সৈয়দ মুজতবা আলী ও তাঁর জাতীয়তাবাদ চিন্তা

প্রকাশিত: ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২১

সৈয়দ মুজতবা আলী ও তাঁর  জাতীয়তাবাদ চিন্তা

সৌমিত্র দেব

সৈয়দ মুজতবা আলী জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।  তাঁর  জীবন ও সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে আলোচনা করলে খুব সহজেই তা বোঝা যায়। বিশেষ করে পত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন কলামে, কখনো সরাসরি আবার কখনো প্রচ্ছন্নভাবে তাঁর এই চেতনার উল্লেখ আছে। কেমন ছিল তাঁর জাতীয়তাবাদী চিন্তার রূপ, সে প্রসঙ্গে যাবার আগে একটু ফিরে যেতে হবে তাঁর পূর্বপুরুষের কাছে। মুজতবার পূর্বপুরুষরা ছিলেন তরফের সৈয়দ। কথিত আছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় এই পরিবার ইংরেজ বিরোধিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মুজতবার বাবা সৈয়দ সিকন্দর আলী পারিবারিক প্রথা ভেঙ্গে ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহী হন এবং সরকারি চাকুরি ও খান বাহাদুর খেতাব লাভ করেন। মুজতবারও জন্ম পরাধীন ভারতবর্ষে। ইংরেজ শাসনে তিনি ইংরেজ নিয়ন্ত্রিত বিদ্যালয়ে ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের ডামাডোলে বালক বয়সেই তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ ঘটে। রীতিমতো জেদ করে চলে যান রবীন্দ্র সান্নিধ্যে, শান্তি নিকেতনে। ইংরেজ নিয়ন্ত্রিত বিদ্যালয় ত্যাগ করলেও  তিনি ইংরেজি শিক্ষা ছাড়েন নি। বরং বিশ্বভারতীর উদার আবহাওয়ায় শুধু। ইংরেজি নয়, রুশ, জর্মন, আরবি, ফারসী, সংস্কৃতসহ বহু ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।
ইংরেজি শিক্ষা বাবা ও ছেলের মধ্যে চেতনাগত যে পার্থক্য তৈরি করেছিল তা মূলত রাজনৈতিক। ইংরেজি ভাষার প্রতি সৈয়দ সিকান্দর আলীর যেমন প্রীতি ছিল মুজতবা আলীর তেমনি বিদ্বেষ ছিল না।বরং  বহু ভাষায় পারদর্শী হবার পরও ভালো ইংরেজি জ্ঞানই তাকে বিশ্বসাহিত্যে প্রবেশের পথ করে দিয়েছে । জর্মনের বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অভিসন্দর্ভটিও তিনি ইংরেজি ভাষাতেই রচনা করেছিলেন। তবে একই বিষয় বা ভাষা মাধ্যম যেখানে তাঁর পিতাকে ইংরেজদের অনুগ্রহভাজন হতে শিখিয়েছে সেখানে তাঁর মনে জ্বেলে দিয়েছে বিদ্রোহের আগুন। ১৯৪৬ সালের ৩ মে সংখ্যা ‘দৈনিক আনন্দবাজার’-এ প্রকাশিত প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান প্রবন্ধে তিনি ইংরেজদের বিভিন্ন অপপ্রচারের জবাব দিয়েছেন। এমন কি সরস ভাষায় তিনি একথাও বলতে ছাড়েন নি যে, “আমাকে তো কেউ এমবেসেডর বানাবে না। আমার দেশ স্বাধীন হলে তাঁর দূতাবাসের দারোয়ানের চাকরি হলেও আমি রাজি।”১
এবার আসি তাঁর জাতীয়তাবাদী চিন্তা প্রসঙ্গে। মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে সুনীতি কুমার চট্টোপ্যাধ্যায় লিখেছেন- “লেখকের ব্যক্তিত্ব যা তাঁর বইয়ে ধরা যাচ্ছে তাঁর মধ্যে আর দুটি জিনিস লক্ষণীয়। তিনি একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বিশ্বের একজন, বিশ্বমানবতায় ভরপুর উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি, যিনি ইউরোপীয়, ভারতীয় আর ইসলামীয় তিনটি সভ্যতার বাহ্য ইতিহাস, আর রূপ আর তার ভিতরের কথা  সব নখদর্পণে রাখেন, ‘তিনি ইতিহাস, দর্শন, আর সাহিত্যের অধ্যাপক, ইংরেজি, ফরাসি, জরমান, বাংলা (প্রাচীণ ও আধুনিক) সংস্কৃত ফারসী আরবী আর তাছাড়া অন্য কতকগুলো সাহিত্যের হাওয়া আর তার মহাকাব্য আর বচনে তার মনের ফুলবাগানে সৌরভের মত ভেসে বেড়াচ্ছে-তার কাছে। গোঁড়ামির লেশমাত্র নেই; আর অন্য দিকে তেমনি খাঁটি বাঙালী-কেবল খাঁটি বাঙালী নন, খাঁটি মুসলমান বাঙালী। তিনি নিজে মুসলমান সংস্কৃতি ও ধর্মের গৌরবে স্ব মহিমায় প্রতিষ্ঠিত আছেন। তার আন্তর্জাতিকতা বাঙালি মুসলমান জাতীয়তার ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত।২
