সৈয়দ আল ফারুকের জন্মদিন আগামীকাল

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২১

সৈয়দ আল ফারুকের জন্মদিন আগামীকাল

আনহার সামসাদ 

কবি ও শিশু সাহিত্যিক সৈয়দ আল ফারুকের জন্মদিন আগামীকাল । এ উপলক্ষে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোয়েট্রি এসোসিয়েশনের সভাপতি কবি সৌমিত্র দেব ।
সৈয়দ আল ফারুকের জন্ম ১২ এপ্রিল লক্ষীপুর জেলার টুমচর গ্রামে। বাবা : সৈয়দ বদরুল আলম, মা : জাকিয়া আলম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স, এমএ।

আধুনিক কবিতার সচেতন পাঠকমাত্রই তার একটি কবিতার জন্যে অপেক্ষা করেন নিয়মিত।সমসাময়িক ঘটনা, সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ, স্বদেশ-মাটি, স্বপ্ন-রমণী, রক্ত মাংসের নারী – সাধারণ অতিসাধারণ সব কিছুই ধারণ করে আছে সৈয়দ আল ফারুকের কবিতার শরীর অসাধারণভাবে।

প্রথম কবিতা লেখা কৈশোরে উনিশ শ উনসত্তরে, সাহিত্য চর্চায় পুরোপুরি আত্মমগ্ন হয়েছেন সত্তরদশকের মাঝামাঝি। ১৯৮২ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উড়োখুড়ো মন’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যাপকভাবে পাঠকের সমাদর আর আলোচকের প্রশংসা আয় করেন, চিহ্নিত হন সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবিহিসেবে।

 

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে সৈয়দ আল ফারুক একটি দীপ্র নাম। কী ছড়া, কী কবিতা, কী গল্প – সবশাখাতেই উজ্জ্বল উপস্থিতি তাঁকে সত্তর দশকের শীর্ষস্থানীয় শিশুসাহিত্যিক হিসেবে চিহ্নিত করে।

অশ্রুতপূর্ব শ্রুতিসুখকর অন্তমিল প্রয়োগ, বৈচিত্রময় আঙ্গিক রচনা, নিপুন নিখুঁত ছন্দ সৃষ্টি সৈয়দ আলফারুকের ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অসংখ্য স্মৃতিধার্য ছড়ার সৃষ্টি-কর্তা, এই লেখক লিখেছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিস্ময়কর স্মরণীয় কিশোর কবিতা। অভাবনীয় উপমা, মিষ্টি শব্দচয়ন, টুকরো চিত্রকল্প – সবমিলিয়ে প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্র, শক্তিশালী। বিচিত্র বিষয়, অপূর্ব বর্ণনা এবং মোহনীয় ভাষা তাঁরশিশুকিশোর গল্পগুলোর মূল প্রাণশক্তি। সৈয়দ আল ফারুকের ছড়া-কবিতা-গল্পের জগৎ এমন একমোহনীয় জগৎ – যেখানে কেবল ছোটদেরই নয়, সব বয়েসী পাঠকের সমান প্রবেশাধিকার, সমানআনন্দ।

 

২০টি কাব্যগ্রন্থ, ২০টি ছোটদের বই নিয়ে মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থসংখ্যা অর্ধশত ।

 

উল্লেখযোগ্য কবিতার বই : তুমি খাপ-খোলা তলোয়ার, গুলশান ব্রিজের পাশে প্রকাশ্য রাস্তায়, স্ত্রীর পত্র পুরুষ হইতে সাবধান, এক মিনিট ভালোবাসা পালন করুন, শ্রেষ্ঠ কবিতা, আমি সিঁড়িটা ব্যবহার করতে চাই না অথচ সিঁড়িটা আমাকে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক, কবিতাসমগ্র ১, নির্বাচিত ১০০ কবিতা, সৈয়দ আল ফারুকের শ্রেষ্ঠ কবিতা এবং আমাদের কোথাও কোন শাখা নেই।

 

উল্লেখযোগ্য ছোটদের বই : ছবির মধ্যে ছবি, বদলে যেতে যেতে, বাংলাদেশের পা দুটো, সবার ওপরে মুক্তিযোদ্ধা, সাহেবের মামা, একাই ১০০, সৈয়দ আল ফারুকের কিচ্ছু ভাল্লাগে না, একার কাছে একটাজাদুর পেনসিল আছে, আমার আমি, কিশোরসমগ্র ১, থ এবং আমি নিজের হাতে বাজাই নিজের ঢোল, আমার মনে জাগতো শুধু বঙ্গবন্ধু হই আমাদের শিশুকিশোর সাহিত্যের অনন্য সম্পদ।

 

নব্বইয়ের সাড়াজাগানো ‘সাপ্তাহিক আকর্ষণ’ সম্পাদক, লন্ডন থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ‘কারি লাইফ’-এর এশিয়া এডিটর ছিলেন দীর্ঘদিন।

লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের প্রতিষ্ঠান মূলধারা এবং ছোটদের লেখক, প্রকাশক ও সংগঠকদের প্রতিষ্ঠান শিশুসাহিত্য পারিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থাপনা-সদস্য। উড়েছেন, ঘুরেছেন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ।

 

উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি : ডাকসু সাহিত্য পুরস্কার, জেনারেশন পুরস্কার, নাট্যসভা সাহিত্য পুরস্কার, শিশু-উন্নয়ন পুরস্কার, শিশু একাডেমি অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, কবি জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য পুরস্কার, আইরিন আফসানা শিশুসাহিত্য পুরস্কার, নুরুল কাদের ফাউন্ডেশন পুরস্কার, সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক, গুলশান ক্লাব সম্মাননা, লক্ষীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার, আনন্দধারা পুরস্কার ইউকে, বাঙালি সম্মাননা পুরস্কার ইউকে, চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক, ওয়াল্ড সেন্টার ফেয়ার ইউএসএ সম্মাননা নিউ ইয়র্ক, মানবাধিকার শান্তি পদক, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার পশ্চিমবঙ্গ, সময়ের শব্দ সম্মাননা কলকাতা, চ্যানেল আই সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার, মোহাম্মদ নাসির আলী পদক, খেয়া সাহিত্য সম্মাননা ।

 

ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফরাসী, জার্মান, গ্রিক, উজবেক, ইতালিয়ান, পর্তুগিজসহ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা।

 

সত্তুর দশকের প্রধান কবি ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশেও রয়েছে তার ব্যাপক ভূমিকা। বিশ্ববাঙালির সামনে তিনি কথা বলেন বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলাদেশকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে। পাঠ-অভিনয়েও পারদর্শী সৈয়দ আল ফারুক মন্চে ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, পরিচালনা ও পরিকল্পনায়ও সুনাম কুডিয়েছেন।

 

দেশের উল্লেখযোগ্য লেখকদের বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা ও ছড়া নিয়ে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তারসম্পাদিত বাতাসে লাশের গন্ধ গ্রন্থটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে চিহ্নিত। তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী বঙ্গবন্ধু বইমেলা ও বঙ্গবন্ধু উৎসবের আয়োজক। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ নিয়ে টেলিভিশনে ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করেছেন চারমাসব্যাপী, যাতে পৃথিবীর নানা দেশের বঙ্গবন্ধু অন্তপ্রাণ ২৬ জন বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক-শিল্পী-শিক্ষাবিদ-অনুবাদক-রাজনীতিবিদ-কুটনীতিবিদকে সম্মান জানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী যারা কাজ করছেন, তাদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু কী কী কাজ করেছেন সে-সব নিয়ে, পাঠ করেছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি। গবেষণা করছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা তার ‘শেখ মুজিবের তর্জনি’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সৈয়দ আল ফারুকের সর্বশেষ বই ‘আমার মনে জাগতো শুধু বঙ্গবন্ধু হই।

 

করোনাকালীন সময়ে শিল্পী নাহিদ নাজিয়ার সঙ্গে প্রতিদিন যৌথভাবে অংশ নেন ‘উইডিয়া’ নামে সাড়াজাগানো ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট ওয়েব সিরিজে। এক বছরে প্রায় সাড়ে তিন শত কবিতা-ছড়া-গানের মিউজিক ভিডিও তথা পাঠ-অভিনয় পরিবেশনা ফেইসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিকমাধ্যমে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। ঘরবন্দি মানুষের মানসিক সুস্থতায় সাহায্য করেছে।

 

শয়নে-স্বপনে-জাগরণে সাহিত্য-ই তাঁর জীবন। ৬৩ বছরের এই জীবনে ৫২ বছরের লেখক-জীবন আর প্রায় অর্ধশত বই নিয়ে সৈয়দ আল ফারুক এখন বিশ্ববাঙালির কাছে একটি অনন্য নাম।

 

একমাত্র পুত্র অরণ্য সৈয়দ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে হিস্ট্রি ও জার্নালিজমে অনার্স, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশান ও পলিটিক্সে মাস্টার্স, বর্তমানে গবেষণা ও লেখালেখিতে ব্যস্ত। স্ত্রী প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা নাহিদ নাজিয়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স, এমএ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

এবার জন্মদিনে দুনিয়াব্যাপী লকডাউন, ছুটি থাকায় তিনি প্রথম জন্মদিনের মতোই পুরো সময় বাড়িতে থাকবেন এবং হোয়াটসঅ্যাপে ভাইবার ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে দিনব্যাপী ভক্ত পাঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন, করোনাভাইরাস নিয়ে কথাবার্তা বলবেন এবং সবাইকে যার যার বাড়িতে থাকার ব্যাপারে এবং বাইরে বেরুলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করবেন। জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমেরিকা, ইউকে ও বাংলাদেশের তিনটি অনলাইন টিভি চ্যানেল তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে।