সাদা বালু ও সোনার কাপ

প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২১

সাদা বালু ও সোনার কাপ

 

-লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

গতকাল বৃহস্পতিবার ৭ অক্টোবর সাফ ফুটবলে মালদ্বীপের কাছে বাংলাদেশ ২-০ গোলে হেরে গেলো। দুটো গোলই হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধে। ১-১৬ অক্টোবর মালদ্বীপের রাজধানী মালে শহরে চলবে সাফ ফুটবলের চ্যাম্পিয়নশীপ। ২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে মালদ্বীপ সাফ ফুটবলের শিরোপা জয় করেছিল। সাফ ফুটবলের শিরোপা বাংলাদেশ জিতেছিল ২০০৩ সালে। ১৯৯৩ সালে দক্ষিন এশিয়ার ফুটবলের এই চ্যাম্পিয়নশীপ শুরু হলে ভারত সর্বোচ্চ ৭ বার শিরোপা লাভ করে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ছিল সাফ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ।

 

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন  সে সময় বেগম খালেদা জিয়া। আমি সেই বছর কবি শামসুর রহমান সম্পাদিত দৈনিক মাতৃভূমির সাংবাদিক। উদ্বোধনী দিনে বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান এর আয়োজন করা হয়েছিল সন্ধ্যার পূর্বে। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি গ্যালারিতে এসেছেন। আমার ছেলে জুনায়েদের বয়স তখন চার বছর। মনে পরছে তখন হালকা শীতের বাতাস ছিল ঢাকা শহরে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে জুনায়েদকে নিয়ে আমি স্টেডিয়াম পৌঁছলাম যখন তখন তার উৎসাহের কমতি ছিল না। সন্ধ্যার সময় আমি আর জুনায়েদ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ঠিক পিছনে দাঁড়ানো।

 

 

সেখানে গিয়েছিলাম সন্ধ্যায় ঢাকা স্টেডিয়ামের আতশ বাঁজি দেখার জন্য। আমাদের চারপাশে এসএসএফের সদস্যরা দাঁড়ানো ছিল। স্টেডিয়ামের সব দরজা এসময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যার সময় স্টেডিয়ামের সব আলো নিঁভিয়ে দেয়া হলো। শুরু হবে চোখ ঝলসানো আতশ বাঁজি। এসময় জুনায়েদ ভয় পেতে শুরু করেছে। সে বুঝতে পেরেছিল খুব শব্দে এক একটি আতশ বাঁজি আকাশে ছুটে যাবে। জুনায়েদ আর স্টেডিয়ামে থাকবে না। যত দ্রুত বের হতে হয় সে ব্যাবস্থার জন্য জুনায়েদ ব্যাস্ত হয়ে গেলো। আমি বুঝলাম কোনো ভাবেই তাকে আর ঠেকানো যাবে না। দ্রুত এসএসএফ এর সদস্যদের বললাম ভিভিআইপি গেইট খুলে দিতে। আমরা বের হয়ে এলাম।

 

 

 

যখন ডিআইটি ভবনের সামনে পৌঁছলাম সেসময় শুরু হলো আতশ বাঁজি। জুনায়েদ তখন ভয়মুক্ত। তাকে বাসায় রেখে আমি স্টেডিয়ামে ফিরলাম। বাংলাদেশ সাফ ফুটবলের সেই আসরে ফাইনালে মালদ্বীপকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সাফ ফুটবলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মালদ্বীপ। ২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। গতকালের বাংলাদেশ-মালদ্বীপের ম্যাচের পর আমার কিছু কথা মনে পরে যাচ্ছে। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভয়াবহ সুনামীর কথা সবারই মনে থাকার কথা। ২৮ তারিখ আমার মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল। কিন্ত সুনামীর কারনে মালে বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ ছিল সেদিন।

 

 

 

আমি ৫ জানুয়ারিতে রওয়ানা দিলাম। সুনামীর জন্য মালদ্বীপের সবকিছুই বেশ বদলে গিয়েছিল। বিশেষ করে তাদের ট্যুরিজম ইন্ড্রাস্ট্রিতে ধ্বস নেমে গেলো বলতে পারা যায়। আমি গিয়েছিলাম একটি রিসোর্টে কাজ নিয়ে। মালে এয়ারপোর্ট-মালে শহর-ভিহানাফুসি আইল্যান্ড এই ট্রাই-এঙ্গেলেই আমার বিচরন ছিল। ফ্রন্ট অফিসের কাজ শেষ হলেই আমি মালদ্বীপের ফিস মার্কেট থেকে শুরু করে সেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করে সময় কাটাতাম। এবং ডায়েরিতে প্রতিদিন নোট রাখতাম।

 

 

 

মালদ্বীপ ১১৯২টি কোরাল দ্বীপ নিয়ে ভারতীয় মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত একটি দেশ। সেখানে যাবার পর দেখেছিলাম চারপাশে ভারতীয় মহাসাগরের জলরাশি আর বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। দ্বীপগুলোতে তেমন গাছপালাও নেই। প্রচুর নারিকেল গাছ। পাখিও কম। আর সাদা বালুর সৈকত। ঘাসে পা পরেনি আমার। বৃষ্টির দেখা মিলেছিল পাঁচ মাসে দুইবার। এমন ভৌগলিক পরিবেশে ফুটবল খেলার সুযোগ খুব কম সেই ধারনা থেকে আমি একদিন বের হয়েছিলাম বিভিন্ন খোঁজ খবর সংগ্রহ করতে। সেদিন কি বার ছিল মনে নেই। তবে আকাশ সেখানে সবসময়ই পরিষ্কার থাকে। ঝলমল রোদ।

