সুগন্ধায় বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি

প্রকাশিত: ১:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২১

সুগন্ধায় বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি

 

নির্মলেন্দু গুণ

কবি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ূন কবির আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর আমরা বিশ-পঁচিশজন কবি সাহিত্যিক বাংলা একাডেমি থেকে মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সুগন্ধাতে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সম্ভবত ১৯৭২ সালের জুন মাসের শুরুর দিকেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য যোগদান করা লেকচারার ও তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কবি হুমায়ুন কবির নিহত হন ৬ জুন ১৯৭২।
আমরা, মনে হয় ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে সুগন্ধায় গিয়েছিলাম। তখন তিনি সুগন্ধায় থাকতেন।
উপস্থিতকবি সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে আমিই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলি। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে কবি-সাহিত্যিকদের জীবনের নিরাপত্তা প্রদানের দাবি জানাই।১৯৬৪ সালে রেলগাড়িতে নেত্রকোণা হয়ে মোহনগঞ্জ যাবার পথে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার কিছু কথা হয়েছিলো। সেটাও ছিলো জুন মাস। তারপর তাঁর সঙ্গে আমার আর কথা বলার কোনো সুযোগ হয়নি।
বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু সম্বোধন করে কথা বলতে আমার বেশ ভালোই লাগছিলে।
আমার প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, একটা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে অস্ত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা তাদের অস্ত্র জমা দেয়নি। সেইসব অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চলছে। এমতাবস্থায় আপনারা খুব সাবধানে থাকবেন। আমিও আমার নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করে উঠতে পারিনি।
এখন আপনাদের মধ্য থেকেই কেউ যদি আমাকে গুলি করে বসেন? আপনাদের বডি চেক করা হয়নি। আপনারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, আমাকে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা বানিয়েছেন– আমি আপনাদের অবিশ্বাস করি কেমন করে?
আমি জানি, কিছু বুদ্ধিজীবী লেখক আছেন– যারা এখনও বাংলাদেশকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। হুমাযুন কবিরকে তারাই মেরেছে। আমার কাছে কিছু তথ্য আছে।
এখন আমি যদি আপনাদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, ধরেন “ভাষা মতিন”কে যদি ধরি, তখন আবার আপনারাই তাঁর মুক্তির দাবি নিয়া আমার কাছে আসবেন না তো?
বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে এইরকম কথা শুনে আমরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাই।
বঙ্গবন্ধু তোফায়েলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ( তোফায়েল আহমদ তখন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন।) কবির জন্য একটা শোকবার্তা তৈরি করো।
তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন– আপনারা, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরা সমাজের সামনের সারিতে থাকবেন– এটাই আমি চাই।
বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিলো একটা মধ্যমানের চেক লুঙ্গী এবং গায়ে সাতই মার্চের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, হাতে সদ্যনির্বাপিত কালো পাইপ।
লেখকদলে যাঁরা ছিলেন, স্মৃতি থেকে তাঁদের নাম বলছি–
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, আহমদ ছফা, আবুল কাশেম ফজলুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহা, মুহম্মদ নুরুল হুদা, আবুল হাসান, আবু কায়সার, সাযযাদ কাদির, সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ, হুমায়ূন আজাদ, হীরেন দে ( এই ঘটনাটির ওপর হীরেনের একটি চমৎকার কবিতা আছে), মনসুর মুসা, আহমদ কবির, শাহ নূর খান, অরুণাভ সরকার, ফিউরি খোন্দকার, নির্মলেন্দু গুণ, রইসউদ্দীন ভূইয়া, শিহাব সরকার, সানাউল হক খান..প্রমুখ।
পিআইবির পরিচালকপদে কর্মরত কবি জাফর ওয়াজেদ এই বিষয়টি নিয়ে হয়তো আরও বিশদ বলতে পারবেন। কেননা, তাঁর কার্যালয়ে ঐ সময়ের দৈনিক পত্রিকাগুলো আছে।