমা কী সব বেইচা ফেলতিস।’ শরীফা দুঃসাহস দেখে আমি ভরকে যাই।
বুজির নিরুত্তাপ ভাবে বলে, আমি এখন শুব। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। গেস্টরা আসলে ডাকিস।’
শরিফা ইতি উতি চেয়ে আমারে চোখের ইশারা করে খাবার ট্রেটা নিয়ে চলে গেল। এই রুম থেকে বের হবার অনুমতি আমার নাই। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষে ফাহাদ এলে আমার ফুসরাত। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বুজি পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ল। এবার ক্যামো দেবার পর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার বলছে সপ্তাহখানেক এমন থাকবে। শরীফা চলে গেলে দরজা গলিয়ে খাবারের ঘ্রাণে বাড়ির বাতাস ঘনীভূত। মাঝে মধ্যে দরজা খুলে গেলে দেখছি রুনু-ঝুনুর ব্যস্ততা। বৌদের দেখছি না। বোধয় রান্নাঘরে। বুজির বৌরা কেউ জুতের না। শাশুড়ি এতো বড় একটা অসুখে তাদের উদাসীনতা কারো দৃষ্টি এড়ায় না। আজ তারা মেহমানদের জন্য খাবার বানালো। রান্নাঘরে শাশুড়ির রান্না হয়ে গেলে দুই বৌ রান্না ঘর দখল করে রাখল। বাটি নিয়ে তারা সিঁড়ি বেয়ে উপর নিচ করছিল। শুধু শাশুড়ির ঘরের দরজাটি এড়িয়ে যাচ্ছিল।
বুজি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল। উঠে যন্ত্রনায় ছটফট করছিল। কিছুদিন ধরে বুজি পেটের ব্যথায় অস্থির হতো। ঘুমটা যে ভেঙ্গে যাবে এটা আমি জানতাম। দিনে এভাবে টুকরো টুকরো ঘুমাবে অথচ রাতে দিব্যি ঝিমাবে। ক্যামোর রিএ্যাকশন শরীরে ছড়িয়ে থাকা জীবানুকে সনাক্ত করে ধ্বংস করছিল। বুজির নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠে। পেট চেপে সে কুকড়ে বসতে চাইলে বসাই। গত কয়েকদিন শরীরের ভেতরের যন্ত্রণা হচ্ছিল। ব্যাগের ভেতর গ্যাস ও স্টুল জমে ফুলে উটেছে। ঠিক সেই সময় কলিংবেল বাজে। গেস্টদের আগমনে বৌরা অপ্রস্তুত হয়ে নিজেদের আড়াল করে ড্রইং রুমের দিকে আগায়। বুজিরে আধশোয়া করে কোলে নিয়ে দোয়া পড়তে থাকি। জানি কিছুক্ষণ পড়ে সব স্বাভাবিক হবে। অন্তত আজকের দিন মার কিছু না হোক ভেবে আবিদ রুমে ঢুকে দরোজা বন্ধ করে। কোমল ভাবে বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে । ক্যামোর রিএ্যাশন। গেস্ট চলে আসছে। আপনি বললে শুরু করব।
সেদিন বুজির বড় একটা সম্পদ বিক্রি হয়। দুলাভাই জীবিত অবস্থায় প্রায় সব সম্পত্তি বুজির নামে করেছিল।
