সৌমিত্র দেবের মতো সুদর্শন কবি খুব কম দেখা যায়

প্রকাশিত: ১:২৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২১

সৌমিত্র দেবের মতো সুদর্শন কবি খুব কম দেখা যায়

সমকালের কবিদের মাঝে সৌমিত্র দেবের মতো সুদর্শন কবি খুব কম দেখা যায়। আরেক সুদর্শন কবি হলেন গোলাম কিবরিয়া পিনু। পিনু ভাই আমার সিনিয়র, সৌমিত্র দেব আমার জুনিয়র। পুরুষ হিসেবেই সৌমিত্র দেবের রূপ আমার চোখে যেভাবে ধরা পড়েছিল তাতে ভাবি নারীদের হৃদয়ে কী চিত্তবিক্ষেপ সে সৃষ্টি করেছিল। শুনেছি তার ভক্তকূলের সংখ্যা সুন্দরীকূলে ঈর্ষাজনক। বহুকাল এই ছয়ফুট দীর্ঘ ছিপছিপে গড়নের খাড়া নাক আর প্রশস্ত কপালের আর্য গড়নের যুবক বিবাহযোগ্যা কন্যাদের মাঝে এক প্রার্থিত বর হয়ে বিচরণ করছিলেন আর আমি ভাবছিলাম কার ভাগ্যে শেষাবধি শিঁকে ছিঁড়ে।
সৌমিত্র দেবের সাথে প্রথম দেখা হয় ১৯৯২ সালের বইমেলায়, যে বইমেলা আমার স্মৃতিতে চিরকাল জ্বলজ্বলে হয়ে থাকবে মঙ্গলসন্ধ্যার পাঁচকবির পাঁচটি ক্ষীণতনু কাব্য প্রকাশের কারণে। নব্বই দশকের তিন কবি সরকার আমিন, শাহনাজ মুন্নী ও শিবলী সাদিকের সাথে যোগ দিয়েছিলাম আশির দুই কবি রাজু আলাউদ্দিন ও আমি। সে বছরেই সৌমিত্র দেবের  কাব্য ‘আকাশের রঙ বদলায়’ প্রকাশিত হয়েছিল। সে সংগ্রহ করেছিল আমাদের পাঁচ পুস্তিকা আর পাঠ করেছিল সাগ্রহে। ‘সেই থেকে আপনার কবিতা আমার হৃদয়ের মণিকোঠায়’ সৌমিত্র পরে আমাকে বলেছিল।
সৌমিত্রকে আমি ঘনিষ্ঠভাবে চিনতে শুরু করি আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন রাষ্ট্রদূত মসয়ূদ মান্নানের মাধ্যমে। নিজে কবিতা না লিখলেও কবিতার প্রতি মসয়ূদের একটা তীব্র আকর্ষণ বরাবরই ছিল। সে নিজে কবিতা আবৃত্তি করতো আর সেই ভালোবাসা থেকে গড়ে তুলেছিল আবৃত্তির সংগঠন ‘মেঘদূত’। কবিতা লিখি বলে ‘মেঘদূত’-এ আমাকে সম্পৃক্ত করেছিল মসয়ূদ। আরেক কবি ছিলেন সৌমিত্র দেব। পরে আবিস্কার করি মেঘদূতের তৃতীয় কবি কাজী দিনার সুলতানা বিনতিকে। এই তিনজনের বাইরে চক্ষু চিকিৎসক ডা. রশিদ হায়দার (নানা), চিকিৎসক ফারহানা রহমান, ব্যাংকার সালাহউদ্দিন আহমেদ, তখনো ছাত্র পরে ব্যাংকার সৈয়দ মুতাকিল্লা, গৃহবধূ শাগুফতা হুসেইন, তখন ছাত্রী পরে গৃহবধূ মৌসুমী মর্তুজা মৌমি, তখনো ছাত্র পরে শিক্ষক শামসুদ্দোহা সাকিন, তখন ছাত্র পরে শহরত্যাগী সাজিদুল হক প্রমুখ ছিলেন আবৃত্তিশিল্পী। মোটামুটি এই ছিল ‘মেঘদূত’ পরিবার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে মসয়ূদ মান্নান ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। ঢাকায় তার এই উপস্থিতি প্রায় নীরব হয়ে থাকা মেঘদূতকে সরব ও সক্রিয় করে তুল্ল। চিলির নোবেলবিজয়ী কবি পাবলো নেরুদার কবিতা নিয়ে ঢাকার মেক্সিকান রেস্তোরাঁ এল টরোতে প্রথম অনুষ্ঠান, ধানমন্ডিস্থ জার্মান কালচারাল সেন্টারে বাংলাদেশ-জার্মান মৈত্রী ঘিরে কবিতা পাঠ, বনানীর ইকবাল টাওয়ারে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের দিয়ে মাতৃভাষার কবিতাপাঠ, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে বিজয় দিবসের কবিতা পাঠ, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে অক্টোবর বিপ্লবকে সামনে রেখে রাশান কবিতা আবৃত্তি, বনানীর আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে কবিতা পাঠ – অনেকগুলো কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মসয়ূদ মান্নানের নেতৃত্বে ‘মেঘদূত’। নিজে রাষ্ট্রদূত হওয়ায় মসয়ূদ মান্নানের ব্যক্তিগত ও পেশাদারী সম্পর্ক ছিল অনুষ্ঠানগুলো সাফল্যের সাথে আয়োজনের সহায়ক। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের দিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কবিতাপাঠ ছিল ব্যতিক্রমী আয়োজন। সময়টা ছিল ২০০৭-২০১০ সাল।
কবিতা আবৃত্তির রিহার্সাল হতো মসয়ূদ মান্নানের সহধর্মিণী নুজহাত মান্নানের নিউ ইস্কাটনস্থ গাউস নগরের বাসায়, কখনো মসয়ূদের কলাবাগানস্থ বাসায়। আবৃত্তির রিহার্সাল, অনুষ্ঠানে কবিতাপাঠ আমাদের পরস্পরকে ঘনিষ্ঠ করে তুলছিল। সৌমিত্র দেবের সাথে এসময়েই আমার সবচেয়ে বেশি অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। তাকে আমার বিনয়ী, লাজুক ও প্রেমিকস্বভাবী মনে হয়েছে। সেসময়ে আমি ও সৌমিত্র উত্তরার তিন নম্বর সেক্টরে প্রতিবেশি ছিলাম। ফলে রিহার্সাল শেষে, নুজহাত ভাবীর পাঠানো চা ও বিবিধ প্রকার খাবার আহার শেষে, আমি ও সৌমিত্র আমার সাদা গাড়িতে উত্তরার পথ ধরতাম। কখনো কাজী দিনার সুলতানা বিনতিকে পথে নামিয়ে দিতাম। কখনো সওয়ারী হতো সাজিদ।
সৌমিত্র দেবের লেখালেখি সম্পর্কে আমি কমই জানতাম। নব্বই দশকের একজন কবি হিসেবেই তাকে চিনতাম, কিন্তু সে যে একজন ভ্রামণিক এবং ভ্রমণকাহিনীর লেখক, এটা জানা ছিল না। কবিতা ও ভ্রমণগদ্যের বাইরে তার ফিকশন, নন-ফিকশন মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪১। তার চেয়ে অন্তত দশবছর আগে লেখালেখির জগতে এসেও আমার গ্রন্থসংখ্যা ওই সংখ্যার চেয়ে অন্তত কুড়িটি কম। এতে প্রমাণিত হয় লেখক হিসেবে সৌমিত্র দেব অধিকতর সক্রিয়।
সৌমিত্র দেবের বাড়ি মৌলভীবাজার। সেখানেই তার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা। পরবর্তী পড়াশোনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখান থেকে তার স্নাতক ডিগ্রিলাভ। সে যে মৌলভীবাজারের সন্তান তা জানতে পারি ‘আপনার দেশের বাড়ি কোথায়’ জাতীয় বাংলাদেশে প্রচলিত সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা সম্পৃক্ত প্রশ্ন থেকে নয়, বরং ২০১৫ সালে যখন সে মৌলভীবাজার পৌরসভায় মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সেই অবাক করা সংবাদ শুনে। এটা আমি আশা করিনি। কায়োমনোবাক্যে চেয়েছিলাম একজন কবি যেন পৌরকর্তা হয়। কিন্তু এ সমাজ মাসলম্যানকে সমীহ করে, কবিকে করে উপেক্ষা। সৌমিত্র দেবের নির্বাচনী পরাজয় ছিল কবি নির্মলেন্দু গুণ সৃষ্ট ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা মাত্র। শহীদ কাদরী যতই আকাঙ্ক্ষা করুক আগামী নির্বাচনে সবগুলো ভোট একজন কবির বাক্সে জমা পড়ুক, আমাদের লোকেরা রাজনৈতিক মাস্তান, দুর্নীতিতে কলাগাছ হয়ে ওঠা বেঢপ ধনী ও অসৎ ক্ষমতাবানদেরকই ভোট দেয়, সুশীল সমাজের কাউকে নয়। মৌলভীবাজার শহরে অবশ্য সৌমিত্র দেবের ব্যপক পরিচিতি রয়েছে, কেবল কবি হিসেবে নয়, নিজ জেলা শহরে নব্বইয়ের ছাত্র-গণআন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে। হয়তো সেটাই তাকে ভোটে নামতে উদ্দীপ্ত করে থাকবে।
আমি জানতাম না হাছন রাজার দেশের লোক সৌমিত্র দেব মরমী গানের রাজাকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। লোক সাহিত্য নিয়ে মগ্ন সৌমিত্র দেবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই – ‘মরমী কবি হাছন রাজা ও তাঁর জীবন দর্শন’। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় বিচরণ করলেও লোক সাহিত্যে তার বিশেষ অবদান আছে । ২০০৯ সালে ঢাকায় তার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় হাছন উৎসব । হায়, সে উৎসবে সৌমিত্র আমাকে আমন্ত্রণ পাঠায়নি। তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি’ গ্রন্থের একজন কন্ট্রিবিউটর। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের চতুর্থ ব্যাচে (১৯৯৬) প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সৌমিত্র। সেখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতার বই ‘শময়িতাদের বাড়ি’।
বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট, এশিয়াটিক সোসাইটি ও বাংলা একাডেমির বিভিন্ন গবেষণাকর্মে অংশ নেওয়া সৌমিত্র দেব পরে পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতা। গবেষণার অভিজ্ঞতা, তার সাথে লেখক সত্তার সমন্বয়ে সাংবাদিকতা পেশা তার প্রিয় হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে সহায়ক হয় বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট থেকে অর্জন করা সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। জাতীয় পর্যায়ে তিনি কাজ শুরু করেন দৈনিক ‘প্রথম আলো’য়। এরপর টানা ৫ বছর কাজ করেছেন ট্যাবলয়েড দৈনিক ‘মানবজমিনন’-এ। ছিলেন এর সহকারী সম্পাদক । তখন আমার কিছু কবিতা ছেপেছিলেন, মনে পড়ে।
২০০৯ সালে অনলাইন পত্রিকা রেডটাইমস ডট কম ডট বিডি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক। মাঝে মাঝেই দেখি তিনি আমার লেখা ফেসবুক থেকে নিয়ে রেডটাইমস বিডিতে ছেপে দেন ভ্রাতৃঅধিকারে।
২০০৯ সাল সৌমিত্র দেবের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বছর। ঢাকায় হাছন রাজাকে নিয়ে জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজন, রেডটাইমসবিডি প্রতিষ্ঠা ছাড়াও এ বছরেই তিনি স্কুল শিক্ষিকা পলা দেবকে বিয়ে করেন। জানলাম এর ভাগ্যেই শিঁকে ছিড়েছে, অস্থির মানুষটিকে ইনিই অবশেষে জয় করতে সক্ষম হলেন। প্রবল সুন্দরী পলা দেব ভারী চমৎকার মানিয়ে গেছে সুদর্শন সৌমিত্র দেবের সাথে। দুটি যেন চলচ্চিত্রের জুটি। বহুকাল ধরেই তারা বাস করছেন কনকর্ড লেক সিটিতে। পলা সৌমিত্রের একমাত্র পুত্র সৌভাগ্যের দুটি জন্মদিনে সে সিটিতে গিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ পেয়েছি, পেয়েছি উষ্ণ অভ্যর্থনা। প্রথমবার আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বন্ধু মসয়ূদ মান্নান।
সৌমিত্র দেবের সৌভাগ্য বলি বা কৃতিত্ব বলি তিনি পৃথিবীর বহু দেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন । ২০০৫ সালে অংশ নেন দশম উত্তর আমেরিকান বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে। এ ছাড়া চীন, মালেশিয়া , নেপাল ও ভারতে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন, প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাংলাদেশের। তার ৫টি ভ্রমণকাহিনী ‘পূর্ব থেকে পশ্চিমে’, ‘জলে স্থলে অন্তরীক্ষে’, ‘হিমালয় কন্যার হাসি’, ‘আমেরিকা- রুদ্ধশ্বাসে একমাস, ‘চিরবসন্তের চীনানগরী’ এসকল অভিজ্ঞতা ধারণ করে। তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তালিকায় আছে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও বিকল্প গণমাধ্যম, অজবীথি, বন পর্যটক, নীল কৃষ্ণচূড়া, তুমুল তুষার বৃষ্টি , আগুন পিপাসা, পাথরের চোখ প্রভৃতি।
সৌমিত্র দেব বহুমাত্রিক। লেখালেখিই তার প্রধান নেশা, অন্য দুটি নেশা হলো অভিনয় ও আবৃত্তি। অমন নায়কোচিত মানুষের অভিনয় না করলে মানায়? কিন্তু অফার থাকা সত্ত্বেও তিনি ঢাকাইয়া বাণিজ্যিক ছিঃনেমায় অভিনয়ে নামেননি রুচির কারণে। সৌমিত্র অভিনয় করেন আর্ট ফিল্মে। কবি নির্মলেন্দু গুণ রচিত মাসুদ পথিক পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’-এ তিনি প্রথম অভিনয় করেন। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে । সম্প্রতি তিনি শিল্পকলা একাডেমির অর্থায়নে নির্মিত রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ চলচ্চিত্রে একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন । চলচ্চিত্রে অবদান রাখার জন্য ২০১৮ সালে পেয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা। সৌমিত্রের ঝুলিতে রয়েছে কবিতার জন্য ‘বাংলাদেশ রাইটার্স ফাউন্ডেশন পদক’ (২০০৫)। বাংলাদেশ গণগ্রন্থাগার আয়োজিত একুশে প্রতিযোগিতায় তিনি কবিতা বিভাগে চট্রগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম হয়েছিলেন।
আজ সৌমিত্র দেবের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হলো। এবছরই এক যুগ পূর্ণ করলো তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান রেডটাইমস ডট কম ডট বিডি। কবি ও কবির সংগঠনকে অভিনন্দন জানাই। সৃষ্টিশীলতায় কাটুক না আরও পঞ্চাশ বছর!

কামরুল হাসান ঃ কবি ও অধ্যাপক 

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930