২০১৮ সালে ৩০শ ডিসেম্বর

প্রকাশিত: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০২০

২০১৮ সালে ৩০শ ডিসেম্বর

সিমকী ইমাম খান

১২,

নির্বাচনের মাঠ তৈরী করলেও নির্বাচন করার আর সুযোগ পেলাম না । ২০১৪ সালে দল নির্বাচন বয়কট করেছিল । তারপর থেকে সরকারের একচেটিয়া দমন নিপীড়ণ । এ অবস্থায় বিএনপি ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর হাতছাড়া করতে চায় নি । সে কারণে ডক্টর কামাল হোসেনের গণ ফোরাম , মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যসহ বিভিন্ন দলের সমন্নয়ে জাতীয় ঐক্যযফ্রন্ট গঠণ করে । নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরী হয় ।
আমি একাদশ জাতীয় নির্বাচন-২০১৮ উপলক্ষে আমার নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করার জন্য বিএনপি্র দলীয় মনোনয়ন ফর্ম তুলেছিলাম । কিন্তু যিনি আমাকে এই আসনে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই নেত্রী আমার মা বেগম খালেদা জিয়া তখন কারাগারে । তাই দলীয় সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে ছিল না। দল মনোনয়ন দিয়েছিল রফিকুল ইসলাম খানকে। আমি আশাহত হয়েছি । কিন্তু পিছিয়ে যাই নি । বরং আমি দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি সন্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে একসাথে প্রচারণা করেছি । জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের জন্য শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ভোট যুদ্ধে নিজে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নেতাকর্মী সাথে নিয়ে দলীয় প্রতীকে ভোট দিয়েছি । বিভিন্ন সেন্টারে গিয়ে জাতীয়তাবাদী দলের নেতা-কর্মীদের নিকট ধানের শীষের পক্ষে ভোট দেবার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছি ।


উল্লেখ্য, সারা দেশে নিজ দলীয় অনেক নেতাকর্মীরাই সেই নির্বাচনে ভয়ে ও শঙ্কায় বের হন নি ।কিন্তু আমি সেদিন ঘরে বসে না থেকে রাজপথে নেমেছি নিজ দলের প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য। নির্বাচনের দিন দুপুরের দিকে এলাকার একটি সেন্টারে ভোট চলাকালীন সময়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার সময় আওয়ামীলীগের দলীয় সন্ত্রাসী ক্যাডার আমার ওপরে হামলা করে এবং আমি সেদিন গুরুতর আহত হই।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০১৮ এক কলঙ্কিত নির্বাচন। এমন কলঙ্কজনক নির্বাচন দেশের ইতিহাসে আর হয়নি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তারিখের সংসদ নির্বাচন, সমসাময়িক গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় নির্বাচন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে।

নজিরবিহীন ভুয়া ভোটের এই নির্বাচনের আগের দিনই বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশাসনের সহায়তায় ভোট ডাকাতি হয়েছে। অথচ নির্বাচনের দিন প্রশাসন এসব অনিয়ম ঠেকাতে নিষ্ক্রিয় ছিল।

নির্বাচনের আগে থেকেই সাধারণ জনগনের মাঝে এই নির্বাচনের সকল প্রকার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। নির্বাচনের আগেই আসন ধরে ধরে বিএনপি ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের নামে ভৌতিক মামলা হয়েছে। সেই মামলা ধরে ধরে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সেই মামলায় বিরোধী দলকে আটকানোর জন্য গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে। সারা দেশে সরকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস শুরু করে। এর মাধ্যমে গোটা দেশে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে। এমন নির্বাচন অতীতে আর কখনো হয়নি এ দেশে। এমনকি সারা দেশে টার্গেট করে এজেন্টদের আটক করা হয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যা থেকে জাল ভোট দিয়ে কারচুপি করা হয়েছে।

গত ১১ বছরে প্রথমবারের মতো এই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল, ফলে সে বিবেচনায় ২০১৮ সালের এই জাতীয় নির্বাচনের একটা ভিন্ন দিক ছিল।

