সেদিন থেকে এক দিন এগিয়ে গেলাম

প্রকাশিত: ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০২০

সেদিন থেকে এক দিন এগিয়ে গেলাম

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

একটি দেশের সবচেয়ে বড় একটি সংবাদপত্র ইন্ড্রাস্ট্রি প্রকৃত অর্থেই বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আদর্শ একটি ক্ষেত্র। ইত্তেফাক গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রি এক সময় ছিলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ সংবাদপত্র ইন্ড্রাস্ট্রি। একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের একজন সাংবাদিক হওয়া মূলত বিভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করা ছাড়া আর কিছুই না। একটি দেশের, একটি সমাজের, রাজনৈতিক তত্ত্বের ও আর্থ-সামাজিক ভিত্তির সন্ধান লাভ করার কাজটি বেশ দূরহ। জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ শক্তির সহযোগে নির্মিত হয় একটি অনুসন্ধানের বেশ কিছু উপাত্ত। সাংবাদিকতা সাহিত্য নয়। সাংবাদিকতা হলো একটি সুনির্দিষ্ট তথ্যের প্রকাশ। সত্যের সন্ধান লাভ একজন সাংবাদিকের পেশা জীবনকে বিশুদ্ধ করে। এই পৃথিবী যখন প্রযুক্তির উপর সার্বিক ভাবে নির্ভর হয়ে পরেছে তখন সংবাদপত্রগুলোও পূর্বের পর্যায় থেকে গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলেছিলো। ঠিক এমনই এক সময়ে সংবাদপত্র ইন্ড্রাস্ট্রিতে আমি যোগদান করেছিলাম। আমার বয়স সবে মাত্র বিশ বছর তখন। সালটা ১৯৯৩। দেশের সর্ব বৃহৎ সংবাদপত্র অফিসে আমার কাজ জুটে গেলো একদিন। সেদিন থেকেই এক দিন এগিয়ে গেলাম আমি। আমার জীবনটাই অন্যরকম হয়ে গেলো। আমি যে অনেক দ্বায়িত প্রাপ্ত হলাম তাই নয় বরং অনেক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ একই সাথে উন্মুক্ত হয়ে গেলো আমার। ইত্তেফাক পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক রাহাত খানের সান্নিধ্য পাবার সুযোগ আমার হয়েছিল। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকতা প্রতিদিন একটি সরু সুতোর উপর দিয়েই হেটে চলা। আমার কাছে আজও মনে হয় সাংবাদিকতা শুধুই অভিজ্ঞতা। গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক শব্দটি কখনোই আমি গ্রহন করিনি। কারন প্রতিটি বিষয়বস্ত একটি অপরটির সাথে সম্পর্কিত নয়। প্রতিটি ঘটনাই সতন্ত্র। এজন্যই গভীর অনুভূতির দ্বারা আমি বারবার তাড়িত হয়েছি পেশা জীবনে।
১৯৯৩ সালের কথা। আমার বসবাস তখন হাতিরপুলে। খুব কাছে বেগম সুফিয়া কামালের বাসা ছিলো। আমি থাকতাম ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা তখনো প্রধানমন্ত্রী হননি। তিনি কবি সুফিয়া কামালের বাসায় যেতেন। আমি এসময় ইংরেজি পত্রিকা দি নিউ নেশানে কাজ করি। স্পোর্টস এডিটর। ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট থেকে হেটেই শাহবাগ যাওয়ার সুবিধা ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্বও কম। হেটে অথবা রিক্সায় অল্প সময়েই বিশ্ববিদ্যালয় আর শাহবাগে পৌঁছে যাবার সুবিধার জন্যই ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে বসবাস করতাম আমি। শাহবাগে যেতাম বইয়ের দোকানে। সুযোগ পেলেই শাহবাগ যেতাম। জীবনের এসময়ে আমার চাহিদা বলতে সংবাদপত্র অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় আর বইয়ের দোকানগুলো। এর বাইরে আমার তেমন বিচরণ ছিলোনা। এমনকি পোশাক কেনার মতো বিষয়গুলোও আমি এড়িয়ে চলেছি। আমার মামা মেজর জেনারেল শামীম চৌধুরী আমাকে তার ব্যাবহৃত শার্টগুলো পরতে দিতেন। আর ঈদে নতুন শার্ট পেতাম। নিজে কিছু কাপড় কিনেছিলাম বঙ্গবাজার থেকে। ভালো জুতো কখনোই পড়িনি। এলিফ্যান্ট রোড বাসার কাছেই। সেখানে একের পর এক জুতোর দোকান। এলিফ্যান্ট রোডের পাশেই হাতিরপুলে আমি বসবাস করতাম। অথচ পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিলো না আমার। নব্বইয়ের দশকে ইউএসএ থেকে জুতো ও কাপড় আসতো এলিফ্যান্ট রোডের দোকানগুলোতে। আমি একটি মুগজিন সু ও একটি অরিজিনাল লি জিন্স কিনেছিলাম একবার বেতনের টাকা থেকে। কারন এক সময় দেখলাম আমাকে অনেক মানুষের সাথে মেলামেশা করতে হচ্ছে। ফাইভ স্টার হোটেল থেকে বিদেশী দূতাবাসে যেতে হয় আমাকে। ধীরে ধীরে আমি ফ্যাশনের জগতে ঢুকে গেলাম। ফ্যাশনটা আর আমার জীবনে গৌন থাকলো না। সঙ্গে সব সময় থাকতো একটি মূল্যবান লেদার ব্যাগ। ব্যাগটির রং ছিলো রেড ওয়াইন। একদম ব্যতিক্রমী রং। সেটার বেশ কিছু পকেট। ব্যাগের ভিতরে সব সময় বিদেশী পত্রিকা থাকতো। লন্ডন-নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত পত্রিকার সম্ভার বলা যেতে পারে।
এখানে একটি তথ্য উপস্থাপন করা উচিত আমার। আমার জীবন যাপনের এই পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন একজন মহানায়ক। সত্যিকার অর্থেই মহানায়ক। সে সময় অবশ্য তিনি মহানায়ক ছিলেন না। সে সময়ে তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক ও রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। সংবাদপত্র জগতে তিনি ‘যদ্যপি আমার গুরু’। তিনি হলেন ক্যাপ্টেন হাসান মাসুদ। বর্তমানে অভিনেতা। তিনিই আমার বস, অভিভাবক। সেই ঘটনাটা একটু বলি।
ঐ যে বলেছিলাম আমার বাসা বেগম সুফিয়া কামালের বাসার পাশে। ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে। বাসা থেকে আমি বের হয়ে শাহবাগ চলে যাই যখন তখন। পাঠক সমাবেশে কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-গায়ক-নায়ক-আর্টিস্ট-শিক্ষক সকল পেশাজীবির জটলা তখন লেগেই ছিলো। নব্বইয়ের দশকের শুরুর কথা। আমি যেহেতু ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলাম অনেকেই সেখানে ছিলেন আমার পূর্ব পরিচিত। কেউ তখন সিনেমা বানাচ্ছেন, কেউ বই প্রকাশ করছেন। এমনই এক সময়ে হুমায়ুন আজাদ এর বিখ্যাত গ্রন্থ নারী প্রকাশিত হলো নদী প্রকাশনী থেকে। ওয়ান এন্ড ওয়ানলী কাজ নদী প্রকাশনীর। আর সেটাই সুপার হিট। প্রকাশক প্যানেলের কথা এখানে বলবো না। তবে কৈশোর কাল থেকেই তারা আমার পরিচিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় শাহবাগে আড্ডা জমে উঠতো এসময়। তখন ইন্টারনেটের ব্যাবহার এতো সহজ ছিলো না। মোবাইল ফোনতো সাধারন মানুষের হাতে হাতে পৌঁছায়নি। টেলিভিশন চ্যানেল ছিলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি। এছাড়া অন্য কোনো চ্যানেল ছিলো না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে বিকেলের আড্ডা। খাঁটি ঢাকাইয়া আড্ডা। এখানেই প্রয়াত সঙ্গীত শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর সাথে পরিচয়। বর্তমানে যেখানে পিজি হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সুউচ্চ ভবন সেখানে কিছুই ছিলোনা সেসময়। জায়গাটা ফাঁকা পরে ছিলো। সেই ফাঁকা জায়গায় প্রাচীরের ভিতরে এক কোনে একটি বাঁশের মাচা বানানো ছিলো। সেখানে এসে সবাই জড়ো হতেন একে একে বিকেল হলেই। এখানেই পত্রিকার কাজ শেষ করে চলে আসতেন ক্যাপ্টেন হাসান মাসুদ। তার সাথে এভাবেই এখানে আমার পরিচয় ঘটে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলেন। অত্যন্ত উদার মানুষ তিনি। ঘনিষ্ঠ হওয়াই স্বাভাবিক।
একদিন একটি ঘটনা ঘটলো। তিনি ছিলেন দি নিউ নেশানের স্পোর্টস এডিটর। স্পোর্টস পেইজে তিনি ছাড়াও আরেকজন কাজ করতেন। হঠাৎই তিনি অন্য পত্রিকায় চলে যাওয়ার কারনে হাসান মাসুদ খুব বিপদে পরে গেলেন। হাসান মাসুদকে স্টেডিয়ামে যেয়ে ম্যাচ রিপোর্ট করতে হতো। একটি ইংরেজি পত্রিকার দুই-পেইজ কাজ একজনের পক্ষে প্রতিদিন চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এক বিকেলে হাসান মাসুদকে জিজ্ঞাস করেছিলাম কেমন আছেন। তখন তিনি বললেন, ভীষন ঝামেলায় আছেন। কারন জানতে চাইলে তিনি এসব কথা খুলে বললেন। আর বললেন, তিনি স্পোর্টস ডেস্কের জন্য একজন সাব-এডিটর খুঁজছেন। আমি রাজি আছি কিনা জানতে চাইলেন। আমি বিষয়টি একটু ভাবলাম। তারপর রাজি হয়ে গেলাম। বেতন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো কথাই হয়নি সেদিন। তিনি বললেন আগামীকাল ইত্তেফাক পত্রিকা অফিসে চলে যেতে। সময় দিয়ে দিলেন আমাকে কখন সেখানে যেতে হবে।
পরদিন দুপুর। দুপুর তিনটায় ধানমন্ডি থেকে আমি টিকাটুলি গেলাম। এই প্রথম টিকাটুলি যাওয়া। বঙ্গভবনের উল্টো দিকে ইত্তেফাক অফিস। তার পাশে দৈনিক ইনকিলাব অফিস। ইত্তেফাক অফিসের এসময় রমরমা ব্যাবসা। কোটি কোটি টাকার সিনেমার বিজ্ঞাপন। অনেক বেতন সাংবাদিকদের। দুই-তিনটা বোনাস বছরে। ব্যাগ-ভরা টাকা এক-একজনের। ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি আছে সবার। কিন্ত নিউ নেশান পত্রিকার বিজ্ঞাপন অনেক কম। সার্কুলেশনও কম। তাই বেতন কম সেখানে। তবে সুযোগ সুবিধা অনেক। আমি ঐতিহাসিক এই সংবাদপত্র ইন্ড্রাস্ট্রির সামনে দাড়িয়ে এক ভর দুপুর দেখছিলাম সেদিন। ভিতরে যাবার বিষয়টি ইনফর্ম করা ছিলো আগে থেকেই। গেইটে অনেক নিরাপত্তা ব্যাবস্থা। বিশাল রিসিভশন ডেস্ক। আমি সেখানে জানালাম নিউ নেশান পত্রিকাতে যাবো। সেখান থেকে চারতলায় ফোন চলে গেলো। মুহূর্তের মধ্যেই অনুমতি চলে আসলো। জীবনের এই প্রথম ঐতিহাসিক ইত্তেফাকের এক একটি সিড়ি দিয়ে আমি উপরে উঠছিলাম আর বিষয়টি উপলব্ধি করছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো পত্রিকাটির। অন্যদিকে তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর। ইত্তেফাক গ্রুপে কাজ করা একটি সামাজিক মর্যাদার বিষয়। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি চারতলায় নিউ নেশান পত্রিকার অফিসে পৌঁছে গেলাম। সেখানেও রিসিভশন ডেস্ক। জানতে চাইলাম স্পোর্টস এডিটর কোথায় বসেন। আমাকে দেখিয়ে দেয়া হলো। হাসান মাসুদ একটি কক্ষে বসে তখন। আমাকে দেখে বললেন, ‘আইসা পরছো’। হা সূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বসে থাকলাম। চমৎকার অফিস। ভীষন ব্যাস্ত সবাই। কারো দিকেই কারো খেয়াল নেই যেনো। ক্যাপ্টেন হাসান মাসুদ আমাকে কিছু ব্রিফিং দিলেন। এদিনই আমার সাংবাদিক হিসেবে প্রথম দিন। আমাকে একটি টেবিল-চেয়ার দেখানো হলো। সেটি আমার ওয়ার্ক স্টেশন। আমি ভীষন খুশি। আমাকে ভিতরে নিয়ে যাওয়ার পর পরিচিত করিয়ে দেওয়া হলো সবার সাথে।
এদিন টেলিপ্রিন্টার এর সাথে আমার পরিচয় ঘটলো। আমি প্রথম দিনেই স্পোর্টস পেইজের অনেক কাজ বুঝে নিয়েছিলাম। বিদেশী সংস্হার খবর এডিটিং করার কাজ। সেই সঙ্গে শিরোনাম তৈরী করা। খবরের সাইজ নির্ধারণ করা। এবং খবরের গুরুত্ব নির্ধারণ করা। আমি অনেক কিছুই বুঝে গিয়েছিলাম হাসান মাসুদের প্রথম ব্রিফিং এ। এবং সেদিন থেকেই আমি জীবনে একদিন এগিয়ে গেলাম। অর্থাৎ, আমি আজকে পত্রিকার যে কাজ করছি, যে খবর পেয়েছি, যে খবর তৈরী করছি এবং যা সব দেখছি সবকিছু পরের দিনের খবর। পাঠক এসব কিছুই পড়ছেন পরের দিন। পত্রিকা ছাপা হয় গভীর রাতে। সারাদেশে ভোরে অথবা দূরের শহরে পৌঁছে পরের দিন দুপুরে। সবাই যা খবর পড়ছে পরের দিন সেসব খবর আমি আগের দিনই জেনে যাচ্ছি, তৈরী করছি। সেদিন বুঝে গেলাম আজ থেকে আমি একদিন এগিয়ে গেলাম ঢাকা শহরে। আমার হৃদয় প্রশস্ত হয়ে গেলো। আমার চিন্তা জগত বদলে গেলো। আমার খাবার রুচি বেড়ে গেলো। সমাজে আমার নিরব আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। মতিঝিল, দিলকুশা এরিয়াতে মানুষজন হয়ে উঠলো আমার পরিচিত। টিকাটুলির পথ হয়ে গেলো আমার পথ। বঙ্গভবনের ছাদে সূর্যাস্ত হয়ে গেলো আমার এক একটি বিকেলের গল্প। চায়ের কাপ হাতে চারতলার বেলকনিতে দাড়িয়ে বিকেলের ব্যাস্ততা দেখি তখন। সন্ধ্যার সময় আমার টেবিলে চা আসে। প্রতি মাসে বেতনও পাই। ধানমন্ডির বাসায় অনেকগুলো পত্রিকার সৌজন্য সংখ্যা পৌঁছে যেতো প্রতিদিন ভোরে। বিট-পিয়ন সেসব পত্রিকা আমার বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায় সাত-সকালে। কম্প্লিমেন্টারি পেপার এর রোল খুলে সকালে আমি কয়েকটি পত্রিকার খবর সকালেই পড়ে ফেলি সাত সকালে। বাড়ির গেইটে সংবাদপত্রের গাড়ি আমাকে অফিসে নিয়ে যাওয়ার জন্য দাড়িয়ে থাকে। আবার রাতে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। হরতালে রাজার হালে গাড়িতে ঢাকা শহরে ঘুরাঘুরি করছি আমি। প্রায় প্রতিদিনই হরতাল থাকতো ঢাকা শহরে সে সময়ে । আওয়ামী লীগ তীব্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলো এসময়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন। রাজপথ প্রায়ই রণাঙ্গন। আমি গাড়িতে নির্ভয়ে চলাফেরা করছি। গুলিতে মানুষ মরছে, মানুষের মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে, আরো কতো দৌড়-ঝাপ। রাজনীতির মঞ্চ উত্তপ্ত। শাহবাগ-মৎস ভবন-প্রেসক্লাব-বায়তুল মোকাররম মসজিদ-দৈনিক বাংলা মোড়- মতিঝিল দিলকুশা-বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কোথাও সংঘর্ষহীন ছিলো না কোনোদিন। খালেদা জিয়ার উৎখাতের আন্দোলনে ঢাকা উত্তাল। ১৯৯৩-১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এমনই ছিলো ঢাকা শহরের রাজপথ-অলিগলি।
অন্যদিকে আমি নিউ নেশান পত্রিকায় যোগদানের পরপরই ক্যাপ্টেন হাসান মাসুদ বিদায় নিলেন দি নিউ নেশান থেকে। জয়েন করলেন দি ডেইলি স্টার পত্রিকায়। যাবার দিন বলে গেলেন ‘তুমি একাই চালাও আজ থেকে’। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায়।এই তিন বছর আমি নিউ নেশানের স্পোর্টস এডিটর। সব কাজের দ্বায়িত আমার একার উপর। তিন বছরে কোনোদিন একদিনের জন্যও ছুটি ছিলোনা। শুধুমাত্র সরকারি ছুটির দিনে ছুটি। হাসান মাসুদ চলে যাবার পর একদিন তৎকালীন ম্যানেজিং এডিটার গিয়াস মজুমদার সাহেব তার সুবিশাল কক্ষে আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি কিশান নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন এসময়। গিয়াস মজুমদার সাহেবের বাড়ি ছিলো নোয়াখালি। অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন দোতলায় ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের কক্ষে। সেদিন আমার বেতন বাড়িয়ে দিলেন ব্যারিস্টার সাহেব। বিকেলে নাস্তার জন্য প্রতিদিন ইন্টারটেইনম্যান্ট ভাতা পৌঁছে দেয়া হতো আমার টেবিলে। যাতায়াত ভাতা পেতাম। গেস্ট ভাতা দেয়া হতো। কেনাকাটার জন্য প্রতিমাসে ভাতা প্রদান করা হতো। স্ট্যাপলার-পিন-ফাইল-বই-ম্যাগাজিন সহ যাবতীয় জিনিস ক্রয়ের জন্য ভাতা দেয়া হতো। আমি কখনো টাকার পরিমান বাড়িয়ে ভাউচার তৈরী করে সাইন করে দিতাম। এটাতো প্রায়ই হতো। ঈদে বোনাস পেতাম। অনেক খাত থেকে প্রতিমাসে টাকা আসতো। তাছাড়া আমি সাপ্তাহিক রোববার ও পাক্ষিক ক্রীড়ালোক থেকেও টাকা পেতাম। সেখানে রিপোর্ট লেখার জন্য আমাকে আলাদা সম্মানী ভাতা দেওয়ার রীতি ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতাম এসব টাকা থেকে। নিজস্ব বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম ঢাকা শহরে। খাওয়া দাওয়া সব সময়ই হোটেল-রেস্ট্রুরেন্টে করে নিতে হতো। যেখানেই যাই, যাই করি শুধু মনে হতো, সবার থেকে একদিন এগিয়ে গেলাম জীবনে। সাংবাদিক হিসেবে আমার অনুভূতি ও মানুষ হিসেবে আমার উপলব্ধি বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধশালী হতে থাকে ধীরে ধীরে একদিন। শুরু হলো আমার কর্ম জীবন।

ছড়িয়ে দিন