স্বপ্নের দেশ নেপাল

প্রকাশিত: ৮:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৮

স্বপ্নের দেশ নেপাল

আনোয়ার চৌধুরী

পরথমে বন্দনা করি ছিরজন করিছেন যিনি প্রভু দয়াময়
তারপরেতে বন্দনা করি দয়াল নবী প্রেমময়
পূর্বেতে বন্দনা করি রঘুনন্দন পাহাড়
পশ্চিমে বন্দনা করি মক্কারঅ শহর
দক্ষিনে বন্দনা করি কালিদহ সায়র
সর্বশেষে উত্তরে বন্দনা করি হিমালয় পাহাড়
খুব ছোট বেলায় গ্রামের এক কবি গানের অনুষ্ঠানে এভাবেই কবিয়ালের মুখে হিমালয় পর্বতের নামটি শুনেছিলাম। তখন গ্রামাঞ্চলে কবিগান ও বাউলা গানের বেশ প্রচলন ছিলো। কবিয়ালরা গানের শুরুতেই এভাবে খুব ভক্তিসহকারে ¯্রষ্ঠা ও তার সৃষ্টির প্রতি প্রশস্থিমুলক কয়েকটি লাইন উচ্চারন করে মূল অনুষ্ঠান শুরু করতেন। আবার প্রবল ঝড় তুফান ও কাল বৈশাখীর তান্ডবের সময় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্রামবাসী জুড় গলায় হাঁক দিতো ‘আল্লা রছুলের দোহাই দেই ,গোয়াছ কুতুবের দোহাই দেই ,বাবা শাজালালের দোহাই দেই, হিমাইল্লা পর্বতের দোহাই দেই হইরা যা হইরা যা, অন্যখান্দা চইল্লা যা চইল্লা যা” । পরে বুঝতে পারি এই ‘হিমাইল্লা পর্বত’ আসলে হিমালয় পাহাড় । তারপর পরে চতুর্থ কি পঞ্চম শ্রেনীতে একটি পাঠ ছিলো ‘এভারেষ্ট বিজয়’ শেরপা তেনজিং ও এডমান্ড হিলারী ২৯,০২৮ ফুট উচ্চতায় এভারেষ্ট চ’ড়ায় উঠে জগৎময় হৈচৈ ফেলে দেয় । তখন জানতে পারি এই হিমালয় পর্বত আমাদেরই নিকট প্রতিবেশী দেশ নেপালে অবস্থিত। সিকি শতাব্দির চাকুরী জীবনে পৃথিবীর অনেক দেশে গেলেও নেপাল যাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠেনি। গত বছর শ্রান্তি বিনোদন ছুটি উপলক্ষে নেপালে যাওয়ার সকল প্রস্তুতি গ্রহন করেও ব্যাটে বলে মিলন হয়নি শেষতক। সম্প্রতি কাঠমন্ডু এয়ারপোর্টে ইউএস বাংলার এয়ারক্রাফট দুর্ঘটনার পর নেপাল ভ্রমণের চিন্তা একেবারেই মাথা থেকে সরে যায়। বেঘোরে প্রান দেব নাকি? গিন্নির বক্তব্যও একই । কিন্তু ভাগ্যে থাকলে তা কি খন্ডন করা যায়? কি করে এই ভ্রমণ হলো তা একটু খোলে বলি। আশা করি পাঠক ধৈর্য হারাবেননা।
অফিসে কাজ করার সময় প্রশিক্ষণ শাখার উপসচিব ফারহানা রহমান জানায় বিবিআইএন(ইইওঘ) মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্টে এর (গঠঅ) আওতায় ঢাকা থেকে একটি বাস র‌্যালী যাচ্ছে নেপালে। ওটা ট্রায়্যাল রান। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাস র‌্যালীটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে যাত্রা করে পঞ্চগড় জেলার বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতের ফুলবাড়ী স্থল বন্দরে প্রবেশ করবে। তারপর নেপালের কাকঁরভিটা সীমান্ত দিয়ে নেপালে প্রবেশ করে কাঠমন্ডু পৌছাবে। বাংলাদেশ থেকে ২৫ জন প্রতিনিধি যাবে। আমি চাইলে টিমে অর্ন্তভুক্ত হতে পারি। খানিকটা ইতস্তত করে শেষে রাজি হয়ে গেলাম। নিমরাজীর কারন হলো ভ্রমণটি হবে সড়ক পথে, প্রায় এক হাজার একশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হবে,অনেকটা দুর্গম পথে। ইতিপূর্বে ২০১৩ সালে বিসিআইএম(ইঈওগ) কার র‌্যালীতে অংশ গ্রহন করেছিলাম। কলিকাতা-ঢাকা-সিলেট-শিলচর(আসাম)-ইম্পাল (মনিপুর)-কালে-মান্দালয়-রাসো(মিয়ানমার)-কুনমিং(চীন) পর্যন্ত দূরুত্ব ছিলো প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার । সুতরাং এগারশ কিলোমিটার তো নস্যি!
আমাদের যাত্রা শুরু হয় ঢাকার মতিঝিলস্থ বিআরটিসি ইন্টারন্যাশনাল বাস টার্মিনাল থেকে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জনাব নজরুল ইসলাম এই বাস র‌্যালীর উদ্বোধন করেন ২৩ এপ্রিল সকাল বেলা । উদ্বোধন অনষ্ঠানে ভারতীয় দুতাবাসের প্রথম সচিব গৌরব গান্ধী ও নেপালী দুতাবাসের ডেপুটি চীফ অব মিশন মি.ধন বাহাদুর ওলিসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তিন দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক ও সুধীজন উপস্থিত ছিরেন। ৫০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান জনাব ফরিদ আহমেদ ভুঁইয়া । সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয় ছাড়াও স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, প্রধানমন্ত্রির কার্যালয়,বাংলাদেশ টেলিভিশন,সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও একটি বাংলা দৈনিকের প্রতিনিধিরা টিমে অর্ন্তভুক্ত ছিলো। তাছাড়া ছিলেন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (অউই)প্রতিনিধি মাসুক আল হোসেন ও মানদেশ মহাজন। নেপালী ও ভারতীয় দলেও নিজ নিজ দেশের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধি ছিলো। শ্যামলী পরিবহনের দুটি এসি বাসকে তাজা ফুলের মালা ও তিন দেশের জাতীয় পতাকা, বিআরটিসি’র লগু দিয়ে সজ্জিত করা হয়। পুরো ভ্রমণটির ব্যবস্থাপনায় সহযোগি ছিলো শ্যামলী পরিবহন । শ্যামলী পরিবহনের বাস ঢাকা-কোলকাতা, ঢাকা-আগরতলা ও ঢাকা- শিলং-গৌহাটি রুটে চলাচল করে। শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠান শুভঙ্কর এন্ড ঘোষেরও কয়েকজন প্রতিনিধি ছিলেন সার্বিক সহযোগীতার জন্যে।
আমরা প্রথমেই যাত্রা বিরতি দিই সাভারের নন্দন এ্যামিউজমেন্ট পার্কে আমার সিলেটী বন্ধু সেলিম ভাইয়ের সৌজন্য। নেপালী ও ভারতীয় বন্ধুরা নন্দন পার্কের নান্দনিকতায় বেশ উৎফুল্ল হয়। অনেকেই নানা লোকেশনে ছবি তোলে। চা-কফির স্বাদ গ্রহন করে যাত্রা শুরু হয় পরবর্তী বিরতিস্থল সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলের দিকে। সেখানে জনপ্রিয় এ্যারোষ্টক্রেট রেষ্টুরেন্টে স্বাগত জানায় জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দিকা ও পদস্থ কর্মকর্তাগন। নানা ব্যাঞ্জন ও যমুনা নদীর সুস্বাদু তাজা মাছ দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন উপভোগ করি। লাঞ্চ শেষ হতেই স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘিরে ধরে দলপতি ফরিদ আহমেদ ভুঁইয়াকে। ঢাকা-কাঠমন্ডু বাস চলাচলের বিষয়ে তাদের আগ্রহের যেন শেষ নেই। সাধারন মানুষের ঔৎসুখ্যেরও কমতি ছিলোনা। রংপুরে পৌছার আগে বগুড়া শহরে থামতে হয় খানিকট সময়। এখানেও সম্বর্ধনার আয়োজন করেছে স্থানীয় পরিবহন মালিক সমিতি, প্রেসক্লাব ও আরো কয়েকটি সংগঠন। ফুলেল শুভেচ্ছা ও বাহারী আপ্যায়নের পর রংপুরের দিকে যাত্রা। নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা পরে রংপুর শহরের নর্থ ভিউ হোটেলে পৌছাই। রংপুরে জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীব ও বিভিন্ন বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানায়। টিম লিডারদের উত্তরীয় পরিয়ে দেয়া হয়। ডিনারের পর জমকালো সঙ্গীতানুষ্ঠান। উত্তর বঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াইয়া সঙ্গীত পরিবেশন করে অতিথিদের তৃপ্ত করা হয়। অনুষ্ঠান শুরু হয় তিন দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে। নেপালী জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত নেপালী ছাত্রীরা। পরদিন সকালে যাত্রা করি ভারতের উদ্দেশ্যে পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা হয়ে।
পথিমধ্যে ভারতীয় ও নেপালী বন্ধুদেরকে দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরা ঐতিহাসিক এ মন্দিরের নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী দেখে মুগ্ধ হয়। স্থানীয় সাঁওতাল নারী পুরুষের একটি দল ধর্মীয় নৃত্যগীতি পরিবেশন করে অতিথিদের আনন্দ দেয়। নেপালী টিম লিডার গোবিন্দ প্রাসাদ খারেল,রোশান খানাল ও ভারতীয় অমিত মুনজালসহ কয়েকজন প্রতিনিধি নৃত্যে অংশ গ্রহন করলে আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। পঞ্চগড় সার্কিট হাউজে পৌছলে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পুলিশ সুপার, স্থানীয় বিজিবির কমান্ডিং অফিসারসহ জেলার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাগন অতিথিবর্গকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সার্কিট হাউজে লাঞ্চ সেরে রওয়ানা দিই বাংলাবান্দা স্থল বন্দরের দিকে। বাংলাবান্দা সীমান্তে পৌছলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা প্রদান করা হয়। তাছাড়া পঞ্চগড় চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হান্নান শেখ ফুলের তোড়া দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেন। কাষ্টমস ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাস বহর জিরো পয়েন্ট অতিক্রম করে ফুলবাড়ী পয়েন্টে ভারতের মাটি স্পর্শ করে।
ফুলবাড়ীতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর গুরুত্বপূর্ণ অফিস। বিএসএফ এর ডিআইজি জনাব অজিত কুমার আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানায়। তার সাথে ছিলেন নর্থ বেঙ্গল ষ্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (ঘইঝঞঈ) চেয়ারম্যান সুবল রায়। ক্যাম্পের খোলা প্রাঙ্গনে সর্ম্বধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএসএফ কর্তৃপক্ষ। প্রথমেই ফুলের মালা ও উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানায়। এ ঐতিহাসিক অভিযাত্রার দ্বার উন্মোচন করার ক্ষণটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য শুরু হয় ক্যামেরা ও সেলফোনের ক্লিক ক্লিক শব্দ। সহাস্য করমর্দনের সময় মনে হয়েছে যেন কতকালের চেনা। আর চেনাইতো,হাজার বছরের চেনা জানা। এই ফুলবাড়ী এই শিলিগুরী তো অবিভক্ত বাংলারই অংশ ছিলো। বেশ কিছুক্ষণ আন্তরিক আলাপ আলোচনার পর আপ্যায়নের পালা। সবুজ ঘাসের চত্তরে রঙিন ছাতার নীচে পাতা চেয়ার টেবিলে বসলাম বিশাল দলসহ,ফলমুল,পিঠা, টক ঝাল মিষ্টি ও কোমল পানীয় দিয়ে আপ্যায়নের সুন্দর আয়োজন ও পারস্পরিক আলাপচারিতা। অনেক ব্যবসায়ী,সাংবাদিক ও সুধিজনের সাথে কথা হয়, সকলের একই কথা দ্রুত যেন বাস চলাচল শুরু হয়। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে খানিকটা দূর এগিয়ে যেতেই ইমিগ্রেশন ও শুল্ক অফিস। সেখানকার আনুষ্ঠানিকতাও শেষ হলো যথানিয়মে। এবার যাত্রা শিলিগুরী শহরপানে। ততক্ষণে সূয্যি মামা পশ্চিম আকাশ থেকে বিদায় নিয়েছে। কয়েক কিলোমিটার চলার পরই বাস বহর শহরে প্রবেশ করে। আলো আধাঁরীতে বাসের জানালার ফাঁক দিয়ে শিলিগুরী শহর দেখা। সকলের দাবী বাস বহর যেন পুরো শহরটা ঘুরিয়ে আনে। কিন্তু ট্রাফিক আইনের মারপ্যাঁচে তা আর হলোনা। খানিকটা পরেই নামলাম হোটেল মাউন্ট মাইল ষ্টোনের সামনে। আজকের রাত এখানেই কাটাতে হবে। লবিতে এখানেও স্বাগত জানালো উত্তরীয় পরিয়ে,সংগে চা শরবত ও মিষ্টান্ন। চেক ইন এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রুমে গিয়ে ফ্রেস হলাম। শরীর ও মনে রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু এলিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। টিম লিডার জানিয়েছেন এক্ষুনি বের হতে হবে শহর দেখতে । বের হয়ে বুঝলাম শহর দেখাতো নয় আসল কাজ হলো শপিং। হোটেল থেকে কিছু দূর যেতেই বিশাল শপিং মল কসমস সেন্টার। শিলিগুরী শহরের দুটি নামকরা শপিং মলের একটি। সময় দেয়া হয় সাকুল্যে ৬০ মিনিট, এরিমধ্যে কেনাকাটা শেষ করতে হবে। যে যেভাবে পারে হুরমুর করে পছন্দের দোকানে ঢুকে পড়ে। তবে বেশীরভাগই বিগ বাজার নামক চেইন শপে যায়। ফিক্সড প্রাইস থাকায় দরদামের ঝক্কি ঝামেলা নেই।যথারীতি জিনিসপত্রের জন্য টাকা দিয়ে ব্যাগ কিনতে হলো। তারা কোন শপিং ব্যাগ দিবেনা। আমাদের দেশের শপিং মলের মতো দরাজ দিল কিংবা সৌজন্য পরায়ন নয়। তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এবার কম বিরক্ত হয়েছি। কেননা মাস কয়েক আগে ইউরোপ ভ্রমনে গিয়ে বেশ কয়েকটি শপিং মলে একই অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়েছি। তারাও কোন শপিং ব্যাগ দেয়না। তবে প্যারিসে বেশ সুন্দর ব্যাগ দিয়েছিলো। যাকগে এক ঘন্টার তুলনায় দেড় ঘন্টা ব্যয় করে বের হলাম সকলে।
ডিনার খেয়ে রিসিপশন থেকে আনা দৈনিক ষ্টেস্টসম্যান পত্রিকায় চোখ বুলাই। পত্রিকাটির বাংলা ইংরেজী দুই ভার্সনই বের হয়। পত্রিকা জুড়েই রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের হিড়িক পড়েছে রাজ্যজুড়ে। পত্রিকার শিরোনাম পড়ে যা দেখলাম তাতে গা শিহরিয়া উঠে। ক্ষমতাবান দিদির তৃণমুল কর্মীদের দাপটে বিরোধী কিংবা স্বতন্ত্র কেহই নমিশন পেপার সাবমিটই করতে পারছেনা। রির্টাণিং আধিকারিকের অফিসে যাওয়ার পথেই অধিকাংশ প্রার্থীকে গনধোলাই দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে। মহাক্ষমতাধর বিজেপির প্রার্থী ..দেলখানকে পিটিয়ে মেরেই ফেলে । ঘটনা এখানেই শেষ নয়, মৃত ব্যাক্তিকে নিজ দলের সমর্থক হিসেবে জাহির করার জন্য তার লাশ জোর করে হাসপাতাল থেকে বের করে দলীয় অফিসে নিয়ে যায়। তার স্ত্রী ও বাবাকে ধরে এনে সাংবাদিকদের নিকট বলতে বাধ্য করে তারা বিজেপি নয় তৃণমুলের সমর্থক। হত্যান্ডের জন্য বিজেপিই দায়ী ! সেলুকাস কি বিচিত্র দিদির রাজ্য! আর এসকল ঘটনা নাকি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নাকের ডগাতেই ঘটেছে! পত্রিকার রিপোর্টে তাই দেখলাম। এরুপ পরিস্থিতে বিরোধী পক্ষ হাইকোর্টে রিট ফাইল করে। কোর্ট নমিনেশন পেপার দাখিলের সময় একদিন বাড়িয়ে দেয় এবং সকলের অধিকার নির্বিঘœ করার জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নির্দেশ দেয় । বলিহারি কান্ড কে শুনে কার কথা। লৌহমানবী দিদির সাফ কথা পশ্চিম বাংলায় কোন বিরোধী দল থাকবেনা, বাম ডান যেই হোকনা কেন , এরা উন্নয়নের শত্রু, গনতন্ত্রের দুশমন! দিদি তার ওয়াদা শতভাগ রাখবেন বলেই মনে হয়। কেননা দেশে ফিরে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার খবরে দেখলাম পঞ্চায়েত ও জিলা পরিষদের নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ আসনে তৃণমুল প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হযেছেন! সাবাস দিদি সাবাস ,এগিয়ে চলুন জোড় কদমে! আগে জানতাম ‘মরদকা বাত হাতীকা দাত’ এখন দেখছি ‘দিদিকা বাত হাতীকা দাঁত!’ সহজেই বুঝা গেল বাংলাদেশের সাথে তিস্তিার জল বন্টন নিয়ে দিদি তাঁর অবস্থানের কোন পরিবর্তন করবেননা। আমরা যতই পদ্মার ইলিশ আর রসগোল্লা পাঠাই এতে দিদিও মান ভাঙবে বলে মনে হয়না। ভারতের দু দু’জন জাদঁরেল প্রধানমন্ত্রি তাঁর কাছে কেন অসহায় তা না বুঝার কারন নেই। যাকগে সে কথা। বিদেশে গেলে সেখানকার জাতীয় দৈনিক পত্র্রিকা পড়া আমার আগ্রহের বিষয়। অবশ্য পত্রিকার ভাষা বাংলা কিংবা ইংরেজী হলে। তবে আসামে গিয়ে অসমীয়া পত্রিকাও কিছুটা পড়তে সক্ষম হয়েছিলাম সেবার।
সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা পৌছে যাই শিলিগুরী শহরের এক প্রান্তে ‘উত্তর কণ্যা’র ছিমছাম চত্তরে। স্বাগত জানান নর্থ বেঙ্গল ডিভিশনের কমিশনার মি. বরুণ কুমার রায় আইএএস,শিলিগুরী সাব-ডিভিশনের মহকুমা প্রশাসক জনাব সিরাজ উদ্দিন দানেসসার আইএএস, ও পশ্চিম বঙ্গ ট্রান্সপোর্ট দপ্তরের যুগ্মসচিব এক ভদ্র মহিলা যার নামটি ভুলে গিয়েছি। তাছাড়া রাজ্যের অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তারাতো ছিলেনই । ছিলেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক ,সুধীজনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। কনফারেন্স হলে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বর্ধণা দেয়া হয়। আমাদের টিম লিডার ও নেপালের টিম লিডারকে উত্তরীয় পড়িয়ে দেয়া হয়। আমাদের দেয়া হয় ফুলগুচ্ছ। একটি ছিমছাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও নৃত্যানুষ্ঠান পরিবেশনে আন্তরিকতার ছাপ ছিলো ষোল আনা। অনুষ্ঠান সঞ্চালক ভদ্রলোকের বাংলা ভাষায় আবেগঘন উপস্থাপনায় সকলে বিমুগ্ধ । ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির নৃত্য ছিলো দেখার মতো। কমিশনার বরুণ কুমার রায় মহোদয় ও আমাদের দলনেতা ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া সাহেবের বক্তৃতার মাধ্যমে রিসিপশন অনুষ্ঠান শেষ হয়। আপ্যায়নের পর কমিশনার বরুণ কুমার ও ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া যৌথভাবে তিন দেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ফ্লাগ অফ ছিরিমনি শেষ করেন।
আপ্যায়নের সময় পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করার সুযোগ পাই। সকলেই এই রুট চালুর বিষয়ে আগ্রহী। তিনদেশের জনগনই লাভবান হবে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে,ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার হবে, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সহজ হবে, পারস্পরিক নৈকট্য বাড়বে এবং হিংসা বিদ্ধেষ ও অবিশ্বাস দূর হবে। কমিশনার বরুন কুমার ইন্ডিয়ান এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের(ওঅঝ)১৯৯১ ব্যাচের কর্মকর্তা, অতিরিক্ত সচিব, নিবাস বাংলা মুল্লুকেই। সিরাজ উদ্দিন দানিস্সর দিল্লীওয়ালা। পুরকৌশলে ¯œাতক,পরে দিল্লী ইউনির্ভাসিটি থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে ২০১৪ সালে ইন্ডিয়ান এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে যোগদেন। দু’বছর বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ শেষে মাঠ প্রশাসনে পদায়ন হয়। মাস ছয়েক হলো বাংলা প্রদেশের এই শিলিগুরী মহকুমায় এসডিও হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি জানান ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এই পদের নাম এসডিএম(ঝঁন –উরারংংরড়হধষ গধমরংঃৎধঃব) কেবল পশ্চিম বঙ্গেই বৃটিশ আমলের ঐতিহ্য ধরে রেখে এসডিও পদটিকে এখনো বহাল রেখেছে। দানেস্সর সাহেব বেশ ভালো বাংলা জানেন। জিজ্ঞেস করলে সহাস্যে বলেন যাদের সাথে কাজ করতে হবে তাদের মুখের জবান যদি না জানি তাহলে কিভাবে তাদের সমস্যা বুঝবো? সুন্দর উপলব্দি। ভারতে সিভিল সার্ভিসে কোটার প্রসংগ তুলতেই মৃদু হেসে বললেন ‘আমি কোন কোটায় আসিনি, ভারতে শত রকমের কোটা থাকলেও সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় মুসলমানদের জন্য কোন কোটা সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেই,মুসলমানদের অবস্থা ওবিসি’র (ঙঃযবৎ ইধপশড়িৎফ ঈষধংং) চেয়েও খারাপ, পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে টেনে তোলার বা মেইনষ্ট্রিমিং করার কোন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এজন্যে সম্প্রদায় হিসেবে তারা নিজেরাও অনেকটা দায়ী,আধুনিক শিক্ষার প্রতি এখনো তাদের অনিহা রয়েছে, সুযোগেরও অভাব রযেছে,বাধ্য হয়ে মাদ্রাসায় ঢুকে।’কথা আরো বলা যেতো কিন্তু সময় একেবারেই শেষ । সুদর্শন তরুণ কর্মকর্তার সাথে করমর্দন করে বিদায় নেয়ার আগে কয়েকটি ¯œ্যাপ নিই। শিলিগুরী শহরের উপর দিয়ে বাস বহর চলছে নেপাল সীমান্তের দিকে।