রাতদিন কীভাবে কাটছিল বুঝতাম না। সময় গড়াচ্ছিল। ভিজিটরও কম আসত না। তাদের নাস্তা পানি আড্ডা। বুজির মুখে হাসি লাগিয়ে রাখা চেষ্টা করত। প্রায় দিন বুজির অবস্থা বেগতিক মনে হতো। তখন ভিজিটরদের সামনে চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করত। দিনদিন খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি বেড়ে গেল। শরীরের টান পরেছিল। এখন হাতগুলো হাড্ডির সঙ্গে মিশে শীতে ঝরে যাওয়া গাছের মতো রগগুলো স্পষ্ট। হিমশীতল ঠান্ডাটা কলোস্টমির ব্যাগ ছুটে সব মেখেটেখে একাকার হতো। ঠান্ডা লাগার ভয়ে দ্রুত জামা-কাপড় চেঞ্জ করছে জানটা বের হয়ে যেত। কষ্টের মধ্যেও মায়া লাগে। ডাকসাইটের সেই বুজি আহারে কত নরম আর ছোট হয়ে গেছে। ইদানীং হাঁটতে চায় না। মানে পারেও না। স্মৃতি হাতরে বেড়ান চোখের দৃষ্টি। ম্লান ও ¤্রয়িমান। হুইল চেয়ারে বাড়ির চারপাশটা একবার ঘুরালেই ক্লান্ত বোধ করে। বিছানায় যাবার জন্য করুন আকুতি। সমস্ত শরীরে ব্যথ্যার কারণে ফাহাদ ও হাকিম পালা করে ম্যাসেজ করে দেয়। সপ্তাহ শেষে থ্যারাপিস্ট মিন্টুর ম্যাসেজে ভালো ঘুম হত।
থার্ড ক্যামো দেবার পর হঠাৎ অবস্থার পরিবর্তন হলে সবাই কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। তাহলে কী বুজি ভালো হচ্ছে! ছোটবেলায় বুজির যেবার টাইফয়েড হলো। আম্মা-আব্বা সারারাত জেগে বুজির কী সেবা! হাই কোর্টের মাজারে আব্বা মানত করে। জানের বদলে জান। আমি যে একটা ব্যক্তি সেদিকে কারো খেয়াল নেই। চিলেকোঠায় বসে আমি কী বুজির মৃত্যু কামনা করেছিলাম?
ফোর্থ ক্যামোর দেবার আগে বুজির সিবিসি টেস্টের রেজাল্ট ভালো ছিল না। ব্লাডের হিমোগ্লোবিন ও ইলোক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স। রক্তে বিলোরবিন বাড়তি। আবিদের চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। মার জন্য তারা কিনা করছে। একদম প্রথমে সবাই সিদ্ধান্ত নিলো দেশের বাইরে নিয়ে যাবে। ব্যাংকক ন্যাশনাল হসপিটালে সব চেক করালে একই রিপোর্ট। প্রথমে ক্যামো ও রেডিও থেরাপি। পরে অপারেশন করে টিউমার অপশারন। দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে বুজি রাজি হলো না হলে চারিদিকে ভাঙন আর পতনের বিকট আওয়াজ কানে বাজল। দেশে ফিরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপক্ষে চলে গেল। দুলাভাইর বন্ধুর শালা নামকরা কলোরেক্টল সার্জন বুজিরে দেইখা বলল, ক্যামো অপারেশনের পরে দিলেও চলবে। আগে অপরেশন। ডাক্তার যখন জানে না শুদ্ধ চিকিৎসা পদ্ধতি। সাধারণ মানুষ তখন গিনিপিগ।
মানুষের মধ্যে যারা যত বেশী নমনীয়, পরিস্থিতি তাদের নিয়ে সব সময় পরিহাস করেছে। ডাক্তার অবলীলায় বুজির অপারশেন করে ব্যাগ বসিয়ে দেয়। দের মাস পর ব্যাগ সরিয়ে পুনরায় অপরেশন করে রিভার্স করে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তার সপ্তহখানেক পর থেকে ক্যামো। কিন্তু ঘটনা হলো বিপরীত। ছুরি-কাচি লাগার পর বুজির অবস্থা খারাপ হতে থাকে। আবিদ বুঝে নাই কী বিপদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ও পুনরায় ব্যাংকক যোগাযোগ করলে টেস্টগুলো করিয়ে রিপোর্ট পাঠাতে বলে। সপ্তাহখানেক পর তারা রিপ্লায়ে কলোস্টমির ব্যাগসহ ক্যামো শুরু করতে বলে। ততদিনে লিভার ধরে গেছে।