এখানে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মত অনুসারে মুজতবা আলীর জাতীয়তাবাদ হচ্ছে বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদ। কিন্তু আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাক্ষ্য আবার অন্যরকম। তিনি লিখেছেন-পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সন্তোষ কুমার ঘোষ হচ্ছেন তথাকথিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রবক্তা। বাংলাদেশের  স্বাধীনতার পর আনন্দবাজার পত্রিকায় স্বনামে একটি কলাম লিখে সন্তোষ প্রমাণ করতে চেয়েছেন-বাংলাদেশের লোকেরাই শুধু বাঙালি নয়, পশ্চিম বঙ্গের লোকেরাও বাঙালি । সুতরাং বাংলাদেশের লোকের উচিৎ একটি স্বতন্ত্র পরিচয় খুঁজে বের করা। ঢাকার পূর্বানী হোটেলে এক সন্ধ্যায় সৈয়দ মুজতবা আলীর উপস্থিতিতে সন্তোষ ঘোষের সাথে গাফফার চৌধুরীর জাতীয়তাবাদ নিয়ে হালকা বিতর্ক হয়। গাফফার চৌধুরীর জবানীতে তখন মুজতবা আলীর ভূমিকা ছিলো এরকমÑ “সৈয়দ মুজতবা আলী এতক্ষণ নিশ্রুপ আমাদের আলাপ শুনছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, ওহে সন্তোষ, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বহুকাল তো নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে চায় নি, পশ্চিমবঙ্গের নামও বঙ্গ ছিলো না। তোমরা এতকাল পূর্ববাংলার লোকদের বাঙাল বলে ঠাট্টা করেছে। এখন সেই বাঙাল নাম দখল করার জন্য তোমাদের এত আগ্রহ কেন?”৩
এখানে বোঝা যায় মুজতবা আলী পূর্ববাংলা ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আবার মুজতবা আলী নিজের জবানীতে রায় পিথৌরার কলামে লিখেছেন, “বাঙালী একথা ভুললে চলবে না, সে বাঙালি। সে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রীশ্চান নয়, সে বাঙালী।”৪ এখানে প্রমাণ হয়  মুজতবা অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।
সে বিশ্বাস কতটুকু ছিল, আদৌ ছিল কি? জাতীয়তাবাদের বিকৃত রূপ সম্পর্কেও সৈয়দ মুজতবা আলী অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। ছাত্রজীবনে একটি অটোগ্রাফ শিকার করতে গিয়ে তিনি পরিচিত হন রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী চিন্তার সাথে। সেই চিন্তা তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। শান্তিনিকেতন থেকে তিনি অটোগ্রাফ আনতে গিয়েছিলেন জনপ্রিয় কথা শিল্পী শরৎচন্দের বাড়িতে। মুজতবা লিখেছেন, “শরৎ চন্দ্র শুধোলেন, আমারই কাছে এসেছো কেন? কিছুমাত্র না ভেবে বললুম, আপনার লেখা আমার বড় ভালো লাগে।”
শরৎচন্দ্র কলম হাতে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ চিন্তা করে লিখলেন-দেশে্র কাজই যেন আমার সকল কাজের বড় হয়।
এখানে একটু বুঝিয়ে বলতে হয়। শরৎচন্দ্র তখন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক ও কংগ্রেস যােগদান করেছেন। ওদিকে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকা থেকে ফির প্রথম অসহযােগ আন্দোলনের সমালােচনা করে প্রবন্ধ লিখেছেন। এই নিয়ে শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথে কিছুটা মসিযুদ্ধও হয়ে গিয়েছে-যদিও তেমন কিছু তীব্র নয় এবং সকলেই জানেন রবীন্দ্রনাথের প্রতি শরৎচন্দ্রের ছিল অকৃত্রিম এবং গভীর শ্রদ্ধ তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং রবীন্দ্রনাথও তাকে দেখতেন অত্যন্ত স্নেহের চক্ষে।