উত্তর কন্যা এবং শিলিগুরী সম্পর্কে কিছু বলা মনে হয় দরকার। উত্তর কন্যা হলো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের উত্তরাঞ্চলীয় সচিবালয়। ফলক দেখে জানা গেল ২০১৪ সালে মুখ্যমন্ত্রি মমতা বন্দোপাধ্যায় এর উদ্বোধন করেন। উত্তারাঞ্চলের জনগনের উন্নয়নের জন্য তিনি গঠন করেছেন নর্থ বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট(ঘইউউ) । কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরন এর পরিবর্তে তিনি স্থাপন করেন ‘নবান্ন’। এরিই আদলে করেছেন ‘উত্তর কন্যা’। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর দরদ সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। মাঝে মাঝেই তিনি এখানে অফিস করেন। অফিস প্রাঙ্গনের চারিদিকের বিস্তৃত খোলা জায়গায় নান্দনিক ফুলের বাগান এর সৌন্দর্য ও আকর্ষন আরো বাড়িয়েছে।
শিলিগুরী পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার একটি মহকুমা। তবে মহকুমা শহরের কিছু অংশ জলপাইগুরী জেলার অর্ন্তগত। সমতল এলাকায় অবস্থিত শহরটির অবস্থান রাজধানী কোলতার পরই। ওপার বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর(তবে হাওড়াকে কোলকাতা থেকে আলাদা ধরলে এর অবস্থান হবে তৃতীয়) , উত্তর বঙ্গের বানিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত।একটি কসমোপলিটন শহর,নানা জাতের মানুষের বসবাস এখানে,আদি বাসিন্দার তুলনায় অভিবাসীর সংখ্যাই বেশী। বৃটিশ আমল থেকেই মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীরা এখানে জেঁেক বসে আছে এবং এখনো ব্যবসা বানিজ্যের বড় অংশ তাদেরই নিয়ন্ত্রনে। অঞ্চলটি ৪টি ‘টি’(ঞ) যথা- টি,টিম্বার,ট্যুরিজম ও ট্রেড এর জন্য খ্যাতি পেয়েছে। শিলিগুরী মহকুমায় ৪৫টি চা বাগান রয়েছে। বৃটিশ আমল থেকেই চা উৎপাদন ও বিপননে এগিয়ে ছিলো। ব্যবসা বানিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে শহরটির চাকচিক্যে সহজেই নজর কাড়ে। আসামসহ উত্তর পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের গেটওয়ে এই শিলিগুরী শহর। রেল,সড়ক ও আকাশ পথে গোটা ভারতের সঙ্গেই এর যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সাথে প্রায় ২০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। গ্রীস্মকালে প্রচন্ড গরম এবং শীতকালে প্রচন্ড শীত। ভৌগলিক ও সামরিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। শহরের কাছেই ব্যস্ত বাগডোগরা সিভিল ও মিলিটারী এয়ারপোর্ট। শহরের জনসংখ্যা ৫ লক্ষের চেয়ে কিছু বেশী। বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। নেপালীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সংখ্যাও কম নয়। বাংলা ও ইংরেজী যুগপৎ অফিসিয়্যাল ভাষা,তবে নেপালী ও হিন্দিও প্রচলিত আছে। ইউনির্ভাসিটি অব নর্থ বেঙ্গল এবং নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ এ শহরের দু’টি নামকরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ইকোনমিক হাব হওয়ার দরুন বিহার,ঝাড়খন্ড, আসাম,মেঘালয়,সিকিম,ও উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন জিলা থেকে দলে দলে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার লোক এখানে এসে জড়ো হয়েছে জীবন জীবিকার জন্য। বেশ কিছু ভুটানী ও তিব্বতি জনগোষ্ঠিও এখানে বসবাস করে। শতকরা ৯০ ভাগের উপরে হিন্দু ধর্মের অনুসারী, মুসলমানের সংখ্যা ৫/৬শতাংশের মতো।
শিলীগুরী করিডোর: চিকেন’স নেক
ভৌগলিক অবস্থান,আয়তন ও আকৃতির কারনে শিলিগুরী অঞ্চলটি সমর বিশেষজ্ঞদের কাছে চিকেন’স নেক হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যখানে অবস্থিত ভারতের এই অঞ্চলের প্রস্থ খুব অল্প, কোন কোন পয়েন্টে ২৭ কিলোমিটারের মতো। ভৌগলিক অবয়বটি দেখতে অনেকটা মুরগীর গলার মতো বলেই একে চিকেন’স নেক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভৌগলিক ও সামরিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। চির বৈরী দেশ চীনের সীমান্ত খুব কাছেই। সিকিম ও ভুটানের মধ্যে অবস্থিত চীনের চুম্বি উপত্যকা শিলিগুরীর খুব কাছে। ফলে ভারতকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয় এই স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাটি নিয়ে। চীনের সাথে যুদ্ধ বেধেঁ গেলে যেকোন সময় বদ খেয়ালের বসে এই চিলতে ভুমিটি চীন দখল করলে গোটা উত্তর পূর্বভারতের সেভেন সিষ্টার্স বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এক অজানা ভয় সব সময় নাকি তাড়া করে ফিরে। সাম্প্রতিক ‘ডুকলাম’ সংকটের কারনে এই ভীতি আরো বৃদ্ধি পায় । এলাকাটির ভৌগলিক ও সামরিক দিক থেকে নাজুক অবস্থানের কারনে ভারতের কৌশলী প্রধানমন্ত্রি প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে গত শতাব্দীর সত্তুরের দশকে। সেটি হলো চীন সংলগ্ন ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র সিকিমকে ভারতের সাথে অঙ্গীভুত করা। একটি গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে সিকিম প্রতিবেশী শক্তিশালী ভারতে যোগদান করে। এক কালের স্বাধীন রাষ্ট্র সিকিম এখন ভারতের একটি ক্ষুদ্র অঙ্গ রাজ্য। তারপরেও নিরাপত্তা ইস্যুটি জলন্তই থেকে যায়। মোদ্দা কথা হলো শান্তিপূর্ণ সমাধান ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কোন বিকল্প নেই। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা,ভৌগলিক ও আঞ্চলিক অখন্ডতার প্রতি সন্মান প্রদর্শণ এবং সর্বোপরি সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণই আসলে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ‘ ঋৎরবহভংযরঢ় ঃড় ধষষ,ঊহবসু ঃড় হড়হব ‘ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির এই মূলমন্ত্রকে আকঁড়ে ধরলে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো এ নীতিকে অনুসরণ করতে পারে।
আমাদের বাস র‌্যালী শহরের চেক পয়েন্ট এলাকা থেকে যাত্রা করে শহরের উপর দিয়ে যাচ্ছিল তখন দুপাশে উৎসুখ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করি। শহরের বুক চিরে বয়ে চলেছে বেশ বড় নদী মহানন্দা । ব্রীজের উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় লক্ষ্য করি নদীতে পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। খা খা করছে। একি অবস্থা! সেতো দেখছি আমাদের দেশের নদীর মতোই। একজন বললেন এ নদীই তো পঞ্চগড় জেলার ভিতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তখন মনে পড়লো চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় চাকুরী করার সময় মহানন্দা নদী দেখেছি। ওটিও ক্ষীন ¯্রােতা ছিলো।বাঁধ দিয়ে পানি আটকে ফেললে পানীয় জলের কেমন সমস্যা হয়, নদী কিভাবে মরে যায়,পরিবেশের কিরুপ ক্ষতি হয় মমতাজী তা নিশ্চয়ই বুঝবেন। শহরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম শহরটি দ্রুত সম্প্রসারন হচ্ছে। বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মান করা হচ্ছে,ফ্লাইওভার ও ওভারপাস নির্মান হচ্ছে। চাকচিক্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তর কন্যায় চা পানের সময় আলাপচারিতায় জানা যায় কয়েক মাস আগে মুখ্যমন্ত্রি দার্জিলিং জেলার কালিম্পং মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করেন। এই সুর ধরে শিলিগুরীবাসী আওয়াজ তুলছেন শিলিগুরীকে মহকুমাকেও জেলা করা হোক। কালিম্পং এর তুলনায় শিলিগুরী অনেক বেশী উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। দাবী আদায়ের জন্য গঠন করা হয়েছে জেলা বাস্তায়ন কমিটি। ী। শহরে বেশ কিছু ব্যানার ও পোষ্টার দেখতে পাই। সমর সাহা নামে একজন ব্যবসায়ী জানালেন আগামী বিধান সভা নির্বাচনের আগেই শিলিগুরী জেলায় উন্নীত হবে,এটি এখন সময়ের দাবী। আমরা আমাদের প্রতিবেশী মহকুমার উন্নতি ও মঙ্গল চাই।
বাংলাদেশ থেকে যাত্রার সময়ই আমাদের গাড়ী বহরের সাথে পুলিশ প্রটেকশন ছিলো,ভারতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এতে চলাচল নির্বিঘœ হয়েছে বটে তবে গাড়ীর গতি কমে গিয়েছিলো যথেষ্ট মাত্রায়। আবার পুরিশের ঘনঘন ভেঁপু বাজানোর কারনে রাস্তার দুপাশের পথচারী ও জনসাধারনের নজর পড়েছে আমাদের গাড়ী বহরের উপর। আম জনতা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো গাড়ী বহরের দিকে,অনেকেই হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানায়। আসলে দুপাশে এক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরী হয়েছিলো ঢাকা থেকে কাঠমন্ডু পর্যন্ত। আমাদের চালকরা ছিলো খুবই অভিজ্ঞ ও সতর্ক। তারপরেও দুয়েকবার হোচট খেতে হয়েছে। শিলিগুরী শহরের শেষ প্রান্তে একটি ছাগল দৌড়ে এসে গাড়ীর চাকার সাথে ধাক্কা খায়। ছাগলটিকে বাঁচাতে চালক যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়,তবে আমরা বাসের ভিতর হুমরী খেয়ে পড়ি। গাড়ী থামালে আমরা নেমে ছাগলটিকে দেখতে যাই,মায়া লাগে, ¯েœহপ্রবন ছাগশিশুগুলি আহত মায়ের পাশে এসে দাড়ায়, ছাগলটির মালকিন একজন দরিদ্র কিষানী,সে তার সাথে আরো কয়েকজন কৃষানী সমেত দৌড়ে এসে আহত ছাগলটিকে আগলে ধরে। একটি করুণ দৃশ্যের সৃষ্টি হয়,কিন্তু চালকের কোন দোষ না থাকায় কেউ অভিযোগ করেনি। আমরা কয়েকজন আহত ছাগলটির ছবি নিই। একজন সখেদে বললেন ভাগ্যিস ছাগল আহত হয়েছে,যদি গরু আহত হতো তাহলে গো-মাতাকে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে নিদেন পক্ষে থানা পুলিশের মুখোমুখি হতে হতো! এ প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত তথ্য শেয়ার করতে চাই পাঠকের সাথে। ভারতের জাতির পিতা গান্ধীজীর ছাগল প্রীতি সকলেই কম বেশী জানেন। তিনি সব সময় ছাগল সাথে নিয়ে চলাফেরা করতেন, ছাগ দুগ্ধ ছিলো তাঁর প্রিয় খাবার। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে সৃষ্ট রায়টের সময় গান্ধীজী নোয়াখালী আসেন। তিনি প্রতিদিন নোয়াখালীর দাঙ্গা কবলিত প্রত্যন্ত এলাকা পরিদর্শন করতেন । একদিন ফেনী মহকুমার প্রত্যন্ত অঞ্চল পরিদর্শনের সময় কিছু দুষ্ট লোক গান্ধীজীর প্রিয় ছাগলটি চুরি করে নিয়ে যায়। যে স্থানে এই অপকর্মটি হয়েছিলো পরবর্তীকালে সেটির নাম হয় ‘ছাগল নিয়া বা ছাগলনাইয়া”। মহাত্মা গান্ধী খুব ব্যথিত হন। কিন্তু অহিংসায় বিশ্বাসী মহাত্মা তাঁর আকাশসম ঔদার্য দিয়ে ছাগল চোরদের ক্ষমা করে দেন। এই ঘটনার সত্যাসত্য কতটুকু জানিনা,তবে এটি সে অঞ্চলে বেশ প্রচলিত আছে। কিন্তু বর্তমানে গেরুয়াধারী ভারত গান্ধীজীর অনুসারী নয় বলে ছাগলের পরিবর্তে গো-মাতাকেই বেশী গুরুত্ব দেয় এমনকি মানুষের চেয়েও! আমরাও কম কিসে? সুন্দর বনে বাঘ রক্ষায় মানুষের তুলনায় বাঘকেই প্রাধান্য দিয়েছি আইন প্রনয়ন করে! নিজেকেই প্রশ্ন করি ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের মুল্য কি দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাঠক ভালো জানেন।
রানীগঞ্জ ঃ হৃদয়ভরা উষ্ণতার ছোঁয়া
ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই আমরা ভারত -নেপাল সীমান্তে পৌছে যাই। ভারত প্রান্তের জায়গাটির নাম রানীগঞ্জ। জায়গাটি পানির ট্যাংকি নামেই বেশী পরিচিত। জানিনা কোন রানী এ বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলো কিংবা কোন রানীর নামে প্রশাসন বা এলাকাবাসী এটির নামকরণ করে। বৃটিশ রানী তো ছিলোই,লাগোয়া কোচবিহার রাজ্যের মহারাজারও তো অনেক রানী ছিলো। এই ছোট্ট বাজার বা গঞ্জের মতো জায়গাটি দার্জিলিং জেলার অংশ। ‘নীড় ছোট ক্ষতি কি, আকাশ তো বড়’ গানের কলির সাথে এর যেন মিল খুঁজে পাই। রানীগঞ্জে ইমিগ্রেশন অফিস,শুল্ক অফিস ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প। আমরা প্রথমে যাই ইমিগ্রেশন অফিসে । ওখানকার কর্মকর্তারা স্বাগত জানায় আন্তরিকতার সাথে। ৩/৪ টি স্বল্প পরিসর কক্ষে অভিবাসন অফিস । আমরা কেউ কেউ বসে,কেউ ছবি তুলে,অনেকে এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে প্রাঙ্গনটি দেখে সময় কাটাই। কর্তৃপক্ষ চা-বিসকিট দিয়ে আপ্যায়ন করে। কর্তব্যরত ভগবান বীর ও চৌহান রাজে নামে দু’জন সেন্ট্রাল রির্জাভ পুলিশের কর্মকর্তার সাথে আলাপ জমাই। দু’জনের বাড়ীই রাজস্থান প্রদেশে। প্রাপ্য বেতন ভাতা ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট, কেবল ছুটি ছাটা নিয়ে সমস্যা, বয়স্ক পিতামাতা ও পরিবারের সদস্যদের নিকট থেকে বহু দূরে কর্মস্থল। আপ্যায়নকারী কিরন সাহা কয়েকবার ঢাকা গিয়েছেন বলে জানান। এই রুট চালু হলে অনেক লোক বাংলাদেশে যেতে পারবে,এতেই সে খুশী। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আমরা হেটেই অল্প দূরে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে যাই। ওয়াও এলাহী কান্ড! ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে সুরের মূর্চনায় নেচে গেয়ে আনন্দঘন অভ্যর্থনার আয়োজন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তিন দেশের পতাকা হাতে নিয়ে আমাদের সাদরে গ্রহন করে। কপালে লাল রঙের মঙ্গল টিপ দিয়ে বরণ করে নেয়, আর গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা তো ছিলোই। উন্মুক্ত স্থানে প্যান্ডেল স্থাপন করে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম¯্র সীমা বল (ঝঝই) নামে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। সীমা বলের এক কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও চীন সীমান্তে গার্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর নাম বিএসএফ(ইঝঋ),আর নেপাল ও ভুটান সীমান্তে গার্ড দেয় সশ¯্র সীমা বল। তুলনামুলকভাবে এ দুটি দেশের সীমান্ত শান্ত,চোরাচালান,অবৈধ অবিভাসন কিংবা ইনসার্জেন্সির কোন সমস্যা নেই। ফলে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতা সম্পন্ন ও পরিশিলিত একটি বাহিনী এ দু’টি দেশের সীমান্তে নিয়োগ করা হয়েছে। বাস্তবে এর প্রমানও পাই ওদের ব্যবহার আচার আচরণে। আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেয়ার পর এসএসবি’র ডিআইজি এস ব্যানার্জি বক্তব্য রাখেন, তিনি বাস র‌্যালীর উদ্দেশ্য সফল হোক ,যাত্রা আনন্দময় হোক,নিরাপদ হোক এই কামনা করেন। আমাদের দল নেতা ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়াও বক্তব্য রাখেন। তিনি আতিথিয়তার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানান এসএসবিকে। এসএসবি ঠান্ডা পানি, সরবত , বিশেষ ধরনের মুড়ি, চালভাজা, মিষ্টি,চা, কফি ইত্যাদি হরেক রকম মুখরোচক খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করে। বিদায়ের সময় একটি সুন্দর ব্যাগ উপহার দেন যার মধ্যে নানা পদের শুকনা খাবার দাবারসহ দার্জিলিং টি’র প্যাকেট ও এসএসবি’র মনোগ্রাম সম্বলিত মগ ছিলো। র‌্যালীতে অংশগ্রহনকারীদের চিকিৎসার জন্য এসএসবি’র একটি মেডিক্যাল টিমও প্রস্তুত রেখেছিলো। বেশ কয়েকজন মহিলা চিকিৎসক বার বার জিজ্ঞেস করেন আমাদের কোন সমস্যা আছে কিনা, ঔষধপত্র লাগবে কিনা। দীর্ঘদেহী মহিলা চিকিৎসকের আন্তরিকতার কথা স্মরণ থাকবে। তিনি ছিলেন চিকিৎসক দলের টিম লিডার। ডিআইজি ও তাঁর দল রাস্তায় এসে বাসে উঠিয়ে দিয়ে যান। ওদের উষ্ণ অভ্যর্থনা স্মরণ রাখার মতো। বলা বাহুল্য আমাদের সহযাত্রী ভারতীয় প্রতিনিধি দলের টিম লিডার শ্রীযুক্ত রাজিব রানা ছিলেন এই এসএসবি’র ৪১ ব্যাটেলিয়ানের কমান্ডডেন্ট।
মেসি সেতু: বন্ধুত্বের রাখি বন্ধন
বাস বহর কিছুটা সামনে এগুতেই একটি দীর্ঘ সেতুর উপর উঠলাম। বিশাল নদী কিন্তু অনেকটাই পানি শুন্য। নেপালী টিম লিডার গোবিন্দ প্রাসাদ খারেলকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি নদীটির নাম মেচি । এ নদীর অর্ধেক ভারতের আর বাকী অর্ধেকটা নেপালের, মাঝখানে সীমানা পিলার বসানো আছে। বোধ করি সীমানা নির্ধারক চতুর র‌্যাডক্লিফ সাহেব এখানটায় দৃষ্টি দেয়ার সুযোগ পাননি! ভারত-নেপাল নিজেরাই মীমাংসা করে নিয়েছে। ফলে কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। নদীর উপর স্থাপিত সেতুটি দু’দেশকে যুক্ত করেছে বন্ধুত্বের মেল বন্ধনে। দেখলাম দীর্ঘ সেতু পার হয়ে হেটে কিংবা বাইসাইকেলে চড়ে অসংখ্য লোক এপার ওপার যাচ্ছে অবাধে। নেই কোন বাঁধা বিপত্তি কিংবা সেপাই শাস্ত্রীর চোখ রাঙানি। নেই কোন পাসপোর্ট ভিসার বালাই। আহা এমন যদি সকল দেশেই হতো তবে কেমন হতো , তুমি বলো তো? না না তুমি বলো, আসলে উত্তম সুচিত্রা কেউ বলতে পারেনি,আমরাও বলতে পারবোনা। তবে বেশ কয়েক বছর আগে একটি সংগঠন ঢাকা শহরে দেয়ালে দেয়ালে লিখতো ‘ভিসা মুক্ত বিশ্ব চাই’ ‘সকল দেশে অবাধে যেতে চাই’। কিন্তু ইদানিং আর এরুপ দেয়াল লিখন চোখে পড়েনা। কারন বোধ হয় একটিই যে পৃথিবী নামক গ্রহটি অনেক বদলে গেছে,অনেক জটিল হয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে মানবতা, মানবাধিকার রক্ষায় ডজন ডজন আইন কানুন থাকা স্বত্বেও। আন্ত:সীমানার নিরাপত্তা এখন কেবল সিপাই শাস্ত্রী মোতায়েন করেই সরকারগুলো সন্তুষ্ট নন, এজন্যে দরকার কাটা তারের বেড়া, ইলেকট্রিক বেড়া, সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার,দূরবীনসহ আরো কত কি। তবে এ দায় শুধু কোন একক রাষ্ট্রের নয়, সকলেরই এ দায় বহন করতে হবে খানিকটা হলেও। অবাধ যাতায়াতের সাথে সাথে সীমান্তের নিরাপত্তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। খারেল জানায় ভারত-নেপালের জনগনের জন্য ভিসার বালাই না থাকায় তারা প্রতিদিন এপার ওপার যায় নিজ নিজ প্রয়োজনে। নেপালীরা প্রয়োজনীয় বাজার সদাই ইন্ডিয়া থেকেই করে সেতু পার হয়ে।
যাক ওসব কথা যা বলতে চেয়েছিলাম,রোশান জনালো নেপালে অসংখ্য নদী রয়েছে যার অধিকাংশই হিমালয় পর্বত থেকে নেমে এসেছে। অনেকগুলো বেশ খর¯্রােতা। বর্ষায় ভয়ংকর রুপ ধারন করে। আবার শুস্ক মৌসুমে রিভার বেডে চাষাবাদ করা যায়। বল্লাম আমাদের নদীগুলির অবস্থা আরো করুণ। শুস্ক মৌসুমে গরুর গাড়ী রিক্সা সাইকেল মায় ভটবটি টমটমও চলে।
মেসিনগর শহর: ভালোবাসার সরোবর