নিত্যদিনের স্বাভাবিক স্ট্রেস থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে আত্মমগ্নতার চাইতে সহজ কোন উপায় নাই। একাগ্র চিত্তে কাজে ডুবে থাকা। বুজিকে নিয়ে মগ্ন ছিলাম। কতদিন ধরে তুরাগের পাশে রহস্যময় প্রাসাদপুরীতে আছি জানতাম না। যদি না ফাহাদ মনে করিয়ে দিত। বুজির কষ্টগুলোকে একাত্ম করে তার ভেতর ডুবে থাকতাম। ঘড়ির কাটা ধরে কিছুই হচ্ছিল না। রাতের খাবার হয়তো মাঝরাতে। সকালেরটা দুপুরে। রাতের খাবারের জন্য আজ সুজির সঙ্গে দুধ গুলিয়ে চামচ কেটে খাওয়াচ্ছিলাম। বুজি বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিলে বাচ্চাদের মত বিভিন্ন আদুরে স্বর করছিলাম। আবিদ আলোকিত করিডোরে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। হসপিটালের ক্যাবিন ডিউটি নার্সরা ডেস্ক চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছে। আমার চোখে ঘুম এসে চোখ ভারি হয়ে থাকবে তবু আমাকে জেগে থাকতে হবে। হসপিটালে অস্বস্তি এক পরিস্থিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে রাখাটা কষ্টের হলেও আয়ত্ম করতে পেরেছিলাম।
বুজির নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হতে থাকে। বসা-শোয়ার মধ্যে মনে হচ্ছিল খুব কষ্ট হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে নিঃশ্বসে অসুবিধা হচ্ছিল। সিস্টার এসে পালস অক্সি মিটার লাগাত। কোলন থেকে রক্ত বের হবার রিজনও এখনও ডাক্তার বের করতে পারেনি। রক্ত বের হবার সময়টা আমি নিজেকে আড়াল করে রাখতাম। সবার পিছন থেকে বলতাম
বুজিরে বিদেশে নিয়ে চল।’
আবিদ হাতে গ্লবস পড়ে চাপা দিয়ে রক্ত বন্ধ করার জন্য সমানে ট্রাক্সিল ইনজেকশন ভেঙ্গে ক্ষত স্থানে লাগাচ্ছিল।
চোয়াল শক্ত করে দাঁতের সঙ্গে দাঁত চেপে বলল, বললেই তো সব হয় না। এখন সেটা অসম্ভব। ডাক্তাররা বোর্ড বসাবে। দেখি কী বলে।’
আমি অপ্রস্তুতভাবে বসে চোখের পানি ফেলছিলাম। আমার উষ্ণ পানির ধারা কেউ দেখল না।
শেষের দিকে বুজির রক্ত বের হবার কারণ কোন ডাক্তার বের করতে পারল না। বোর্ড বসল। বুজির অস্থিরতা কিছুতে যাচ্ছিল না। ভ্যানগগের ছবির মতো বুজির চোখে হলুদের প্রভাব। রক্তের পর রক্ত, প্লাজমার পর প্লাজমা দেয়া হচ্ছিল। রক্তের ডোনার খুঁজতে কেকা ফাহাদ সবাই ব্যাস্ত। নাতি-নাতনী কেউ বাকি নেই। দিনে চার ব্যাগ প্লাজমা পাঁচ দিন দিলে রক্ত বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যতবার রক্ত যাবে সিবিসি করিয়ে রক্ত দিতে হবে। অনকোলোজিস্ট, হেমাটলজিস্ট, সার্জন মিলে এই ডিসিশন নিল।
