সৃষ্টির বৈচিত্রে নজরুল

প্রকাশিত: ১২:৩৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৮

সৃষ্টির বৈচিত্রে নজরুল

সম্পা দাস

রবীন্দ্র বলয়ের প্রভাবে যখন বাংলা সাহিত্যের আদিগন্ত চরাচর আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই ধূমকেতুর মত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যধারা এবং নজরুলের কাব্যধারা সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র। পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টিশীলতা ও প্রগতি যেহেতু সময়ের দাবীতে বিবেচিত হয় সেই অর্থে নজরুল তার সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই বাংলা সাহিত্যে কিংবদন্তীর আসন করে নিয়েচেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মত্ত এক কাব্য¯ স্রষ্টা। চেতনায় বিদ্রোহী, হৃদয়ে কুসুম কোমল এক ধ্যানমগ্ন বিনম্র  প্রেমিক। মননে তার আন্তর্জাতিকতাবাদ। একাধারে সাম্যের গায়ক, পৌরুষে ভাস্বর, তেজস্বী সেনানী, অন্যধারে বিদ্রোহী এবং চির-প্রেমিক’। [নির্মল কুমার সাহা, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪০৫, প্রকাশকের কথা, শতকথায় নজরুল।]

নজরুলের গোটা কর্মময় জীবনটাই ছিল বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। সাহিত্য বা সঙ্গীতের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তার স্বচ্ছন্দ অনুপ্রবেশ বা পদচারণায় পূর্ণতা পায়নি। নজরুল তাঁর লেখনী দিয়ে যুগের দাবী মিটিয়েছেন এবং নতুন নতুন মূল্যবোধেরও জন্ম দিয়েছেন। নিজে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তিনি ধর্মীয় গন্ডীর বাইরে যেয়ে মানবতার জয়গান করেছেন। তিনি ছিলেন অধ্যাত্মসাধক এবং মননে চরম অসাম্প্রদায়িক। জাতিভেদকে তিনি সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করতেন। মানুষকে দেখেছেন সবার উপর। জাতিভেদ সম্পর্কে তিনি বলেছেন।

‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া!
ছুলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া।

নজরুল তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সঙ্গীত, কবিতায় রসুলের প্রশস্তি গেয়েছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্যে ছিল সব ধর্ম থেকে সত্য উদঘাটন করা এবং সত্যের কাছাকাছি যাওয়া। তিনি রসুল (সাঃ) নিয়ে একটি প্রবন্ধ কাব্য লিখেছেন যার নাম ‘মরু-ভাস্কর’। এর চতুর্থ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কাজটি শেষ করতে পারেননি।

নজরুলের জীবন লোকায়ত জীবনের সাথে ঘনিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল। তিনি তাঁর লেখনি দিয়ে লোকায়ত জীবনের সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রকাশ করেন। তৎকালীন সময়ে রবীন্দ্র-সাহিত্য বিদগ্ধ শ্রেণীতে যেমন নাড়া দেয় তেমনি নজরুল সাহিত্য ও সঙ্গীত গণমানসে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। আমরা ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে দেখি কিভাবে লোকায়ত জীবনবোধ ও চেতনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেচে। মৃত্যুক্ষুধার কাহিনী, ঘটনা, চরিত্র, পরিবেশ, ভাষা-সবটাই লোকায়ত। উপন্যাসখানি শুরু হয়েছে তিনটি শব্দের একটি বাক্য দ্বারা ‘পুতুল খেলার কৃষ্ণনগর’। পুতুল লোক শিল্পের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। উপন্যাসে তৎকালীন সময়ের সংস্কার বোধটাও চরমভাবে অনুভূত হয়। লোকায়ত জীবনের সংস্কার, লোকায়ত জীবনবোধ তথা সেই সময়কার মূল্যবোধকে তিনি উপন্যাসে তুলে আনেন। নজরুলের লোক জীবনের তথা সাধারণ জীবনের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল বিধায় তিনি ভালবেসে সহানুভূতির সাথে লোকায়ত জীবকে তাঁর কাব্যে এনেছিলেন।

তৎকালীন বৃটিশ শাসনামলে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়নের যুগে এই মহাপ্রাণের জন্ম হয়। তিনি সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে বিদ্রোহ করেছেন। তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার ১৯২২ খ্রীঃ ২৬শে সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হতেই কবির বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয় এবং যথারীতি তাঁকে জেলখানায় পাঠানো হয়।

আদালতের বিচারের দিন ম্যাজিস্ট্রেট ও অসংখ্য জনতার সামনে তিনি যে লিখিত জবানবন্দী পাঠ করেন সেই অমূল্য প্রবন্ধটি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ শিরোনামে ১ম বর্ষ, ৩২ সংখ্যা, শনিবার ১৩ মাঘ ১৩২৯, ইংরেজী ২২ আগস্ট ১৯২৩ তারিখে ধূমকেতুতে প্রকাশ হয়। তিনি প্রবন্ধটিতে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করেন। তার জনানবন্দীতে ছিল, ‘রাজার বাণী বুদবুদ, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র। আমি কবি, আমি প্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কন্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানীর বাণী যে বাণী রাজ বিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে। কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়অরে তাহা নিরপরাধ, নিস্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্যস্বরূপ।’ [শতকথায় নজরুল, ৩৯ পৃষ্ঠা]

নজরুল বিদ্রোহী কবি। তাঁর বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশিত হবার পরই লোকে তাকে বিদ্রোহী কবি হিসাবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। তিনি পরাধীনতা, সামাজিক রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন লেখনী দিয়ে লিখে গেছেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল এই পৃথিবীর সমস্ত উৎপীড়ন ও অত্যঅচারের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে লিখেছেন।

মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধবনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না-

কিন্তু দুঃখের বিষয়, কবি শান্ত হবার যে পূর্বশর্ত দিয়েছিলেন তার আগেই নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে তিনি নিজেই শান্ত হয়ে যান। লোভীর নিষ্ঠুর লোভ যতদিন থকাবে ততদিন উৎপীড়িতের কন্ঠে ধ্বনিত হবে তার কাব্য।

পরাধীন দেশের শুঙ্খল মোচনের জন্য দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করা ও বাংলার মাটর গান গেয়ে বাঙালির প্রাণে সাড়া জাগানো এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাই ছিল নজরুল জীবনের ব্রত। তিনি ‘রাজবন্দীর আত্ম কাহিনীতে’ বলেন, আমি পরম আত্মবিশ^াসী। আর যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলে, কাহারো তোষামোদ করি নাই, প্রশংসা এবং তোষামোদের লোভে কাহারো পিছনে গোঁ ধরি নাই। আমি শুধু রাজার বিরুদ্ধে বলি নাই- সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য তরবারীর তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। ‘তিনি অকৃত্রিমভাবে বঞ্চিত সমাজের লাঞ্চিতদের কথাই লিখেছেন। বঞ্চিত মানুষের বেদনার সাথী হতে পেরেছিলেন বলেই লিখেছিলেন ‘জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান, বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাব আমি নিজেকে নিঃশে^ষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা।’ তাঁর ‘অগিনবীণা’, ‘বিশেষ বাশী’, ‘ফনিমনা’, ‘সর্বহারা’, ‘ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয় শিখা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’ ও ‘সঞ্চিতা’ বাঙালিকে উদ্দীপনা যুগিয়েছে, অনুপ্রাণীত করেছে মুক্তি সংগ্রামে।

ছোট গল্পেও নজরুল-প্রতিভা শৈল্পিক স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল। নজরুল-প্রতিভা মূলতঃ রোমান্টিক বা গীতি কবির। তাঁর কাব্যে পরাধীন ভারতের অবরুদ্ধ জাতির সামগ্রিক আবেগ ও জিজ্ঞাসা পেয়েছে মুক্তি। পরাধীন ও অগ্নিতপ্ত সময়ে নজরুল বেনিয়া ইংরেজদের দুঃশাসন ও বৈরী শৃঙ্খল ভেঙ্গে জাতির অস্তিত্বের মুক্তি প্রত্যাশি হয়েছিলেন।

নজরুল-জীবনে নারী এসেছে মানুষ হিসেবে। তাঁর সাহিত্যে নারী এসেছে সম-অধিকারের দাবীতে। নারী যে শুধু পুরুষের কামনার ইন্ধন, খেলার পুতুল কিংবা প্রজননের অসহায় যন্ত্র নয়, সৃষ্টির ইতিহাসে শিল্প-সংস্কৃতিতে তারও যে মহৎ দান রয়েছে- এ কথা তিনি স্বার্থান্ধ সমাজকে শুনিয়েছেন। ধর্ম ও নীতির দোহাই দিয়ে হেরেমের মধ্যে অসহায় পশুর মত নারীকে বন্দী করে যে-কদর্যতা ও বিভীষিকাময় জীবনযাত্রা চলছিল সেখানে নজরুল উচ্চারণ করলেন মুক্তির বাণী, সাম্যের মন্ত্র-

সে যুগ হয়েছে বাসী
যে যুগে পুরুষ ছিল না ক
নারীরা আছিল দাসী।
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ। সাম্যের যুগ আজি
কেহ রহিবে না কাহারও উঠিছে ডঙ্কা বাজি
যুগের ধর্ম নাই-
পীড়ন করিলে যে-পীড়ন এনে পীড়া দেবে তোমাকেই [নারী-সাম্যাদীঃ সর্বহারা]

কবি নারীকে নিয়ে বীরঙ্গনা’ কবিতাটি লিখেছেন বিত্ত ও অর্থবান সমাজপতিদের ব্যঙ্গ করে। নজরুল নারীর রন-রঙ্গিণী মূর্তিই কামনা করনেনি, তাকে প্রেমময়ী বধূ, ¯েœহময়ী জননী ও প্রিয় দয়িতা রূপেও চিহ্নিত করছেন। ‘বিদ্রোহী’, ‘অনামিকা’, ‘সিন্ধু’, ‘হে মোর অহংকার’, ‘গোপন প্রিয়া’ প্রভৃতি কবিতা ও গানে নিত্য কালের প্রিয়াকে তিনি আহবান করেছেন।

নারীর কন্যা, বধু, জননী রূপাঙ্কনে নজরুলের কৃতিত্বের চেয়ে তাঁর কৃতিত্ব রয়েছে .. কে উপলব্ধি করে বিপ্লবাত্মক মানসিকতা নিয়ে শত শত বৎসরের অপমান ও নির্যাতনের পুঞ্জিভূত বেদনার বিরুদ্ধে নারী সমাজকে দৃপ্তকন্ঠে সচেতন হবার আহবোনেঃ

‘জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা
জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্ত-টিকা’।

নজরুল অসংখ্য হাম্দ ও নাত লিখেছেন। তিনি তাঁর ‘খেয়াপারের তরণী’ সহ অসংখ্য কবিতায় ঈশ^রের প্রতি আনুগত্য জানিয়েছেন। তিনি ‘ফাতেহা-ঈ দোয়াজ দহম’ কবিতায়ও রসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতি হৃদয় উহার করে শ্রদ্ধা জানান। তিনি ভজন, শ্যামা, কীর্তন-সহ অন্যান্য ধর্মীয় সঙ্গীত লিখে যান। তিনি শুধু গীতিকারই নন। তাঁর রচিত সকল সঙ্গীতের তিনি সুরারোপও করেছেন-যা যুগ যুগ পরেও অস্তিত্বে /স্মরণে অম্লান হয়ে থাকবে।

নজরুলের রয়েছে বিচিত্র হাজার হাজার সংগীত। এই বিশাল প্রতিভাবে মূল্যায়ন করা সহজ নয়। নজরুল-সঙ্গীত মূল্যায়নে কাজী মোতাহার হোসেন ‘স্মৃতিগর্বে নজরুল’ ৯০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন। ‘আমি অনেক বার শুনেছি নজরুল কী গভীর আবেগে মীড়, মূর্ছনা প্রভৃতি অলংকারকে ভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাগ থেকে রাগান্তরে গিয়ে আবার পূর্ব রাগে ফিরে আসতেন। ভিতরে প্রবল আবেগ বাইরে সুরের নব-নব প্রকাশে নিপুণভাবে বিকশিত হত-শুনে অবাক লাগতো।’

‘সঙ্গীত রচনার সময় তিনি সব ভুলে বসে থাকতেন। শুধ চা আর পান চলতো সারাদিন ধরে। একই আসনে বসে নতুন সঙ্গীত রচনা, সেই সঙ্গীতে সুর সংযোজনা, আবার সেইসঙ্গে নানাজাতীয় শিল্পীদের সেই সঙ্গীত দেয়া সারাদিন ধরে চলতো। দেখা যেত, এক আসনে বসে কবি ৮/৯টি গান রচনা করে ফেলতেন। কবি কাব্যের মধ্যে বহু স্থানে কিছু উচ্ছ্বাস ও অসংযমের আভাস পাওয়া যায় বটে, কিন্তু গানের স্বল্প পরিসরে কবি ছিলেন সম্পূর্ণ।’ [জসীমউদ্দিনের ‘আমাদের কবি ভাই’-এর ১৫১ পৃষ্ঠা]

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

August 2022
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031