সাহিত্যে “ছড়া”

প্রকাশিত: ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২১

সাহিত্যে “ছড়া”

শাহাদত বখ্ত শাহেদ

পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষা সাহিত্যেে অন্যতম প্রকাশ মাধ্যম হলো ছড়া। এই ছড়া যুগে যুগে বিভিন্ন ভাষায় পাঠকের মন জয় করে আসছে। শব্দে,ছন্দে, অন্ত্যমিলে ছড়া যেন এক নান্দনিক অনুভূতি। সেই অনুভূতি শিশুদের যেমন আকৃষ্ট করছে বড়োদের তাই। ছড়া বিভিন্ন ভাষায় লেখা হয়েছে। ইংরেজী সাহিত্যে ছড়া বা লিমেরিক ব্যাপক ভাবে পরিচিতি পেয়েছে।ছড়ার কিংবদন্তি লিয়রের কথা কারো অজানা নয়। বিদেশী ভাষায় যে সকল ছড়াকাররা ছড়াসাহিত্যকে প্রাণ দিয়েছেন তাদের মধ্যে JAMES L HYMES,JUDUB NICHOLLS,JOYCE CAROL THOMAS, RUTH TILLER অন্যতম।
বাংলা ছড়ারও এক ঐতিহাসিক রুপ লাবণ্য আছে।সেই প্রাচীন কাল থেকে বাংলা ছড়া তার নিজস্ব জায়গা দখল করে নিয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে ছড়াকাররা নির্মাণ করে যাচ্ছেন ছড়ার মজবুত ভীত। প্রাচীন কালের নাম অজানা অনেক ছড়াকাররা শত শত ছড়া লিখে গেছেন। যা এখনো মানুষের মুখে মুখে পঠিত হয়। এই ছড়াগুলোতে নানা রকম বিষয় আশয় গতি প্রকৃতির ভিন্নতা পাওয়া যায়। প্রাচীনকালের কিছু রসাত্নক ছড়ার উদ্ধৃতি না দিলে নয়। যেমন :
কোথায় আমার চাঁদমণি,
মুচ্ কি হাসি মুখখানি!
ঝাঁপিয়ে কোলে
আয় দেখি মা
গাল ভ’রে দি
হাজার চুমা।
অন্যছড়ায়-
আঁধার ঘরের মানিক।
নড়’বোও না – চ’ড়বোও না –
দেখ্ বো খানিক খানিক!
সময়ের ধারাবাহিকতায় অনেক ছড়াকারদের জন্ম হয়েছে বাংলাসাহিত্যে। তারা ছড়া লিখে গেছেন নানা রকম চিন্তা ভাবনায়। যেমন- গুরুসদয় দত্ত থেকে শুরু করে,রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে সুকুমার রায়,যোগীন্দ্রনাথ সরকার,সত্যন্দ্রনাথ দত্ত,অন্নদাশঙ্কর রায় থেকে শুরু করে,দিলওয়ায়,রোকনুজ্জামান খান, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, ,আবুল খায়ের মুসলেহ উদ্দীন,ফররুখ আহমদ,বন্দে আলী মিয়া,অমিতাভ চৌধুরী,সুনির্মল বসু সহ অনেক ছড়াকার কবিরা বাংলা ছড়াসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।
বর্তমান আধুনিক কালে বাংলা ছড়াকাররা কেউ ঘরে বসে নেই। তারা লিখছেন অবিরাম ধারায়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে যারা ছড়া
লিখে লিখে সদ্য প্রয়াত হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কাদের নওয়াজ খান,ফতেহ ওসমানী,আজিজ আহমদ সেলিম,বিশ্বদেব চৌধুরী, আবদুল বাসিত মোহাম্মদ,মাহমুদ হক,গোবিন্দ পাল,আলম তালুকদার, শামসুল করিম কয়েস,নাসের মাহমুদ,
আহমাদ উল্লাহ, ইলতুৎ আলীদ, ফজল এ খোদা প্রমুখ।
জীবদ্দশায় যারা