 

 

ভিহামানাফুসি দ্বীপ থেকে স্পিড বোট জুপিটারে করে মহাসাগরের উপর দিয়ে আমি এক দুপুরে মালে পৌঁছলাম। ভাবলাম পায়ে হেটে মালদ্বীপের ফুটবল রহস্য উদঘাটন করবো। আমি ভিভিআইপি জেটি থেকে হাটতে হাটতে শহরের অন্য প্রান্তে আর্টিফিসিয়াল বিচে চলে গেলাম। সেখানে ইউরোপিয়ানরা সার্ফিং করে থাকে সাধারণত। ওখানে জাপানিজরা একটি সি-ওয়াল তৈরী করেছে। খুব চমৎকার একটি লোকেশন।

 

 

 

আমি আর্টিফিসিয়াল বিচ থেকে আরেকটু এগিয়ে দেখতে পাই একটি মাঠ উচুঁ ফ্যান্চিং দিয়ে ঘিরে রাখা। বুঝতে বাকি রইলো না এটাই ওদের একমাত্র প্রাকটিস গ্রাউন্ড। তারপর আরো এগিয়ে গিয়ে দেখতে পারলাম ফুটবল এসোসিয়েশন অব মালদ্বীপ এর ভবন। কিছুদিন আগেও ভবনটি ছিল না। এই হচ্ছে মালদ্বীপের ফুটবলের অবকাঠামোগত শক্তি। অবকাঠামোগত শক্তি এটা হলে হবে কি ভেতরের খবরতো ভিন্ন।

 

 

 

মালদ্বীপের মানুষরা নিজেদের পরিচয় দেয় মলদ্বীভিয়ান বলে। আমি তাদের সাথে ইংরেজীতে কথাবার্তা চালিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। ওরা আমাকে জানায় ওদের বিভিন্ন দ্বীপে সী-প্লেনে পৌঁছতে প্রায় আট ঘন্টা সময় লাগে। সেখানে সাদা বালুর উপর তারা ফুটবল খেলে। ওদের দ্বীপগুলোতে ঘাস নেই। বালুতে ফুটবল খেলার জন্য ওদের শারীরিক দক্ষতা ও গতি অনেক বেশি হয়। বিষয়টি বুঝতে পারার পর লাঞ্চ করতে যথারীতি চলে গেলাম আমার প্রিয় রেস্টুরেন্ট পিজারিয়াতে।

 

 

 

সেখানে দোতলা কাঠের ডেকে মহাসাগরের বিশ-ত্রিশ ফুট উচুঁ ঢেউ আছড়ে পরে। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে লাঞ্চ করি আমি সেখানে কখনো কখনো। সী-ফিশ বয়েল্ড ও স্টিম রাইস। সঙ্গে ক্যাপাচিনো। খুব স্বাস্থ্যকর খাবার। বিকেলে গেলাম প্রাকটিসের পর্ব দেখতে। আমি তখন বিস্মিত হলাম। তারা ভৌগলিক ভাবে ফুটবলের জন্য না জন্মালেও ফুটবলকে কিভাবে তারা জাতীয় পর্যায়ে পরিচর্যা করে চলেছে সেটা দেখে বিস্মিত না হবার কারন নেই। শারীরিক দক্ষতা ও গতিতে মালদ্বীপের ফুটবল অবশ্যই দক্ষিন এশিয়ার যেকোন দেশ থেকে অনেক এগিয়ে। অথচ এই দেশে ঘাস নেই, ফুটবলের মাঠ নেই। নেই ভালো কোচ। নেই অবকাঠামো। মালদ্বীপের মানুষ ফুটবল ভালোবাসে।

 

 

বিকেলে ঢাকায় ইত্তেফাক অফিসে পিবিএক্সে টেলিফোন করলাম। পরিচয় দিয়ে বললাম ইত্তেফাকের ক্রীড়া সাংবাদিক কাশিনাথ বসাককে সংযোগটি দিতে। কাশিনাথ বসাক টেলিফোন ধরে   জানতে চাইলেন কোথায় আছি। সবকিছু খুলে বললাম। জানালাম মালদ্বীপের ফুটবলের বিভিন্ন তথ্য। অনেকক্ষণ কথা হলো টিকাটুলির ইত্তেফাক অফিসে কাশিনাথ বসাকের সাথে।

 

 

 

মালে শহরে সূর্যাস্ত দেখছি। ভারতীয় মহাসাগরের উপর হেলে পরেছে সূর্য। অভূতপূর্ব দৃশ্য। আক্ষেপ হয় বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য। সেখানে ফুটবলের সূর্য কবে উদিত হবে। সেইসব ভাবছি আর ভাবছিলাম ভিহামানাফুসি আইল্যান্ডে ফিরে যেতে হবে। একটি দোকানে ঢুকে নিজের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা সেরে নিলাম আমি। আর ঠিক করে নিলাম একদিন এই বিষয়ে কিছু লিখবো। আজ ষোল বছর অতিবাহিত হলো। গতকাল সাফ ফুটবলের চ্যাম্পিয়নশীপে বাংলাদেশ মালদ্বীপের কাছে ০-২ গোলে হেরে গিয়েছে। মালদ্বীপের সাদা বালুতে সোনার কাপটি এবার কার হাতে যাবে? ১৬ অক্টোবর সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোর শীর্ষ খবর হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

October 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31