মেসি সেতু পার হতেই বিশাল বড় মিছিল দেখা যায় । ব্যান্ড পার্টি ও সানাইয়ের সুরে গোটা পরিবেশ যেন এক মোহনীয় রুপ ধারন করে। আবাল বৃদ্ধ বনিতা রং বে-রংঙের পোষাকে সজ্জ্বিত হয়ে নানা শুভেচ্ছা বাণীর মাধ্যমে আমাদেরকে বরণ করে নেয়। হাজারো জনতা শোভাযাত্রাসহকারে কাঁকরভিটা ইমিগ্রেশন অফিসের সামনের খোলা চত্তরে নিয়ে যায়। সেখানে ফুলেল শুভেচ্ছা ও উত্তরীয় পড়িেেয় দেয়া হয় সকল অতিথিকে। সেখান থেকে ইমিগ্রেশন অফিসের হল রুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যায়। সরকারী বে-সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, চেম্বার সভাপতি, মেসি মিউনিসিপ্যালিটির মেয়র ও ডেপুটি মেয়র,নেপাল-বাংলাদেশ যৌথ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি, র‌্যালীতে অংশগ্রহনকারী নেপালের প্রতিনিধি মি.টেক বাহাদুর আরিয়াল, কাঠমন্ডুস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ১ম সচিব মাহবুবুল আলমসহ অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে ফুলের মালা ও উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানানো হয়। হলটি ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ। জনা দশেক গুরুত্বপূর্ন ব্যাক্তির বক্তৃতার পর ভারত ও বাংলাদেশের দলনেতা বক্তব্য রাখেন। ততক্ষণে ঘড়ির কাটা বেশ উপরে উঠে গেছে। তারপর শুরু হয় আপ্যায়নের পালা। কত আর খাওয়া যায়? ঘন্টা খানেক আগেইতো রানীগঞ্জে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের রাজসিক আপ্যায়ন হয়ে গেলো,তাছাড়া ওদের দেয়া খাবারের প্যাকেট তো গাড়ীতে আছেই। তবু নতুন দেশের আপ্যায়ন কিছু মুখে দিতেই হবে, নতুবা গৃহস্থের অমঙ্গল হবে। অনেক আইটেমের মধ্যে একটি ছিলো সুপরিচিত সিঙ্গারা! আমাদের ডেপুটি টিম লিডার আজহারুল ইসলাম খান জানতে চাইলেন এত কিছু থাকতে সিঙ্গারা খাচ্ছি কেন, জবাবে বলি‘স্যার বাংলাদেশ ও ভারতের নানা জায়গায় আপ্যায়ন পেয়েছি ঢের কিন্তু কোথাও সিঙ্গারা দেয়নাই। তাই সিঙ্গারার স্বাদ নিচ্ছি’ হাসির বন্যা বয়ে যায় আমার উত্তরে। বিদায়ের সময় মেসিনগরের ডেপুটি মেয়র মিসেস মিনা কুমারী পোখরেল আমার ভিজিটিং কার্ড রাখেন এবং তার সেল ফোন নম্বর দেন। তার খুব ইচ্ছা বাংলাদেশ সফর করার । আমি তাকে সাদর আমন্ত্রন জানাই। টেক বাহাদুর আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন। তিনি আর আমাদের সাথে যাবেননা। তিনি কাঁকরভিটাস্থ মেচি কাস্টম অফিসের প্রধান আধিকারিক।
মেসির সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে নেপালীদের বক্তব্যে বাংলাদেশের সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের আগ্রহ ছিলো প্রবল। তারা স্থলপথে বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বানিজ্য করতে চায়, ল্যান্ড লকড কান্ট্রি হওয়ায় বাংলাদেশের মংলা পোর্ট ব্যবহার করতে চায়,কিন্তু বাঁধা হলো নেপালের কাঁকরভিটা থেকে বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা পর্যন্ত ভারতের ৩৯ কিলোমিটার সড়ক পথ। দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনা সুরাহা হয়নি। বাংলাদেশ ও নেপাল উভয় রাষ্ট্রই চেষ্ঠার কোন ত্রুটি করেনি। কিন্তু ভারতের মন গলেনি। অবশেষে ২০১৫ সালে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে বিবিআইএন মোটর ভিহাইক্যাল এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রিসহ চার দেশের মাননীয় মন্ত্রিগন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির ফলে উক্ত চার দেশের মধ্যে পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচলের পথ উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। । কিন্তু বাঁধা আসলো অন্য জায়গা থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে। ভুটানের পার্লামেন্ট চুক্তিটিকে অনুমোদন (রেটিফাই )করেনি। ভুটান নিজ দেশের জীব বৈচিত্র ও পরিবেশ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। তিন দেশের যানবাহন ঢুকলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে -এই যুক্তিতে পার্লামেন্ট দীর্ঘদিন যাবৎ চুক্তিটিকে ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলে চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে ছিলো দীর্ঘদিন যাবৎ। অবশেষে ভারতের প্রবল আগ্রহে আপাতত: ভুটানকে ছাড়াই অবশিষ্ট তিন দেশের সমন্বয়ে চুক্তিটি কার্যকরার লক্ষ্যে এই বাস ট্রায়াল রানের আয়োজন। এখানে উল্লেখ্য যে তিন দেশের মধ্যে কার্গো ট্রায়াল রান ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভুটানকে বাদ দেয়া হয়নি। ভবিষ্যতে ইচ্ছা করলেই এ কার্যক্রমে যোগ দিতে পারবে। কোন কোন ট্রান্সপোর্ট বিশেষজ্ঞ অবশ্য উদ্যেগের সমালোচনা করছেন। তাদের মতে এতে ভারতই বেশী লাভবান হবে। কেননা তারা কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে তার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের জন্য ট্রাঞ্জিট পাচ্ছিলনা। এখন বিবিআইএন এর মোড়কে অনায়াসে তা পেয়ে গেলো। ৩৯ কিলোমিটারের বিনিময়ে তারা হাজার কিলোমিটারের সুযোগ পেয়ে গেলো,সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশ হারালো তার বাজার। অবশ্য যেকোন বড় উদ্যোগের সমালোচনা থাকবেই। আর ইস্যূটা যদি ভারত-বাংলাদেশের হয় তাহলেতো কথাই নেই। যাক ভবিষ্যতই বলবে কে কতটা লাভবান হবে। তবে শুধু অর্থনৈতিক লাভটাকেই বড় করে দেখলে হবেনা,মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে তা এতদাঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এক মাইল ফলক তৈরী করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
বাস র‌্যালী কাঁকরভিটা থেকে কয়েক কিলোমিটার যেতেই থামতে হলো ধৌলাবাড়ী পৌরসভায়। ধৌলাবাড়ী চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হলো । ফুলের মালার সাথে মিস্টান্নের প্যাকেট তো আছেই। আমরা গাড়ী থেকে নামিনি,কিশোর/কিশোরীরা বোধ করি স্কাউট টীমের সদস্য ওরা আমাদের হাতে নাশতার প্যাকেট দিয়ে যায়। ওদের আন্তরিকতা ও সারল্য দেখে মুগ্ধ হই। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে শত শত শিশু কিশোর হাত নেড়ে বিদায় জানায়। যাত্রা শুরু হলো চিতোয়ানের সৌরাহার দিকে,সৌরাহার প্যারাািইজ হোটেলে রাত্রি যাপন। পথিমধ্যে ইটাহারীতে আছে লাঞ্চের বিরতি। নেপালী বন্ধু খারেল জানালো আরো ৬/৭ ঘন্টা লাগবে চিতোয়ান প্যারাডাইস হোটেলে পৌছতে। তবে গোটা পথটাই ছিলো সমতল ভুমি,নেপালীদের ভাষায় তেরাই অঞ্চল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল তিনটার সময় পৌছা গেল ইটাহারী নামক স্থানে। ছোটখাট টাউনশীপ । পাথিভারা হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্টের সামনে বাস বহর দাঁড়াল । হুরমুর করে তিনতলা রেষ্টুরেন্টে উঠলাম। একদিকে ক্ষুধা অন্য দিকে ওয়াশরুমে যাওয়ার চাপ। মাত্র দুটি প্রক্ষালন কক্ষে এত লোকের ব্যবস্থাপনা সত্যিই কঠিন ছিলো। তবে লাঞ্চের মান ভালো ছিলো। নানা পদের শাক সবজি ছিলো বেশ উপাদেয়।

লাঞ্চের পর বাস আবার যাত্রা শুরু করে। এবার গন্তব্য চিতোয়ানের সৌরাহা শহরের প্যারাডাইস রিসোর্ট। রাস্তা যতনা সরু তার চেয়ে বেশী সরু ব্রীজ। কিছুক্ষণ পরপরই সরু ব্রীজের দেখা মিলে,দুটি গাড়ী ক্রস করা খুব কঠিন ,এজন্যে অনেক জায়গায় বেশ সময় থেমে থাকতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পৌছার আশা অনেক আগেই উবে যায়। দুপাশে সুবিস্তৃত ফসলের খোলা মাঠ,গরু মহিষের দলে দলে হেলে দোলে চলাচল,মাটির কিংবা ইটের তৈরী দেয়ালঘেরা টিনের ঘর,বাড়ীর সামনে খড়ের পালা,পড়ন্ত বিকেলে রাখাল ছেলেদের গবাদি পশুর পাল নিয়ে বাড়ী ফেরা, রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে অলস মানুষের বসে থাকা ইত্যাদি দেখে মনেই হয়নি ভিন দেশে আছি। মনে হয়েছে দেশেরই কোন লোকালয় পার হচ্ছি। এলাকাটি নাকি ভারতের বিহার সীমান্ত ঘেষা তেরাই অঞ্চল জানালেন এক নেপালী সহযাত্রী। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর এক বিশাল নদী অতিক্রম করি। সেতু পার হওয়ার সময় খারেল জানায় নদীর নাম কুশি, নেপালের সবচেয়ে বড় নদী এবং সেতুটিও সর্ব বৃহৎ। নদীটি খর¯্রােতা ও বেশ প্রশস্থ। কুশির দৈর্ঘ্য ৭২০ কিলোমিটার । এ নদীর উৎপত্তি হিমালয়ের তিব্বত অঞ্চলে। নেপাল অতিক্রম করে ভারতের বিহার রাজ্যে প্রবেশ করেছে। অত:পর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাটিহার জেলার কুর্সেলার নিকট গঙ্গা নদীর সাথে মিশে জীবন ধন্য করেছে। এ নদী নেপাল ও বিহারের জন্য একদিকে আর্শীবাদ অন্যদিকে বিপদজনকও বটে। এর পানি দিয়ে দু’দেশের বৃহৎ অঞ্চল সুজলা সুফলা হয়েছে।কিন্তু মাঝে মধ্যেই তার মন মেজাজ ঠিক থাকেনা। বিশেষতঃ বর্ষাকালে হঠাৎ হঠাৎ সে ভীষন বিগরে যায়। তখন ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি হয়। ফসলের মাঠ, ফলের বাগান,বাড়ী –ঘর, শহর- বন্দর, জীব জন্তু, নারী পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ মানুষকে অবলীলায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোন দয়া মায়া নেই,কারো কথায় কর্নপাত করেনা,এমনকি দেবতার কথাও নাকি সে অমান্য করার দু:সাহস দেখায়! তবে এ নদীর উপর বাঁধ তৈরী করে জল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। কুশি ব্যারাজ বা ভীমনগর ব্যারেজ নির্মান শুরু হয় ১৯৫৯ সালে শেষ হয় ১৯৬৩ সালে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন,বন্যা নিয়ন্ত্রন ও সেচ কার্যক্রম পরিচালনা এই ত্রি-বিধ উদ্দেশ্যে বাঁধটি নির্মন করা হয়। সমুদয় খরচ ভারত সরকার বহন করে। এটি ছিলো প্রধানমন্ত্রি পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। নেপালকে রাখি বন্ধনে আবদ্ধ করার চমৎকার কৌশল। আমরা ধীরে ধীরে বাঁধটি অতিক্রম করি। বাঁধের কারনে অপার ষ্টীমে বিশাল জলাধার সৃষ্টি হয়েছে যা দেখতে লেকের মতো। স্বচ্ছ পানিতে ঝাঁকে ঝাঁকে বক ও নানা রকম পাখির বিচরণ খুবই চিত্তাকর্ষক। শুরু থেকেই ভারতের সহায়তা নিয়েই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছে। খারেল জানায় নেপালে বিদ্যুতের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। কিছু উৎপাদন হয় বাকীটা ভারত থেকে আমদানী করে প্রয়োজন মেটাতে হয়। তবু ঘাটতি থেকেই যায়। আমরা বলি চার দেশ মিলে যৌথভাবে আপনাদের দেশে জলাধার তেরী করে হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি উৎপাদনের ব্যবস্থা করলে আপনাদের প্রয়োজনও মিটবে তদুপরি অন্যরাও লাভবান হবে। খারেল মিটিমিটি হাসে। হাসিতে যেন রহস্য লুকিয়ে আছে!ভর সন্ধ্যায় নদীর সৌন্দর্যে সকলে বিমোহিত। আপসোস সূয্যি মামা ডুবার আগেই কেন এমন সুন্দর জায়গায় আসতে পারলামনা।
গাড়ী বহর চলছে তো চলছেই ,পথের যেন শেষ নেই! কি আশ্চর্য সকাল বেলার মনোভাব ছিলো এ পথ যদি শেষ না হতো, আর এখন অনুভুতি হলো এ পথ যদি দীর্ঘ না হতো!আসলে লম্বা সময় বাসে বসে থেকে সকলের দেহ ও মনে এক ধরনের ক্লান্তির ছাপ দেখা দেয়। গান বাজনা হাসি তামাশা কোথায় যেন হারিয়ে গেলো ধীরে ধীরে। নিদ্রা দেবী যেন চেপে বসেছে ঘারে! মাঝে মধ্যেই নাক ডাকার শব্দ শুনা যায়! নেপালী বন্ধু রাজু প্রাসাদ অভয় দেয়। অনেকটা শিশুদের ঘুম পাড়ানোর মতো!
রাত নয়টার সময় পথিমধ্যে একটি রেস্তোরা কাম কমিউনিটি সেন্টারে গাড়ী থামানো হলো ,উদ্দেশ্য হাত পা সোজা করা, চা কফি পান করা সর্বোপরি প্রাকৃতিক কর্মাদি সম্পন্ন করা। কিন্তু শৌচাগারের যা অবস্থা! কি আর করা কোন বিকল্পতো নেই। আমরা পৌছে দেখি একটি বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পথে। একটি পুরানো ধাচের কারে নব বধুঁকে তুলা হয়েছে বরের বাড়ী যাওয়ার জন্য । বধুর সাথে বেশ কয়েকজন মহিলা কি যেন বুঝাচ্ছে। কারের পাশেই পাগড়ী পরিধান করে বর দাঁড়িয়ে আছে বেশ তৃপ্তিদায়ক চেহারা নিয়ে। কনের চোখ ছল ছল করছে।অন্যরা তাকে প্রবোধ দিচ্ছে, অভয় দিচ্ছে,নানা রকম পরামর্শ দিচ্ছে। এ যেন বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা ছোট্ট শহরের বিয়ের অনুষ্ঠানের চিত্র। বর-বধু দু’জনই অল্প বয়স্ক মনে হলো ,উভয়েরই গায়ের রং বেশ কালো। জানিনা এখানে বাল্য বিবাহের উপর কোন বাধা নিষেধ আছে কিনা। সহযাত্রী সুলতানা ইয়াসমীন, ফারহানা রহমান, নীলিমা আক্তার,মতিউল চৌধুরী ও নেপালী ফরেন সার্ভিসের রোশান খানাল খুব আগ্রহভরে বর কনের কাছে গিয়ে ওদের অনুভুতি পর্যবেক্ষণ করেন। আমরাও কয়েকজন উৎসাহ ভরে নেপালী বিয়ের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ নষ্ঠ করিনি। যাক হালকা জলখাবার মুখে দিয়ে আবার গাড়ীতে চড়ে বসলাম,যেতে হবে দূর বহু দূরে চিতোয়ান শহরে।
দীর্ঘ পথ চলার পর অবশেষে পৌছলাম সৌরাহাস্থ চিতোয়ান ন্যাশনাল পার্কের প্যারাডাইজ হোটেলে ,রাত তখন আড়াইটা! রিসিপশন থেকে দ্রুত চাবি নিয়ে রুমে চলে যাই। জানানো হলো ভোজন কক্ষে ডিনার রেডি।ক্লান্তির কাছে ক্ষুধা যেন হার মেনেছিলো সেদিন। যেন ঘুমের রাজ্যে পৃথিবী শান্তিময়। ফলে অনেকেই না খেয়ে সটান শুয়ে পড়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়। খুব সকালেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। হোটেলটি ঘুরে ফিরে দেখি। হোটেল তো নয় গাছ গাছালি ও নানা প্রজাতির ফুল ও লতাগুল্মের এক সুবিন্যস্ত সবুজ উদ্যান। পৃথক পৃথক কটেজ। সরু পথের দুপাশে সুউচ্চ পাইন গাছ। রিসিপশন কক্ষের সামনে ভোগেন বেলিয়াসহ নানা রকম ফুলের গাছ। পাখির কিচিরমিচির শব্দ। কোকিলের কুহু কুহু রব। এ এক অন্যরকম জগত। এমন পরিবেশে থাকলে যে কেউ কবি ও গায়ক হয়ে যেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস!
নাশতা সেরে যাত্রা শুরু হলো কাঠমন্ডুর পথে । খারেল জানায় কাঁকরভিটা থেকে চিতোয়ান পর্যন্ত পথ ছিলো তেরাই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। তেরাই মানে সমতল ভুমি। পাহাড়ী দেশ নেপালের একটি অংশ সমতল এলাকায় অবস্থিত। বিশেষ করে ভারত সংলগ্ন এলাকাটি তেরাই অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। খারেলের মতে এখন থেকে শুরু হবে পর্বতসংকুল উচুনীচু বন্ধুর পথ। খুব সাবধানে থাকতে হবে, প্রত্যেককে সীট বেল্ট বেঁেধ নিতে হবে। তাছাড়া নির্মান ও সংস্কারের কাজ চলমান থাকায় আমাদেরকে খুব সকালে যাত্রা শুরু করতে হয়। বাস বহর চলছে পাহাড়ী পথ ধরে। পাহাড় যে এত উচুঁ হতে পারে নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো যাবেনা। অনেক উচুতে উঠার পর আবার নীচে নামতে হয়,কোথাও আবার সর্পিলাকার,অনেক দূর গিয়ে আবার আগের জায়গাতেই ফিরে আসতে হয়! রাস্তার পাশে পিলে চমকে উঠার মতো গভীর গিরি খাদ! খারেল অভয় দিয়ে বলেন বিপদ সংকুল পথ হলেও এ পথে দুর্ঘটনার হার খুব কম। কারন এ পথের চালকরা খুবই অভিজ্ঞ,চলাচলে সর্বদা সতর্ক থাকে। জানালার পাশে বসা অনেকেই চোখ বন্ধ করে রাখে। যেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হবে! হঠাৎ কল কল শব্দে চমকে উঠি! একি গহীন অরণ্যে নদীর জলের কলধ্বনি! জানালার পর্দা সরাতেই দেখি কি সুন্দর পাহাড়ী নদী কল কল রবে বয়ে চলছে! রোশান খানাল জানায় নদীর নাম ত্রিশুলী। জন্ম স্থান চীন নিয়ন্ত্রিত তিব্বত দেশে। সেখানে এই নদীর নাম কিরঙ সাংপো। হিন্দু পন্ডিতদের অনেকের মতে দেবতা শিব হিমালয়ের গোসাইকুন্ডা নামক স্থানে তাঁর ত্রিশূল মাটিতে গেঁেথ ফেলে পানির জন্য । ফলে সৃষ্টি হয় এক স্রোতস্বীনির যার নাম ত্রি-শুলী। একথা সত্য ভারতীয় উপমহাদেশে নদ নদীর সাথে দেব দেবীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অনেক স্থানে নদীকেই দেবতা জ্ঞান করা হয় এবং পূণ্য লাভের আশায় নদীর কোন স্থানে ¯স্নান ও পূজা করা হয়। নদীটি বেশ খরস্রোতা,যদিও অনেক জায়গায় পানির গভীরতা খুব বেশী না এবং প্রস্থেও নাতিদীর্ঘ। তবে বর্ষায় নাকি নদীটি ভয়ঙ্কর রুপ ধারন করে। প্রবল ¯্রােতে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নদীর পানি খুবই স্বচ্চ। অনেক জায়গায় তলদেশ দেখা যায়। এ নদী রিভার রাফটিং এর জন্য বিখ্যাত। দু’তীরেই উচু পাহাড়। অনেক জায়গায় ষ্টিলের পাত দিয়ে তৈরী দৃষ্টি নন্দন সরু উড়াল সেতু দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে দুপারকে। বেশ কয়েক জায়গায় থামতে হয়েছে,সড়ক নির্মান ও মেরামতের কারনে। এক জায়গায় নেমে নদীর ছবি নিই। পাহাড়ের নীচে রাস্তা ঘেঁেষ দোকানপাটও আছে। রাস্তার পাশে বসে এক বৃদ্ধ কাঁচা শসা বিক্রি করছিলো লংকাগুড়াসহ। করিৎকর্মা রাকেশ ওগুলো কিনে সকলের হাতে পৌছে দেয়। কিছুদূর যেতেই একটি চমৎকার রিসোর্ট দেখতে পাই। দেখলাম গাড়ী আকাঁবাঁকা সরু রাস্তা ধরে সেদিকেই যাচ্ছে। মাইক্রোফোনে জানানো হলো এই রিসোর্টে আমরা কিছুটা সময় কাটাবো এবং এখানেই লাঞ্চ সারবো। জায়গাটির নাম কুরিন্টার(কঁৎরহঃবৎ)। এ পথের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।
রিভারসাইড রিসোর্ট রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নীচে। অনেকগুলি সিড়ি পার হয়ে নীচে নামতে হয়। গনেশের মূর্তি দাঁিড়য়ে আছে পাহড়ের গা ঘেষে। কাঠ,পাথর,ইট,রঙিন টিনসহ নানা উপাদানে তৈরী করা হয়েছে রিসোর্টটি ত্রিশুলী নদীর তীরে। বেশ খানিকটা নীচে নদীর তীর ঘেঁেষ চেয়ার টেবিল পেতে রাখা আছে, উপরে রঙিন ছাতা,কোথাওবা কাঠের শেড, নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার চমৎকার ব্যবস্থা । পাশেই সুইমিং পুল। অনেক পর্যটক পরিবার পরিজন নিয়ে সুইমিং পুলে জলকেলী করছে । পশ্চিমা কপোত কপোতিরা একান্তে সময় কাটাচ্ছে প্রকৃতির কোলে বসে। নদীর দু’তীরের পাহাড়ের মনোলোভা সৌন্দর্য প্রান ভরে উপভোগ করছে নানা দেশের নানা বয়সী পর্যটক। প্রকৃতি যেন বলছে ‘এখানটা স্বপ্নপুরী,এখানে ভালোবাসতে নেই মানা’। আমরা রিসোর্টের বিভিন্ন অংশে ঘুরে ফিরে আনন্দ উপভোগ করি। অল্প দূরেই নাকি আছে মনস্কামনা মন্দির ও কেবল কার। আমাদের অগ্রজ সহকর্মী মনিন্দ্র কিশোর মজুমদার আবার মন্দিরভক্ত ধার্মিক মানুষ। তিনি দেশ-বিদেশের অনেক মন্দিরে গিয়ে অর্ঘ্য দিয়েছেন,এমনকি নিজ বাড়ীতেও কালি মন্দির স্থাপন করে ঘটা করে বিশাল উদ্বোধন অনুষ্ঠান করেছেন। তিনি মন্দিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষন করেন,কিন্তু সেখানে যেতে বেশ সময় লাগবে বলে টিম লিডার ও খারেলকে রাজি করানো যায়নি। স্যার এতে ভীষন মনক্ষুন্ন হন। অবশ্য পরে তার মনস্কামনা পুর্ণ হয় ভক্তপুর দরবারের মন্দির, চন্দ্রগীরির মহাদেব মন্দির ও কাঠমন্ডুর বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দির পরিদর্শন করে।
আমাদের পুরো সফরটিতেই অগ্রজ-অনুজের ব্যবধানটি যেন আপনাআপনি স্বেচ্ছায় উবে যায়। ফলে আনন্দ উপভোগ করা যায় নির্বিঘেœ ও হৃষ্ট চিত্তে। এর পিছনে অগ্রজদের বিশেষ করে দলপতি ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া ও আজহারুল ইসলাম খানের ভুমিকা ছিলো বেশ ইতিবাচক। তাঁদের উদারতায় পুরো ভ্রমণটি হয়েছিলো অসাধারন উপভোগ্য ও স্মরণে রাখার মতো। আর নেপালী দল নেতা বাক পটু খারেলের কথা না বললেই নয়। সারাটা পথ মাতিয়ে রেখেছেন তিনি। বিভিন্ন লোকেশনের বর্ননা দিয়ে আমাদের জানার পরিধিকে সমৃদ্ধ করেছেন। হাস্য রসাত্মক ভঙ্গিতে তাঁর উপস্থাপনা ছিলো বেশ উপভোগ্য। তিনি তাঁর নাম মনে রাখার সহজ উপায় বাতলে দেন। রেলওয়ের ‘রেল’ ও খাবারের ‘খা’এ দুটি শব্দ মনে রেখে জোড়া লাগিয়ে দিলেই খা-রেল হয়ে যাবে!