তীব্র ব্যথায় বুজির আর্তনাদে সবাই স্তব্ধ। চোখের পানিতে তুরাগ সিক্ত। খাওয়া নাই ঘুম নাই সার্বক্ষণিক বসে দাঁড়িয়ে সময় পার করছি। নানা আজেবাজে স্বপ্ন দেখার পর একদিন দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছিলাম। সেদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে হঠাৎ মনে হলো আমি শুয়ে আছি বুজি আমার পাশে বসে মাথায় হাত বোলাচ্ছে আর বলছে, আশ্চর্য তিনটা ক্যামো দেবার পর তোর একটা চুলও পড়ে নি! ৪র্থটা দিলে বোধয় পড়তে পারে।’
আমি শুয়ে শুয়ে বুজিকে দেখছি। আদ্যোপান্ত অলঙ্কারে আচ্ছন্ন। শক্ত-পোক্ত শরীর। ঠোঁটের কোনে মোনালিসা হাসি। হ্যা আমি তো চেয়েছিলাম জীবনের এই রূপান্তর। বুজির মতো সব কাজে পারঙ্গম এটিকেট একজন।
বুজির ভাঙ্গা ভাঙ্গা আওয়াজ আসছিল অনেক দূর থেকে। মনে হচ্ছিল বুজি অনেক দিন থেকে আমাকে খুঁজছিল। হসপিটালে দেখে দিশেহারা অবস্থা। এদিকে নিজেকে হসপিটালের বেডে দেখে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে। সেই দেয়াল সেই কার্নিশ, বাড়ির ভেতরে বাড়ি, আমার ভেতরে বুজির জীবন নাকি তার উল্টোটা।
আমি হসপিটালের বিছানায় কেন? অসুস্থ তো বুজি। আমি বুজির দিকে হাত দু’টো বাড়িয়ে দিচ্ছি বুজির মতো। বুজি পেছনে ফিরেও তাকাচ্ছে না। বুজির গায়ে সেই কস্তুরী ঘ্রাণ। ও বুজি আমারে কোলে নেও।’
বুজির তখনও হাসছে। যাকে কোন মতে মৃদু হাসি বলা যায় না। কোনোভাবেই না। আমি কনুই ভর করে বিছানায় ঠেলা দিয়ে বসতে চাইলাম। কিছুতেই পারলাম না। ধারে কাছে ফাহাদকেও দেখলাম না। কলোস্টমি থেকে রক্তের ¯্রােতে ভিজে যাচ্ছে বিছানা। আমি চিৎকার করছি, বুজি বুজি, আমারে ধরো। রক্ত বন্ধ কর। লইলে আমি কমায় চলে যাব।’
হঠাৎ জানালাটা খুলে গেলে বুজি একটা কবুতর হয়ে গেল। সাদা ধবধবে কবুতর। আব্বার সেই সাদা কবুতরটার মতো। মুক্ত হয়ে বুজি জানার ওপাশ থেকে আমার দিকে লাল চোখে তাকাল।
ততক্ষণে ডাক্তার এসে দেখে আমি গোঙাচ্ছি। ব্যাস্ত হয়ে আইসিইউতে নিতে হবে বলে সবাই সেই দিকে যাচ্ছিল। জানালা সরে গেল বুজি অদৃশ্য। করিডোরের ওপরে কয়েকটা মাথা। বাতিগুলো জ্বলানো। একমাসের অধিক পরিচিত ডাক্তার নার্স সিস্টার। আপ্রাণ বোঝাবার চেষ্টা করি, আমি না বুজি অসুস্থ। আমারে বুজির কাছে যাইতে দেন।’
কে শোনে কার কথ? বিশাল আইসিইউ রুমেটাতে নিয়ে এলে জানালা দিয়ে বুজিকে আবার দেখা যায়। আইসিইউর ডাক্তার নার্স ভেনটিলেশন, পালস অক্সি মিটার, বিপি মেশিন, রক্ত ও স্যালাইন শুরু করে দেয়। শো শো করে বাতাস ওঠে। এখনও তো বৈশাখ মাস আসে নাই তার আগেই ঝড়!
ও বুজি, আমারে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।’
উড়ন্ত বুজির মুখ দেখতে পেলাম না আমি।
দেখলাম সমস্ত আকাশ আর আকাশের ভেতর ঘুর্ণয়মান ঝড়ে ঘুরে ঘুরে বুজি কেমন পাক খেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছিল।