সুবর্ণচরের ইতিকথা

প্রকাশিত: ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২১

সুবর্ণচরের ইতিকথা

শেলী সেনগুপ্তা

সুবর্ণ চরের চারদিকে সাদা কাশবনে ছেয়ে গেছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা। বাতাস একদিক থেকে আরেক দিকে বয়ে যাচ্ছে। নদীর জল কুলু কুলু শব্দে পাড়ের কোলে আছড়ে পড়ছে। ‘ভুল করেছি ভুল করেছি’, বলে ফিরে যাচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ফিরে আসছে। এ যেন ফুল আর প্রজাপতি অথবা মেঘ আর বাতাসের খেলা।

নদী থেকে কয়েক হাত দূরে একটা ডিবির ওপর বসে এনায়েতউল্লাহ ছিপ ফেলে বসে আছে। মাছ ধরার দিকে খুব একটা আগ্রহ নেই। বারবার তাকাচ্ছে অনেকদুরের দিকে। কোন নৌকা দেখা যাচ্ছে না। বড়ভাই রহমতউল্লাহ গেছে মহাজনের বাড়িতে। সেই ভোরে গেছে , ফেরার সময় হয়েছে। অপেক্ষা করছে ফিরলে একসাথে খাবে। রহমতউল্লাহ বারবার বলে গেছে খেয়ে নিতে। প্রতিবারই যাওয়ার সময় বলে যায়। কিন্তু এনায়েতউল্লাহ কখনো ভাইকে ছাড়া খায় না। রহমতউল্লাহ ফিরে এলে দু’ভাই গল্প করতে করতে খায়। মহাজন কি বললো, মহাজনের বাড়িতে কি খেতে দিলো, আসার পথে কি দেখলো, এসব গল্প করতে করতে মাটির শানকিতে ভাত খায়, কখনো মাছ আবার কখনো মেটে আলু দিয়ে রান্না শুটকি, সে শুটকিও ওরা নদীতে থেকে মাছ ধরে শুকিয়ে করে রাখে। এভাবেই ওদের ছয়দিন কেটে যায়, তারপর আবার রহমতউল্লাহ নৌকা করে মহাজনের বাড়িতে যায়।

ওরা দু’ভাই, কখনো বাবাকে দেখেছে বলে মনে পড়ে না। বেড়ে উঠেছে মহাজনের বাড়িতে। রমজান মাতবরের বাড়িতে মা ঝিয়ের কাজ করতো। ওরা দু’ভাই হাতে হাতে কামলাদের সাথে কাজ করতো। দিন শেষে চাকরবাকরদের মহলে দু’ভাই, মায়ের দু’পাশে শুয়ে থাকতো। কখনো বাবার কথা মনে আসেনি, মা’কে জিজ্ঞেসও করা হয় নি।

ছোটবেলা থেকেই মহাজনের বাড়িটাকে নিজেদের বাড়ি বলে জানতো ওরা। সেখানেই মা মারা গেলো। ওরা নিজেদের অসহায় ভাবতে শুরু করলো। ওদের দিনকাটে মহাজন বাড়িতে কামলা খেটে, খাবার দাবার, কাপড়চোপড় এর কোন অভাব নেই। তারপরও কোথায় যেন একটা শূন্যতা। সারাদিন ক্ষেতেখামারে কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে ওদের বুকের মধ্যে একটা কষ্টের বাতাস বয়ে যায়। শূন্য বুকের দেয়ালে মাথা কুটে হাহাকার। দু’ভাই মায়ের জায়গাটা ফাঁকা রেখে মাটিতে বুক চেপে দু’পাশে শুয়ে থাকে।

একটু বড় হতেই চারপাশে ফিসফাস শব্দ। কেউ কেউ আড়ালে বলে ওদের চেহারার সাথে মহাজনের চেহারার বেশ মিল। মাঠে কামলাদের সাথে কাজ করার সময় কোন কোন দুষ্ট কামলা কিছু শুকনো বিচালি দাড়ির মতো করে ওদের মুখের কাছে ধরে। তারপর নিজেরাই হেসে গড়িয়ে পড়ে। ওরা কিছুই না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

কথাটা ধীরে ধীরে চাউর হতে লাগলো। একসময় মহাজন গিন্নী ওদের ডেকে ভালো করে মুখের দিকে তাকালো। তারপর থেকে ওদের দুর্ভাগ্য শুরু হলো। মহাজন গিন্নী কারণে অকারণে ওদের ওপর প্রচন্ড রেগে যায়। অকারণে ওদের বকাবকি করে। তাতে বাড়ির অন্য চাকরবাকররাও ওদের পেছনে লাগা শুরু করলো। কাজের পরিমান বেড়ে গেলো। সারাদিন কাজ করে খেতে গেলে ঠিক মতো খাবারও পেতো না। শোয়ার জায়গাও কখনো পেতো না।

একসময় মহাজনের কানেও ওদের কথা গেলো। তিনি ডেকে দু’ভাইকে দু’পাশে দাঁড় করিয়ে মুখের দিকে দেখলেন। তারপর আবার কাজে পাঠিয়ে দিলেন। তাতেও ক্ষেতের কামলাদের কানাকানি চললো কিছুদিন।

একদিন মহাজন ওদের দু’ভাইকে ডেকে সুবর্ণ চরের কথা বললো। বললো, দু’ভাই এখন থেকে সেখানে থাকবে, মহিষগুলো দেখাশুনা করবে। চর থেকে শন কেটে নিয়ে আসবে। ওখানেই তাদের থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা করা হবে। একদিন এসে সারা সপ্তাহের খোরাকি নিয়ে যাবে। ওদের মনে হলো নতুন জায়গাতে গিয়ে হয়তো এর চেয়ে ভাল থাকবে। তাছাড়া মা যখন নেই তখন সব জায়গায় ওদের কাছে সমান। সবকিছু শুনে নিয়ে নাও ভাসিয়ে চলে এলো। এসে দেখে বিরান চর। প্রথম প্রথম হাতে কাজ উঠতো না। ধীরে ধীরে এখানে নিজেদের থিতু করে নিয়েছে। থাকার জন্য একটা টংঘর বানিয়ে নিলো। তার ওপর একটা কাঁথা বিছালো আর দু’টো বালিশ রেখে দিব্বি দু’ভাই ঘুমানো শুরু করলো।

সময়ের সাথে সাথে সুবর্ণকে ওদের খুব আপন মনে হতে শুরু করলো। যতক্ষণ কাজ থাকে করে তারপর রান্না করে খাওয়াদাওয়া ঘুমায়, কখনো চরের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়ায়।

ওদের মুল কাজ হলো মহিষের দেখাশুনা আর চর পাহারা দেয়া। বেশিরভাগ মহিষ দুধ দেয়। দুধ জ্বাল দিয়ে সর বানায় , তা থেকে ঘি বানিয়ে জমিয়ে রাখে। প্রতিসপ্তাহে মহাজনের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। নিজেরাও দুধ ঘি খায় ইচ্ছামতো।

রাতে ঘুমানোর সময় ওরা মায়ের গল্প করে। গল্পে গল্পে মনে হয় মা ওদের পাশে এসে বসেছে। মা’র কথা বলতে বলতে যখনই এই অনুভূতিটা আসে , তখনই চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন ওদের দেখলে যে কেউ বলবে ওরা পৃথিবীর সব চেয়ে সুখি মানুষ।

 

 

এনায়েত উল্লাহ সকাল থেকে ছিপ ফেলে বসে আছে। আজ তেমন কাজ ছিলো না।সকালেই রহমতউল্লাহ মহিষগুলোকে খাইয়ে দিয়েছে। তারপর দুধ দোহন করে নিয়েই মহাজনের বাড়ির উদ্দেশ্যে নৌকা ভাসিয়ে দিয়েছে।

আর নদীতে ছিপ ফেলে বসে আছে এনায়েতউল্লাহ। বসে থাকতে থাকতে ওর ঝিমুনি এসে গেছে। ছিপের গোড়াটা মাটিতে পুঁতে পাথরে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। ভাবছে বড়ভাই আসার সময় হলে চোখ খুললে হবে।

আস্তে আস্তে নদীর শোঁ শোঁ শব্দ কমে আসলো। একসময় চারদিক কেমন যেন শান্ত হয়ে এলো। নদীর দিক থেকে বয়ে আসা বাতাস ওর সারা শরীরে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে এক শান্তিময় নীরবতায়।

কতক্ষণ কেটে গেছে জানে না। হঠাত মনে হলো কেউ কানের কাছে তীব্রস্বরে চেঁচাচ্ছে। প্রচন্ড রাগারাগির মতো। মহাজনের বাড়িতে থাকার সময় মহাজনগিন্নীর অহেতুক চেঁচামেচির মতো। এনায়েতউল্লাহ’র একটুও ইচ্ছে করছে না চোখ খুলতে। জোর করে চোখ বন্ধ করে আছে। রাগারাগি ক্রমশ বাড়ছে। মনে হলো কেউ গায়ে পানির ঝাপটা মারলো।আর তো চোখ বন্ধ করে রাখা যায় না। এনায়েতউল্লাহ চোখ খুলতে বাধ্য হলো।

হতভম্ভ হয়ে দেখলো, নদীতে ঝড় উঠেছে। বিশাল বিশাল ঢেউ পাড়ের কোমরে আছড়ে পড়ছে। কি এক অসহ্য ক্রোধে নদী সবকিছু দুমড়েমুচড়ে দিতে চাইছে।

এনায়েতউল্লাহ’র একবার বড়ভাইএর কথা মনে হলো , আবার মনে হলো, ওদের টংঘরের কথা। উঠে দাঁড়িয়ে টংঘরের দিকে ছুটে গেলো। মনে হচ্ছে চরটা যেন ছোট হয়ে গেছে। কয়েক কদম ছুটেই টংঘরের কাছে পৌঁছে গেলো। মাচা ভেঙ্গে টংঘরটা একদিকে হেলে পড়েছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। এদিক ওদিক তাকিয়ে এক লাফে টংঘরে উঠে গেলো। দোদুল্যমান ঘরটা ওর ওজন নিতে পারলো না। ধপাস করে পড়ে গেলো। এনায়েতউল্লান চিৎ হয়ে পড়ে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো। হঠাত দেখে একটা বিশাল ঢেউ চরের অনেকটা জায়গায় গড়িয়ে আবার নদীতে ফিরে গেলো। ঢেউটা নেমে যাওয়ার সময় অনেককিছু রেখে গেছে। এনায়েতউল্লাহ’র মনে হলো অবাক হওয়ার মতো কিছু একটা চরের বুকে পড়ে আছে। নদীর চিৎকার ক্রমশ অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে পেছন ফিরে নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস তার রাগের শেষ ছিঁটেফোটা উগলে দিতে দিতে দিক পরিবর্তন করলো। আকাশটাও বেশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে। এনায়েতউল্লাহ পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলো ঢেউ এর ফেলে যাওয়া আবর্জনাগুলোর দিকে। কাছাকাছি গিয়ে ওর চক্ষু চড়কগাছ। একটা দেহ পড়ে আছে,অনেকটা রমজান মহাজনের বড়ছেলের বঊএর মতো দেখতে। পার্থক্য শুধু রমজান মাতবরের বড়ছেলের বঊএর শরীর বেশ কাপড়চোপড় থাকে । এটার শরীরে কিছুই নেই। এনায়েতউল্লাহ ছুটে যায় দেহটার কাছে। খুব কাছে থেকে দেখে লজ্জা পেলো। মনে হলো কিছু দিয়ে ঢেকে দেয়া দরকার। দ্রুত ছুটে গেলো মাটিতে পড়ে থাকা ওদের টংঘরের দিকে। বাঁশের সাথে জড়িয়ে মাটিতে পড়ে আছে একটা গামছা।ওটা নিয়ে আবার ছুটে এলো, তারপর দেহটা ঢেকে দিলো। গামছা দিয়ে ঢেকে দেয়ার সময় মেয়েটা একটু কি কেঁপে উঠলো?

ধীরে ধীরে বাইরের ঝড় থেমে গেছে কিন্তু এনায়েতউল্লাহ’র ভেতরের ঝড় কিছুতেই থামছে না। একটু দূরে গিয়ে বসে একবার নদীর দিকে আর একবার মেয়েটার দিকে তাকায়। মেয়েটা নড়ছে। কাত হওয়ার চেষ্টা করছে। একসময় উঠে বসার চেষ্টাও করলো। এনায়েতউল্লাহ মনে মনে বড় ভাইকে খুঁজছে। এখন সে কি করবে। মেয়েটা উঠে বসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো , আবার চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।এনায়েতউল্লাহ গুটি গুটি পায়ে মেয়েটার পাশে বসলো। মেয়েটা একবার চোখ খুলে ওকে দেখে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললো। মনে হলো যেন ঘোরের মধ্যে আছে। এমন সময় অনেক দূরে একটা বিন্দুর মতো নৌকা দেখা যাচ্ছে। ওটা রহমতউল্লাহ’র নৌকা,এনায়েতউল্লাহ ছুটে গেলো একেবারের নদীর পাড়ে। হাঁটুজলে নেমে দু’হাত নেড়ে নেড়ে ভাইকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। রহমতউল্লাহ একটু অবাক হলো,ছোটভাই তো কখনো এমন করে না, আজ কি হলো? নৌকা পাড়ের কাছে আসার আগেই বড়ভাইকে টানাটানিশুরু করলো। রহমতউল্লাহ ওকে বুঝিয়ে শান্ত করে নৌকাটা টেনে ডাঙ্গায় তুললো, তারপর এনায়েতউল্লাহ’র সাথে ছুটতে ছুটতে মেয়েটার কাছে চলে এলো। ততক্ষণে মেয়েটা ঊঠে বসেছে। গামছাটা শরীরে জড়িয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে । রহমতউল্লাহ নিজের কাঁধের গামছাটাও দিয়ে দিলো।

মেয়েটা চরের মাঝখানে মাটিতে বসে আছে। একবারও মুখ তুলে দেখছে না। রহমতউল্লাহ অনেকবার জানতে চেয়েছে, ‘ওর নাম কি ,কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে,কে কে আছে’, মেয়েটা কোন জবাবই দিচ্ছে না। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। কিছুই বুঝতে পারছে না, অথবা বুঝতে চাইছে না।

দু’ভাই মিলে টংঘরটা দাঁড় করালো। তারপর তোলা চুলাতে চালডাল মিশিয়ে রান্না বসিয়ে দিলো। রহমতউল্লাহ আসার সময় কিছু হাঁসের ডিম এনেছিলো, তার থেকে তিনটা সেদ্ধ করে নিলো। খেতে গিয়ে দেখলো প্লেট মাত্র দুইটা। মেয়েটা খাবে কিসে? এনায়েতউল্লাহ তাড়াতাড়ি একটা কলাপাতা কেটে আনলো। নিজের জন্য কলাপাতায় খাবার নিলো, বড় ভাইকে আর মেয়েটাকে দুই প্লেটে খেতে দিলো। মেয়েটার জন্য প্লেট ছেড়ে দিয়ে সে খুব তৃপ্তি পেলো। মনের মধ্যে একটা ডাহুক যেন সুখ সুখ করে ডেকে উঠলো।

মেয়েটার সামনে প্লেটে করে খাবার দিতেই গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করলো। মনে হলো যেন কতদিন খায় নি। ওরা নিজেদের খাবার থেকে আর কিছু তুলে দিলো। মেয়েটা খেয়ে নিলো, তারপর ঘুমের জন্য কাতর হয়ে গেলো। কিছু না বলে টং এর ওপর উঠে ঘুমিয়ে গেলো।

ওরা দু’ভাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিচেই একটা কাঁথা পেতে শুয়ে পড়লো। ঘুমানোর ওরা ভাবছে মেয়েটা কতদিন থাকবে তার কোন ঠিক নেই, আদৌ যাবে কি না তারও ঠিক নেই, যদিও দু’ভাই ই কায়মনে চাইছে মেয়েটা যেন কখনোই এখান থেকেনা যায়। রহমতউল্লাহ বললো,

ঃ হগল সমত তো মেটিত শোয়ন যাইতো ন, আরেকখান টং বানান লাগবো।

ঃ হ,হেইডা আমিও ভাবতাছি।

ঃ কাইলই বানামু, তুই ফজরের সমত কয়ডা বাঁশ কাইট্টা আনিছ।

ঃ আইচ্ছা।

দু’ভাই দু’দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো। একই কাঁথার নিচে শুয়ে দু’জনই স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নের উপকরণও এক। ওদের বৈচিত্রহীন শান্ত জীবনে হঠাত আসা মেয়েটা। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো। প্রতিদিনের নিয়মে সূর্য ওঠার আগেই ওদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মহিষগুলো ঘাসের জমিতে ছেড়ে দিয়ে এলো। প্রতিদিন রহমতউল্লাহ মহিষের দুধ দোহন করে আর এনায়েতউল্লাহ দু’জনের ভাত রান্না করে। আজ রহমতউল্লাহ’র কিছুতেই মহিষ দোহন করতে যেতেমন চাইছে না। এনায়েতউল্লাহকে যেতে বললো।

অন্যসময় এনায়েতউল্লাহ খুশি মনেই যায়। আজ তারও মন চাইছে না। বড়ভাই’এর আদেশ মানতে যেতেই হলো, অখুশি মনেই বালতি নিয়ে চলে গেলো। রহমতউল্লাহ দ্রুত ভাত তুলে দিলো। এর মধ্যে মেয়েটা টংঘর থেকে নেমে এলো। হাঁটতে হাঁটতে নদীর কিনারে কাশবনের দিকে চলে গেলো। রহমতউল্লাহ পেছন পেছন কিছুদূর গিয়ে জিব কেটে ফিরে এলো। বুঝলো মেয়েটা প্রাকৃতিক কর্ম সারতে গেছে।

এনায়েতউল্লাহ অন্যদিনের চেয়ে আগেই দুধ দোহন করে চলে এসেছে। ওকে দেখে রহমতউল্লাহ’র মাথা গরম হয়ে গেলো। বেশ কড়া স্বরেই জানতে চাইলো, সে মহিষগুলোকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় রেখে এসেছে কিনা?

সেও ঘাড় ত্যাড়া করে জবাব দিলো,দিয়ে এসেছে। তাতেওবড়ভাই খুশি হলো বলে মনে হলো না। রেগে আর কিছু বলতে যাবে তখনই দেখে কাশবন থেকে বের হয়ে মেয়েটা এদিকেই আসছে। তখনও মেয়েটা গামছা পরা। দু’ভাইএরই মনে হলো মেয়েটার জন্য শাড়ি কেনা দরকার। ওরা তিনজন খেতে বসলো। গরমভাতের সাথে সদ্য দোহানো ফেনাওঠা দুধ, কবজি ডুবিয়ে খেলো ওরা। তখনও মেয়েটার মুখে কোন কথা নেই। খেয়ে নদীর কিনারায় গিয়ে বসে রইলো। দু’ভাই যখন যে সময় পায় মেয়েটার কাছাকাছি থাকে।

রহমতউল্লাহ হঠাত মনে হলো, মেয়েটার পরনে শুধু দু’খানা গামছা। মেয়েমানুষের পরনে থাকবে শাড়ি।

এনায়েতউল্লাহ’র সামনে কয়েকবার বক বক করলো। ভাবছে সে ই বলুক শাড়ি কিনে আনার কথা। কিন্তু সে মেয়েটা দেখতে এতোটায় মগ্ন যে বড়ভাইএর কথাটা কানেই ঢুকলো না। রহমতউল্লাহ আর অপেক্ষা না করে নৌকা নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলো। ঘন্টা খানেক পরে দু’টো শাড়ি নিয়ে ফিরে এলো।

মেয়েটাকে দিতেই হাত বাড়িয়ে নিয়ে কাঁশবনে চলে গেলো।কিছুক্ষণ পর ওদের সামনে আসতেই ওরা যেন চোখ ফেরাতে পারছে না। সবুজ শাড়িতে মেয়েটাকে টিয়া পাখির মতো লাগছে। দেখে দেখে মন ভরছে না।

দু’ভাই নিজেদের কাজ ছেড়ে সারাক্ষণ মেয়েটার আশেপাশে থাকে। একজন আরেকজনকে কাজের তাগাদা দেয় কিন্তু কেউই করে না।

মেয়েটা তার মতোই আছে। ওদের সাথে কথা বলে না,কোন প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না। খেতে দিলে খায় না দিলে চুপ করে বসে থাকে। সারাদিন নদীর পাড়ে বসে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে চোখের উপর হাত দিয়ে রোদ থেকে চোখ আড়াল করে আকাশ দেখে। বার বার ডাকলে খেতে আসে। অলসভাবে খায় , আবার নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে।ওকে দেখলে মনে হয় অনন্ত অপেক্ষা ওর জন্য নির্ধারিত।

রাতে মেয়েটা একটা টংঘরে শুয়ে থাকে আর ওরা দু’ভাই আরেকটা টংঘরে। আগে দু’ভাই ঘুমানোর সময় কত গল্প করতো। ওদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিলো মা। মা’র গল্প করতে করতে ওরা ঘুমিয়ে যেতো। আজকাল ওরা মেয়েটার গল্প করে। রহমতউল্লাহ এমনভাবে কথা বলে যেন মেয়েটা ওর কত আপন, এবং ওর জন্যই সে এই চরে এসেছে। নেয়ামতউল্লাহ’র বিষয়টা পছন্দ হয় না। তাই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে।

আবার নেয়ামতউল্লাহ যখন মেয়েটা কথা বলে তখন রহমতউল্লাহ’র ভালো লাগে না। এখন ওরা আর মুখোমুখি শোয় না। এতোদিন যে কাঁথাটা ওদের যথেষ্ট মনে হতো, এখন সেটা ছোট মনে হয়। সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখা যায়, কেউ একজন কাঁথার নিচে শুয়েছে। অন্য আরেকজন হয়তো পরনের লুঙ্গিটা গায়ে দিয়ে গুটিসুটি শুয়ে আছে।

 

মেয়েটা এসেছে বেশ কয়েকদিন হয়ে গেলো। ওর সম্পর্কে কিছুই জানা হলো না। ওদের জানার কোন ইচ্ছেও নাই। মেয়েটা ওদের চোখের সামনে আছে এটাই যেন যথেষ্ট।

কাল রহমতউল্লাহ’র মহাজনবাড়ি যাওয়ার দিন। এখন থেকে ভাবছে কি করবে। মেয়েটাকে নেয়ামতউল্লাহ’র সাথে রেখে যেতে মন সরছে না। নেয়ামতউল্লাহকেও পাঠানোর উপায় নেই । সে কখনো একা যায় নি। এই প্রথম নিজের ভাইকে শত্রু মনে হচ্ছে। কষ্ট হচ্ছ, অথচ কোন রকম সমাধানেও আসতে পারছে না। নেয়ামতউল্লাহও খুশি। সে এদিনটার অপেক্ষা করছিলো। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে একসময় ওরা ঘুমিয়ে পড়লো।

আজ মেয়েটার চোখেও ঘুম নেই। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। ওকে খুব অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে একটা কিছুর অপেক্ষা করছে।

 

আজকের সকাল ওদের একটু আগেই হয়েছে।এনায়েতউল্লাহ মহিষগুলোকে চরতে দেয়ার আগে দুধ দোহন করে নিলো। তারপর ওদের ঘাসজমিতে ছেড়ে দিয়ে এলো।বেশ উৎসাহ নিয়ে বড়ভাইকে সবকিছু গুছিয়ে দিচ্ছে। রহমতউল্লাহ’র একটুও ভালো লাগছে না। কথায় কথায় ছোটভাইকে ধমক দিচ্ছে। তাতে ওর কিছুই যায় আসে না। হাসি মুখে সব মেনে নিচ্ছে। ওর চোখেমুখে একটা ধূর্তভাব ফুটে উঠেছে। একই মায়ের পেটের ভাই, যারা কখনোই নিজেদের ভিন্ন ভাবেনি আজ তাদের মধ্যে একটা শত্রুভাব জেগে উঠেছে। দু’জনেই কৌশলী হয়ে উঠেছে। কে কিভাবে অন্যজনকে হারাতে পারে তেমন একটা চেষ্টা এখন ওদের মধ্যে।

রহমতউল্লাহ রওনা হওয়ার আগে মেয়েটার সাথে দেখা করার জন্য টংঘরে গেলো। মেয়েটা সেখানে নেই। নদীর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেলো,ভাবলো ওর সাথে দেখা করে নৌকায় উঠবে। ফেরার পথে বাজার হয়ে আসবে। ভাবছে মেয়েটার জন্য চুড়ি,চুলের ফিতা আর চিরুনি আনবে। সাজলে নিশ্চয় মেয়েটাকে অনেক ভালো লাগবে। ভাবতে ভাবতে নদীর পাড়ে যে পাথরটায় মেয়েটা বসে সেখানে চলে এসেছে, এদিকে পেছনে আসতে আসতে ছোটভাই তাগাদা দিচ্ছে নৌকায় ওঠার জন্য।

মেয়েটা পাথরের ওপর নেই। দু’ভাই অবাক হলো।মেয়েটা হয় টংঘরে থাকে নাহলে এখানে , অথচ আজ কোথাও নেই। দু’ভাই ছোটাছুটি করে সারাটা চরে খুঁজলো। কাঁশবন নাড়িয়ে দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস হৈ হৈ করে বলছে , নেই , মেয়েটা কোথাও নেই। একসময় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লো দু’ভাই। মুঠো মুঠো বালি নিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে ওরা যেন বালির বিন্দুর ভেতরে হয়তো মেয়েটাকে খুঁজে পাবে।

নদীর পাড়ে বসে থাকতে থাকতে দুপুর হয়ে গেলো। সেদিন আর মহাজনের বাড়িতে যাওয়া হলো না। সারাদিন ওরা কিছুই খেলো না। রাতটাও কাটলো অভুক্ত। আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’ভাই ভাবছে,

আসলে কি মেয়েটা ওদের জীবনে এসেছিলো নাকি স্বপ্ন?

ভাবছে আর হাই তুলছে।

পরদিন সকালে রহমতউল্লাহ ছোটভাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। দু’ভাই একসাথে মহিষের বাথানে গেলো। মহিষের দুধ দোহন করে ঘাসের জমিতে ছেড়ে এলো। রহমতউল্লাহ ভাত রান্না বসালো। নেয়ামতউল্লাহ চুলাতে লাকড়ি গুঁজে দিলো। ওরা দুই প্লেটে ভাত নিয়ে মহিষের দুধে কবজি ডুবিয়ে খেলো।

রাত এলো, ওরা একই কাঁথার নিচে মায়ের গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে গেলো। আজ ওরা দু’ভাই মুখোমুখি শুয়েছে, কাঁথাটাও বেশ বড় মনে হচ্ছে।