আমাদের নানা উদ্যোগ

প্রকাশিত: ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২০

আমাদের নানা উদ্যোগ

সিমকী ইমাম খান

১৪

খালেদা জিয়ার বয়স এখন ৭৭ বছর। যে বয়সে তার পরিবারের সান্নিধ্যে থাকা দরকার সেই বয়সে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাকে একাকিত্ব পেয়ে বসেছে মারাত্মকভাবে। তাকে আধুনিক চিকিৎসা দিতে হবে। হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডও বলছে, উন্নত চিকিৎসা দরকার, কিন্তু সেটা তো তিনি পাচ্ছেন না। আধুনিক চিকিৎসা দিতে হলে তো আধুনিক সেন্টারও লাগে। যদি আধুনিক চিকিৎসার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জামিন বা মামলা স্থগিত করে পছন্দমতো হাসপাতালে ওনার চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে সবার জন্য মঙ্গল হতো।

খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, স্থায়ী কমিটি ও সিনিয়র নেতারা এ বিষয়ে যা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সে অনুযায়ী তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

দলের চেয়ারপারসনের কারাবাস প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তৎকালীন সময়ের ঐ মুহুর্তে বলেছিলেন, “খালেদা জিয়াকে সরকার ২ বছরের অধিক সময় ধরে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আটক করে রেখেছে। অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে রেখে সরকার খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার স্বাস্থ্যের যে কোনো অবনতির জন্য বর্তমান সরকারকে সব দায়দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। জনগণের সামনে তাদের একদিন আদালতে দাঁড়াতে হবে”।

কারাগারে সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা পড়েন খালেদা জিয়া। এরপর ইবাদত-বন্দেগি ও বই পড়ে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান তিনি।

২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্ট খালেদা জিয়ার নিম্ন আদালতের দেওয়া ৫ বছরের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন। পরবর্তিতে এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। একই বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলায় এক তরফা মিথ্যা রায় দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাবার পর তাকে জামিন করার জন্য তার আইনজীবীগন মামলার রায়ের কপির জন্য আবেদন করলে মামলার রায়ের কপি নিয়েও সরকার হুকুম মতো আদালত নানা রকম তাল বাহানা করতে থাকেন। অবশেষে এ নিয়ে গনমাধ্যমে, সংবাদপএে এবং বিএনপির মামলার রায়ের কপি হাতে পাবার পর বেগম জিয়ার জামিনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। তৎকালীন ২৩শে ফেব্রুয়ারি রোববার দুপুর ২টার পর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি শুরু হয়েছে। এর আগে সকালে রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ দুপুর ২টায় জামিন শুনানির সময় নির্ধারণ করেন।

আদালতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন (বাপ্পী) বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল এ মামলায় শুনানি করবেন। তিনি এখন অন্য মামলায় ব্যস্ত আছেন। এজন্য দুপুর একটা পর‌্যন্ত সময় প্রয়োজন। তখন আদালত বলেছিলেন, অ্যাট টু (দুপুর দুইটায়)। ঔই সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাতে সায় দিয়ে বলেন, এটা আদালতের বিষয়।

১৯ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) আবেদনটি উপস্থাপনের পর আদালত ২৩ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছিলেন।

ওইদিন আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার এই আবেদনটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়ের করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী সগীর হোসেন লিয়ন।

২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর এই মামলায় তার জামিন আবেদন পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করে দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। তবে আবেদনকারী (খালেদা জিয়া) যদি সম্মতি দেন তাহলে বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী তার অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেয়ে বন্দি রয়েছেন খালেদা জিয়া। আপিলের পর হাইকোর্টে যা বেড়ে ১০ বছর হয়। পরে ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়া জামিন আবেদন করেন।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের সাত নম্বর কক্ষে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান (বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সাজা হয়েছে মামলার অপর তিন আসামিরও।

দণ্ডপ্রাপ্ত অপর তিন আসামি হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

এরপর ওই বছরের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এর বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। পরে গত বছরের ৩০ এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাত বছরের দণ্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অর্থদণ্ড স্থগিত ও সম্পত্তি জব্দ করার ওপর স্থিতাবস্থা দিয়ে দুই মাসের মধ্যে ওই মামলার নথি তলব করেছিলেন।