খারেল জানায় আমরা যে মহাসড়ক দিয়ে যাচ্ছি তা নেপালের লাইফ লাইন । এই মহাসড়কটি অন্যতম প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্র চীনের সাথে নেপালকে যুক্ত করেছে। এই পথেই নেপালের সাথে চীনের সার্বিক যোগাযোগ,পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করা হয়ে থাকে। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন ২০১৫ সালে ভারত যখন নেপালে অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে জ্বালানীসহ সর্বপ্রকার ভোগ্য পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে নেপালের জনজীবনকে অচল করে দিয়েছিলো তখন চীনই ছিলো একমাত্র ভরসা। চীন এগিয়ে না আসলে নেপালী জনগন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে অনাহারে মারা যেতো। চীন সে সময় প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দেয়। হাজার হাজার নেপালী শিশু কিশোর রাস্তায় নেমে ভারতের অমানবিক কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানায়। শিশুরা দিপালী উৎসব করতে পারেনি, সর্ববৃহৎ উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেনি। ভারত সম্পর্কে শিশুদের মনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়। এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টের সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভ দেখা দেয় যা ভারতীয় সামরিক বাহিনী অবহিত হয়। ভারতের এমন অবন্ধু সুলভ আচরনে ক্ষুব্দ নেপালীরা স্বাভাবিকভাবেই চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। মাওবাদী নেপালী সরকার চীনের সাথে নিবির বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। ভারত সম্পর্কে তিনি আরো অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলেন, আমাদের অনাগ্রহ দেখে তিনি থেমে যান। এটি তিন দেশের সৌহার্দের বাস র‌্যালী, এখানে এমন কিছু বলা উচিৎ হবেনা যা অন্য কাউকে আহত করে। তবে তার বক্তব্যের মাঝামাঝি সময়ে তিনি জেনে নেন এই বাসে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের কেউ আছেন কিনা, আসলে আমাদের বাসে ভারতীয় কেউ ছিলোনা।
দীর্ঘক্ষণ চলার পর আমরা কাঠমন্ডু শহরে পৌছাই। তবে জায়গাটি ছিলো শহরের একপ্রান্তে,মূল শহর নয়। আমরা জানতে পারি আমাদের ভ্রমণসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। আজ আমাদের থাকার কথা ছিলে কাঠমন্ডু শহরে । কিন্তু এত লোকের আবাসনের জন্য একসাথে উপযুক্ত হোটেল কক্ষ পাওয়া যায়নি বলে নেপাল কর্তৃপক্ষ চল্লিশ কিলোমিটার দূরে পর্যটন শহর ধুলিখেলে(উযঁষরশযবষ) থাকার ব্যবস্থা করেছে। আমরা সকলেই খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করি। রাজধানী অতিক্রম করে অন্য স্থানে থাকা কেমনতরো ব্যবস্থা! তবে সিদ্ধান্তটি যে আমাদের জন্য শাপেবর হযেছিলো পরে তা বুঝতে পারি । যদিও ক্লান্ত দেহে কিছুটা বাড়তি পথের ধকল সহ্য করতে হয়েছিলো। কিভাবে শাপে বর হয়েছিলোতা একটু বলি। ধুলিখেল নেপালের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রের একটি। পাহাড়ী শহর। চারদিকে উচু পাহাড়,এখান থেকে হিমালয়ের কোন কোন চ’ড়া দেখা যায় আকাশ রৌদ্রজ্জ্বল থাকলে। এমন সুন্দর শহরে রাত কাটানো সত্যিই আনন্দের বিষয়।
তো কাঠমন্ডু শহরে ঢুকেই বিরক্তিকর যানজটে আটকে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় নেয় শহর পার হতে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে শহরেই। সারা শহরেই ২০১৫ সালেরর ভয়াবহ ভুমিকম্পের ক্ষত চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। অনেক ভবনের মেরামত কাজ এখনো শেষ হয়নি কিংবা বেশ কিছুর কাজ এখনো শুরুই হয়নি। খুব ঘনবসতি। রাজু পাওডেল বলেন চারিদিকে পাহাড় থাকায় ঘরবাড়ী তৈরীর জন্য সমতল জায়গার বড় অভাব। ফলে ঘনবসতির কোন বিকল্প নেই। অধিকাংশ ভবনই সাদামাটা ধরনের। রাস্তার পাশে শাক সবজির দোকান নিয়ে বসেছে নেপালী মেয়েরা। অনেক পন্যেই ভারত থেকে আসে। একটি উঁচু জায়গায় পুলিশ ষ্টেশনের পাশে রাস্তার উপর গাড়ী থামানো হয়। সকলেই ওয়াশ রুমের খোঁজে বের হয়। রাস্তার পাশে দাঁিড়য়ে গরম গরম চা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। দোকানপাট ও চায়ের ষ্টল অবিকল আমাদের দেশের মতো। চায়ের কাপ ১০ রুপি। অতিরিক্ত দুধ দিয়ে তৈরী । দোকানে প্রান গ্রুপের চিপস,চানাচুর,জুস ইত্যাদি দেখতে পাই। দোকানী জানায় এগুলি বাংলাদেশ থেকে আমদানী করা হয়। ভালো লাগে বিদেশে স্বদেশী পণ্যের কদর দেখে।
ধুলিখেল শহরের কাছাকাছি যেতেই খারেল সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন‘ বাম পাশের উচু পাহাড়ে দেখুন ভগবান শিব এর মূর্তি’। সত্যিই সোনালী রঙের বিশাল মূর্তি দৃষ্টিগোছর হয়। বাস আরো কাছে গেলে আলোকজ্জ্বল মূর্তি দেখতে পাই। এই শিব মূর্তি ও তদসন্নিহিত এলাকা এ শহরের অন্যতম পর্যটন আকর্ষন। বাস যখন থামলো ধুলিখেল লজ রিসোর্টের অল্প দূরে তখন ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে সয়লাব হয়ে গেছে গোটা রাস্তা। বড় ছাতা দিয়ে অল্প দূরে মাইক্রোতে উঠানো হয়। তারপর পাহড়ের ঢালে নান্দনিক রিসোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ কয়েকটি কটেজের সমন্বয়ে রিসোর্ট। কোনটি একতলা, কোনটি দুতলা, কোনটি পাহাড়ের চুড়ায়, কোনটি ঢালে,কোনটি সমতলে,চারদিকে নানা রঙের বাহারী ফুলের গাছ ও ঘন বনবিথির মাঝে এক মায়াবী পুরী এই রিসোর্ট! ওয়াও এত সুন্দর প্রকৃতি! এখানকার বিশাল হল রুমে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চা কফি ফলের জুস ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়ন শুরু হয়ে যায় বসার সাথে সাথেই।
রাত সাড়ে আটটায় শুরু হয় আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। নেপালের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব মধুসুধন অধিকারী, যুগ্মসচিব কেশব রায় শর্মা,ধুলিখেল মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মেয়র অশোক কুমার বেঞ্জু,ডেপুটি মেয়র মিসেস বিমলা কুমার চৌলাগাইন, ভারতীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান রাজিব রানা ও আমাদের টিম লিডার জনাব ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ মঞ্চে বসেন। পরিচিতি পর্বের পর শুরু হয় উত্তরীয় ও ঐতিহ্যবাহী নেপালী টুপি পরিয়ে বরণ করার পালা। এই টুপি নাকি আমাদের ঢাকাই কাপড় দিয়ে তৈরী। ওরা বার বার একথা বলছিলো। মাথায় নেপালী টুপি ও গলায় উত্তরীয় পরিধানরত ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় মুহুর্তের মধ্যেই । চেহারা সুরতে নেপালী ভাব চলে আসে। দেশ-বিদেশের বন্ধুরা ঠাট্টা করে কমেন্টস করে ‘ বন্ধু আনোয়ার থাপা কেমন আছো ? কেউবা বলে আনোয়ার শ্রেষ্ঠা, কেউবা আনোয়ার কৈরালা,আনোয়ার শেরপা কিংবা আনোয়ার বাহাদুর! ইত্যাদি ’আমরাও বেশ মজা পাই। মঞ্চে উপবিষ্ট বক্তাদের বক্তব্যের পর শুরু হয় আমাদের সন্মানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । নেপালী ললনাদের পরিবেশিত নৃত্য ও গায়িকাদের সঙ্গীতের মূর্ছনায় পুরো হল রুম আনন্দে ভাসতে থাকে। দু’জন নামকরা গায়িকা ও একজন নৃত্য শিল্পীকে কাঠমন্ডু ও অন্য একটি শহর থেকে বিশেষ আমন্ত্রন জানিয়ে আনা হয়েছে। আর গোটা অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন নবনির্বাচিত নগরপিতা অশোক বেঞ্জু। তিনি নেপাল মিউনিসপ্যিাল এসোসিয়েশনেরও সভাপতি। জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যাক্তি,উচ্চ শিক্ষিত। গায়িকা সীতা কার্কী ও মোনা রোকখা কাঠমন্ডু শহরের নামকরা সঙ্গীত শিল্পী। সীতার ক্ষীন্নর কন্ঠে গাওয়া নেপালী সঙ্গীত সত্যিই উপভোগ্য ছিলো। দুজনেই নেপালী ফোক সং ও আধুনিক গান গেয়ে আসর বাজিমাত করে। পরে তারা হিন্দি এবং বাংলা গানও গায়। ওদের অনুরোধে আমাদের সুলতানা ইয়াসমীন, নীলিমা আক্তার এবং চন্দন কুমার দে স্যারও মঞ্চে যায় এবং বাংলা গান গেয়ে নেপালী ও ভারতীয় শ্রোতাদের বাহবা কুড়ায়। সুলতানা জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া গান ‘বাবু চেংরারে মোক জলপই পারিয়া দে’ গেয়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। শ্রোতাদের ‘ওয়ান মোর, ওয়ান মোর’ আবেদনে সাড়া দিয়ে সে আরো ৩টি গান পরিবেশন করে। তারপর নেপালী শিল্পী ‘আমি যে কে তোমার ….. অমর সঙ্গী’ জনপ্রিয় গানটি পরিবেশন করে বেশ দরদী গলায়,আমাদের শিল্পীরাও তার সাথে সুর মিলায়, এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরী হয়। গানের পর শুরু হয় নেপালী নৃত্য শিল্পীর মনকাড়া নৃত্য । তিনি দর্শকদের আহবান করেন তার সাথে নাচে অংশ গ্রহন করতে। খারেল এগিয়ে যায় সর্বাগ্রে ,তারপর একে একে রোশান,রাজু পাওডেল সুলতানা,মতিউল,এলাহি,নিলীমা,অপূর্ব, আজহার খান,মাসুক,চন্দন কুমার ও দলনেতা ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ নৃত্যে অংশ গ্রহন করেন। প্রায় ঘন্টা ব্যাপী চলে এই আনন্দ নৃত্য। এখানে বলে রাখা ভালো আমরা যখন ধুলিখেলের দিকে যাই তখন খারেল আমাদেরকে তার ভাষায় একটি সু সংবাদ দেয় । কি সে আনন্দ সংবাদ? তিনি হাসতে হাসতে যা বলেন তরজমা করলে দাঁড়ায় ধুলিখেলে খুব উন্নত মানের পানীয় পাওয়া যায় যা টনিকের মতো কাজ করে,এখানে আগত পর্যটকরা এ পানীয়ের জন্য একেবারে দেওয়ানা হয়ে যায়,তার বিশেষ অনুরোধ সকলেই যেন এর স্বাদ গ্রহন করি,তিনি পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেছেন। রিসিপশনের পর পরই নানা রকম এপিটাইজারের সাথে এই বিশেষ পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে। বলা বাহুল্য চৌদ্দ আনা অতিথিই খারেলের অনুরোধ রক্ষা করেন,কেউ কেউ একটু বেশী মাত্রায়ই করেন অনেকটা টেলিভিশনের ফুটিকা খাওয়ার মতো !এত আপ্যায়নের পর ডিনার আর সেভাবে জমেনি।
রাজকীয় অতিথিশালায় রাতটি বেশ ভালোই কাটে। ভোর বেলা ঘুম ভাঙ্গে হরেক রকম পাখির সুমধুর ডাকে। গোবিন্দ প্রাসাদ খারেলকে আবারও মনে মনে ধন্যবাদ দিই এমন একটি মায়াবী প্রকৃতির কোলে রাত কাটানোর সুযোগ করে দেয়ার জন্যে। পর্দার ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যের ক্ষীন আভা দেখে হুরমুর করে উঠে সামনের লনে দাঁড়াই। আহ কি সুন্দর প্রকৃতি! পাহাড় চুড়ায় সূর্যের লাল আভা আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হচ্ছে। আকাশ পরিস্কার,সন্ধ্যা রাতের ঝড় বৃষ্টির কোন চিহ্নই নেই। চারদিকে উচুঁ পাহাড়ের সারি,দূর পাহাড়ে শ্বেত শুভ্র বরফের দলা, তাহলে ওটাই কি হিমালয় পর্বত?মাউন্ট এভারেষ্ট,কাঞ্চনজংগা? জানিনা,তবে যে সৌন্দর্য উপভোগ করলাম তা কম কিসে? সেল ফোন দিয়ে প্রকৃতির রুপকে বন্দী করতে নানা কসরত করছি,এমন সময় দেখি নীচে এক তরুনীও প্রকৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেবল ক্লিক ক্লিক শব্দ। বুঝলাম তিনি আমাদেরই লোক,অনুরোধ করলে তার ক্যামেরায় প্রকৃতির ফ্রেমে আমাকেও বাঁধলেন। রুম থেকে বের হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই,কেবলই মায়াবী ও মোহনীয় পরিবেশ ,প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ননাতীত।
অনেকক্ষণ প্রকৃতিতে অবগাহনের পর ব্রেকফাষ্টের পালা। অনেক উচু পাহাড়ের উপর রেষ্টুরেন্ট।নান্দনিক শৈলীতে সাজানো। তিনতলার খোলা বারান্দায় বসে ব্রেকফাস্ট যেন এক স্বর্গীয় আবহ তৈরী করেছে। যতদূর চোখ যায় কেবল খোলা আকাশ আর সবুজ পাহাড়ের মিতালী। রেষ্টুরেন্টের খাবারের মান ও বৈচিত্রে আমরা মুগ্ধ। আলু পরটা, ছুলে বাটোরা,আলুর দম,বুটের ডাল এত সুস্বাদু হয় তা যেন প্রথম অনুভব করলাম। হিল্লি দিল্লী ঘুরে এগুলো খাওয়ার অনেক অভিজ্ঞতা আছে,কিন্তু এমন তৃপ্তি কোথাও পাইনি। দই,মিষ্টি ও ফলমুলের অন্য রকম স্বাদ পাই। গ্রিন টি’র ফ্লেবার এখনো যেন নাকে লেগে আছে। কেউই ব্রেকফাস্ট শেষ করতে চায়না,কেবলই বসে থাকতে চায় প্রকৃতির কোলে। নয়টার যাত্রা শুরু হয় বেলা ১১টায়। মন যেন সায় দেয়না অন্য কোথাও যেতে। কাঠমন্ডু না গিয়ে আরেকটি রাত এখানে কাটানো যায়না? না যায়না,তাড়া দিলেন দলপতি,আদেশ করলেন গাড়ীতে চড়তে। বিদায় ধুলিখেল সালাম তোমাকে।
আচ্ছা বিদায় বেলা ধুলিখেল সম্পর্কে কিছু তথ্য পাঠককে না দিলে কেমন দেখায়? ধুলিখেল নেপালের কাবরীপালানচক জিলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর। রাজধানী কাঠমন্ডু থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে এর অবস্থান,সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১৫৫০ মিটার। লোকসংখ্যা মাত্র ১৭ হাজারের মতো। শহর ছোট্ট হলে কি হবে,নেপালের অর্থনীতি,বানিজ্য ও রণকৌশলগত দিক থেকে এর গুরুত্ব সুদূর অতীত থেকেই অনেক বেশী । এটি কয়েক শতাব্দী ধরে একটি বানিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। নেপালের সাথে তিব্বতের যোগাযোগ এ শহরের মাধ্যমেই হয়। প্রাচীনকালে নেপালীরা তিব্বত থেকে লবন ও স্বর্ণালংকার আনার জন্য এপথটি ব্যবহার করতো। নেপালেরর সবচেয়ে বড় উৎসব হলো দশাইন । দশাইন আসলে অনেকটা দুর্গাপুজার দশমীর অনুষ্ঠানের মতো।কার্তিক মাসের দিকে প্রায় ১৫ দিন ব্যাপী এ অনুষ্ঠান চলে অত্যন্ত জাঁক জমকের সাথে। তখন তিব্বতীরা তাদের মেষের পাল নিয়ে নেপালে ঢুকে। মেষ বিক্রি করে মরিচসহ অন্যান্য গৃহস্থালী দ্রব্যাদি সদাইপাতি করে নিজ দেশে ফিরে যায়। ১৯৬৫ সারে তিব্বতের সাথে সড়ক বাস যোগাযোগ স্থাপতি হলে ধুলিখেলের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কাঠমন্ডু- তিব্বতগামী পর্যটকরা যাতায়তের সময় সাধারনত মধ্যবর্তী ষ্টেশন হিসেবে ধুলিখেলে রাত্রী যাপন করে ভ্রমণকে পরিপূর্ণ করে নেয়। ধুলিখেলের গুরুত্ব আরো বাড়িয়েছে নেপালের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বি.পি. হাইওয়ে ও আর্নিকো হাইওয়ে। দু’টি মহাসড়কই ধুলিখেলের উপর দিয়ে গিয়েছে। আর্নিকো মহাসড়কটি রাজধানী কাঠমন্ডুকে তিব্বতের সীমান্ত শহর কোদারীর সাথে যুক্ত করেছে। ধুলিখেল শহরের পুরোনো অংশে এখনো ‘নেওয়ার’ নামক আদিবাসীরা বাস করে। নেওয়ারী ভাষা ও সংস্কৃতি নাকি বেশ সমৃদ্ধ। তাছাড়া ব্রাহ্মণ, ছেত্রী,তামাং ও দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস কওে এ অঞ্চলে। ধুলিখেলকে বলা হয় মন্দিরের শহর,কালি মন্দির,শিব মন্দির,গনেষ মন্দির,চন্দেশ্বরী মন্দির,হরি সিদ্দি মন্দির,বিষ্ণু মন্দির,ভগবতী শিব মন্দির ও গীতা মন্দিরসহ হিন্দু ধর্মের সকল গুরুত্বপুর্ণ দেব-দেবীর মূর্তি ও মন্দির রয়েছে।
ভক্তপুর রাজ্য ঃ ঐতিহ্যের শহর
ধুলিখেল শহরকে বিদায় জানিয়ে আমরা যাত্রা করি প্রাচীন রাজ্য ভক্তপুর দেখতে। এবার শুধু বাংলাদেশী দলই যাচ্ছি। সত্যিকার অর্থে গতরাতের অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আমাদের ত্রি-দেশীয় সরকারী কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। আজ ও কাল এ দ’ুদিন আমাদের নিজস্ব কর্মসূচি। গতরাতে খারেল প্রস্তাব করেছিলো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ভরতপুর নিয়ে যেতে,কিন্তু আমাদের ব্যবস্থাপক রাকেশ রাজি না হওয়ায় তিনি কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়ে বিদায় নেন বলে মনে হয়েছে। তবে খারেলের মতো একজন রশিক সহকর্মীকে আমরা খুব মিস করছি। ধুলিখেল থেকে ভক্তপুরের দুরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার আর রাজধানী কাঠমন্ডু থেকে ১৩ কিলোমিটার। তবে রাস্তা সংস্কারের কাজ চলামান থাকায় ও পাশাপাশি যানজট থাকায় অনেক সময় লেগেছে ভক্তপুর পৌছতে।
ভক্তপুর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অফিসের সামনে বাস রেখে আমরা ভক্তপুর দরবার স্কোয়ারের প্রধান ফটকে পৌছাই। আমরা কেন ভক্তপুর আসলাম,কি দেখতে আসলাম তেমন কিছুই আগে থেকে জানানো হয়নি। রাকেশ জানিয়েছিলো গেলেই দেখতে পাবেন। প্রধান ফটকের কাছে টিকিট কাইন্টার ও তথ্যকেন্দ্র। রাকেশ সকলের জন্য টিকিট কাটায় ব্যস্ত। আমি তথ্য কেন্দ্র থেকে একটি বুক-লেট বা দরবারের পরিচিতিমূলক একটি ছোট বুক-লেট সংগ্রহ করি। প্রাচীনকালে হিমালয়ান এলাকায় অনেকগুলি রাজ্য ছিলো যার মধ্যে এই ভক্তপুর একটি। নৃপতিরা ছিলো বৌদ্ধ অথবা হিন্দু ধর্মের অনুসারী । ধর্মকর্মে তাদের বেশ মতি ছিলো। রাজপ্রাসাদে সকল শক্তিমান দেবদেবীর মূর্তি ও মন্দির স্থাপনে তারা ছিলেন খুবই একনিষ্ঠ এবং সিদ্ধহস্ত। ভক্তপুর রাজপ্রাসাদেও এর কোন ব্যাতিক্রম নেই।
দরবার স্কোয়ার রাজ প্রাসাদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। আসলে রাজকীয় দালানকোঠার সন্মুখে একটি খোলা চত্তর । সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উচ্চতায় এর অবস্থান। রাজকীয় কমপ্লেক্সে মোট ৪টি স্কোয়ার রয়েছে, আর সবগুলোর মিলিত নামই ভক্তপুর দরবার স্কোয়ার। এই স্কোয়ারকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করেছে। এটি নেপালেরর অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র এবং প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই প্রাসাদ ও স্কোয়ার দেখতে আসে। আমরা প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় কাটাই রাজ প্রাসাদ ও এর বিভিন্ন স্থাপনা দেখতে। স্বল্প সময়ে সবগুলো স্থাপনা দেখা সম্ভব হয়নি। যে গুলি দেখার সুযোগ হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি সম্পর্কে পাঠকদের সংক্ষিপ্ত ধারনা দিতে চাই।
পাঁচপান্না ঝেইলে দারবারঃ রাজপ্রাসাদের অন্যতম আকর্ষন হলো ৫৫ জানালা বিশিষ্ট একটি ভবন। মাল্লা বা মল্ল (গধষষধ) রাজ বংশের সময় এই ভবনটি নির্মান করা হয়। রাজা ভুপতিন্দ্র মাল্লা এই ভবনের নির্মান কাজ শুরু করেন। কিন্তু তিনি কাজ শেষ করতে পারেননি। তাঁর পুত্র রাজা রঞ্জিত মাল্লা ১৭৫৪ সালে নির্মান কাজ শেষ করেন। সময় বিবেচনায় দেখা যায় আমাদের দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরও একই সময়কার। কান্তজীর মন্দির নির্মান শুরু করেন কান্ত নগরের মহারাজা প্রান নাথ ১৭০২ সালে এবং শেষ করেন তাঁর পুত্র মহারাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে। দু’টি ক্ষেত্রেই অপূর্ব মিল রয়েছে তাহলো পিতা নির্মান কাজ শুরু করেন আর পুত্র নির্মান কাজ শেষ করেন। তবে ভক্তিপুর রাজপ্রাসাদে মন্দিরের অভাব নেই। হিন্দু ধর্মে পূজনীয় এমন কোন দেবদেবী নেই যার নামে মন্দির তৈরী করা হয়নি। যেমন নয়াতাপয়া মন্দির,ভৈরব নাথ মন্দির,লু ধৌকা মন্দির,ভাতশালা দেবী মন্দির,ছোট পশুপতি,মন্দির,হনুমানমূর্তি,সিংহ দরজা,রামেশ্বর মন্দির,বদরীনাথ মন্দির,গোপীনাথ মন্দির,কেদারনাথ মন্দির,উগ্রচন্ডি ও উগ্রভৈরব,হাতী মন্দিরসহ আরো অসংখ্য ছোট বড় মন্দির রযেছে। সব মন্দিরের বর্ননা দেয়া সম্ভব নয় ,নিজ চোখে দেখা ও নেপালী গাইডের সাবলীল বর্ননা থেকে যতটুকু বুঝতে পারছি তা থেকে কয়েকটি মন্দির ও স্থাপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিচ্ছি।
রানী পুকুর ঃ এখানে রানীসহ রাজপ্রাসাদের মহিলারা ¯œান করতেন। পুকুরটি অতি ছোট আকৃতির,সান বাঁধানো ঘাট,পাড়ে দেবদেবী ও সাপের নকশা সম্বলিত পাথুরে ওয়াল ও শিবলিঙ্গ। আমাদের কয়েকজন সহকর্মী নেমে পুকুরের জল স্পর্শ করে ধন্য হয়। রানীর পুকুরে ¯œান করতে না পারলেও হাত তো ধোয়া হয়েছে!
