সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংহতি দিবস আজ

প্রকাশিত: ২:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১, ২০২১

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংহতি দিবস আজ

 

১৯৭৩ সালের এই দিনে ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের প্রতিবাদে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে পুলিশের গুলিতে বিপ্লবী মতিউল ইসলাম এবং বিপ্লবী মির্জা কাদেরুল ইসলাম মারা যান। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রসৈনিক মতিউল-কাদের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ছাত্র হত্যাকান্ডের শিকার হন।ভিয়েতনাম সরকার তাদেরকে জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করেছে ।
গবেষক শেখ রফিক জানান, সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন থাবা মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে আজও তৎপর। এই জন্য তারা তথাকথিত ‘মুক্তবাজারের’ জালে আবদ্ধ করে, বহুজাতিক কোম্পানীর মাধ্যমে, বিশ্বব্যাংক-আই.এম.এফ-ডব্লিউ টি ও প্রভৃতি সংস্থাকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক শোষণ পরিচালনা করে। বৈষম্য ও নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলে। মার্কিন নেতৃত্বে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের মত দেশকে পদানত রাখতে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়, দেশে দেশে যুদ্ধ বাধায়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্রষ্টা ছিলো এই সাম্রাজ্যবাদ যেখানে কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করা হয় ।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জন্মলগ্ন থেকেই এই ঘৃণ্য সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও চক্রানে-র বিরোধিতা করে আসছে। আমাদের দেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব দূর করার জন্য ছাত্র ইউনিয়ন নিরন-র সংগ্রাম করে চলছে। দেশে দেশে পরিচালিত স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনগণের মুক্তি সংগ্রামের পাশে ছাত্র ইউনিয়ন সবসময়ই দাঁড়িয়েছে। সেই কর্তব্যবোধ থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন ভিয়েতনামের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করে বাংলার মাটিতে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিবাদ মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের সামনে পৌছলে পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মীর্জা কাদের ও মতিউল ইসলাম শহীদ হন। সেই থেকে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংহতি দিবস পালন করে আসছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। ২০০১ সালে ভিয়েতনাম সরকার শহীদ মতিউল-কাদেরকে সে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেছে। প্যালেস্টাইন, কঙ্গো, দক্ষিন আফ্রিকা, মোজাম্বিক, এ্যাঙ্গোলা, কিউবা, নিকারাগুয়া, লাওস, কম্পুচিয়া, ইরাক, আফগানিস’ান সহ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশে দেশেসাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, দখলদারিত্ব ও যুদ্ধের সক্রিয় বিরোধীতা করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। ঐ সব দেশের সাধারণ মুক্তিকামী মানুষের প্রতি সব সময়ই সংহতি প্রকাশ করে আসছে ছাত্র ইউনিয়ন। যুদ্ধ নয়, বিশ্ব শানি-ই ছাত্র ইউনিয়নের কাম্য।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী মতিউল-কাদের
মতিউল ইসলাম
১৯৫১ সালে রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার অন্তর্গত বাগমারা গ্রামে মতিউল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে, বাবার কাছে। বিদ্যালয় জীবনে প্রধান শিক্ষক ছিল তার পিতা। ঐতিহ্যগতভাবে প্রাথমিক পর্যায়েই তার ধ্যান-ধারণায়, চিন্তায়-চেতনায় মেহনতি মানুষের জন্য গভীর অনুরাগ সৃষ্টি হয় এবং তখন থেকেই প্রস্তুতি পর্ব চলে। নবম শ্রেণীতে উঠে স্কুল ছাত্র সংগঠনের সহকারী সাধারণ সম্পদক পদে নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক পাস করে গাইবান্ধা কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সংস্পর্শে আসেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আইএ পাস করে ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে ভর্তি হন। এখানে বৃহত্তর পরিবেশে এসে তার রাজনৈতিক চিন্তার আমূল পরিবর্তন ঘটে। মতিউল বুঝতে পারে বুর্জোয়া প্রশাসন, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল এবং বুর্জোয়া ছাত্র সংগঠন দ্বারা দেশের গরিব কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের মুক্তি এবং কল্যাণ সম্ভব না। তাই ধীরে ধীরে প্রগতিবাদী চিন্তাধারার কর্ম সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং এই সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে মতিউল গেরিলা ট্রেনিং নিতে ভারতে চলে যান এবং সেখান থেকে ফিরে কুমিল্লা সীমান্তে জীবন বাজি রেখে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন চালান। অপারেশনগুলোতে পাক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার সংগ্রাম স্বার্থক হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে সে জবাব দেয়, ‘দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক এসেছিল তাই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু এটাকে আমি চূড়ান্ত সংগ্রাম বলে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি শোষণহীন, শ্রেণী- বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব। তার জন্য আমাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মতিউল আবার ফিরে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। জহুরুল হক হলের ১৪৮ নম্বর রুমে থাকতেন। জহুরুল হক হল শাখার প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের সকল কাজে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং নিষ্ঠাবান।
স্বাধীনতার পর অনেকেই যখন স্ব-স্ব স্বার্থ উদ্ধারে মগ্ন মতিউল তখন সকল ধরনের লোভ-মোহ ত্যাগ করে সংগঠনের কাজে নিজেকে নিবেদিত করেন। কতদিন না খেয়ে, আধাপেট খেয়ে নিজের পয়সা খরচ করে সংগঠনের কাজ করতেন। বন্ধু লুৎফর রহমানকে নিজের কাছে রেখে নিজের খাবারকে দু’ভাগ করে খায়িয়ে দু’বছর পর একটি চাকরির সংস্থান করে দিয়েছিলেন। মতিউল শুধু দেশের নিপীড়িত মানুষের কথা চিন্তা করতেন না, তিনি সমস্ত বিশ্বের অসহায় শোষিত-লাঞ্ছিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কথা ভাবতেন। অত্যাচারী শাসক সে যে দেশেরই হোক, যে জাতিরই হোক, সে দেশের নির্যাতিত মানুষের জন্য মতিউল সহমর্মিতা পোষণ করতেন। বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রের অবস্থান, শ্রেণীসংগ্রাম, বিপ্লব ও মানুষের মুক্তি ইত্যাদি নিয়ে প্রতিনিয়ত অধ্যয়ন করতেন। মেহনতি মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত রয়েছে বলে তার দৃঢ় ধারণা জন্মেছিল।
ওই সময় মার্কিন নগ্ন হামলায় ক্ষতবিক্ষত ভিয়েতনামের মানুষ। বিশ্ববিবেক ধিক্কার জানাচ্ছিল এই নগ্ন হামলাকে। এ সময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিযনের উদ্যোগে ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ভিয়েতনাম সংহতি দিবস পালনে ডাক দেয়। ওই দিন তোপখানা রোডে অবস্থিত মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের (ইউসিস) দিকে মিছিল এগিয়ে চলে। ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে নেতৃত্ব দান করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নূহ-উল-আলম লেনিন, মাহবুব জামান প্রমুখ। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদের। পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিতে মতিউল ও কাদের মৃত্যুবরণ করেন।


মির্জা কাদেরুল ইসলাম
মির্জা কাদের ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন ‘রঙধনু’ নামক খেলাঘর আসরের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে ‘মুক্তি’ নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। কুলাউড়া থানার স্থানীয় সমস্যা নিয়ে ছাত্র জনতার প্রত্যেকটি মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। কবিতা-গান-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। বিদ্যালয় জীবন থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৭২ সালে কাদের ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ধর্ম ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন পান। ১৯৭৩ সালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ভিয়েতনামের জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের পাস দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় পুলিশ বিনা উস্কানিতে গুলিবর্ষণ করলে মির্জা কাদেরুল ইসলাম ও মতিউল ইসলাম মারা যান। মতিউল-কাদেরসহ শত সহ¯্র আত্মত্যাগী জীবনের চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হই। মেহনতি মানুষের মুক্তির শপথ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলার সংগ্রামে সামিল হই। আর এই শপথই হোক সাম্যাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবসের দৃঢ় সংকল্প।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com