২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি

প্রকাশিত: ২:৫২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৬, ২০২০

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি

সিমকী ইমাম খান

৯,

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আমরা যাইনি । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এর দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে বেশীর ভাগ বিরোধী দল সেদিন নির্বাচন বয়কট করেছিল । জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে এসেছিল বিষয়টি ।

সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতাসীন দল পদত্যাগ করে না । কারণ সবাই সেখানে নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে রাজনীতিবিদদের মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্থার অভাব রয়েছে এবং তারা মনে করে যে ক্ষমতাশীল দল প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে কারচুপি করবে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন হয়েছিল রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এবং দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়- এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করে। উল্লেখ্য, এর জন্য আরও দায়ী নির্বাচন কমিশনের অকার্যকারিতা, রাজনৈতিক দলের অসদাচরণ ও বিধিবিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং প্রার্থীদের ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচনে জেতার মানসিকতা।
আমাদের দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন হয়েছিল আওয়ামীলীগেরই নেতৃত্বে । ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামীলীগের সেই আন্দোলনে সঙ্গী হয়েছিল জামায়াত । এই দলটি রাজনৈতিক ভাবে আমাদের মিত্র , কিন্তু সুযোগসন্ধানী । ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে থেকে তারা ১৮ টি আসন পেয়েছিল । ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগের সঙ্গে মিলে গিয়ে আসন পেয়েছিল মাত্র ২টি । বিশ্বাসঘাতকতার উচিৎ শাস্তি পেয়েছিল । তাই আবার জোট বাঁধে বিএনপির সঙ্গে। পুরস্কারও পায় ।২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে জামায়াত থেকে দুজন মন্ত্রিত্ব লাভ করেন । ওয়ান ইলেভেনের সময়েও ছিল গা ছাড়া ভাব নিয়ে । ২০০৮ এর নির্বাচনে তারা আবার জোট বাঁধে বিএনপির সঙ্গে। সেটা অন্য প্রসঙ্গ ।
১৯৯৬ সালে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান ।এরপরে২০০১ সালে আওয়ামীলীগের আমলেও ওই নির্বাচনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হয়েছিল । তখন প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান । ২০০৮ সালের নির্বাচনও হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে । তখন প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ ।

তাহলে সমস্যা কোথায় ? ২০১১ সালে সংসদে আওয়ামীলিগের নেতৃত্বে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলোপ ঘটানো হয় । সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে । এবং তখন থেকেই বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে সংকটের শুরু।

বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় জোট তখন থেকেই এর প্রতিবাদ করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে সরকার বিরোধী দলের দাবি মেনে না নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব দেয়, যেখানে বিরোধী দলের প্রতিনিধি থাকার কথাও উল্লেখ করে। বিরোধী দল সরকারের প্রস্তাব মেনে নেয়নি। তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের জন্য হরতাল, অবরোধ, গণতন্ত্রের অভিযাত্রার মতো কর্মসূচী পালন করে।

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জোরালো হয় ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবরের পর থেকে। ২৫ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। বিরোধী দলীয় জোট এই তফসিল প্রত্যাখান করে। তারপরই তারা রেল, সড়ক, নৌপথে টানা অবরোধ কর্মসূচী দেয়। কিন্তু আমার কাছে তখন মনে হয়েছে বেগম খালেদা জিয়া পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মতো অসহায় । চারপাশে মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগত শেঠ , উমি চাঁদ আর ঘষেটি বেগমেরা। প্রিয় দুই পুত্রও কাছে নেই । এ অবস্থায় মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে আমি আহত হই । কিন্তু আমার দল এই ইস্যুকেও কাজে লাগায় নি ।

এর ফলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারী দেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নির্বাচনের প্রহসন হয় । মঞ্চস্থ করে গণতন্ত্র হত্যার নাটক। এ দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে ১৫৩ জন সংসদ সদস্যকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল, সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে যার কোন নজির নেই। ৪৭টি ভোটকেন্দ্রে কোন ভোটারই ভোট দিতে যায়নি। সেই নির্বাচনের প্রহসন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশে উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সকল নির্বাচনই ছিল ভোটারবিহীন একতরফা সাজানো প্রহসনের নাটক। এসব নির্বাচন থেকেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে যে, তৎকালীন আওয়ামী সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর প্রহসনের নির্বাচনের সময় আওয়ামী সরকার বলেছিল যে, ‘এ নির্বাচন শুধুমাত্র সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন। পরবর্তী সময় সকল দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।’ কিন্তু সরকার সে প্রতিশ্রুতি আজও পালন করেনি। বরং নির্বাচন ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
প্রস্ন আসতে পারে, বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলেন কেন?এর জবাবটা আমি আগেই দিয়েছি। পলাশীর যুদ্ধে সুসজ্জিত সেনাদল থাকার পরেও নবাব যেভাবে হেরে গিয়েছিলেন,একই কারণে দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ নেতা কর্মী থাকার পরেও মীরজাফরদের কারণেই জয়ী হতে পারলেন না দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ।

এডভোকেট সিমকী ইমাম খান ঃ সদস্য, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটি

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031