এরপর ঔই বছরের ২০ জুন বিচারিক আদালত থেকে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরবর্তিতে ৩১ জুলাই বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ তার জামিন আবেদন খারিজ করে দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে জামিন চান খালেদা জিয়া। এ আবেদনের শুনানির পর ১২ ডিসেম্বর সেটি খারিজ হয়ে যায়।

বেগম জিয়ার জামিনের জন্য আদালতে আবেদন করা হলে আদালত প্রথম ধাপের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেন। বেগম জিয়া কারাগারে অসুস্থ হলে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পূনরায় আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করার পর আদালত থেকে জামিনের অনুমতির প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষায় থাকে বিএনপি। তবে পূর্বের মতো আবারও নিরাশ হলে প্যারোলের আবেদন করা হবে কি না, তা নিয়েও দলে আলোচনা চলছিলো তৎকালীন সময়ে। খালেদা জিয়ার পরিবার ও দলের একটি অংশ প্যারোলে হলেও খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে। অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে ঔই মুহুর্তে বলা হয়েছিলো, প্যারোলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে খালেদা জিয়ার পরিবার।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া দুই বছর ধরে কারাবন্দী। শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে গেলে গত বছরের এপ্রিলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। তখুন থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আছেন। এর আগে জামিন চাওয়া হলেও আদালত তা মঞ্জুর করেননি।

পরবর্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের মতো দেশে যাওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন করা হয়। দিন দিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। কারও সাহায্য ছাড়া তিনি চলাফেরা ও ওষুধ সেবন করতে পারেন না। দেশের বাইরে তথা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে তাঁর অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট বা বায়োলজিক এজেন্ট নামের থেরাপি নেওয়া প্রয়োজন।

এই মামলায় জামিন পেলেও তাৎক্ষণিক মুক্তি পাবেন না খালেদা জিয়া। কারণ, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তিনি সাজাপ্রাপ্ত। ওই মামলায় তাঁর জামিন হয়নি। তবে বিএনপির নেতারা মনে করছেন, যেহেতু দুটি একই ধরনের মামলা, তাই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন হলে অন্যটিতেও আবেদন করে জামিন পাওয়া যাবে।

গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করেন। এতে খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন নিয়ে পর্যালোচনা হয়। দলের নেতারা মনে করেন, জামিন শুনানির আগে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না। জামিন শুনানি ও আদালতের রায় দেখে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছেন কারাগারে দিন দিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। একা হাঁটাচলা করতে পারছেন না। তাঁর শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা ও যন্ত্রণা বেড়েছে। এই অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে খালেদা জিয়ার জীবন বাঁচানোই তাদের অগ্রাধিকার। প্যারোলে হলেও তাঁর মুক্তি প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরাও প্যারোলে হলেও খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে। তবে প্যারোলের আবেদনের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার ইচ্ছা–অনিচ্ছার ওপর।

বিএনপির নেতাদের একটি অংশেরও প্যারোল নিয়ে ভিন্নমত আছে। তাঁরা মনে করেন, জামিনে মুক্তি পাওয়া খালেদা জিয়ার আইনগত অধিকার। প্যারোল নেওয়ার অর্থ হলো সরকারের অনুকম্পা নেওয়া এবং নতি স্বীকার করে নেওয়া।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন জামিন প্রসঙ্গে তৎকালীন ঔই সময়ে মতামত প্রকাশ করেছেন যে, খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি সরকারের ওপর নির্ভর করছে। সরকারের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করা না হলে খালেদা জিয়া জামিন পাবেন বলে তাঁরা মনে করেন। তিনি বলেছিলেন, আদালতে জামিন না হলে অবস্থা বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ ওই সময়ে বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার জামিন না হলে পরিস্থিতি এখনকার মতো চুপচাপ থাকবে না। অনেক দিন কেটে গেছে। জামিন হলে ভালো। না হলে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামবে এবং খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবে।

চলবে

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031