কালী মন্দিরঃ রানী পুকুর দেখা শেষ হলে গাইড আমাদেরকে নিয়ে আসে আরেকটি মন্দিরের কাছে। আমরা ঢুকতে চাইলে দ্বার রক্ষী বাঁধা দেয়। গাইড জানায় এ মন্দিরের দেবী খুবই মেজাজী। এটি একটি গরম মন্দির, এখানে কেবল হিন্দু ধর্মের লোকই প্রবেশ করতে পারে,অন্য ধর্মের লোক প্রবেশ করলে দেবী বিগরে যেতে পারে,এতে প্রবেশকারীরই ক্ষতি হতে পারে,খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল এ পর্যন্ত কতজনের ক্ষতি হয়েছে! মজার ব্যপার হলো আমাদের হিন্দু ধর্মাম্বলী সহকর্মীগনও ঢোকতে পারেনি। রাকেশ বারবার বলছিলো ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, আমরা খাঁটি হিন্দু, আমাদেরকে প্রবেশ করতে দিন, পূণ্যি লাভের সুযোগ দিন, মাকে এক নজর দেখতে দিন’,কিন্তু কে শুনে কার কথা, নাকি বাংলাদেশী হিন্দুদের পিওরিটি সম্পর্কে ওদের কোন শোভা সন্দেহ আছে ! তবে আমাদের দলে কোন ব্রাহ্মণ সন্তান না থাকায় মান ইজ্জত কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছে। জানিনা বাবা,যাক মনে কষ্ট নিয়েই অনেককে সেখান থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। আসলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় স্থানগুলো নিয়ে এক শ্রেনীর সেবায়েত,পান্ডা ও খাদেম নামধারী ভন্ডদের দৌরাত্ম চলে আসছে হাজার বছর ধরে।আজমীর শরীপ গিয়েও খাদেম নামধারী পান্ডাদের ভন্ডামী দেখেছি। আমাদের দেশেও মাঝে মাঝে শুনতে পাই ওমুক মাযার খুব গরম,বিনা-অজুতে প্রবেশ নিষেধ আর আওরতদের তো এমনিতেই প্রবেশাধিকার নেই। প্রশ্ন জাগে ধর্মীয় স্থান বা উপাসনালয় বা দেবালয় গরম হবে কেন? সে জায়গাটি তো ঠান্ডা হওয়ার কথা,শীতল হওয়ার কথা, শান্তির জায়গা হওয়ার কথা!সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়ার কথা। অথচ জাপানে সকল মন্দির ও উপাসনালয় একেবারে শান্তিময়, সকলের জন্য উন্মুক্ত।
নয়াতাপোয়া মন্দিরঃ ‘নয়াতাপোয়া’ একটি নেওয়ারী শব্দ যার অর্থ পাঁচ তলা। দরবারের পাঁচতলা বিশিষ্ট মন্দিরটি সমগ্র নেপালের সর্ববৃহৎ ও সর্বোচ্চ মন্দির। স্থাপত্য শৈলী ও নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য মন্দিরটি একটি বিশিষ্ট স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত। আমরা মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকগুলি ¯œ্যাপ নিই। উপরে উঠার মতো ধৈর্য কারো ছিলোনা,এমনকি মন্দিরভক্ত অগ্রজ সহকর্মী মনিন্দ্র কিশোর মজুমদারেরওনা।
উগ্রচন্ডি ও উগ্রভৈরবঃ প্রধান ফটকের পাশেই বহু হস্ত বিশিষ্ট ভয়ঙ্কর রুপের দৃ’টি পাথুরে মূর্তি একটি উচুঁ বেদীর উপর দাঁড়িয়ে আছে। ওরা দুজন হলেন দেবতা উগ্রভৈরব ও উগ্রচন্ডি বা শিব ও তার স্ত্রী পার্বতীর রুদ্রু মূর্তির রূপ। উগ্রচন্ডির ১৮টি হাতই অস্ত্র সজ্জ্বিত এবং তার রুপটি এমন যে তিনি একটি মহিষকে বধ করতে উদ্যত হয়েছেন,আর উগ্রভৈরবের হাত ৬টি কম মাত্র এক ডজন। দেব রাজ্যে নারীরা যেন সব সময়ই এককাঠি সরেস থাকেন! আহা বেচারা পুরুষ! স্বর্গালোকেও তোমার অবস্থা ¤্রয়িমান,ক্ষমতাহীন! মূর্তিগুলোর নির্মানের সময়কাল উল্লেখ করা আছে ১৭০১ খৃষ্টাব্দ। স্থপতি এতটাই দেবীভক্ত ছিলেন যে তিনি স্বেচ্ছায় নিজের হস্তযুগল কর্তন করে ফেলেন যাতে তার হাত দ্বারা অনুরুপ মূর্তি আর তৈরী না হয়! একথার ঐতিহাসিক ভিত্তি কতটুকু জানা না গেলেও প্রচলিত মিথ এমনই জানালেন গাইড রঞ্জন থাপা। তাজমহলের স্থপতি মোহাম্মদ ঈশা সম্পর্কেও অনুরুপ মিথ প্রচলিত আছে,তবে পার্থক্য হলো সেখানে নাকি সম্্রাটের নির্দেশে হাত কেটে নেয়া হয়! জানিনা কোনটি সত্যি। রাজ রাজাদের খেয়াল কত বিচিত্র হয়!
লু ধৌকাঃ এটিও একটি নেওয়ারী শব্দ যার অর্থ সোনালী ফটক। স্বর্ণের তরী প্রধান দরজা । দরবারের সবচেয়ে সুন্দর ও দামী স্থাপনা হিসেবে সারা দুনিয়ায় নাকি এর খ্যাতি রয়েছে জানালেন রঞ্জন থাপা। গেইটের উপর দেবী কালীর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। অনেক পশ্চিমা স্থপতি নাকি এর শৈল্পিক রুপে এতটাই মৃগ্ধ হয়েছেন যে বলতে বাধ্য হয়েছেন এমন স্থাপনা জগতে বিরল। আমাদের মতো আনারী আমজনতা তো আর নির্মাণ শৈলী সম্পর্কে মত দিতে পারিনা, এজন্যে জহুরীর দরকার। রাজা রঞ্জিত মাল্লা এই রাজকীয় তোড়ণ ও পঞ্চান্ন জানালা বিশিষ্ট প্রাসাদ নির্মান করে ইতিহাসে খ্যাতি পেয়েছেন।
ভুমিকম্পঃ গোটা হিমালায়ান অঞ্চলটিই ভুমিকম্প প্রবণ হওয়ায় নেপাল বিভিন্ন সময় মারাত্মক ভুমিকম্পের শিকার হয়েছে। এই রাজপ্রাসাদও বেশ কয়েকবার ভুমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রথমবার ১৯৩৪ সালের ভুমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতি গ্রস্থ হয় প্রাসাদ ও তদসংলগ্ন মন্দিরসমূহ। সর্বশেষে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের ভুমিকম্পে অনেকগুলি ভবন ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। প্রাসাদের প্রধান মন্দিরের ছাদ ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয় এবং ভাতসালা দেবীর মন্দির পুরোপুরি চুরমার হয়ে যায়। আমাদের নেপালী গাইড রঞ্জণ থাপা এমনভাবে ঘটনাগুলোর বর্ননা দেয় যাতে মনে হয় আমাদের সামনেই সবকিছু ঘটছে। তবে এটা ঠিক প্রত্যেকটি স্থাপনার গায়ে ভুমিকম্পের ক্ষত চিহ্ন যেন দগদগ করছে । এমন ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ভাঙ্গাচুরা চেহারা দেখলে যে কেউ ব্যাথিত হবে। আশার কথা নেপাল সরকার এগুলো মেরামত ও সংস্কারের কাজ শুরু করেছে,অনেকগুলি ভবন ও মন্দিরের মেরামত কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। তবে এসকল কাজ খুব সহজ নয়,আদি সেইপে নিয়ে যাওয়া খুব দক্ষ শিল্পীর প্রয়োজন হয়। আর বিরাট অংকের অর্থ সংস্থানের তো প্রয়োজন আছেই। এজন্যেই বোধ করি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সরকার, প্রতিষ্ঠান ও সুধীজন মুক্ত হস্তে দান করছে। দেখলাম কর্তৃপক্ষ স্কোয়ার প্রাঙ্গনে দাতাদের নাম সম্বলিত একটি বিল বোর্ড ঝুলিয়েছে এবং কে কত রুপি সহায়তা করেছেন তাঁর নামধামসহ পরিমান উল্লেখ করা হয়েছে। দেখলাম চীন সর্বোচ্চ দাতা, ইউরোপের অনেক ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামও দেখলাম,আছে ভারতের ও অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম। ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিকে রক্ষা করার এমন উদ্যোগ প্রশংসার দাবী রাখে। ভারত ভ্রমণের সময় দেখেছি ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণের জন্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া(অৎপযরড়ষড়মরপধষ ঝঁৎাবু ঙভ ওহফরধ-অঝও) নামে একটি শক্তিশালী সংস্থা রয়েছে । আমাদের দেশেও রযেছেন প্রতœতত্ত অধিদপতর। জানিনা নেপালে এমন কোন সংস্থা আছ কিনা।
দরবার স্কোয়ারে ও প্রধান ফটকের বাহিরে নানা রকম পণ্যের দোকানপাট রয়েছে। দোকানীদের অধিকাংশই নারী। তবে পর্যটক দেখলেই দাম বাড়িয়ে বলে। আমাদেও নারী সহকর্মীরা মালা জাতীয় কিছু আইটেম কেনাকাটা করেন।
চন্দ্র গীরি কেবল কার: আকাশের সাথে মিতালী
দরবার স্কোয়ার থেকে আমরা রওয়ানা দিই চন্দ্রগীরির দিকে। দরবার থেকে চন্দ্রগিরির দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার ,কিন্তু রাস্তা নির্মানজনীত কারনে বেশ সময় লেগে যায়। চন্দ্রগীরির অন্যতম আকর্ষন হলো কেবল কারে চড়ে পাহাড়ের চূঁড়ায় আরোহন। আমরা প্রায় ঘন্টাখানিকের মধ্যেই পৌছে যাই। আহ কি সুন্দর জায়গা! উচু পাহাড় থেকে নীচের শহরকে কেমন ঝলমলে দেখাচ্ছে!আমরা কেবল কারের প্রথম মঞ্জিল থাংকুটে(ঞযধহশড়ঃ) পৌছাই। সেখান থেকে কেবল কারে চড়ে চন্দ্রগীরি হিলের চূঁড়ায় পৌছাতে সময় লেগেছে ১২ মিনিটের মতো। থাংকুট ষ্টেশন থেকে চন্দ্রগীরি ষ্টেশনের দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। কেবল কার যখন উচুঁতে উঠছিলো তখন গা হিম হয়ে যায়, শরীরে কাপুনি ধরে! অনেকে চােখ বন্ধ করে রাখে। কিন্তু এমন সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে হলে কিছুটা সাহসীতো হতেই হবে। যদিও রিস্কের কথা বলা হয় বাস্তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোন বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। তো চোখ খোলে দেখি চারিদিকে কেবল সবুজ পাহাড় ও নীল আকাশ। পাহাড় যেন আকাশের সাথে মিতালী পেতেছে। পাহাড় চুড়ার ফাঁক দিয়ে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আপন মনে। আবারো সাহস করে নীচের দিকে তাকাই। কী সুন্দর প্রকৃতি! চোখ যেন সরতে চায়না। সম্বিত ফিরে পাই সহযাত্রীর ধাক্কায়, আমরা চলে এসেিেছ চন্দ্রগীরি হিল ষ্টেশনে। আট হাজার ফুট উপরে উপরে উঠে এসেছি! জীবনে প্রথম এতো উচুঁতে উঠা। পাহাড় চূঁড়ায় সমতল ভুমি তৈরী করে কেবল কার ষ্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। ষ্টেশনের পাশেই একটি খোলা চত্তর, সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হয় সকলে মিলে। এখানেই শেষ নয় আরো উপরে উঠতে হবে । শুরু হলো প্রায় খাড়া পথ বেয়ে উপরে উঠার পালা । ওজনওয়ালাদের জন্য এ পথে চড়া মহা বিপদ আরকি,কিন্তু ওখানে না উঠলে চন্দ্রগীরি আসাই যে বৃথা! হিমালয় শৃঙ্গ দেখা কিংবা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে উপরে উঠতেই হবে। যত কঠিনই হোক তা জয় করতে হবে । তাইতো ৮০ কেজি ওজনের ব্যাচমেট নীলিমাসহ সকলেই শেষ পর্যন্ত চন্দ্রগীরির চুড়ায় পদচিহ্ন আঁকার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছে। ওখান থেকে চারিদিকের গীরিশৃঙ্গ ও মায়াময় প্রকৃতির রুপ মাধুর্য উপভোগ করতে পেরে জীবন ধন্য হয়েছে। এই চুড়ায় দুতলা ভবনের উপর স্থাপন করা হয়েছে পর্যবেক্ষন টাওয়ার। সিড়ি বেয়ে উঠলাম সেখানে। গোলাকৃতির ডেকে আছে দূরবীক্ষণ যন্ত্র হিমালয়ের বিভিন্ন চুড়া দেখার জন্য। কিন্তু ঝলমলে রোদ্দুর না থাকলে দেখা সম্ভব হয়না। আমাদের ভাগ্যও সেদিন সুপ্রসন্ন ছিলোনা। ক্ষণে ক্ষণেই বৃষ্টি হামলে পড়ছিলো। ফলে অনেক চেষ্ঠা করেও কাঞ্চনজঙ্গা কিংবা অন্য কোন চুড়া দেখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে হিমালয় পাহাড়ের শীর্ষচুড়া না দেখলেও কিয়দংশ হলেও দেখতে পেয়েছি তাও কম কিসে? টাওয়ারের তিন দিকেই সুউচ্চ পাহাড়শ্রেনী।এ এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য যা কেবল উপভোগ করা যায়,বর্ননা করার যেন ভাষা নেই। এখানেও একই অবস্থা কেউই নামতে চায়না,আরো সময় কাটাতে চায়! কিন্তু সময় যে বাঁধা। টাওয়ার থেকে নেমে নীচের রেস্তোরায় নেপালী মেন্যু দিয়ে লাঞ্চ করলাম তৃপ্তির সাথে। রেস্তোরার পাশেই এক কর্নারে সুভ্যেনীর শপ। নানারকম স্যুভেনির, রেপ্লিকা, টি শার্ট,ক্যাপ,পাশমিনা,সান গ্লাস,পাথর ও পিতলের তৈরী দেব দেবীর মূর্তিসহ হরেক রকম আইটেম যা পর্যটকদের কাছে খুব প্রিয়। রেস্তোরার একটু দূরে আধুনিক স্থাপত্য রীতিতে তৈরী ভুবনেশ্বর মহাদেব মন্দির। পুরোহিত উচ্চ স্বরে মন্ত্র পাঠ করছে বিরামহীনভাবে। মন্দিরটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সহযাত্রী রাকেশ শ্রদ্ধার্ঘ অর্পন করে অত্যন্ত ভক্তিসহকারে। মন্দিরে ডোনেশন বক্স রাখা আছে। মন্দিরের পাশেই একটি ষ্ট্যাচু যা নেপালের প্রধানমন্ত্রি উদ্বোধন করেন। সময় ফুরিয়ে আসায় আমরা নামতে থাকি ধীরে ধীরে। হঠাৎ আকাশ পরিস্কার হয়ে যাওয়ায় প্রকৃতি যেন নতুন রূপ ধারন করে। শুরু হয়ে যায় ক্লিক ক্লিক শব্দ! প্রকৃতির সাথে নিজেকেও বন্দী করার প্রতিযোগিতা যেন থামতে চায়না। প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলিন করে সেলফোনের ভিতর বন্দী করার ক্ষেত্রে নারী সহকর্মী ফারহানা,সুলতানা ও নীলিমার উৎসাহের যেন শেষ নেই। মাঝে মাঝে আমরাও যোগ দিই ওদের সাথে। টিম লিডার যতই তাড়া করুন এতে কারো যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। এ জীবনে কি আর আসা হবে এখানে? থাকিনা আরো খানিকটা সময়! কিন্তু শেষেরও শেষ আছে। অবশেষে ধীরে ধীরে অতি সাবধানে সতর্ক পায়ে নামতে থাকি চন্দ্রগীরি কেবল কার ষ্টেশনের দিকে । পেছনে পড়ে থাকে একরাশ আনন্দ স্মৃতি আর সঙ্গে নিয়ে আসি তৃপ্তির ঝুলি। কেবল কারে নেমে আসি নীচের ষ্টেশন থানকুটে। নামার সময়ও আনন্দ অনুভুতি। কয়েক বছর আগে উঠেছিলাম মালয়েশিয়ার কেবল কারে। মনে হয় এখানে প্রকৃতি আরো গভীর আরো মায়াময় আরো আকর্ষনীয়। নীচে নামার সাথে সাথেই কর্তপক্ষ সকলের হাতে তুলে দেয় ব্রোসিয়ার,আমি তখন তথ্য কেন্দ্রে একই জিনিস সংগ্রহে ব্যস্ত! নামার সময় ভাবছিলাম এমন উচ্চ প্রযুক্তির ও বিশাল খরচের কাজ নেপালের মতো দেশ করলো কিভাবে? টিম লিডার ফরিদ স্যার জানালেন ওটা নেপাল নয় জার্মানীর একটি কোম্পানী করেছে এবং ওরাই অপারেট করছে। প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে ওটা নির্মান ও সাজাতে। আর খানিকটা দূরের পাহাড় চুড়ায় চলছে নান্দনিক উচু উচু ভবন নির্মানের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। যারা পাহাড় চুড়ায় উঠবেন তারা যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, হিমালয়ের কোলে অবকাশ যাপন করতে পারেন সপরিবারে কিংবা প্রেয়সির কোলে মাথা রেখে দু’দন্ড শান্তিতে কাটাতে পারেন জীবনের কয়েকটি দিন। সে উদ্দেশ্যে নির্মান হচ্ছে আর্ন্তজাতিক মানের আবাসিক হোটেল,কটেজ,পানশালা,রেষ্টুরেন্ট ও সুপারমল সহ নানা রকম আনন্দ সহায়ক ¯া’পনা। যারা ভ্রমণপিপাসু, যারা রোমান্টিক,যারা প্রকৃতির সাথে মিতালী করতে চান,যারা ভাবুক, যারা সৃষ্টির বৈচিত্র দেখতে চান সর্বোপরি যাদের হাতে আছে কাড়ি কাড়ি কড়ি তারা আসতে পারেন এখানটায় নির্দ্বিধায়।
দলপতি ফরিদ স্যার এবং হরফুনে মৌলা রাকেশ ঘোষ পরবর্তী ও শেষ মঞ্জিল রাজধানী কাঠমন্ডুতে ফেরার তাগিদ দিচ্ছিলেন বার বার। ডিপুটি টিম লিডার আজহার স্যার স্মরণ করিয়ে দেন যে কাঠমন্ডুস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস তাঁর বাসভবনে ডিনারের আমন্ত্রন জানিয়েছেন বাংলাদেশ টিমকে, যথা সময়ে হাজির হওয়া দস্তুর। চন্দ্রগীরিকে পিছনে রেখে যাত্রা শুরু হলো রাজধানীর পথে। যানজট যেন ছাড়তে চায়না আমাদের । আমরা যে ঢাকার লোক তা যেন নেপালের রাস্তাগুলি জেনে গেছে অনেক আগেই! রাত প্রায় ৯টার সময় পৌছাই রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের বাসায় অনেকটা বিধ্বস্ত অবয়বে। নারী সহকর্মীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও হোটেলে না গিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রদূতের বাসায় চলে যেতে হয়। ওরা চেয়েছিলো একটু সাজগোছ করবে, শাড়ী পড়বে, কপালে টিপ দেবে,কিন্তু সময় এমনই বেরসিক যে, সে সুযোগটুকু ওদের দিতে রাজি হয়নি!