তবে দলীয় সরকারের অধীনে নিয়ন্ত্রিত এবং একচেটিয়াভাবে নির্বাচন করার অভিযোগ ওঠে। এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এবং অভিযোগের পাল্লা অনেক ভারী হয়। বেশির ভাগ নির্বাচনী এলাকা বা আসনে সরকারপন্থী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে, বল প্রয়োগ করে, ভীতি প্রদর্শন করে বিএনপির ধানের শীষের পক্ষের প্রার্থীদের প্রথাগত প্রচারণায় দারুণ বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্প করতে দেয়া হয়নি অথবা করা হলেও ভেঙে ফেলা হয় অথবা জ্বালিয়ে ফেলা হয় এবং বলা হয়, আর যেন ক্যাম্প না বানায়। সিএনজি তথা বেবিট্যাক্সি বা অটোরিকশা নামক তিন চাকার গাড়িতে বা রিকশায় মাইক লাগিয়ে গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে প্রচারণার সময় বহু গাড়িঘোড়া ভাঙা হয়েছে, মাইক ভাঙা হয়েছে এবং যারা প্রচারণার কাজে ছিল তাদেরকে মারধর করা হয় এবং অনেককেই গ্রামছাড়া করা হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে দু-তিন দিন পর পুলিশ ধরে নিয়ে যায় এবং কোনো-না-কোনো বাহানায় মামলা দায়ের করা হয়। প্রার্থীদের পোস্টার লাগানো হয়, সরকারপন্থী লোকগণ এই পোস্টারগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে। যেহেতু পোস্টারগুলো রশিতে টাঙানো থাকে, তাই রশির যেকোনো এক পাশে গোড়ায় কেটে দিলেই রশিটি পোস্টারসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং অন্তত দশটি পোস্টার অকেজো হয়ে যায়। পোস্টার লাগানোর সময় ধানের শীষের বহু কর্মীকে মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়, বহু কর্মীকে মারধর করে নিষেধ করা হয়। ফলে বহু নির্বাচনী আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের পোস্টার ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি। বিরোধী দল বিএনপি’র পোস্টার ও ডিজিটাল ব্যানারগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায় একই কায়দায় নিষেধাজ্ঞা, হামলা, মারধর, ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি ঘটেছে।বিপুলসংখ্যক আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের জনসংযোগের সময় ও মিছিলের সময় বাধা ও আক্রমণ আসে। অনেক ক্ষেত্রেই জনসংযোগ ও মিছিল করার আগেই সরকারপক্ষের লোকেরা জানিয়ে দেয়, যেন ধানের শীষের প্রার্থী ও তার লোকেরা জনসংযোগ বা মিছিলে না নামে । এবং হুমকি দেয়া হয়, নামলে খবর আছে। বহু ক্ষেত্রে এই হুমকি উপেক্ষা করে ধানের শীষের প্রার্থীগণ জনসংযোগ ও মিছিলে নেমেছেন এবং নামার পর আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

৩০শে ডিসেম্বেরের নির্বাচন নিয়ে এখনও রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে আলোচনায় অগ্রাধিকার পায়। কারণ এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর টানা তৃতীয়বারের মত সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
ভোটের আগের রাতেই অনেক অভিযোগ ছিল । ভোটের দিন সারাদেশে সব ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু অনেক নির্বাচনী এলাকা থেকে বিএনপি এবং তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বেশ কিছু প্রার্থী ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্র নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে নানা অভিযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

বিএনপির অভিযোগ ছিল, ২৯ তারিখ রাতেই মানে ভোটের আগের দিন রাতে বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে।

সেই রাতের পরিবেশ ছিল কার্ফুর মতো । একদম অন্ধকার রাত, কোন মানুষজনকে বাসা থেকে বের হতে দেয়া হয় নি ।
আমি এটার সাক্ষি, কারণ তখন মানে ভোটের আগের দিন রাতে আমার শরীরটা একটু খারাপ হয়েছিল কিছু ঐষধ এর দরকার ছিল কিন্তু সে রাতে আমার লোক জনকে গেটের বাহির হতে দেয়নি ।

প্রায় সারারাতই বিরোধী প্রার্থীরা বিভিন্ন মিডিয়ায় টেলিফোন করে এমন অভিযোগ করছিলেন।

তবে আগের রাতে সিল মারার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে আওয়ামী লীগ।

অনেক প্রশ্ন এবং অভিযোগের মুখেও টানা তৃতীয় বার সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মাত্র সাতটি আসন পেয়ে শেষ পর্যন্ত সংসদে গেছে।

(চলবে)

ছড়িয়ে দিন

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031