স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে আওয়ামী লীগ

প্রকাশিত: ১:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০১৮

স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে আওয়ামী লীগ

নজরুল ইসলাম চৌধুরী, এম.পি
বাংলাদেশ ও তার জনগোষ্ঠি দীর্ঘসময় রাজনৈতিক শাসক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বারা চরমভাবে আক্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রের প্রতি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছিল সে সময় দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়, শিক্ষার হার, খাদ্য উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের হারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবার সূচক ছিল অত্যন্ত নিম্নগামী। বিগত দশ বছরে মানুষের জীবন যাত্রার মান যেমন উন্নত হয়েছে তেমনি নাগরিক সেবা ও অর্থনীতির ভীত দৃঢ় ও সুসংহত হয়েছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিষয়টি যেমন কাল্পনিক নয় তেমনি এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিও সামাজিক গুরুত্ব বহন করে। নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সরকার গঠন হয় যে কোন রাষ্ট্রে। জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন প্রতিফলিত হয় ভোট ব্যাংকের মাধ্যমে। আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রসরতার ভাগ্য নির্ধারিত হবে মূলত দুটো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমটি আওয়ামী লীগের ক্ষমতা টিকে থাকার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়টি আওয়ামী লীগের বিকল্প কোন দলের ক্ষমতায় আসা বা নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারবাহিকতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মনে করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগই পূনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতার দ্বায়ভার গ্রহণ করবে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ৬৯ বছরে সাংবাদিক লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী চট্টগ্রাম ১৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে মহান সংসদের ন্যাম ভবনে সৌজন্য সাক্ষাতে কথা বলেছেন উন্নয়ন-নির্বাচন ও দলীয় সংগঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। রেকর্ড থেকে এখানে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ ২০১৮ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ৬৯তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে বাংলাদেশ। সুপ্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটি স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে যার নেতৃত্বে জননেত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্র ও জনগণের সর্বাধিক উন্নয়ন সংগঠিত করে স্বর্ণযুগের পর্ব ও পর্যায়টিকে কিভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে?
নজরুল ইসলাম চৌধুরীঃ ধন্যবাদ আপনাকে। আওয়ামী লীগের ৬৯ বছরের অগ্রযাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ ও প্রকৃতির ইতিহাসে একটি ঐতিহ্য ও গর্বের প্রতিধ্বনি। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাস। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য আওয়ামী লীগের অবদান ইতিহাসে দলটির স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছে মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর এদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, অগণতান্ত্রিক পন্থায়, সামরিক ক্যু সংগঠিত করে এবং ভোট চুরি করে নানা রাজনৈতিক মতের সরকার গঠিত হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক কোন সরকারই বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অংহকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। পারেনি জনগণের ভাগ্যের সমষ্টিগত পরিবর্তন সংগঠিত করতে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যতবার অধিষ্ঠিত হয়েছে ততবারই বাংলাদেশে জনকল্যাণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সংগঠিত হয়েছে। শুধু স্বাধীনতা অর্জন হয়, শুধু সংবিধান রচনা নয়, শুধু উন্নয়ন নয় আওয়ামী লীগ তার মৌলিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা জনগণের সাথে রাজনৈতিক দলের মৌলিক সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। যা বাংলাদেশে অন্য কোন দল করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অগ্রগামি জনগোষ্ঠির পাশাপশি শোষিত-দরিদ্র শ্রেণীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে। অধিকার প্রতিষ্ঠার এই স্বকীয় ধারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে দৃঢ় করেছে। বঙ্গবন্ধু গরীব-দুঃখি-মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সারাজীবন রাজনীতি করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সমষ্টিগত মুক্তি। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ তার নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বাংলাদেশকে সুখি-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজ বঙ্গবন্ধু করে যেতে পারেননি। তিনি দেশের স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন তিনি পূরণ করতে পারেননি। স্বপ্ন পূরণের পূর্বেই ঘাতকের ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন স্বপরিবারে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনককে ঘাতকরা হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি বিষয়েই গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে খুব দ্রুতই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল স্বমহিমায়। স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ঘাপটি মেরে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর অগ্রযাত্রাকে পর্যবেক্ষণ করেছিল এবং খুব গোপনে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করেছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়েই এদেশে মৌলবাদী শাসক সমাজ জাগ্রত হলো। সাম্প্রদায়িতকতার নকশা বাস্তবায়িত করতে তারা অবাধ সুযোগ পেল জেনারেল জিয়াউর রহমানের সহায়তায়। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চর্চা এখনো অব্যাহত। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সারাদেশে বিএনপি-জামাত যেভাবে সহিংসতা মঞ্চস্থ করেছিল সেভাবে যে ক্ষমতায় আসা যায় না সেটা প্রমাণিত হযেছে পরের বছর ২০১৫ সালে পূনরায় বিএনপি-জামায়াত এদেশে লাগাতার সহিংস আন্দোলন করে দেশকে অস্থীতিশীল করে তুলেছিল। ফলে জনগণ নিরাপত্তা সংকটে পরে যায়। পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সমষ্টিগত জনসমর্থন আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে আসে। আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসের মোকাবেলা করে জনগণকে উন্নয়ন উপহার দিলে জনসমর্থনের সূচক সম্পূর্ণরূপে বিএনপি-জামাতের বিপক্ষে চলে যায়। তারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে মানুষকে পেট্রোল দিয়ে জীবন্ত দগ্ধ করে হত্যা করেছিল পথে প্রান্তরে। শুধু মানুষ নয় গবাদি পশুদেরও তারা পুড়িয়ে হত্যা করে। হত্যা-রাজাজানি-অরাজকতার রাজনীতিতে তারা চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয় জনগণের কাছে। বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদিকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন সন্ত্রাস মোকাবেলার মধ্য দিয়ে অন্যদিকে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তা, জ্বালানী নিরাপত্তা সহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কালজয়ী ভূমিকা পালন করে গেলেন। বাংলাদেশ ২০২১ সালের  ভিশন বাস্তবায়নের পর ২০৪১ সালের  ভিশন বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ বিশ্বে একসময় পরিচিতি লাভ করেছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসেবে। খরা-দূর্ভিক্ষ-দারিদ্রতা-দূর্যোগ বাংলাদেশকে পর্যদস্তু করে ফেলেছিল। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথা মুখে বলা হলেও জনগণ সেটা উপলব্ধি করেনি। অথচ এখন বাংলাদেশ গতিশীল একটি রাষ্ট্র।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ মাননীয় সংসদ সদস্য উন্নয়ন সম্পর্কে আপনি সুনির্দিষ্ট করে আমাদের অভিহিত করবেন কি?
নজরুল ইসলাম চৌধুরীঃ আমার নির্বাচনী অঞ্চলে একজন সামরিক জান্তা দীর্ঘসময় সংসদ সদস্য ছিরেন। তিনি দীর্ঘসময় ক্ষমতায় ছিলেন তবে জনগণের মৌলিক প্রত্যাশা পূরণে তিনি ব্যর্থ হয়েছিরেন। তিনি সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। আমাদের অঞ্চলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন তিনিই। কর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াত। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হতো। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে এই সামরিক জান্তা আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ১১০০ মিথ্যা মামলা দেয়া হলো। পরবর্তীতে আমরা কোর্টে যাই ও একসাথে মামলাগুলো থেকে কর্মীরা নিষ্কৃতি পায়। তাদের জামিন দেয় কোর্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম নজিরবিহীন ঘটনা আর ঘটেনি। সেই নেতা মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু তেমন উন্নয়ন তিনি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে আমার অঞ্চলে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সংগঠিত হয়েছে। শঙ্খ নদী ছির আমাদের জনজীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ আতংক। চিনের দুঃখ যেমন ছিল হোয়াংহো নদী, তেমনি দুঃখ ছিল আমাদের শঙ্খ নদী। শেখ হাসিনা শঙ্খ নদীর পেছনে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করে জনগণকে নদী ভাঙ্গনের হাত হতে রক্ষা করেছেন। বর্ষা মৌসুমে শঙ্খ নদী ভয়াবহ রূপ ধারণ করত। মানুষ রাতে ভয়ে ঘুমাতো না। নদীতে বিলীন হয়ে যেতে একের পর এক বাড়ি। মসজিদ-কবর সবই তলিয়ে যেত নদী ভাঙ্গনে। নদী গর্ভে বিলীন হতো নানা স্থাপনা। আমরা নদী ভাঙ্গন শাসন করতে পেরেছি শতভাগ। ব্যাপক রাস্তাঘাট নির্মান করেছি। বিগত ৪০ বছরে এত রাস্তাঘাট নির্মাণ হয়নি এই অঞ্চলে। স্কুল-কলেজ-মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণতো হয়েছেই। আমি শৈশবে মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। কোন সরকারই ইতিপূর্বে মাদ্রাসার ভবন করতে পারেনি। আমি বেশকিছু মাদ্রাসা সরকারী বরাদ্ধে বিশাল বিশাল ভবন নির্মান করে দিয়েছি। কর্ণেল অলি আওয়ামী লীগের নাম কোথায়ও ব্যবহার করে কিছু করে দেয়নি। কিন্তু তার মা-বাবার নামে মহিলা কলেজ আমানুছফা-বদরুন্নেসা কলেজের চারতলা ভবন সরকারী বরাদ্দের সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে দিয়েছি। এই এলাকার সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তিনি তার নাম যুক্ত করে দিয়েছেন। আমি প্রতিহিংসার রাজনীতি করি না। নিজ অঞ্চলে সমতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে আমি কাজ করেছি।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ বাংলাদেশের স্থীতিশীলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে আগামী জাতীয় নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কি?
নজরুল ইসলাম চৌধুরীঃ জনগণ আওয়ামী লীগকে পূনরায় নির্বাচিত করবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে জনগণ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে। জনমনে বিভ্রান্তি নেই। জনগণ রাষ্ট্রের অগ্রগতি উপলব্ধি করতে পারে। আওয়ামী লীগে জনগণের আস্থা রয়েছে এখনো। থাকবেই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আওয়ামী লীগই এদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করবে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনাকে ধন্যবাদ।
নজরুল ইসলাম চৌধুরীঃ আপনাকেও ধন্যবাদ ।