স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সে সুযোগটা পাবেন না

প্রকাশিত: ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ, মে ৩০, ২০১৮

স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সে সুযোগটা পাবেন না

সমালোচনার মুখে কিছুটা পিছু হটেছে নির্বাচন কমিশন।নির্বাচনে সাংসদদের প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা মঙ্গলবার বলেছেন, তারা এখনও ওই প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন। সাংসদদের জন্য স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ এলেও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সে সুযোগটা পাবেন না।

সংসদ সদস্যদের ওপর থেকে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচনে প্রচারে অংশগ্রহণের বিধি-নিষেধ বাদ দিয়ে আচরণ বিধিমালার-২০১৬ সংশোধনের প্রস্তাব গত বৃহস্পতিবার অনুমোদন দেয় নির্বাচন কমিশন।

কমিশনের ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে কয়েকজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা। সবাইকে ‘সমান সুযোগ’ দেওয়ার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন কমিশন এই প্রস্তাব অনুমোদন করায় এটাই নির্বাচনে ‘সমান সুযোগ’ তৈরিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে বলে অভিমত দেন তারা। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর সংসদ সদস্যদের ‘প্রভাবের’ বিষয়টি উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা।

একজন নির্বাচন কমিশনারও ওই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে পরে জানা যায়। সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও অভিমত দিয়েছিলেন তিনি।

কমিশন সভায় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এ বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়ার খবর প্রকাশের পর মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের সামনে এসে অনুমোদিত প্রস্তাব পর্যালোচনার কথা বললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।

নূরুল হুদা বলেন, “শুধু সিটি করপোরেশন নয়, স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন সংসদ সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার স্থানীয় সংসদ সদস্যরা প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন না।”

এই পরিবর্তন এনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিধি সংশোধনের পর পর্যায়ক্রমে পৌর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিধিও সংশোধন করা হবে বলে জানান তিনি।

বর্তমান আচরণ বিধিতে সংসদ সদস্যদের প্রচারে নামার সুযোগ না থাকায় আওয়ামী লীগ এই আচরণ বিধি সংশোধনের দাবি তুলেছিল। ক্ষমতাসীনরা বলছিল, তাদের সংসদ সদস্যরা সিটি নির্বাচনে প্রচারের সুযোগ না পেলেও বিএনপি সংসদে না থাকায় সে দলের নেতারা প্রচারে নামতে পারছে, এতে সবার সমান সুযোগ থাকছে না।

বিদ্যমান আচরণবিধির ২ (১৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ অর্থ প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী ও তাদের সমমর্যাদার কোনো ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়র। এসব ব্যক্তিরা ভোটের প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। শুধু ভোট দিতে নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার অনুমোদিত আচরণবিধির ২ (১৩) ধারায় সংশোধনী প্রস্তাবে ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ তালিকা থেকে সংসদ সদস্যদের বাদ দেওয়া হয়।

এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে- যেহেতু ‘সংসদ সদস্য’ প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত নয়, সেহেতু সংজ্ঞা থেকে সংসদ সদস্য শব্দটি বাদ দেওয়া হবে।

ওই দিন নির্বাচন কমিশন সভা শেষে সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সব এমপি সিটি নির্বাচনে প্রচার চালানোর সুযোগ পাবেন।

এখন ওই প্রস্তাবে লাগাম টানার খবর জানিয়ে সিইসি নূরুল হুদা বলেন, “স্থানীয় এমপিদের এলাকায় একটি প্রভাব থাকে, যার কারণে স্থানীয় এমপিদের প্রচারণার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে তারা ভোট দিতে পারবেন। অন্য এমপিদের সিটির প্রচারে যেতে বাধা থাকবে না।”

কমিশন সভায় একজন কমিশনারের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের পাঁচজন কমিশনারের মধ্যে চারজন পক্ষে মত দিয়েছেন এবং একজন নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। সেই নোট অব ডিসেন্টটি আমাদের যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। তাই আমরা এর বিরুদ্ধে।”

স্থানীয় সাংসদদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে বৈষম্য হবে কি না- প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, “আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে নির্বাচনের বিধান ছিল না। বর্তমানে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয়। এজন্য দলীয় প্রার্থীর পক্ষে দলীয় কর্মীর প্রচারে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাছাড়া সংবিধানের ৩৭ ও ৩৮ ধারায় সবার সভা, সমাবেশ ও চলাফেরার অধিকার রয়েছে।

যার কারণে বর্তমান বিধানটি আমাদের কাছে ঠিক মনে না হওয়ায় এ বিধানটি বাদ দিয়ে আমরা এমপিদের প্রচার চালানোর সুযোগ দিয়েছি।

এমপিরা প্রচার চালালে নির্বাচন প্রভাবিত হবে কি না- প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, “এমপিরা রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী নন। তারা কোনও সরকারি অফিস ব্যবহার করেন না। এখানে নেতিবাচক কোনও প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই।”

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম এ সময় সিইসির কথা ধরে স্থানীয় এমপিদের বাইরে রাখার বিষয়ে বলেন, স্থানীয় এমপিদের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রয়েছে। তাদের ত্রাণ, অনুদান দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তারা কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

“এ কারণে নির্বাচন যেন প্রভাবিত না হয় সেজন্য আমরা তাদের প্রচারণার বাইরে রেখেছি। তবে তারা ভোট দিতে পারবেন। এলাকায় গেলে বা ভোট দিলে প্রভাবিত হওয়ার কোনও সুযোগ নাই।

আচরণবিধি সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে আরও পর্যালোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সিইসির সঙ্গে চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিবও উপস্থিত ছিলেন।