আমি শান্তিনিকেতনের ছাত্র, একথা জেনেই বোধহয় শরৎচন্দ্র বিশেষ করে আমার দৃষ্টি তার দেশের কাজের দিকে আকৃষ্ট করলেন। তদুপরি। আমিতো বলেছি যে তার লেখা আমার বড়ো পছন্দ।
তারপর অটোগ্রাফ বই নিয়ে এলুম, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কাছে।
আমরা তার ছাত্র বলে তিনি একটু বিশেষ যত্ন  নিয়েই আমাদের অটোগ্রাফ বইয়ে ভালো লেখার উদ্ধৃতি এমনকি কবিতাও লিখে দিতেন। তাই খুশি হয়ে বললেন, রেখে যা, ভালো করে লিখে দেব। দিন পনেরো পরে ফের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন কিংবা সময় করে উঠতে পারেন নি। কয়েকদিন পর আবার আসবার আদেশ দিলেন। এবারেও পূর্ববৎ। কিন্তু হয়তো আমার বিষন্ন বদন দেখে বললেন-তুই দাঁড়া। আমি এক্ষুনি লিখে দিচ্ছি।
তারপর অলস হস্তে আমার অটোগ্রাফ বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলেন। হঠাৎ চোখে পড়ল শরৎচন্দ্রের লিখনটির উপর। সঙ্গে সঙ্গে আর কোন চিন্তা না, ভাবনা না। প্রথম সাদা পাতাতেই লিখে দিলেন, আমার দেশ যেন  উপলব্ধি করে, সকল দেশের সঙ্গে সত্য সম্বন্ধ দ্বারাই তার সার্থকতা।
এই কথাটির ভেতরেই আছে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা। রবীন্দ্রনাথ যে আপন দেশকে কতখানি ভালোবাসতেন, কতখানি শ্রদ্ধা করতেন, সে দেশ যেন জনসমাজ মাঝে আপন আসন বেছে নেয়, পূরবপশ্চিম যেন সে দেশের ভাগ্য বিধাতার সিংহাসন পাশে এসে সম্মিলিত হয় এই মহান প্রার্থনা আজ কোন বাঙালির কর্ণে তার কণ্ঠস্বর মন্দ্রিত ধ্বনিত হচ্ছে না?। কিন্তু তিনি জানতেন, দেশের প্রতি ভালোবাসার মত নির্মল জিনিসও যখন স্বাধিকার মত্ততার সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন তার বিকৃততম রূপ দেখা দেয় চরম মৎস্যন্যায়ে। কট্টর জাতীয়তাবাদী তখন নৃশংস, তার ধর্মবোধ তখন লোপ পায়।৫
গুরুদেবের এই জাতীয়তাবাদী দর্শন মুজতবা গ্রহণ করেছিলেন মনে প্রাণে। তাদের স্বপ্নের জাতীয়তাবাদ বিকশিত মৈত্রীত্বের বন্ধনে। বৈরী বিভেদে নয়। প্রথা বিরোধিতার নামে তিনি ঐতিহ্য বিসর্জন দেবার পক্ষপাতি ছিলেন।
তাই গভীর প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন, “ভারতবর্ষকে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ করবে। কে? ভারতীয় ইতিহাসের সে ধারার সন্ধান কোথায়, যে ধারা বহু জাতি, বহু বর্ণ, বহু আর্য, বহু অনার্যকে এক করে নিয়ে বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে বিশ্বমানব কল্যাণের সাগর সঙ্গমের দিকে বিজয় গর্জনে অগ্রসর হয়েছিল।”৬
মুজতবা আলী ঐতিহ্যকে বড় করে দেখেছিলেন বলেই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত বলে সবার আগে সুস্পষ্ট মত রেখেছেন । শেষ
পর্যন্ত মুখতার বুনিয়াদে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র ছেড়ে যেতে  তিনি বাধ্য হন। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের অন্তসারশূন্যতা নিয়ে তিনি লিখেছেন “আরবদেশের ভাষা আরবি, ধর্ম ইসলাম জাতে তারা সেমিটি। আরব মাত্রেরই এই তিন তিনটে ঐক্যসূত্র রয়েছে” পৃথিবীতে এরকম উদাহরণ বিরল। তবু দেখুন তারা ক’টা রাষ্ট্রে বিভক্ত,  তাদের ভিতর রেষারেষি কিরকম মারাত্মক।
সউদি আরব, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, মিশর, কুওআইত, বাহরেন, আলজিরিয়া, তুনিসিয়া, মরক্কোর কথা আর তুললুম না। সেখানে মরু  রক্ত কি মেকদারে আছে জানি নে। তাই যখন করাচী ‘বিশ্ব মুসলিম সংঘ’ গড়ার খেয়ালিপালাও খায় তখন হাসি পায়। আরবদের এতগুলো ঐক্যসূত্র থাকতেও তারা সম্মিলিত হতে পারছে না, তার উপর তুর্ক, ইরানী, পাকিস্তানি জাভার মুসলমানকে ডেকে এনে একতা স্থাপন করা।”৭
পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে গিয়ে মুজতবা ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যে হিন্দির আগ্রাসন ও দিল্লীর এককেন্দ্রিক দৌরাত্য তিনি সমর্থন করতেন না। তার মতে, “আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস, যে ভারতীয় বৈদগ্ধ্য ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে তার বুনিয়াদ প্রদেশে প্রদেশে। প্রত্যেক প্রদেশ আপন নিজস্ব ভাষা এবং সাহিত্য আপন জনপদ সুলভ আচারব্যবহার চারুশিল্প, আপন প্রদেশ প্রসূত ধর্ম এবং সম্প্রদায় এসব তাবৎ বস্তুর চর্চা করে যে ফল লাভ করবে তারই উপর একদিন দাঁড়াবে বিরাট কলেবর, বৈচিত্র সুশোভিত, সর্বজনগ্রাহ্য ভারতীয় বৈদগ্ধ্য।”৮
সহজ কথায়, মুজতবার জাতীয়তাবাদী চিন্তা হচ্ছে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর বিশালতা অনুভব করা। বিশ্ব নাগরিক হতে গিয়ে তার বাঙালি মন ও মননকে ভুলে চান নি। বাংলাভাষা ও সাহিত্য সাধনা করে তার জাতীয়তাবাদ উন্নীত হয়েছে আন্তর্জাতিকতায়।
“যদি বলি, বাংলার চর্চা যে আমি আমার কট্টর বাঙালিত্বের জন্য করছি তা নয়-বাংলার সেবার মধ্য দিয়েই আমি ভারতীয় ঐক্যের সেবা করছি; তাহলে হিন্দিপ্রেমী বাঙালিরা হয়তো আমাকে তাড়া লাগাবেন। তবু সেইটেই হক কথা, সেখানেই খাটি জাতীয়তাবাদ।”
আমাকে বিশ্ব নাগরিক হতে হলে তো আর বিশ্বসংসারের ভাষা শিখতে হয় না । কিম্বা এসপেরান্টোও কপচাতে হয় না। আমি মালাবারের ভাষা জানি নে। তবু মালাবারের লোককে আমার বড় ভালো লাগে। আমি কিঞ্চিত ইংরেজি জানি এবং তার অনুপাতে ইংরেজকে অপছন্দ করি অনেক বেশি।৯
মুজতবার চিন্তায় জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হচ্ছে সংস্কৃতি। এমনকি ভূখণ্ড, সরকার বা সার্বভৌমত্বের চেয়েও তার কাছে সংস্কৃতির গুরুত্বই বেশি। তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের পরিমাণের চেয়েও আমি বহু বহু গুণে বেশি মূল্য দেই বাঙালি সংস্কৃতির পরিব্যপ্তিকে। আমার ধ্যানের বাংলা বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়-পশ্চিম বাংলার গুটিকয়েক জেলাই তার বিহার ভূমি নয়-আমার ধ্যানের বাংলা আসাম, বিহার, উড়িষ্যার সদূরতম প্রান্ত অবধি-না, কম বলা হল, এলাহাবাদ, জব্বলপুর, দিল্লী, জয়পুর যেখানেই বাঙালি সংস্কৃতির ছাপ পড়েছে, ছায়া পড়েছে সেখানেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাংলা পূর্ববাংলাও তাই এ ধ্যানের বাঙলার ভিতরে।”১০
মুজতবার এই ধ্যানের বাংলার ভেতরেই তার জাতীয়তাবাদী চিন্তা নিহিত। যা বেড়ে উঠেছে সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে। মুজতবার জাতীয়তাবাদ ধর্মভিত্তিক তো নয়ই, প্রাদেশিকও নয়, নৃতাত্ত্বিক ধারা থেকে তা গড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিকতার দিকে। সংস্কৃতি নির্ভর জাতীয়তাবাদী চিন্তা বিস্তৃতি পেয়েছে আগ্রাসনে নয়, ভালোবাসায়।

তথ্যসূত্র :
১. প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, আনন্দ বাজার পত্রিকা, ৩ মে ১৯৪৬
২. দেশে বিদেশে, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, মজলিশী মুজতবা
৩. আমরা বাংলাদেশি না বাঙালি, আবদুল গাফফার চৌধুরী
৪. রায় পির্থেীরার কলাম, আনন্দ বাজার
৫. গুরুদেব ও শান্তি নিকেতন, সৈয়দ মুজতবা আলী, মিত্র ও ঘোষ
৬. ঐতিহ্য, দৈনিক বসুমতী
৭. রচনাবলী সৈয়দ মুজতবা আলী, একাদশ খ-, মিত্র ও ঘোষ
৮. প্রাগুক্ত
৯. প্রাগুক্ত
১০. প্রাগুক্ত

ছড়িয়ে দিন