মান্যবর রাষ্ট্রদূত আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানান। হালকা আপ্যায়নের সাথে সাথে শুরু হয় ট্রায়াল রানের নানা দিক নিয়ে অলাপ আলোচনা। ডিনারে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের টিম লিডার রাজিব রানা এবং নেপাল-বাংলাদেশ চেম্বার অব ট্রেডার্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট পান্নালাল জৈনও আমন্ত্রিত ছিলেন। রাষ্ট্রদুত মহোদয় বলেন ট্রায়াল রানের সফলতার উপর নির্ভর করছে প্রটোকল স্বাক্ষরের বিষয়টি। তিনি দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে দায়িত্ব পালন করার সময় থেকেই রিজিওনাল কানেকটিভিটি নিয়ে কাজ করেছেন। কাঠমন্ডুতে পদায়ন হওয়ার পর আরো বেশী সম্পৃক্ত হয়েছেন। ভারত,বাংলাদেশ,নেপাল ও ভুটানের মধ্যে বানিজ্য,পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ত্বরান্বিত করতে হলে স্থল যোগাযোগ অপরিহার্য। তবে সব সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো মানুষে মানুষে যোগাযোগ স্থাপন। এ অঞ্চলের জনগনের আকাংক্ষাকে বাস্তব রুপ দিতে হলে বাস চলাচল ও কার্গো চলাচলের জন্য প্রটোকল স্বাক্ষর করতে হবে,সকল বাঁধা বিপত্তি দূর করতে তিনি সচেষ্ট আছেন বলে জানান। দলনেতা ফরিদ স্যারও আমাদের মন্ত্রনালয়ের অবস্থান এবং ভারত ও নেপালের প্রতিনিধিদের সাথে বিগত কয়েক দিনের অলাপ আলোচনা রাষ্ট্রদূতের সাথে শেয়ার করেন। আনুষ্ঠানিক আলাপ আলোচনার পর রাষ্ট্রদূত মহোদয় ডিনারে আমন্ত্রন জানান। পোলাও রোষ্টের পাশাপাশি অনেক পদের ভর্তা ,শাক শবব্জি, মসুর ডাল,দই ও রসগোল্লার আয়োজন করায় সকলেই তৃপ্তির সাথে ডিনার করে। মেনুতে দেশী খাবারের আধিক্য থাকায় সকলে তাঁকে ধন্যবাদ জানায়। এক সহকর্মী সাদা ভাত চাওয়ায় তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও পরে জানালেন একজনের খাওয়ার মতো সাদা ভাত আছে! সহকর্মী খুব আনন্দের সাথে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। অনেক দিন পর বাংলা খাবার খেয়ে সকলেই অপার তৃপ্তি লাভ করে। ডিনারের পর শুরু হয় হালকা গান বাজনা,আমাদের অগ্রজ সহকর্মী চন্দন কুমার দে, অনুজ সুলতানা ইয়াসমীন বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় ও পুরোনো দিনের গান গেয়ে পরিবেশটিকে আনন্দঘন করে তোলে। রাষ্ট্রদূত মহোদয় যে সঙ্গীতের সমজদার তাঁর বাসায় রক্ষিত বিভিন্ন ধরনের আধুনিক বাদ্য যন্ত্রের উপস্থিতি দেখেই অনুভব করতে পারি। পরে জানতে পারি ওনার পুত্র সন্তানটি ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিউজিকের উপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। মাকা বেটা! তারপর ছবি তোলার পালা। রাষ্ট্রদূত মহোদয় বিসিএস ফরেন সার্ভিসের নবম ব্যাচের সদস্য। আমাদের দলের দশম ব্যাচের আজহারুল ইসলাম খান ও একাদশ ব্যাচের নীলিমা আখতার একসাথে পিএটিসিতে ফাউন্ডেশন ট্রেনিং করায় তাদের সাথে পূর্ব পরিচয় ছিলো। নীলিমা ছিলো ওনার রুমমেট,ফলে আসার আগেই যোগাযোগ করেছিলো এবং তিনিও সাদর আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে দুতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম সচিব অসীত বরণ সরকার, মাহবুবুল আলম ও একজন মহিলা কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। ২২তম ব্যাচের মহিলা কর্মকর্তাটি ২০তম ব্যাচে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ছিলেন বলে জানালেন। ভালো লাগলো তাদের সকলের আন্তরিকতায়।নেপালের বুকে একখন্ড বাংলাদেশে অবস্থান করে মনটা আনন্দে ভরে যায়,দূর হয়ে যায় সকল ক্লান্তি সারা দিনের সকল অবসাদ।
সিংগি রয়্যাল হোটেল কাঠমন্ডু শহরের প্রধান সড়কের উপরেই। শহুরে তারকা হোটেলের সকল বৈশিষ্ট ও সুযোগ সুবিধাই আছে। রিসিপশনে আসতেই হোটেলের ষ্টাফ তেজ বাহাদুর থাপা ও তার সহকর্মীরা ২৫জন অতিথিকে বরণ করে নেয়। স্বাগত জানায় হাতে তাজা গোলাপের পাঁপড়ি ও গলায় রঙিন উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে । এ যাত্রা এটিই ছিলো শেষ অভ্যর্থণা ও শেষবারের মতো গলদেশে উত্তরীয় পড়া। অতিথিকে উত্তরীয় পড়িয়ে স্বাগত জানানোর রীতিটা আসলে পশ্চিম বাংলা ও তদসন্নিত এলাকার একটি দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। এবার নেপাল গিয়ে বুঝলাম সেখানকার রীতিও অনেকটা এরকমই। তবে ওদের ওখানে অতিরিক্ত আরেকটি হলো ঐতিহ্যবাহী নেপালী টুপি পড়িয়ে স্বাগত জানানো। আমাদের দেশেও বর্তমানে এ রীতি অনেক ক্ষেত্রেই চালু হচ্ছে যা পূর্বে ছিলোনা। অনেকে বলেন এটি আসলে শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতি,অনেকে বলেন এটি বাঙ্গালী হিন্দুর সংস্কৃতি। প্রাচীনকালে হিন্দু পন্ডিতদের দ্বারা পরিচালিত টোল থেকে শিক্ষা লাভ করার পর স্বীকৃতি হিসেবে উত্তরীয় পরিয়ে দেয়া হতো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটাকেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেন। পূর্ব বঙ্গ ও আসামে এটি কখনো চালু ছিলোনা। বর্তমানে গন্যমান্য অতিথি ছাড়াও কোন গুরুত্বপূর্ণ পদক বিতরনের সময় পদকপ্রাপ্ত ব্যাক্তিকে পদক দেওয়ার সাথে সাথে উত্তরীয় পড়িয়ে দেয়া হয়। আসলে একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ যা বিশ্বাস করে ও প্রতিপালন করে মোটা দাগে তাই সেদেশের সংস্কৃতি। সংস্কৃতির আদান-প্রদান চলে আসছে সুদূর অতীত থেকে। মিলবে আর মেলাবে। যা উন্নত,যা শোভন,যা মঙ্গলজনক সর্বোপরি যা পরিশীলিত ও সৌন্দর্যময় তা গ্রহন করতে কুন্ঠা থাকা উচিৎ নয়। ভাষা ও সংস্কৃতি কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেনা,সদা প্রবাহমান। কেউ আটকিয়ে রাখতে পারবেনা,তবে খেয়াল রাখতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতি যেন হারিয়ে না যায়।
রুমে উঠার আগে দলনেতা কড়া নির্দেশ দিলেন সকাল ৯টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট সারতে হবে,তারপর শহর পরিভ্রমন ও কেনাকাটা শেষ করে বেলা ১টার মধ্যে হোটেলে ফিরতে হবে। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে লাঞ্চ করতে হবে। তথাস্তু বলে সকলেই যার যার রুমে চলে যায়। একটু ফ্রেস হয়ে খানিকটা সময় রিসিপশন থেকে আনা পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে দিলাম লম্বা ঘুম।
সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে হোটেল লবীতে বসে আছি এমন সময় ব্যাচমেট নীলিমা পরিচয় করে দিলো পাশে বসা নেপালী এক ভদ্রলোকের সাথে। নাম রাম বাবু শাহ। নীলিমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি। ওরা দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র ছিলেন আশির দশকে। নীলিমা আগে থেকে ওর সাথে যোগাযোগ করেছিলো। শান্তশিষ্ট চেহারার লোকটি দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের বরণ্যে গায়ক সুবীর নন্দীর মতো। চাকুরী করেন ইউএনডিপি’র কাঠমন্ডু অফিসে। তার সাথে কথা বলে বেশ আনন্দ পাই। ওর কাছ থেকে জানতে পারি অনেক আগে থেকেই এমনকি পাকিস্তান আমল থেকেই নেপালী ছাত্ররা উচ্চ শিক্ষার জন্য আমাদের দেশে আসছে। তবে হাল আমলে এই সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে জেনে বেশ গর্ব অনুভব করি। উচ্চ শিক্ষার জন্য শুধু আমাদের ছেলেমেয়েরাই বিদেশে যাচ্ছেনা ,বিদেশীরাও যথেষ্ট মাত্রায় আসছে এমন সংবাদ আনন্দদায়ক বই কি। বলা যেতে পারে এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষণ, অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা সত্বেও। অবশ্য গতরাতে ডিনারের সময় মান্যবর রাষ্ট্রদূতও এপ্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন। তিনি জানান নেপাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ৫/৬শ ছাত্র/ছাত্রী বাংলাদেশে যাচ্ছে উচ্চ শিক্ষার্থে। এই মুহুর্তে প্রায় ২০ হাজার নেপালী শিক্ষার্থী রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আশার কথা, ভালো লাগার বিষয়। এপ্রসঙ্গে স্মরণ করতে হয় কাঠমন্ডু এয়ারপোর্টে সাম্প্রতিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত নেপালী যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলো সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র/ছাত্রী যারা ছুটি কাটাতে নিজ দেশে ফিরছিলো। নিস্পাপ সেই তরুন/তরুনীদের আত্মা শান্তি পাক এই কামনা করি।
নারায়নহিতি রাজপ্রাসাদঃ প্যালেস থেকে মিউজিয়াম
আমরা সকলে একসাথে বের হই শহর দেখার জন্যে। নীলিমার সহপাঠি রাম বাবু অনেকটা গাইড হিসেবে কাজ করে। হোটেল থেকে খানিকটা দূর যেতেই শুরু হয় বৃষ্টি,এ ক’দিনে বুঝলাম নেপালে বৃষ্টির কোন ঠিক ঠিকানা নেই। যেতে চেয়েছিলাম রাজ প্রাসাদ দেখতে,কাছে যেতেই দ্বার রক্ষী জানায় আরো ঘন্টা খানেক পরে খোলবে। আমাদেরতো বাঁধা সময়। অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাহির থেকে যতটুকু দেখার তা দেখে নিই। বর্তমানে সেটি আর প্রাসাদ নেই ,জাদুঘরে রপান্তর করা হয়েছে। মনে পড়লো হতভাগ্য রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব এর কথা। বকে যাওয়া সন্তান প্রিন্স ডিপেন্দ্রের হাতে ২০০১ সালের জুন মাসে রানী ঐশ্বরিয়াসহ সপরবিারে নিহত হন। রাজা বীরেন্দ্র ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। সার্ক গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন দূরদর্শী নৃ-পতি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে আন্দোলনকারীদের সাথে তিনি আপোষ মিমাংসায় উপনীত হন । নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে চলে আসেন। জনগনের মনোভাবকে মাথা পেতে মেনে নেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পিতা-পুত্রের লড়াই নতুন কিছু নয়, কিন্তু এভাবে মদ্যপ পুত্রের হাতে সপরিবারে একজন রাজার নৃসংশভাবে নিহত হওয়া কোনভাবেই কাম্য নয়। উত্তরকালে রাজার অনুজ জ্ঞানেন্দ্র রাজা হিসেবে সিংহাসনে আরোহন করলেও খুব বেশীদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। ক্ষয়িষ্ণু রাজতন্ত্রের ভিত কাপিয়ে দেয় মাওবাদী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত গন আন্দোলন। অবশেষে রাজা নতি শিকার করে ২০০৮ সালে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যান সাধারন জীবনে। অবসান হয় শাহ ডাইনেষ্টির প্রায় আড়াইশ বছরের শাসন। একদা ১৭৬৮ সালে রাজা পৃথ্বি বীর বিক্রম শাহ যে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার অবসান হয়ে নেপালে প্রতিষ্ঠিত হয় গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। যদিও এখনো সেখানে গনতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করেনি,বলা যায় ক্রান্তিকাল পার করছে। নেপালে মল্ল, রানা ও শাহ বংশের রাজতন্ত্র চালু ছিলো প্রায় হাজার বছর ধরে।
নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদ তথা জাদুঘরে ঢুকা সম্ভব হবেনা বলে গতি ফিরিয়ে নিলাম কাঠমন্ডু দরবার স্কয়ারের দিকে। হেঁটেই চলা শুরু হলো । নেপালে কোন রিক্সা দেখিনি। তবে টেক্সি থাকলেও খুব বেশী না। কিছু দূর যেতেই দেখি একটি সুন্দর মসজিদ। এ পর্যন্ত কোন মসজিদ দেখিনি। বিশাল মসজিদ কমপ্লেক্সে ঢুকে খাদেম গোছের একজনকে পেলাম,কিন্তু সে আমাদের ভাষা বুঝে না। পরে আরেকজন আসলো তাকে বলায় তিনি বুঝলেন। বিশাল মসজিদ,সংলগ্নে মাদ্রাসা ও ছাত্রাবাস। ক্যাম্পাসে একটি মাযারও আছে। কার মাযার বা মসজিদের নাম কি জানতে পারিনি। ব্রোসিয়ার চাইলে জানান অফিস থেকে দিতে হবে, তবে আজ অফিস বন্ধ। যাক সময়ের স্বল্পতার কারনে সেখানে বেশী সময় ব্যয় করা সম্ভব হলোনা।
মিনিট পনের হেঁটে পৌছি কাঠমন্ডু দরবার স্কোয়ারে। দেখতে অনেকটা ভক্তপুর দরবারের মতোই। পুরোনো আমলের প্রাসাদ,নানা রকম মন্দির, ও রাজকীয় তোড়ন,দেব দেবীর মূর্তি,ভাস্কর্য,সর্বত্রই ভুমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির দগদগে ক্ষত চিহ্ন। দরবার স্কোয়ারের অপর নাম হনুমান ঢোকা(ঐধঁসধহ উযড়শধ)। নেপালের প্রাচীন রাজধানী। প্রাসাদ ও মন্দিরগুলি বিভিন্ন রাজবংশের সময়ে নির্মিত হয়েছে। মল্ল,রানা ও শাহ নৃপতিরা প্রাসাদ ও মন্দির নির্মানে খুব দক্ষতা ও আন্তরিকতার ছাপ রাখে। প্রধান ফটকে পাথরের তৈরী দৃষ্টিনন্দন হনুমান মূর্তি নজর কাড়ে। দেবতা রামচন্দ্রের প্রধান সেনাপতি হনুমানের প্রতি ভারতীয়দের অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধা দেখেছি দিল্লীসহ উত্তর ভারতের অনেক শহরে। প্রশ্ন জাগে মানুষ থাকতে হনুমানকে কেন প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন দেবতা রাম? সে প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়তো আমাদের মতো রাম শ্যাম যদু মধুর কাজ নয়। কাঠমন্ডু দরবারের অন্যতম স্থাপনা বিখ্যাত কাষ্ঠমন্দির। তিনতলা বিশিষ্ট মন্দিরটি নাকি একটি মাত্র বৃহৎ বৃক্ষের কাঠ দিয়ে তৈরী হয়েছিলো । এই মন্দির নেপালের সবচেয়ে প্রাচীন মন্দিরগুলোর অন্যতম। স্থাপত্যশৈলী অনেকটা প্যাগোডা আকৃতির। কাষ্ঠমন্দির থেকেই নাকি রাজধানীর নাম হয়েছে কাষ্ঠমন্ডু বা কাঠমন্ডু। অনেক কিছু দেখার ছিলো বটে, সহকর্মীদের কেউই এখানে বেশী সময় কাটাতে চাননা। কারন একটাই সময় কম,কিছু কেনাকাটা করতে হবে। টেক্সিতে করে ১০ মিনিটের মধ্যেই পৌছে গেলাম কাঠমন্ডুর বিখ্যাত শপিং জোন ‘থামেল’এলাকায়।
থামেল কাঠমন্ডুর অন্যতম বানিজ্যিক এলাকা। বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষনীয় স্থান । সরু রাস্তা ও অসংখ্য দোকানপাট এবং তুলনামূলকভাবে জনাকীর্ণ এলাকা হলো থামেল। মধ্যম আয়ের পর্যটকদের কেনাকাটার উপযুক্ত স্থান। দেখতে অনেকটা পুরান ঢাকার ইসলামপুর কিংবা চকবাজার এলাকার মতো। কি নেই সেখানে, নানা রকম হস্ত শিল্পজাত সামগ্রী থেকে শুরু করে দেবদেবীর পাথুরে ,কাঠের ও পিতলের মূতি,ছুরি,চাকু,খুকরী,পুথির মালা,মুক্তার মালা,ঝিনুকের মালা সর্বোপরি উলের তৈরী নানা রকম পশমী কাপড়চোপর। উলের চাদর ও শালের জন্য এলাকাটি বিখ্যাত। মেয়েদের সবচেয়ে প্রিয় নেপালী ‘পশমিনা’র জন্য এলাকাটির খ্যাতি আমাদের ঢাকা অবধি আছে। দাম মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। আছে অনেক হোটেল রেষ্টুরেন্ট ও ফলফলারীর দোকান। ভ্যানে করে ফেরীওয়ালারা আমসহ নানা রকম ফল বিক্রি করছে। এক ফেরীওয়ালা বেশ পীড়াপিড়ি করছিলো আম কেনার জন্য। ভারতীয় আম ১৮০ রুপি কেজি। বয়স্ক ফেরীওয়ালার চেহারায় দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। নাম জিজ্ঞেস করতেই মৃদু হেসে উর্দুতে বললেন মোহাম্মদ খলিল,সাকিন ভারতের বিহার রাজ্যে। জানলাম কাঠমন্ডু আসতে ওদের কোন পাসপোর্ট ভিসা লাগেনা, নেপালের লাগোয়া এলাকা। তার মতো আরো অনেকেই কাঠমন্ডু শহরে ফেরী করে নানান সওদাপাতির তেজারতি করছে।
পশমিনার সারি সারি দোকান রাস্তার দু’পাশে। আমরা একটি বড় দোকান থেকে অনেক পশমিনা কিনি। ফিক্সড প্রাইজ হওয়ায় দামাদামি করার ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ফারহানার উপর দায়িত্ব ছিলো ভাবীদের জন্য নানা জাতীয় মালা,আংটি কেনার,সে কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করে। আমাদের এহসানে এলাহী স্যার ব্যস্ত ছিলেন ভাবীর জন্য নানা রকম আকর্ষনীয় উপরহার কেনায়। ধুলিখেল শহরে নেপালী ললনাদের সাথে উদ্যাম নৃত্যে অংশ গ্রহন করে তিনি নাকি ইতিমধ্যেই ভাবীর বিরাগভাজন হয়েছেন! এখন ভাবীর মান ভাংগানোর পালা। আর শপিং হলো বাংগালী রমনীকে রমনীয় ও নমনীয় করার মুখ্য দাওয়াই! সুতরাং এলাহী স্যার..।
শপিং সেরে আবার টেক্সিতে চড়ে হোটেলে ফিরে আসি। রুমে গিয়ে লাগেজপত্র নিয়ে নেমে আসি। বাসে করেই রওয়ানা দিই কাঠমন্ডুর ত্রি-ভুবন বিমান বিমান বন্দরের দিকে। পথে নেপালের বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দির দেখতে পাই,কিন্তু ভিতরে যাওয়ার সময় এবং আগ্রহ কোনটাই ছিলোনা। দূর থেকেই দেখে নিলাম। অবশ্য মন্দিরভক্ত মনিন্দ্র কিশোর স্যার, শিশির কুমার রাঊথ ও রাকেশ ঘোষ ভোর বেলায় মন্দির ঘুরে এসেছেন এবং বোধ করি প্রয়োজনীয় অর্ঘ্যও দিয়েছেন। ফলে তাদেরও কোন আগ্রহ নেই। গাড়ী থামার কারন হলো এখানেই লাঞ্চ করতে হবে। রাস্তা থেকে সিড়ি বেয়ে নামলাম বেশ খানিকটা নীচে। মাঝারি মানের রেস্তোরা বাবরী। আমরা পাত বিছিয়ে বসে থাকলেও খাবার পরিবেশনের লক্ষন দেখা যাচ্ছেনা দেখে আমরা বেশ বিরক্ত হই। আমাদের সময় একেবারে মাপা। বিলম্বের কারন হলো খাবার তখনো তেরী হয়নি। আমাদের বারবার তাগিদে ওয়েটার ছেলেগুলি একেবারে জেরবার হয়ে যায়। অবশেষে আসলো মিহি চালের সাদা ভাত যাতে জিরার ঘ্রান পাওয়া যায়। এমন মজার ঘ্রান তো আগে কখনো পেয়েছি বলে মনে পড়েনা। জিজ্ঞেস করতেই এক গাল হেসে পাশান বাহাদুর জানায় চালের নাম ‘জিরা পসিনা’,নেপালের বিখ্যাত চাল। আমাদের দিনাজপুরের কাটারীভোগ চাল হার মানবে এ চালের কাছে। এই সুগন্ধি ভাতের সাথে বাঁধা কপির গরম ভাজি, দেশী মুরগীর কারি, আলোর ভর্তা ,মসুর ডাল ও জীবন্ত খাসির মাংস। সব খাবার উনুন থেকে নামিয়ে সার্ভ করছে। খাবারতো নয় যেন অমৃত! রাকেশ জানতে চাইলো ‘খাসির মাংস কোথায়’? ‘চুলায়’ বিনয়ের সাথে জানায় কিশান ছৈত্রী নামে তরুনটি। ‘চুলায়’ গেলো নাকি? অবশ্য মিনিট পাচেকের মধ্যে জীবন্ত খাসির গরম গোাশতের কারী চলে আসে টেবিলে রাখা সসপেনে। কিছুটা ঝাল ঝোল সমেত খাসির তরকারী খেয়ে মনে হয় আরেকটি অমৃত খেলাম। সদ্য জবাই করা খাসির মাংস ছোট ছোট টুকরা করে ঝোল দিয়ে রান্না করা হয়েছে। ঝোল ছিলো খানিকটা ঝাল যা ছিলো তৃপ্তিদায়ক। একজন বলে জীবন্ত খাসি মানে কি? তাহলে কি মরা খাসিও খাওয়ানো হয়? না বিষয়টি হলো হোটেল রেষ্টুরেন্টে যে মাংস বা মাছ রান্না করা হয় তা ফ্রিজে সংরক্ষিত বেশ কিছু দিন আগের। আমাদেও দেশেও অনেকটা তাই। কিন্তু এখানে আজকে যে খাসির মাংস রান্না করা হয়েছে তা রান্নার কিছুক্ষণ আগে জবাই করা খাসির মাংস যা ফ্রেস। এটাই হলো ওদেও জীবন্ত খাসি! খাওয়া শেষে সকলের একই মত এমন হোমলী খাবার গোটা ভ্রমনে আর খাওয়া হয়নি। জয়তু রাকেশজী! সে আগে থেকেই এ হোটেলে এসে মেন্যু ঠিক করে রেখেছিলো বলে এমন সুস্বাদু নেপালী কুজিনের স্বাদ গ্রহন করতে পারি। তৃপ্তির ঢেকুর তোলে বাসে উঠি। যাত্রা এবার ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট।
বিদায়ের আগে নেপালের আরো কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই যা পাঠকের জানার পরিধিকে সমৃদ্ধ করবে।
তেরাই অঞ্চল ঃ নেপালের শষ্য ভান্ডার