জীবনী শক্তি নিয়ে এখনে ছড়া নিয়ে কাজ করছেন এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আখতার হুসেন,সুকুমার বড়ুয়া,রফিকুল হক, লুৎফর রহমান রিটন,আসলাম সানী, আমীরুল ইসলাম, রাশেদ রউফ,আনজীর লিটন,রহীম শাহ, তুষার কর,ইলতুৎ আলীদ,রোকেয়া খাতুন রুবি,সালাম মশরুর, সেলু বাসিত,জাহাঙ্গীর আলম জাহান,আব্দুল হামিদ মাহবুব, ,ফারুক হোসেন প্রমুখ। দেশের বাইরে বাংলা ভাষাভাষি দেশগুলোর মধ্যে ভারতের কোলকাতা ও ত্রিপুরা রাজ্যে যারা ছড়া নিয়ে কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ভবানী প্রসাদ মজুমদার,দীপ মুখোপাধ্যায়(কোলকাতা)বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী (ত্রিপুরা) প্রমুখ।
বর্তমান আধুনিক কালে ছড়াকাররা ছড়াকে নিয়ে ব্যাপক ভাবে কাজ করে চলেছেন। ছড়াকে পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য
বিভিন্ন মাধ্যম বেছে নিয়েছেন। ছড়াকাররা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়াকে নিয়ে হাজির হয়েছেন পাঠকের কাছাকাছি। যেমন পিভিসি ফরমেটে বের হচ্ছে “ঢালপত্র” নামের ছড়া সাময়িকী, ফেইস বুক কেন্দ্রীক ই পেপারে বের হচ্ছে বিভিন্ন নামের ছড়া সংখ্যা। ছড়ার ছোটোকাগজ গুলোও ছড়াসাহিত্য নিয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে প্রতিনিয়ত। যে কাগজ গুলো বাংলা ছড়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে তাদের মধ্যে অন্যতম- ছড়া পত্রিকা,
অন্ত্যমিল,আড়ঙ্গি,ছড়ালোক, লাটাই,
ছন্দালাপ,ছড়াকর্ম,ছড়াপত্র,ছড়াভূমি উল্লেখযোগ্য ।
ইদানিং ছড়াসাহিত্যে আধুনিক প্রচার মাধ্যম হিসেবে সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে অনলাইন ভিত্তিক টেলিভিশন “ছড়া টিভি”। যে টিভি প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়াকে ছড়িয়ে দিতে চায় বিশ্বব্যাপী।
সাংগঠনিক ভাবে ছড়াকে এগিয়ে নিতে ছড়া সংগঠন গুলো কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ চলছে ছড়ার। ছড়া নিয়ে যে সকল সংগঠন ছড়ার মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম ছড়াকেন্দ্র-সিলেট,সিলেট ছড়াপরিষদ,ছড়ামঞ্চ,ছড়া নিকেতন,ছড়া সংসদ ইত্যাদি।
উপসংহারে বলতে হয় ছড়া এখন আর ছোটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছড়া বড়োরাও পড়ছে, লিখছে।
ছড়া নানা রকম বিষয় নিয়ে লেখা হচ্ছে। যেমন শিশুদের নিয়ে তেমনি সমাজের অসঙ্গতি গুলো খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠছে বড়োদের ছড়ায়। আমাদের স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু সহ সকল বিষয়ে স্হান করে নিয়েছে আমাদের ছড়াসাহিত্য।
সবশেষে অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই বিখ্যাত ছড়ার চারটি লাইন দিয়ে শেষ করবো :
যতদিন রবে পদ্মা,মেঘনা, যমুনা
গৌরী বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।
জয় হোক ছড়ার, জয় হোক ছড়াসাহিত্যের।
সহায়ক গ্রন্থঃ খুকুমণির ছড়া,বাংলাদেশের বাছাই ছড়া,বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ছড়া।
লেখক-
ছড়াকার, সম্পাদক ছড়ালোক।
১৭/৭/২১

ছড়িয়ে দিন