সিপিবি কিভাবে টিকে আছে

প্রকাশিত: ৪:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৩

সিপিবি কিভাবে টিকে আছে

 

জাকির তালুকদার

বাম দল, বিশেষ করে সিপিবি-কে নিয়ে ফেসবুকে ট্রলের পর ট্রল দেখি আর হাসি। বেচারা ট্রলকারীরা নিজের পশ্চাদ্দেশে কোনোদিন হাত দিয়ে দেখে না কত টন ময়লা জমে আছে।
সিপিবি এখন প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন একটি দল। সেই দলটি কেন এত গুরুত্ব পায় ফেসবুকারদের কাছে?
২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নিতে এসে হেফাজত একটিমাত্র দলের অফিসে হামলা করেছিল। সিপিবি অফিসে। হেফাজতের সমাবেশে কেবল হেফাজত ছিল না। ছিল জামাত-শিবির, বিএনপি, জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের কিছু লোক যে ছিল না তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
শুধু সিপিবি অফিসে হামলা হলো কেন?
কারণ জামাত-শিবির এবং জঙ্গিরা জানে যে বাংলাদেশে তাদেরকে তাত্ত্বিক দিক থেকে, ঐতিহাসিক ভূমিকার বিশ্লেষণের মাধ্যমে, এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার সামর্থ্য রাখে কেবল সিপিবি। (যদি কোনোদিন আবার সেই সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে পারে সিপিবি)। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির যে ঢুকতে পারেনি তার কারণ ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর ছিল শক্তিশালী প্রতিরোধ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে সিপিবি-র নেতৃত্বের বড় অংশটাই পার্টি এবং আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তারা ছাত্র ইউনিয়ন, ক্ষেতমজুর সমিতিকে ভেঙে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল। উদীচী, খেলাঘর ভেঙে তুলে দিয়েছিল আওয়ামী লীগের হাতে।
তারপরেও সিপিবি বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। সিপিবি যে পঙ্গু অবস্থাতেও টিকে আছে তার কারণ শুধু আদর্শ নয়। বরং দেশের প্রয়োজনই টিকিয়ে রেখেছে সিপিবিকে।
সাঈদী ইস্যুতে সিপিবি-র নতুন করে বলার কিছু নেই। কয়েক দশক আগে যা বলেছে, এখন আবার বলার দরকার নাই। বরং আওয়ামী লীগার নামে পরিচিত অসংখ্য নারী-পুরুষের ফেসবুকে সাঈদীর জন্য দোয়া করা নিয়ে ভাবুন আপনারা।
সিপিবিই একমাত্র দল যারা জামাত-শিবির তো বটেই, পতিত স্বৈরাচার এরশাদের পার্টির সংস্পর্শে যায়নি কখনো।
সিপিবি-র ভেতরের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃত্ব স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগকে দিয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সমাজতন্ত্র নির্মাণ করিয়ে নেবার লাইন গ্রহণ করেছিল। নব্বইয়ের পর দলত্যাগীরা চলে যাওয়ায় বাকিদের সুবিধা হয়েছে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণের। ২০০০ সালের পর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে সিপিবি। এটাই সঠিক। পার্টি হিসাবে ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করা সম্ভব এই অবস্থান অটুট রাখার মাধ্যমেই।
আওয়ামী লীগের গোস্বা সিপিবি কেন তাদের সরকারের অপকর্মের সমালোচনা করে? কেন তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়।
বিএনপির গোস্বা সিপিবি কেন তাদের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে যোগ না দিয়ে নিজেদের মাত্র কয়েকজন লোক নিয়ে আলাদা কর্মসূচি পালন করে?
আর ফেসবুকে নিজেদের বুদ্ধিজীবী প্রমাণে উদগ্রীব অকালপক্করা ট্রল করে কী কারণে তার উত্তর তারা নিজেরাও জানে না বলেই আমার ধারণা।
সিপিবি-র সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করি আমরা। সেটি ফেসবুকে নয়। আলোচনা সভায় করি, নেতাদের সাথে বিতর্কের সময় করি, বই লিখেও করি। আমার উপন্যাস ‘১৯৯২’ পড়ে দেখতে পারেন চাইলে।
আমাদের এখনকার চাওয়া– ছোট্ট পার্টি সিপিবি আরো ছোট হয়ে যাক। আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগের হয়ে গোপনে কাজ করা সদস্যরা চলে যাক। ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, উদীচী, খেলাঘর থেকে নৌকাপন্থিরা চলে যাক। তারা বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট এবং শেখ রাসেল শিশু সংগঠন করুক।
তারপরেই কেবল সিপিবি পারবে সামনে অগ্রসর হতে।

জাকির তালুকদার ঃ বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত কথাশিল্পী