ভৌগলিক বা ভু-প্রকৃতিগতভাবে গোটা নেপালকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন ক. হিমালয়ান রিজিওন খ. হিলি রিজিয়ন ও গ. তেরাই রিজিয়ন। তেরাই রিজিয়ন সমগ্র নেপালের ১৭% অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এলাকাটি নেপালের দক্ষিনাঞ্চলে ভারত-নেপাল সীমান্ত ঘেঁষে পূর্ব থেকে পশ্চিমাঞ্চলে বিস্তৃত। এ অঞ্চলকে নেপালের শস্য ভান্ডার বলা হয়। কেননা পাহাড় পর্বত বেষ্টিত নেপালের অধিকাংশ ভুমি চাষাবাদ অযোগ্য। তেরাই অঞ্চলের বেশীরভাগ এলাকা সমতল ভুমি। নেপালের প্রধান তিনটি নদী কুশি,নারায়নী ও কার্ণালী এ অঞ্চল দিয়ে প্রভাহিত হচ্ছে। তাছাড়াও অসংখ্য ছোট বড় নদী রয়েছে যাদের প্রবাহের কারনে এ অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত উর্বর। ফলে ধান,পাট, গম,আখ,তামাক,আলু ইত্যাদি নানা জাতীয় ফসল প্রচুর পরিমানে উৎপন্ন হয়। সারা দেশের খাদ্য শস্য এ অঞ্চল থেকেই সরবরাহ করা হয়। এ অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে নেপালের অধিকাংশ শিল্প কারখানা। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশের সবচেয়ে অগ্রসর অংশ। এলাকাটি দক্ষিণ নেপালের পূর্বাংশের মেসিনগর থেকে একেবারে পশ্চিমাংশের মহাকালী পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রস্থে ২৬ থেকে ৩২ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত । তবে পূর্বদিকে এর প্রশস্তা বেশী। তেরাইয়ের দক্ষিনাঞ্চলের ভুমি অত্যন্ত উর্বর,উত্তারাঞ্চলের ভুমি পাথর,বোল্ডার ও বালিতে পরিপূর্ণ। তেরাই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়,ফলে বন্যার প্রাদুর্ভভাব দেখা দেয়।
এই তেরাই আবার আউটার তেরাই(ঙঁঃবৎ ঞবৎধর ) ও ইনার তেরাই (ওহহবৎ ঞবৎধর)নামে দু’অংশে বিভক্ত। ইনার তেরাই একটু উঁচু ভুমি, পাহাড় ও উপত্যকা বেষ্টিত, অপেক্ষাকৃত কম উন্নত, আবহাওয়া শীতল। সেখানে ব্যাপক আকারে ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব থাকায় আদিবাসী থারু জনগোষ্ঠি ছাড়া অন্যরা হয় মৃত্যুবরণ করেছে নতুবা আউটার তেরাই বা অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। থারুরা ম্যালেরিয়ার সাথে লড়াই করে টিকে গেছে। অবশ্য বর্তমানে ম্যালেরিয়া আর সেখানে নেই বললেই চলে।
আউটার তেরাই এর বেশীর ভাগ এলাকা নীচু ও সমতলভুমি, কৃষি ও আবাদযোগ্য,আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে উষ্ণ। আউটার তেরাই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শহর হলো ভদ্রাপুর,মেসিনগর,বিরাটনগর,ইনারুয়া,ইটাহারী,লাহান,রাজবিরাজ,জানকপুর,বিরিজগাংগ,বাতুয়াল ও সিদ্ধার্থনগর।
তেরাই নিয়ে লেখার কারন হলো আমাদের ভ্রমণটির একটি বড় অংশ ছিলো তেরাই অঞ্চল দিয়ে। আমরা ধারনা করেছিলাম পাহাড়ী দেশ নেপালে যাচ্ছি গহীন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। একথা সত্য গহীন অরণ্য দিয়েও গিয়েছি,তবে বেশীরভাগ পথ ছিলো সমতল অঞ্চল দিয়ে। আর সমতল এলাকাই হলো তেরাই।
তেরাই অঞ্চলের আদিবাসী হলো থারু নৃগোষ্ঠি। আর অধিকাংশ হলো ভারতীয় বংশদ্ভুত। ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশ অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে তেরাই অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে এবং এক পর্যায়ে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বৃটিশ আমলে তেরাই অঞ্চল নেপালের প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে তেরাই অঞ্চল হলো বসবাসের জন্য সবচেয়ে লোভনীয় জায়গা,ফলে পাহাড়ী অঞ্চল থেকে লোকজন এখানে প্রায়ই চলে আসে বসতি গড়ার জন্য। তেরাই অঞ্চল চারটি জায়গা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা নিয়ে শুধু তেরাইবাসীই নয় গোটা নেপালই গর্ব করে, সারা বিশ্বে এর পরিচিতিও কম নয়। যেমনঃ
পূণ্যভুমি লুম্বিনী ঃ মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান
বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক মহামতি সাক্ষ্যমুণী গৌতম বুদ্ধ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই লুম্বিনী শহরের এক রাজ পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র স্থান।সারা বিশ্বের বৌদ্ধরা এই শহরে আসেন পূণ্য লাভের আশায়। পুরাতন লুম্বিনী শহর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে শহর তৈরী করা হয়েছে। আমাদের বাস বহর এই শহরের পাশ দিয়েই অতিক্রম করে। দুঃখের বিষয় অনেক পথ চলে যাওয়ার পর এটা জানতে পারি। তখন অবশ্য রাত হয়ে গিয়েছিলো,যাওয়া সম্ভব হতোনা, আর ইচ্ছে করলেই নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করা যায়না। তাছাড়া আমাদের প্রায় ৫০ সদস্যের প্রতিনিধি দলে মনে হয় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী কেউ ছিলোনা । থাকলে হয়তো স্মরণ করতো এ ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থানটির কথা।
তীর্থস্থান জানকপুরঃ সীতার জন্মস্থান
জানকপুর প্রাচীন রাজ্য মিথিলার রাজধানী এবং হিন্দু ধর্মের প্রবাদ পুরুষ দেবতা রামের স্ত্রী সীতার জন্মস্থান। ্উভয় কারনেই এর খ্যাতি সারা ভারতবর্ষ জুড়ে। রামের সাথে সীতার বিয়ে এ শহরেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বলে কিংবদন্তি রয়েছে। বর্তমানে জানকপুর তেরাই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য পূণ্যস্থান। সারা বছরই পূণ্যার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। এখানে আছে জানকী মন্দির, রাম সীতা বিবাহ মন্দির,ধানুষ সাগরসহ নানা রকম স্থাপনা। শুধু ধর্মীয় কারনেই নয়, পুরাতন মিথিলার ঐতিহ্যবাহী আর্ট এন্ড ক্রাফট পূর্নজীবিত করার সেন্টার হিসেবে এটাকে গন্য করা হয়।
চিতোয়ান ন্যাশনাল পার্কঃ দক্ষিন নেপালের সবচেয়ে পরিকল্পিত ও প্রাকৃতিক শোভা মন্ডিত পার্ক হলো চিতোয়ান ন্যাশনাল পার্ক। এই পার্ক বৃক্ষলতার মাঝে শত প্রজাতির পাখি ও বন্য প্রানীর অবাধ বিচরণ ভুমি। পর্যটকদের আকর্ষনীয় স্থান। পার্ক এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রচুর আবাসিক হোটেল,কটেজ,লজ, রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। আমরা এ পার্কের মধ্যেই প্যারাডাইজ হোটেল নামে একটি সুন্দর হোটেলে এক রাত কাটিয়েছি যা ছিলো খুবই আনন্দদায়ক। এখানে হরিণ ও হাতি ছাড়াও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণভুমি। রাফতি নদীর উপর বাঁধ দেয়ার কারনে লামিটাল নামে একটি কৃত্রিম লেইক তৈরী হয়েছে যা পর্যটক আকর্ষন করে। এই লেইকেও নানা প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য। এই পার্কে প্রচুর ঘাস ও শন উৎপন্ন হয় যা পশুখাদ্য ও ঘরের ছাওনীর কাজে ব্যবহৃত হয়।
রয়্যাল বরদিয়া ন্যাশনাল পার্কঃ এটি তেরাই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ পার্ক। চিতোয়ানের তুলনায় এই পার্ক আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে,ফলে নানা ধরনের জীবজন্তু একান্ত নিজের পরিবেশে নির্বিঘœ বিচরণ করতে পারে। এটি নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্ক যেখানে বাঘ দেখতে পাওয়া যায়।
মধেসীয় জনগোষ্ঠি ও মধেসীয় আন্দোলনঃ ভারত-নেপালের সম্পর্কের পারদ
তেরাই অঞ্চলে বসবাসকারী ভারতীয় বংশদ্ভুত নেপালী জনগোষ্ঠিই মধেসী হিসেবে পরিচিত। ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এদের বসবাস। শত শত বছর ধরে ওরা সেখানে বসবাস করছে। মূলত: ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশ রাজ্য থেকেই ওরা এক সময় অবিভাসী হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তাছাড়া ভারতীয়দের সাথে নেপালীদের বিয়ে -শাদীর ফলেও এদের বংশ বিস্তার হয়েছে । তেরাই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ হলো মধেসীয়। ২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী নেপালের ২ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৫৬ লাখ হলো মধেসী। এদের সাথে বিহার ও উত্তর প্রদেশ রাজ্যের লোকদের শুধু ভৌগলিক নয় আত্মীক যোগাযোগও আপার নেপালীদের চেয়ে অনেক বেশী।
সরকারের বিরোদ্ধে মধেসীরা কমপক্ষে ৩ বার তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০০৭ সাল থেকেই মধেষীরা নিজেদের অধিকার আদায়ে স্বোচ্চার হয়। প্রথমে তারা সকল জাতিগোষ্ঠির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকল্পে নেপালকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। এ বছরই কমিউনিষ্ট পার্টিসহ নেতৃস্থানীয় নেপালী রাজনৈতিক দলগুলি মিলে অর্ন্তবর্তীকালীন শাসনতন্ত্র ঘোষনা করে। কিন্ত এ শাসনতন্ত্রে ফেডারেল উপাদান না থাকায মধেসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠি সংক্ষুব্দ হয়। তারা শাসনতন্ত্রের কপি আগুন লাগিয়ে পুরিয়ে দেয়। দাবী আদায়ের জন্য তারা সরকারের তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পুলিশের গুলিতে একজন মধেসীয় নিহত হলে আন্দোলন জংগী রুপ ধারন করে। উপেন্দ্র যাদব নামে এক মধেসীয় নেতার নেতৃত্বে এ আন্দোলন চলে।
২০০৮ সালে দ্বিতীয় মধেসী আন্দোলন শুরু হয় মধেসী রাজনৈতিক দল মধেসী জনঅধিকার ফোরাম,তেরাই মধেসী লোকতান্ত্রিক পার্টি ও সদভাবনা পার্টির যৌথ নেতৃত্বে। দাবী ছিলো তিনটি,যথাঃ ফেডারেলিজম,আনুপাতিক হাওে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা নির্ধারন। বলাবাহুল্য সরকার ওদের দাবী মেনে নিয়ে অর্ন্তবর্তীকালীন সংবিধানে অর্ন্তভুক্ত করে।
২০১৫ সালে নেপালের পার্লমেন্ট রাষ্ট্রের সংবিধান চুড়ান্ত করে। কিন্তু সেখানে অর্ন্তবর্তীকালীন সংবিধানে অর্ন্তভুক্ত মধেসীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হলে ওরা ক্ষুব্দ হয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রের সকল অঙ্গে আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বাদ দেওয়ায় ওরা সবচেয়ে বেশী সংক্ষুব্দ হয়। শুরু হয় আন্দোলন। তেরাই অঞ্চল থেকে সকল নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবারাহ বন্ধ হয়ে যায়। নেপাল এজন্যে ভারতকে দায়ী করে। তাদের দাবী ভারতের ইন্ধনেই মধেসীরা অবরোধ দিতে সাহস পায়। ভারত নিজেই অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে যদিও ভারত তা অস্বীকার করে। জ্বালানী ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে নেপালী হিন্দুদের সবচেয়ে বড় দু’টি অনুষ্ঠান ‘দশমিনা’( দুর্গা পূজার দশমি) ও দিপালী অনুষ্ঠান উদযাপন করতে পারেনি। ভারতের এহেন অমানবিক আচরণে ক্ষুব্দ হয়ে শুধু বয়স্করাই নয় হাজার হাজার শিশু ও স্কুল ছাত্র রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায় । হাজার হাজার নেপালী শিশুর মনে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা তৈরী হয়। ফলে নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্কের চিড় ধরে। বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় আরেক বড় প্রতিবেশী চীন। তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করে নেপালকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। এখন ভারত নয় চীনই নেপালের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী জানালেন খারেল। আমরা যে মহাসড়ক ধরে কাঠমন্ডু যাচ্ছিলাম খারেল বলে এটা ‘নেপালের লাইফ লাইন’। আর এই লাইফ লাইন নির্মাণ করে দিচ্ছে চীন। যাক আমরা চাই সকল প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়। এ অঞ্চলের সরকারসমূহ ও জনগনের নিবির যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের মাধ্যমেই কেবল সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তবে মধেসীয়দের মধ্যেও আবার নানা রকম বিভাজন আছে, আছে আন্ত:কলহ। কারা মধেসীয় এই নিয়ে বিতর্ক আছে। সাধারনভাবে যারা তেরাই অঞ্চলে বসবাস করে তারাই মধেসীয়- এই ধরনের একটি সাধারন সংজ্ঞা প্রচলিত আছে। এভাবে চিহ্নিত করলে তেরাই অঞ্চলের বসবাসকারীর ৬৯% মদেসীয় এবং নেপালের মোট জনসংখ্যার ২৫ভাগ মধেসীয়। কিন্তু তেরাই অঞ্চলে বসবাসকারী থারু জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ মনে করে তারা মধেসীয় নয়, তাদের ভাষা আলাদা,সংস্কৃতি আলাদা এমনকি ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পূর্ণরুপে পৃথক। থারুরা মোট জনসংখ্যার ৬.৫ শতাংশ। অনেকের মতে ভারত থেকে আগত মেইথিলী সম্প্রদায়ের লোকেরাই মূলত মদেসীয়। এ সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ট,মুসলিমরা সংখ্যালঘিষ্ট। থারুদেও অধিকাংশই প্রকৃতি পূজারী। থারুরা মনে করে তারা আদিবাসী। আসলে এই জাতি বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে ২০১৫ সালের সংবিধানে মধেসীয়দের ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতি স্বত্ত্বার রাজনৈতিক অধিকার যথাযথভাবে অর্ন্তভুক্ত না হওয়ার কারনে।
বেগম হযরত মহল ঃ ভারতের স্বাধীনতার বীর সেনানী
রয়েল হোটেলে শুয়ে শুয়ে নেপালী ইংরেজী দৈনিক পত্রিকা দি হিমালায়ান পড়ছিলাম। হঠাৎ একটি ছোট্ট শিরোনাম ও ছবিতে চোখ আটকে যায়। সংবাদটি হলো নেপালে নিযুক্ত ভারতের মান্যবর রাষ্ট্রদূত মাঞ্জিব সিং পুরী বেগম হযরত মহলের ১৩৯তম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষ্যে কাঠমন্ডু জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে তার কবরে পুস্প স্তবক অর্পন করে শ্রদ্ধা জানান। সচিত্র সংবাদটি পড়ে মন চলে যায় ইতিহাসের কিছুটা পেছনে। আশা করি সচেতন পাঠকের মনে আছে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী দুই মহিয়সী নারীর কথা। তাঁরা হলেন ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মী বাঈ ও অযোধ্যার রানী বেগম হযরত মহল(১৮২০-১৮৭৯)।
হযরত মহলের জন্ম ১৮২০ সালে অযোধ্যার ফৈয়জাবাদ শহরে। পারিবারিক নাম ছিলো মোহাম্মদী খানুম। অসাধারন সুন্দরী ও নৃত্যকলায় পারদর্শী অচীরেই এই নারীর ঠাই হয় অযোদ্ধার নবাব আমজাদ আলী খানের দরবারের হেরেমে। তার রুপে গুনে মুগ্ধ হয়ে যুবরাজ ওয়াজিদ আলী শাহ তার সাথে প্রনণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে যান,তার নাম রাখেন মহক পরী। পরে তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করে বেগমের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। সৌভাগ্যবতী মহক পরী পুত্র সন্তান নাম জন্ম দেয়ায় নবাব খুশী হয়ে তাকে বেগম হযরত মহল উপাধী প্রদান করেন। সেই থেকে তিনি অযোধ্যার বেগম সাহিবা হিসেবে সন্মানীত হন। সা¤্রাজ্যবাদী বৃটিশদের চানক্য নীতির কারনে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ বেশীদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। অযোধ্যা ছিলো সে সময়ে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী দেশীয় রাজ্য। আর রাজধানী লখনো ছিলো শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও সঙ্গীত চর্চার কেন্দ্রভুমি। ফলে বেনীয়া ইংরেজদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে রাজ্যটির উপর। কুখ্যাত স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ করে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে অযোধ্যার শাসনভার অধিগ্রহন করে। নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে কোলকাতার মেটিয়ার বুর্জে নির্বাসনে পাঠায়। অবশ্য নবাবের জন্য তারা উপযুক্ত বৃত্তি মঞ্জুর করে। কিছুটা দুর্বল চিত্তের লোক ওয়াজিদ আলী শাহ অনিচ্ছা স্বত্বেও নির্বাসনের জীবন মেনে নিয়ে কোলকাতায় চলে আসেন। বাকী জীবন মেটিয়া বুরুজেই কাটিয়ে দেন । মৃত্যুর পর তাকে এখানে তার প্রতিষ্ঠিত ইমামবাড়ায় সমাহিত করা হয়। নবাব ছিলেন আজীবন আমোদে মানুষ।শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমজদার মানুষ। তিনি নিজে কাব্য ও সঙ্গীত চর্চা করতেন এবং গুনী মানুষের পৃষ্টপোষকতা করতেন। তিনি আজীবন হিন্দুস্থানী ঠুমরী ও খেয়াল সঙ্গীতের পৃষ্টপোষকতা করেছেন। নিজ রাজ্য ও মানুষের প্রতি দরদী হতভাগ্য এই নবাব শেষ জীবনে নি¤েœর সঙ্গীতাংশ গেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।
‘যব ছোড় চলে লক্ষেèৗ নগর
কায়া হালে আদম পরা কেয়া-গুজারী’

নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ নির্বাসনে যাওয়ার সময় বেগম হযরত মহলকে সঙ্গী হতে অনুরোধ করলে স্বাধীনচেতা বেগম তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি প্রাসাদেই থেকে যান। ১৮৫৭ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের (ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করে) সময় মোঘল সম্্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এর নেতৃত্বে ভারতীয় সৈন্যরা বৃটিশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে এই মহিয়সী নারী হযরত মহল ও লক্ষèী বাঈ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। হযরত মহল তার ১৪ বছর বয়ষী নাবালক সন্তান বিরজিস কদরকে অযোধ্যার নবাব হিসেবে ঘোষনা করেন এবং তার পক্ষে নিজে শাসনভার গ্রহন করেন। নানা সাহেব ও ফৈজাবাদের মৌলভীর সাথে মিলিত হয়ে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু শেষ অবধি কিছু লোকের বিশ্বাসঘাতকতায় সুচতুর ইংরেজ বাহিনীর সাথে কুলিয়ে উঠতে পারেননি। ইংরেজরা অযোধ্যা দখল করে নেয় । হযরত মহলকে আত্মসমর্পনের বার্তা পাঠালে তিনি ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে পুত্র বিরজিস কদর ও তার অনুগত সৈন্যবাহিনী নিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র নেপালে আশ্রয় গ্রহন করেন। ইংরেজ সৈন্যরা দিল্লী ও এর আশেপাশের শহর নগর ও দেশীয় রাজ্যগুলিতে নির্বিচারে গনহত্যা চালায়। হযরত মহল পরাজয়ের পরও ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। শেষ পর্যন্ত অসম প্রতিপক্ষের সাথে টিকতে না পেরে তিনি অবশেষে পুত্র বিরজিস কদর ও তার অনুগত সৈন্যবাহিনী নিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র নেপালে আশ্রয় গ্রহন করেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে আনুগত্যের বিনিময়ে সন্মানজনকভাতা ভাতা ও আবাসনের প্রস্তাব দিলে তিনি ঘৃনাভরে প্রথ্যাখ্যান করেন। স্বাধীন দেশে মুক্ত বাতাসে আজীবন শারণার্থীর জীবন কাটিয়ে অবশেষে ১৮৭৯ সালের এপ্রিল মাসে এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী ইন্তেকাল করেন। কাঠমন্ডু জামে মসজিদ প্রাঙ্গনেই তিনি চির নিদ্রায় শায়িত হন। শেষ জীবনে তিনি কবিতা লিখে সময় কাটান। মায়ের মৃত্যুর পর পুত্র বিরজিস কদরকে বৃটিশ সরকার পিতা ওয়াজিদ আলী শাহ এর কাছে চলে আসার অনুমতি দিলে তিনি মেটিয়া বুরুজ চলে আসেন।
অত্যন্ত অনাড়ম্বর ও অবহেলায়ই শুয়ে ছিলেন এতদিন। মাত্র কয়েক বছর আগে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি শামীম আনসারী আবিস্কার করেন যে কত বড় মাপের স্বাধীনতা সংগ্রামী তাঁর মসজিদ প্রাঙ্গনে কত অবহেলা ও অনাদরে শুয়ে আছেন। মূলতঃ তাঁরই উদ্যোগে কয়েক বছর আগে কবরগাহে পুস্প স্তবক অর্পণের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়ে থাকে। পরে তিনি এ কার্যক্রমে ভারতীয় দুতাবাস ও কোলকাতায় বসবাসরত মরহুমার আত্মীয় স্বজনকেও সম্পৃক্ত করেন। এ বিষয়ে তাঁকে সহায়তা করেন তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত শ্রীমান রঞ্জিত রাও। এখন প্রতি বছর ১৮ এপ্রিল কবর প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং কবরে পুস্প স্তবক ও গিলাপ দিয়ে আবৃত করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ বছর হযরত মহলের আত্মীয়দের মধ্যে ডাঃ তালাত ফাতিমা,মানযিলাত ফাতিমা ও কামরান মীর্যা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ বছর আরেকটি নতুন সংযোজন হলো বেগম হযরত মহলের সংগ্রামী জীবনের উপর নির্মিত ২৬ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারী প্রদর্শন। প্রখ্যাত চলচিত্রকার মহী উদ্দীন মীর্যা নির্মিত এই ডকুমেন্টারী নেপাল-ভারত লাইব্রেরীতে প্রদর্শন করা হয়। সম্প্রতি হযরত মহলের এক ভক্ত তার গোরে একটি চমৎকার এপিটাফ লাগিয়েছে;
এই বার-ই সাবা আইস্তা চাল
ইহাহে সোয়ে হোই হাই মাহাক পরী
( ঙদ ুবঢ়যুৎ, নষড়ি ংবিবঃষু ধহফ পধষসষু
ঐবৎব ষরবং ংষঁসনবৎ গধযধশ ঢ়ধৎর )
যাক পাঠক হয়তো মনে করবেন ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি,কিন্তু এ যে ভারবর্ষের স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, তাকে অবহেলা করি কিভাবে যা অনেকটা কুড়িয়ে পাওয়ার মতো! পুরোনো পত্রিকাটি না পড়লে আমিও হয়তো এতটা উৎসাহী হতামনা। নিজেও জানলাম পাঠককেও যতকিঞ্চিৎ জনালাম। হাতে সময় থাকলে এই বীর সন্তানের কবরগাহে একগুচ্ছ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারতাম। যারা কাঠমন্ডু যাবেন তারা এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতি বিজড়িত স্থানটি দেখতে যাবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করে এ প্রসঙ্গের ইতি টানছি।
নেপাল ঃ রাজতন্ত্র থেকে গন তন্ত্র ও সম্প্রীতির জনপদ
নেপালের সরকার ব্যবস্থা,প্রশাসনিক কাঠামো ও সমাজ সম্পর্কে জানার উৎসাহ থাকতে পারে অনেকের। সে সম্পর্কে সংক্ষেপে বলছি। নেপাল রাষ্ট্রের আয়তন মোটা দাগে ১ লক্ষ ৪৭ জার বর্গ কিলোমিটার যা আমাদের তুলনায় সামান্য বেশী। আমাদের দেশের মোট আয়তন ১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার। কিন্তু নেপালের জনসংখ্যা মোটামুটি ৩ কোটির মতো,আর আমাদের লোকসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। যদিও মাথা পিছু আয় ও স্বাক্ষরতার হার বিচেনায় আমরা ওদের তুলনায় খানিকটা এগিয়ে আছি। নেপাল একটি রাজতান্ত্রিক দেশ ছিলো প্রায় হাজার বছর ধরে। রাজাই ছিলেন শাসন ক্ষমতার শধ্যমণি। ২০০৮ সালে তীব্র গন আন্দোলনের ফলে রাজতন্ত্র বিলোপ হয়ে যায়। ফেডারেল রাষ্ট্র এবং পার্লামেন্টারী শাসন পদ্ধতি চালু হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। নেপালে মোট জেলার সংখ্যা ৭৫। ২০১৫ সালে ফেডারেল সংবিধানের আওতায় ৭টি প্রদেশ গঠন করা হয়েছে,কিন্তু প্রদেশের নাম দেয়া হয়নি , ১ নং প্রদেশ ২ নং প্রদেশ এভাবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে প্রাদেশিক পার্লামেন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রদেশের নাম নির্ধারন করবে । মোদ্দা কথা হলো নেপালের গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এখনো শক্তিশালী ভিতের উপর দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায়। মাওবাদী কমিউনিষ্ট পার্টি সরকার পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রি কে.পি. শর্মা ওলি একজন বামপন্থী রাজনীতিবিদ। রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী নেপালের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি যিনি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হযেছেন। তিনি কমিউনিষ্ট পার্টি অব নেপাল (ঈচঘ) এর সভানেত্রী ছিলেন। নেপালের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল নেপালী কংগ্রেস, দলটি দীর্ঘদিন নেপাল শাসন করেছে। নেপালী কংগ্রেস ঐতিহ্যগতভাবে ভারতমুখি। আর বামপন্থীরা চীন পন্থী। বর্তমান বামপন্থী সরকার বিভিন্ন সময়ে ভারতের আচরণে বেজায় ক্ষুব্দ। ফলে তারা চীনের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট। চীন বর্তমানে নেপালের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সবচেয়ে বড় সহযোগি। নেপালী কর্মকর্তাদের কথাবার্তা থেকেও তা আঁচ করতে পেরেছি।
নেপালের রাষ্ট্র ভাষা নেপালী। তবে অন্যান্য অঞ্চলিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষাও সরকারীভাবে স্বীকৃত। ভোজপুরী,বাজিকা,দোতেলী,গুরং,কিরান্তি,লিম্বু,মাগার,মেইতিলী,নেওয়ার,রাই,শেরপা,তামাং, থারু ও উর্দু ভাষা সরকারীভাবে স্বীকৃত ভাষা। সকল জাতিগোষ্ঠির মাতৃভাষার প্রতি সন্মান প্রদর্শনের এক প্রকৃষ্ট উদাহরন।
২০১৫ সালে ফেডারেল সংবিধান প্রনয়রে পূর্বে নেপাল ছিলো বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। কিন্তু নতুন সংবিধানে নেপালকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছে। অনেকে ভাবতে পারেন তাহলে ভারত কি হিন্দু রাষ্ট্র নয় ? না, ভারত ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র যদিও জনসংখ্যার শতকরা ৮০ভাগই হিন্দু। কিন্তু নেপালে বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অত্যন্ত চমৎকার। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও নেপালে তা একেবারেই অনুপস্থিত অত্যন্ত গর্বের সাথে জানালেন একজন নেপালী কর্মকর্তা। নেপালীদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা সত্যিই প্রশংসনীয় । নেপালের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি থেকে প্রতিবেশীরা শিক্ষা নিতে পারে। নেপালের মোট জনসংখ্যার ৮১ ভাগ হিন্দু, ৯ভাগ বৌদ্ধ ও ৪.৫ ভাগ মুসলমান,বাকীরা খৃষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু। মুসলমানরা মোটামুটি স্বাধীনভাবেই তাদের ধর্মকর্ম পালন করতে পারে। চাকুরী বাকুরীর ্েক্ষত্রেও তেমন কোন বৈষম্য নেই। যোগ্যতা থাকলে যে কোন সম্প্রদায়ের লোক নিয়োগ পেতে পারে। নেপালের মুসলমানদের মোটা দাগে কাশ্মীরি, মধেসী ও তিব্বতি এই তিন ভাগে করা যেতে পারে। মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৯৭ ভাগই বাস করে তেরাই অঞ্চলে। তেরাই অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানদের অধিকাংশই ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশ অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিবাসী হয়েছে। তিব্বতের রাজধানী লাসা ও লাদাক অঞ্চল থেকেও অনেক মুসলমান অভিবাসী হয়েছে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের পর অনেক মুসলমান নেপালে আশ্রয় গ্রহন করে।
কাশ্মীরি মুসলমানরা বাস করে কাঠমান্ডু শহর এলাকায়। ব্যবসা বানিজ্য ও চাকুরী বাকুরীতে ওরা এগিয়ে আছে। তাদের কেউ কেউ রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত ছিলো,সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রিও হয়েছেন। কাশ্মীরি বংশদ্ভুত মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে যারা উচ্চ পদে নিয়োগ লাভ করেন কিংবা সমাজ ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হন তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি: সৈয়দ আনোয়ার শাহ(সৌদি আরবে নেপালের সাবেক রাষ্ট্রদূত)ডাক্তার মঈন শাহ(কাঠমান্ডুর খ্যাতিমান চিকিৎসক),সৈয়দ মইন শাহ( ডিরেক্টর,কৃষি বিভাগ,নেপাল),ডক্টও খাজা মোহাম্মদ মহসিন( রাজার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা),ফিদা মোহাম্মদ হাসনাইন( ইতিহাসবিদ),ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ শামীম শাহ ও সৈয়দ নেহাল শাহ( খাদিম, কাশ্মীরি তাকিয়া মসজিদ) ও সৈয়দ ফখরে শাহ(কাঠমান্ডুর বিশিষ্ট স্বর্ন ব্যবসায়ী) প্রমুখ। খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে বিখ্যাত দরবেশ হযরত বাবা মিশকিন শাহ কাশ্মীরি(রঃ) ও তদীয় ভাইপো হযরত বাবা গিয়াস উদ্দিন কাশ্মীরি(রঃ) কাশ্মীর থেকে কাঠমান্ডু আসেন ইসলাম প্রচারের জন্য। রাজা রতœ মল্ল(১৪৮৪-১৫২০) দুই দরবেশকে সন্মানের সাথে গ্রহন করেন। রাজা দরবেশগনকে কিছু কাশ্মীরি ব্যবসায়ীকে কাঠমান্ডুতে বসবাস করার জন্য নিয়ে আসার অনুরোধ করেন। তাঁরা কিছু কাশ্মীরি ব্যবসায়ী যারা তিব্বতে ব্যবসা বানিজ্যে নিয়োজিত ছিলো তাদেরকে কাঠমান্ডুতে ব্যবসা ও স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য নিয়ে আসেন। আজ প্রায় ৬০০ বছর পর তারা ৩০০ পরিবারে উন্নীত হয়েছে। নিজ সম্প্রদায়ের আভিজাত্য বজায় রেখে কাঠমান্ডুর সমাজ জীবনে তারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে সন্মানের সাথে বসবাস করছেন। নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে তাদের বিয়ে শাদির প্রচলন নেই। সর্বদা কাশ্মীরি আভিজাত্যের ছাপ বজায় রেখে চলাফেরা করে।
মধেসী মুসলমানরাও একেবারে পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি মোহাম্মদ লালবাবু রাউথ গাড্ডি নামে একজন মুসলমান রাজনীতিবিদ ২ নং প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিগতভাবে তিনি মধেসীয়। তিনিই প্রথম মুসলমান যিনি মুখ্যমন্ত্রি পদে নিযোগ লাভ করেন।
আনন্দঘন সফর ঃ কুশিলব সকলে
পুরো সফরটি ছিলো একই সাথে চ্যালেঞ্জিং,কষ্টকর,রোমান্টিক এবং কিছুটা আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে আটকানো। তবে এটিকে আনন্দঘন করার জন্য আমরা নিজেরাই নেমে পড়ি মাঠে। বাস ছিলো দু’টি। ঢাকা থেকে যাত্রার সময় প্রথমটিতে বাংলাদেশে টিমের অধিকাংশ ও পুরো নেপালী টিম ছিলো। ভারতের পুরো টিম ও বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ছিলো দ্বিতীয় বাসে। আমাদের বাসে শুরু হয় নানা রকম আয়োজন,যেমন কবিতা আবৃত্তি,জোকস বলা(সেন্সরড ও আনসেন্সরড) ও সঙ্গীত পরিবেশন। শুরুতে পারফর্মারের অভাব হলেও শেষ দিকে নানান বিষয়ের শিল্পীর প্রাচুর্য ছিলো। আমাদের টিমে ছিলেন যুগ্ম সচিব চন্দন কুমার দে ও উপসচিব সুলতানা ইয়াসমিন,প্রকৃত অর্থেই দু’জন সঙ্গীত শিল্পী,আর বিভিন্ন বিষয়ে অপেশাদার শিল্পীর তো অভাবই ছিলোনা। নেপালী টিমে গোবিন্দ প্রাসাদ খারেল যেন একাই একশ। নেপাল সরকারের ফিজিক্যাল ইনফ্রাষ্ট্রাকচার বিভিাগের আন্ডার সেক্রেটারী বহুমুখি প্রভিার অধিকারী খারেল পুরো ভ্রমনের মধ্যমণি হয়ে উঠে। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও সুকুমার বৃত্তি চর্চায় তিনি বেশ পারঙ্গম। নেপাল ফরেন সার্ভিসের আন্ডার সেক্রেটারী রোশান খানাল,আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের আন্ডার সেক্রেটারী মিস রামপাইয়ারী সুনাওয়ার,ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর মি .রাজু প্রাসাদ পাওডেলও বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ গ্রহন করে মাতিয়ে রেখেছে। তারা নেপালের দেশাত্মবোধক ও ফোক সঙ্গীত পরিবেশন করে বেশ আনন্দ দেয়। আমাদের চন্দন কুমার দে রবীন্দ্র সঙ্গীত,নজরুল সঙ্গীত,আধুনিক ও হারানো দিনের গান পরিবেশন করে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করে। সুলতানা ইয়াসমিন ছিলেন অনেকটা সব্যসাচী। কোন ধরনের গান সে পরিবেশন করেনি? তবে লালমনিরহাট জেলার বাসিন্দা সুলতানার কন্ঠে ভাওয়াইয়া যেন জীবন্ত হয়ে উঠে,যেন ফেরদৌসি রহমান নিজেই গাইছিলেন। প্রধানমন্ত্রির অফিসের মহাপরিচালক নীলিমা আক্তার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মাসুক হোসেনও কম যায়নি। ওরা বেশ ভালো গান গেয়েছে। কবিতা আবৃত্তিতে আজহারুল ইসলাম খান,নীলিমা,সুলতানা, আলমগীর হোসেন,মাসুক হোসেন,মতিউল চৌধুরী,মান্নান সরদার প্রমুখ অংশ গ্রহন করেন। অনেকের আবৃত্তি ছিলো হৃদয়গ্রাহী। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় গাইবান্দার ললনা নীলিমার প্রেমের কবিতার আবৃত্তি ছিলো সত্যিই উপভোগ্য। জোকস বলাতে মনিন্দ্র মজুমদার, মতিউল, আজহার খান এমনকি দলনেতা ফরিদ আহমদ ভূঁইয়াও বাদ পড়েননি। একেকজনের জোকস শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। এ অধম সকলের চাপাচাপিতে দেশের কটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে পার পায়। সকল পরিবেশনায় হিউমার ছিলো ষোল আনা। এভাবেই পাঁচ/ছয়টি দিন আনন্দঘন পরিবেশে কাটাই। আমরা জানি জীবনে হয়তো আর কখনো এভাবে এমন পরিবেশে সড়ক পথে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাবোনা। পরিবেশ হালকা করার জন্য দলনেতা শুরুতেই “ আমলাতান্ত্রিক ভাব’ পরিহারের অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে দেন। নেপালে প্রবেশ করার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ আনন্দঘন পরিবেশ বজায় ছিলো। আমাদের দু’জন গাড়ী চালক ও চালকের সহকারী সম্পর্কে দু’কথা না বললে ওদের প্রতি অবিচার করা হবে। ওদের অমানুষিক পরিশ্রম,দক্ষতা ও নিষ্ঠার কারনে এত দীর্ঘ পথ আমরা নির্বিঘেœ অতিক্রম করতে পেরেছি। শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ , তার কাকা ও সহযোগিরা ভ্রমণটিকে আনন্দদায়ক ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভুমিকা পালন করেছে। অকপটে বলতে পারি শুভঙ্কর মোটেও ভয়ঙ্কর ছিলোনা,কিংবা কোন শুভঙ্করের ফাঁকিও দেয়নি,কিংবা শুভঙ্কর ঘোষ কারো কাছ থেকে খায়নি কোন ঘুস! রাকেশ আমাদের দিতে আরাম আয়েশ,দিন রাত খেটেছে বেশ!
গুড বাই কাঠমান্ডু গুড বাই নেপাল ঃ আসতে চাই আবার
ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে ঢুকে প্রথমেই মনে পড়ে সম্প্রতি ইউএস বাংলার মর্মান্তিক এয়ার ক্রাফট দুর্ঘটনার কথা। বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ এরও অধিক যাত্রীর প্রান যায় সে দুর্ঘটনায়। নিহতদের বেশীরভাগই বাংলাদেশী। এক ধরনের ভয় ও সংশয় মনের অজান্তেই ভিড় করে। অনেকেই নিষেধ করেছিলো আকাশ পথে ফেরার জন্য। আমরা মনকে শক্ত করি এই বলে ‘জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য,অমর কবে কেহ রয়’। তাছাড়া অনেকে বলেন জন্ম ও মৃত্যুর বিষয়টি ¯্রষ্টা নিজের হাতে রেখেছেন ,কে কবে কখন কিভাবে মারা যাবে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। আরেকজন বলেন জন্ম ,মৃত্যু ও বিয়ে এই তিন জিনিস হাতে রেখে বাকী সব মানুষের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। বিয়ের মতো একটি কম গুরুত্বপূর্ন বিষয় কেন যে উপরওয়ালা নিজ হাতে রাখলেন! এখানেও আধুনিক যুগের মানুষ কিছুটা বৈষম্যের শিকার! আগেকার দিনের পুরুষরা নিদেন পক্ষে ৩/৪ জন বিবির ছোহবত পেতো অনায়াসে! বেশ দাপটের সাথে তেনাদের নিয়ে ঘর গেরস্থালী করতেন। আর এখন শতকরা ৯৮ জনের ভাগ্যে একজনের বেশী জোটেনা! শুধু কি তাই,এই একজনকে সামলাতেই বেচারা পুরুষটি জেরবার হয়ে যায়! যাক ওসব কথা, নিজে বাচলে বাপের নাম।এখন ভাবতে হচ্ছে আকাশ যানে যাত্রার নিরাপত্তার কথা। মৃত্যু যেহেতু উপরওয়ালার হাতে সে বিষয়ে আমাদের কোন করনীয় নেই, অহেতুক চিন্তা বাড়িয়ে ভ্রমণের আনন্দটুকু মাটি করার কোন ফায়দা নেই। তাছাড়া আমরা যে বিমানে ঢাকা যাচ্ছি সেটি তো ইউএস বাংলার এয়ারক্রাফট নয়, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের । তাই চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই।
টার্মিনালের প্যাসেঞ্জারস লাউঞ্জে বসে প্রশস্ত খোলা পথ দিয়ে এয়ারপোর্টের রানওয়ে দেখছিলাম,অনেকেই দুর্ঘটনার জায়গাটি দেখতে উদগ্রীব, কিন্তু কাউকে পাওয়া গেলনা ওটি দেখিয়ে দেয়ার জন্য। কাঠমন্ডু এয়ারপোর্টটি দেখতে একেবারেই সাদামাটা, কোন চাকচিক্য নেই,নিতান্তই সেকেলে ডিজাইনে তৈরী,আকারেও ছোট, মনে হয় সংস্কার করা হয়না দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু ফ্লাইট ফ্রিকুয়েন্সি অনেক বেশী। কারন একটাই প্রচুর ট্যুরিষ্ট আসে নেপালে হর রোজ। আর তা এই কাঠমন্ডু বিমান বন্দর দিয়েই। বিশ্বের অনেক নামী দামী এয়ার লাইন্সের বিমান এখানে আসে পর্যটক ভর্তি করে। তিনদিকে পাহাড় বেষ্টিত চোট্ট এক চিলতে উপত্যকায় রানওয়ে। ফলে বড় বড় এয়ারক্রাফট এখানে নামতে পারেনা। পাহাড় বেষ্টিত হওয়ার কারনে উড্ডয়ন ও অবতরনে বেশ ঝুঁকি থাকে। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে উঠলাম বিমানে দুরু দুরু বুকে দোয়া দুরুদ পাঠ করে। বিমান ছাড়তেও অনেক বিলম্ব হয়। এয়ার হোস্টেজ জানায় এখন দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে হয় এবং অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে অবতরনের অনুমতি দেয়া হয়। উড্ডয়নের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা। যাক জীবন বাঁচাতে বিলম্ব কোন সমস্যা নয়।
যাত্রীদের অধিকাংশই কাতারগামী নেপালী শ্রমিক। ওদের একজনের সাথে আলাপ হলো, সে প্রায় ১০ বছর যাবৎ কাতারে আছে। একটি কোম্পানীতে গার্ডের কাজ কওে, তার সাথে অনেক বাংলাদেশীও কাজ করে। সে কিছুটা বাংলা বলতে ও বুঝতে পারে। সে বাংলাদেশীদের খুবই পছন্দ করে। সে জানায় মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় প্রচুর নেপালী কাজ করে। অধিকাংশই বিভিন্ন অফিস আদালতে,কল কারখানায়, শপিং মলে ও বাসা বাড়ীতে দারোয়ানের কাজ করে। ওদের সাহস,কর্তব্য নিষ্ঠা ও বিশ্বস্থতার কারনে মালিকরা খুব পছন্দ করে। বেতন ভাতা ভালো বলে জানায়। একথা ধুলিখেল লজের দ্বার রক্ষক কেশ বাহাদুরও বলেছিলো। সেও এক যুগের বেশী সময় মালয়েশিয়ায় চাকুরী করে নেপালে ফিরে আসে। কুযালালামপুরে তার সাথে অনেক বাংলাদেশী কাজ করতো। কারো কারো সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। সেও বাংলাদেশীদের পছন্দ করে। আমরা বাংলাদেশী জানতে পেরে দুই হাত জোড় করে প্রনাম করে । আমরা ওর সাথে ছবি তুলি, এতে সে আনন্দে জড়িয়ে ধরে আমাকে। হায়রে মানুষের সারল্য,মানুষের ভালোবাসা! সাধারন মানুষের মধ্যে কোন ভেদ বুদ্ধি নেই,যতসব আমাদের মতো তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে।
বিমান চলার কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো সামনের বিজনেস ক্লাসের সীটগুলি একেবারে ফাঁকা। কেবিন ক্রুর অনুরোধে আমরা কয়েকজন সেখানে গিয়ে বসি। সে জানায় আবহাওয়াটা ভালো হলে মাউন্ট এভারেষ্ট দেখতে পাবো। জানালার খোপ দিয়ে বাহিরে দু’চোখ নিবিষ্ট করছি অই বুঝি এভারেষ্ট! পাশে দাঁড়ানো ক্রু ইকবাল জানায় না ওটা ঘন মেঘের দলা। তাকিয়ে আছিতো আছিই। বহু আকাঙ্কিত এভারেষ্ট শৃঙ্গ কিংবা কাঞ্চনজ্গংার আর দেখা মেলেনা। হঠাৎ ইকবাল বললো স্যার তাকান তাকান এভারেষ্ট দেখা যাচ্ছে ! তাইতো সাদা সাদা চৌকানাকৃতির বরফের স্তুুপ সারি বেঁধে বসে আছে,যেন আকাশ ছুঁতে চায়। কোথাও উচুঁ কোথাও নীচু বরফের পাহাড়ের যেন শেষ নেই! দেখে দু’চোখ জুড়িয়ে যায়! আহা অবশেষে দেখার সুযোগ হলো মাউন্ট এভারেষ্টের একটি অংশ। জীবন ধন্য হলো আমাদের। আহা একি কোথায় মিলিয়ে গেলো হটাৎ! ইকবাল বলে কেন দেখতে পাচ্ছেননা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। আর দেখার সুযোগ নেই। যাক বাবা স্বল্প সময়ের জন্য হলেওতো দেখতে পারলাম। বেশ আগে কালিম্পং, মিরিক ও দার্জিলিং গিয়েছিলাম,বিভিন্ন স্পটে গিয়ে চেষ্টা করেছি অধরা কাঞ্চনজঙ্গা কিংবা মাউন্ট এভারেষ্টের কোন শৃঙ্গ দেখতে,এবার নেপালের ধুলিখেল,চন্দ্রগীরি মায় কাঠমন্ডু কোথাও থেকে দেখতে পাইনি। কেবল একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে আসার পথে ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হলো! যাক জীবনের একটি অন্যতম আকাঙ্কা মিটলো যত অল্প সময়ের জন্যই হোকনা কেন।
সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল(র:) আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরের মাটি স্পর্শ করলো রিজেন্ট এয়ারের জাম্বো জেটটি। যাক বাচা গেলো! আল্লাহর কাছে হাজার শোকর নিরাপদে স্বগৃহে ফিরতে পেরে। একরাশ সুখ স্মৃতি নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসি।