স্মৃতির বিটিভি

প্রকাশিত: ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ, মে ৫, ২০২১

স্মৃতির বিটিভি

কাওসার চৌধুরী 

২৯ জানুয়ারি, ২০১৯।
সুদীর্ঘ ১৮ বছর পরে বিটিভিতে গিয়েছিলাম একটি নাটকে পারফর্ম  করতে। সেই পারফরমেন্সের সম্মানির চেক আনতে গিয়েছিলাম রেকর্ডিং-এর প্রায় ১৫/২০ দিন পরে। আজকাল আর “ঘাম শুকানোর আগে” পেমেন্ট হয় না কোথাও। কিন্তু বিটিভিতে এক সময় হত। সে কাহিনীতে পরে আসছি।
চেক হাতে নিয়ে দেখি- সর্বমোট আট হাজার টাকা দিয়েছে বিটিভি। ১৯৭৭ সালে জীবনে প্রথম পারফরমেন্স করেছিলাম বাংলাদেশ টেলিভিশনে; একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা। সেই উপস্থাপনার জন্য পেয়েছিলাম সাকুল্যে ৭৫ (পঁচাত্তর) টাকা। দুই চেকের মাঝে সময়ের ব্যবধান আজ প্রায় ৪৪ বছর।
‘চেক’ নেয়ার কাউন্টারটা বিটিভির মূল ভবনের বাইরে। চেকটি পকেটে নিয়ে ভাবলাম- এসেই যখন পড়েছি, যাই একটু ভেতরে, দেখি কাওকে চিনতে পারি কী না! আমাদের সময়ে যারা কর্মকর্তা কর্মচারী ছিলেন তাঁরা- হয় অবসরে গিয়েছেন নতুবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন কেউ কেউ। অনুষ্ঠান প্রযোজকদের মধ্যে সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন, কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী, রিয়াজ উদ্দিন বাদশা, মুসা আহমেদ, জিয়া আনসারী, আলীমুজ্জামান দুলু, মো. আবু তাহের- এরা বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে বেশ আগেই! সম্প্রতি যারা আমাদের ছেড়ে গিয়েছেন তাদের কথা একটু পরে বলছি। এসব ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে যাই মূল ফটকের দিকে। ‘রক্ষী’ আটকে দিলেন আমাকে। বলেন- ‘পাস’ ছাড়া ভেতরে যাওয়া যাবে না! আরে তাইতো, সেটাই তো নিয়ম।
যে বিটিভিতে ২৫/৩০ বছর পারফরমেন্স করেছি ধুমিয়ে, সেই প্রতিষ্ঠানে ‘পাসের’ অভাবে ঢুকতে না পেরে খারাপ যে একেবারে লাগে নি- তা কিন্তু নয়! তবুও ‘নিয়ম’ তো সবার জন্যই প্রযোজ্য- আমি তার বাইরে নই। মেনে নিলাম রক্ষীর কথা। তবে মনে পড়লো যুতসই একটি চুটকির কথা।
একজন স্কুল শিক্ষিকা, বয়স ৪৫ বছর; তিনি গিয়েছেন ক্লাস সেভেন-এ ক্লাস নিতে। ক্লাসে ঢুকে রোল ক’লশেষে জিজ্ঞেস করলেন- আজ কি নিয়ে আলোচনা করবো আমরা? শিক্ষার্থীরাঃ ম্যাডাম, ইংলিশ গ্রামার। ম্যাডামঃ এই ছেলে, বলতো- I am beautiful এটা কোন tense? ছেলেটি ছিল একটু বদ টাইপের। সে উত্তর দিল- ম্যাডাম, ওটা past tense 😊 !
আরো একবার অনুভব করলাম, আমারও tense-এ পরিবর্তন এসেছে অনেক আগেই! আমিও past tense-এর দলে! অগত্যা, বিটিভির ক্যাফেটারিয়ার দিকে যেতে থাকি সুমন কবিরের একটি গানের কলি গুনগুন করতে করতে- “কখনো সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে…”।
মাঝপথে দেখা হয়ে গেলো শ্যাম’দার সাথে। সুরকার সুজেয় শ্যাম; আমাদের শ্যাম’দা। একাত্তরের শব্দ সৈনিক, স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেছেন, লড়াই করেছেন। শ্যাম’দার সুর করা অন্যতম একটি জনপ্রিয় গান-“বিজয় নিশান উড়ছে ওই, বাংলার ঘরে ঘরে……”। অনেকদিন পরে দেখা। পা ছুঁয়ে প্রণতি জানাই প্রথম। দীর্ঘদিন পরে দেখা হওয়ায় খুব সঙ্গত কারনেই অনেক আবেগপূর্ণ কথা হল। মাঝখানে উনার স্বাস্থ্যটাও ভালো যাচ্ছিল না খুব একটা; জানালেন তিনি নিজেই।
ও হ্যাঁ, আমি আবার আমার সিনিয়রদের পা ছুঁয়েই সালাম জানাই- দীর্ঘদিন পরে দেখা হলে। যেমন ধরুণ- মামুন ভাই, রামেন্দু’দা, নূর ভাই, হায়াত ভাই, বাচ্চু ভাইকে পা ছুঁয়ে সালাম জানিয়ে থাকি। ……আর ক’বছর পরে কারো ‘পায়ে হাত দিয়ে সালাম’ জানানোর সুযোগ কতটা থাকবে জানি না! মহান সৃষ্টিকর্তা ওঁদের দীর্ঘজীবী করুন। ছোটলু ভাই (আলী যাকের) তো চলেই গেলেন এরমাঝে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা হচ্ছিল শ্যাম’দার সাথে। আমি বলি- চলুন না ক্যাফেতে গিয়ে একটু চা-এর সাথে কথা বলি। উনি জানালেন- চা সিগারেট বাদ দিয়েছেন বেশ আগেই। ……এরমাঝে উপস্থিত হলেন বিটিভির তরুণ অনুষ্ঠান প্রযোজক মাসুদ চৌধুরী। আমার কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে উনি আবার দু’চারটা অনুষ্ঠান করেছেন এই ক’বছরে, বিটিভিতেই।
মাসুদ চৌধুরীকে আহবান জানাই ক্যাফেতে চা পানের। উনি বললেন- তারচেয়ে ভেতরে চলুন, ওখানে কফি খাওয়াই আপনাকে। উনাকে আমার ‘পাস-ট্রাজেডির’ কথা জানাই। উনি জিভ কাটেন লজ্জায়! যাই হোক, পাস ম্যানেজ করে উনিই আমাকে নিয়ে ভবনের ভেতরে গেলেন।
ভবনে ঢুকেই দেখি- হাতের বাঁয়ের দেয়ালে দু’টি টিভি মনিটর স্থাপন করা হয়েছে। তাতে বিরতিহীনভাবে চলছে বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কিছু স্থির চিত্র। হঠাৎ মনিটরে দেখি দিলশাদ খানমের (নন্দিনী) মুখ। নন্দিনীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ‘কিশোর’রূপী সাইদুল আনাম টুটুল। শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠলো যেনো! সেই বাহাত্তরের প্রযোজনা! আজ থেকে উনপঞ্চাশ বছর আগের কথা। মোস্তফা মনোয়ার বানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্ত করবী’। কী অনন্যসাধারণ মেধা আর পরিশ্রমের ফসল এই ‘রক্ত করবী’।
শুনেছি- রামপুরায় বিটিভি স্টুডিওর ফিনিশিং-এর কাজ তখনো সম্পন্ন হয়নি শতভাগ। এরমাঝেই মোস্তফা মনোয়ার ‘ঝুঁকি নিয়ে’ উতরে গেলেন ‘রক্ত করবী’র শুটিং নিয়ে। প্রোডাকশন টিম থেকে পারফরমার- সবাই জীবন দিয়ে খেটে দাঁড় করালেন ‘রক্ত করবী’। আর সময়ের কোলে সেটাই হয়ে গেলো ‘মাস্টার পিস’!
কী অসাধারণ পারফরমেন্স প্রতিটি পারফরমারের। রাজার ভূমিকায় গোলাম মোস্তফা, বিশু পাগলের ভূমিকায় সৈয়দ হাসান ইমাম, সর্দারের ভূমিকায় জামাল উদ্দিন হোসেন, কিশোরের ভূমিকায় সাইদুল আনাম টুটুল, আর নন্দিনীর ভূমিকায় দিলশাদ খানম তো ইতিহাস গড়লেন! আহা……! সবক’টি চরিত্রের নাম স্মরণ করা গেলো না; দুঃখিত। (এরমাঝে কারো ভূমিকা কি ভুল বলেছি?) নান্দনিক ভাবনা, উদ্বাবনী চিন্তা, দৃঢ মনোবল আর প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি থাকলে যা হয় আর কি! আর কমিটমেন্ট তো ছিলই; বলার অপেক্ষা রাখে না।
তারই ধারাবাহিকতায় একের পর এক নির্মিত হয়েছে দর্শকের হৃদয়কাড়া সব নাটক। ‘মুখরা রমনী বশীকরণ’ ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহ’ ‘বরফ গলা নদী’ ‘শেষের কবিতা’সহ আরো অনেক অনেক নাটক গোটা সত্তর দশক জুড়ে নির্মিত হয়েছে- যা আজো দর্শকের মন ছুঁয়ে আছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সৃষ্টিশীল মানুষের এই দলটি গোটা সত্তর এবং আশির দশকজুড়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে তৈরি করেছে অসাধারণ সব টিভি নাটক। প্রতিটি নাটকের নাম স্মরণ করে বলাটাও এক দুরূহ কাজ বটে! শুধু নাটকই বা কেন- গান, নৃত্য আর শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানেই বা কি কম দাপটের ছাপ দেখা যায়? ছোটদের অনুষ্ঠানের কথাই ধরুণ না! লুৎফর রহমান রিটন তো সেই সময়েই ডানা ঝাপ্টিয়ে বেরিয়ে এলো। স্থান করে নিল দর্শকের হৃদয়ে- প্রধানত ছোটদের অনুষ্ঠান দিয়েই। অনুষ্ঠান প্রযোজক আলী ইমাম, বদরুন্নেসা আব্দুল্লাহ, সাকিনা সারওয়ার- এরা বড়োদের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছোটদের অনুষ্ঠানেও প্রতাপ দেখিয়েছেন দীর্ঘদিন!
গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু, সৈয়দ জামান, কাওসার আহমেদ চৌধুরী (আমি নই), জাহিদুল ইসলাম, নুরুজ্জামান শেখসহ আরো ক’জন গীতিকার- এরা তো স্বাধীনতারই ফসল। সুরকার আলাউদ্দীন আলী, শেখ সা’দী খান, আনিসুর রহমান তনু, লোকমান হোসেন, মাকসুদ জামিল মিন্টু- এরা পুরোটা সময় ধরে কর্তৃত্ব করেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সুরকার আলাউদ্দীন আলী তো চলচ্চিত্র এবং টেলিশন- উভয় ক্ষেত্রেই দাবড়িয়ে বেড়িয়েছেন আজীবন। সেই সময়ের সকল গীতিকার সুরকারের নাম এই মুহুর্তে স্মরণ করতে পারলাম না বলে মার্জনা চাইছি।
টিভি নাটকের কথা যদি বলি- সত্তর এবং আশির দশক তো দর্শকের কাছে নাটকের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে আজো। নাট্যকারদের মাঝে আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশিদ, সেলিম আল দীন- এঁদের তিনজন তো তাঁদের স্বকীয়তা দিয়ে নাটকের তিনটি schooling তৈরি করে দিয়ে গেছেন। এঁদের নাটকের নাম উচ্চারণ করতে গেলে পৃষ্ঠা ভরে যাবে কেবল- নাম তো আর শেষ হবে না!
হক ভাই (সৈয়দ শামসুল হক) অবশ্য বিটিভির জন্য তেমন বেশীকিছু লিখেছেন কীনা জানা নাই আমার। তবে উনার লেখা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ বিটিভি’র মঞ্চ নাটকের স্লটে প্রচারিত হয়েছে।
ফাঁক তালে বলে রাখি- বিটিভিতে, তালিকাভূক্ত শিল্পী হিসেবে আমারও যাত্রা শুরু হয়েছিল কিন্তু সেদিম আল দীনের নাটক ‘আয়না’ সিরিজ দিয়ে। ওই সিরিজের একটি ‘স্লটের’ শিরোনাম ছিল ‘লাল মাটি কালো ধোঁয়া’। নাটকটির প্রযোজক ছিলেন বাচ্চু ভাই (নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু)। ওটারই ৮টি পর্বে অভিনয় দিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করেছিলাম। যদিও ’৭৮ সাল থেকেই ‘প্রাণ তরঙ্গ’ উপস্থাপনা করেছি অনিয়মিতভাবে। অভিনয়ও করেছি অল্পক’টি নাটকে; কিন্তু তালিকাভূক্ত হইনি তখনো।
ফিরে আসি বিটিভির দেয়ালের মনিটরে। এখানে একের পর এক ছবি ভেসে উঠছে, আর ৩ সেকেন্ডের মধ্যেই ডিজল্ভ হয়ে আসছে আরো একটি নতুন ছবি।
প্রডিউসার মাসুদ চৌধুরীকে বললাম- আপনি রুমে যান, আমি আসছি একটু পরে। আপনার রুম নম্বরটি বলুন আমাকে। উনি নাছোড় বান্দা। আমাকে ছেড়ে যাবেন না কোথাও। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন আমার পাশেই।
এরপরে ক্যামেরা তাক করতেই ভেসে এলো মতিন ভাইয়ের (আব্দুল মতিন) মুখ। আমাদের প্রয়াত বন্ধু রাতীনের বাবা। অসাধারণ এক অভিনেতা ছিলেন। মূলত খল-নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতেন চলচ্চিত্রে। উনার ছবির নিচে লেখা- ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’। মনে আছে, এই নাটকের একটি এপিসোড দেখতে বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবনে’র ছাদ ধ্বসে মারা গিয়েছিল বেশক’জন ছাত্র? আহা রে, সেই হৃদয়বিদারক স্মৃতি আজো আমার চোখে জ্বলজ্বল করছে!
তারপরের ছবিটি- সিরিজ নাটক ‘আমি তুমি সে’র। সেই সময়ের ‘হার্ট থ্রব’ সিডনি ভাই (সৈয়দ আহসান আলী সিডনি) একটি চেয়ারে বসে আরো দুই ‘হার্ট থ্রব’ আব্দুল্লাহ আল মামুন আর ফেরদৌসী মজুমদারকে কী যেন বলছেন। এই তিনজনকে একই ফ্রেমে দেখে হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো! আহা রে সময়- কত দ্রুত বয়ে যায়!
এর পরের ছবিটি- ধারাহাহিক নাটক ‘ঢাকায় থাকি’র। তিনটি প্রিয় মুখ এলো পর্দায়- ডব্লিউ আনোয়ার (আলী রাজ), তারানা হালিম এবং ফাল্গুনি হামিদ। আহা রে সেই দিনগুলি। এসব নাটক দেখবার জন্য প্রায় প্রতিটি পরিবারে রাত আটটার আগেই রান্নাবান্না শেষ করে ‘কাউন্ট ডাউন’ শুরু হত নাটকের জন্য।
জাকারিয়া দাদার (মোহাম্মদ জাকারিয়া) কথা মনে আছে আপনাদের? তখোন প্রবীণতম শিল্পী তিনি। ‘থিয়েটার’ নাট্যদলে অভিনয় করতেন মঞ্চে। অসাধারণ অভিনয় উনার। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’, আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘চারিদিকে যুদ্ধ’ ‘সুবচন নির্বাসনে’- কোনটার কথা ফেলে কোন নাটকের কথা বলি! জাকারিয়া দাদার ‘বাচিক’ অভিনয়ে্র কোন তুলনা ছি না! উনার তুলনা উনি নিজেই! জাকারিয়া দাদার কথা আমি অন্তত ভুলতে পারবো না কোনদিন!
পরের ছবিতেই দেখি- ‘আমাদের সন্তানেরা’ নাটকের একটি দৃশ্যে জাকারিয়া দাদা রুবিনা (অথবা শায়লা নাসের)-এর মাথায় হাত দিয়ে কী যেন সংলাপ উচ্চারণ করছেন।
আচ্ছা, এভাবে প্রতিটি ছবি নিয়ে যদি দু’চার লাইন করে লিখতে থাকি- তাহলে ৪০টি ছবির জন্য কত লাইন হয়ে যাবে বলুন তো!? কারো ধৈর্যে কুলাবে ওসব পড়তে গিয়ে!?
তারচেয়ে, আমি বরং ছবির ক্যাপশানগুলো বলে যাই। আপনারা ছবিগুলো দেখে নিন। আপনাদের নিজেদেরই তো কত শত স্মৃতি আছে এসব নাটক নিয়ে। দেখবেন- সে সব স্মৃতিগুলো এসে ভর করবে আপনার চোখে, আপনার হৃদয়ে!
আর দু’একটা ছবির কথা উল্লেখ করেই আমি বিদায় নেবো কিন্তু।
ফতেহ লোহানির কথা মনে আছে? ফজলে লোহানির বড়ো ভাই। সে এক দূর্দান্ত অভিনেতা ছিলেন। একটা ছবিতে উনাকে দেখা গেলো চলচ্চিত্র শিল্পী রোজীর সাথে। পাশে সম্ভবত আয়েশা আক্তার। এটা সম্ভবত কোন চলচ্চিত্রের দৃশ্য; যেটা হয়তো বিটিভি থেকে প্রচারিত হয়েছিল কোন এক সময়!
পাশের ছবিতে অবশ্য উনার ছোট ভাই ফজলে লোহানিকে দেখা গেলো দু’পাশে উনার দুই রম্য অভিনেতা লালু ভাই এবং ……কে নিয়ে।
আরেকটা ছবি দেখে মুহুর্তেই মনটা ভারী হয়ে এলো। ধারাবাহিক নাটক ‘মাটির কোলে’। একই ফ্রেমে তারিক ভাই (তারিক আনাম খান), ফখরুল হাসান বৈরাগী এবং সদ্য প্রয়াত নায়িকা কবরী। একটি শিশু কোলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন কবরী। হায় ‘কোভিড ১৯’! তুমি এত সর্বগ্রাসী কেন?!
‘ফেরা’ নাটকটির কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! আমাদের যুবরাজের (খালেদ খান) অসাধারণ অভিনয় ছিল তাতে। তারই স্কুল শিক্ষকের মেয়ে ছিলেন নায়িকা ফাল্গুনি হামিদ। আবাদুল্লাহ আল মামুন এবং শম্পা রেজাও অভিনয় করেছিলেন নাটক ‘ফেরা’য়। সবাই এক একটি ফ্রেমে স্থবির হয়ে আছেন! যুবরাজ চলে গেছে আজ কয়েক বছর তো হয়েই গেলো। ভালো থেকো বন্ধু!
সৈয়দ সিদ্দিক হোসেনের নাটক ‘শেকড়’-এর কথা আমাদের স্মরণে থাকার কথা। প্রচন্ড শক্তিধর অভিনেতা আবুল খায়ের (প্রয়াত) আর হায়াত ভাই (আবুল হায়াত) দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি ফ্রেমে! অভিনেতা আবুল খায়েরকে নিয়ে একদিন আলাদা করে লিখতে চাই। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসাধারণ কিছু ভূমিকা আছে উনার।
একটি ফ্রেমে দেখা গেলো হুমায়ূন ফরীদি, আফজাল হোসেন আর শামসুদ্দীন দাঁড়িয়ে আছেন। নাটকের নামটি লেখা নেই ওতে। পরের কয়েকটি ছবিতে অবশ্য ‘কানকাটা রমজান’রূপে দেখা গেলো ফরীদি ভাইকে- ফেরদৌসী ভাবীর (হুরমতি) সাথে। কী মারাত্মক (ইতিবাচক অর্থে) জনপ্রিয় হয়েছিল এই নাটক- ভাবাই যায় না। এই নাটকের ‘বিগিনিং টাইটেল’ মিউজিক শুরু হলে গোটা মহল্লা নিরব হয়ে যেতো। ঘরের ভেতরে সবাই কথা বলতেন ফিসফাস করে! আহা, এক একটা নাটকের সে যে কী পরিমান শক্তি- সেটা আজ বলে বোঝানো যাবে না- নতুন প্রজন্মকে!
বলেছিলাম, আর বিস্তারিত লিখবো না ছবি কিংবা ছবির মানুষগুলো নিয়ে! কিন্তু পারলাম কোথায়!
ছবির সিরিয়ালে এবারে এসে পড়লো নাটক ‘কোন এক কুলসুম’। আর যায় কোথা! ছবিতে অসাধারণ অভিব্যক্তি নিয়ে পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে আছেন আসাদ ভাই (রাইসুল ইসলাম আসাদ) আর আয়েশা আক্তার। ভাবা যায় এই দুই শিল্পীর অভিনয়ের কথা! আসাদ ভাইয়ের ‘মধু পাগলা’ চরিত্রটির কথা মনে আছে আপনাদের? আহা, সে কী অভিনয়! শুধু কি ওটাই? হাবিবুল হাসানের (মাকনা ভাই) লেখা নাটক ‘আমার দ্যাশের লাগি’তে আসাদ ভাইয়ের অভিনয় এখনো চোখে লেগে আছে। ‘ইডিয়ট’-এর কথা মনে নেই? কিংবা ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’? এই নাটকে ফরীদি ভাই ‘সেরাজ তালুকদার’ চরিত্র নিয়ে অভিনয়ে জীবন ঘনিষ্ট এক ধারা প্রবর্তন করেছিলেন- নিজের মত করে! বাহ!
সেই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা আল মনসুরের পাশে দেখি দুই প্রজন্মের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে। সাথে শক্তিশালী অভিনেত্রী দিলারা জামান। আল মনসুর আর সুবর্ণা মুস্তাফা জুটির নাটক নিয়ে লিখতে গেলে আমার কাগজ ফুরিয়ে যাবে কিন্তু লেখা ফুরাবে না! তাই আজ আর লিখছি না।
নাটক ‘রঙ্গিলা শহর’-এর স্থিরচিত্রে দেখি- চলচ্চিত্রাভিনেতা টেলি সামাদ, ফরিদ আলী, সাইফুদ্দীন আহমেদ আর টিভি অভিনেতা মুজিবুর রহমান দিলু প্রচন্ড ‘টেনশন’ করছেন। দিলু ভাই সম্প্রতি চলে গেছেন ‘কোভিড’-আক্রান্ত হয়ে। হায় রে সর্বনাশী (কোভিড)- তুই কবে যাবি এই দুনিয়া ছেড়ে!
ওদিকে আর একটি ছবিতে দেখি, মোস্তফা মনোয়ার- জামাল উদ্দিন হোসেন এবং আশকার ইবনে শাইখকে নির্দেশনা দিচ্ছেন ‘রক্ত করবী’ নাটকে। কপাল ভালো- মোস্তফা মনোয়ার আজো আমাদের মাঝে আছেন। মহান সৃষ্টিকর্তা উনাকে দীর্ঘায়ূ করুন। …… পাশে আরেকটি ছবিতে দেখি ‘রক্ত করবী’ নাটকের বেশক’জন শিল্পী কলাকূশলী এক-ফ্রেমে বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ‘কালের’ সাক্ষী হয়ে।
আমাদের জহর ভাইয়ের (জহিরুল হক) কথা মনে আছে না; ‘রংবাজ’ চলচ্চিত্রের পরিচালক? উনাকে দেখি চলচ্চিত্রাভিনেতা দীন মুহাম্মদ এবং আমাদের (নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের) কাসেম ভাইয়ের সাথে অভিনয় করছেন কোন এক নাটকে। জহর ভাইয়ের সাথে আমার বেশ খাতির হয়ে গিয়েছিল ‘বড় বাড়ি’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে। ওই নাটকে জহর ভাই ছিলেন ‘বড় বাড়ি’র বড়ো ছেলে, জামাল উদ্দিন হোসেন ছিলেন মেজো ছেলে, আর ‘বড়ো বাড়ি’র ছোট ছেলের ভূমিকায় ছিলাম আমি। থাক, আমার কথা মনে না রাখলেও চলবে।
ভেবেছিলাম এখানেই শেষ করবো আজকের লেখাটি। কিন্তু মমতাজ স্যার (অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ) এসে বিপদ ঘটালেন! উনি আর ফেরদৌসী মজুমদারকে দেখি এক টেবিলে কী যেন করছেন (ঝগড়া?)! ছবির নিচে নাটকের নামটি লেখা- ‘আমাদের সন্টু মিয়া’। বিটিভি’র এই জুটিটা অসম্ভব রকমের প্রিয় ছিল দর্শকের। কোন বয়ষ্ক মানুষও যে অভিনয় দিয়ে ‘দর্শক-প্রিয়’তার চুড়ায় উঠতে পারেন এই জুটি তার অন্যতম উদাহরণ। মমতাজ স্যার, আপনি যেখানেই থাকুন- অনেক ভালো থাকুন। অনেক কৃতজ্ঞতা আপনার কাছে।
উফ, লেখাটি শেষ করা যাচ্ছে না। বন্ধুগণ, এর পরের ছবিটি ‘শেষের কবিতা’র। চমৎকার রোমান্টিক মুখশ্রী নিয়ে পরষ্পরের দিকে চেয়ে আছেন সৈয়দ আহসান আলী সিডনি এবং চলচ্চিত্রাভিনেত্রী রেশমা। রেশমা আপা কিন্তু ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকে দূর্দান্ত অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে আজো বিশাল জায়গা দখল করে আছেন।
টিভি নাটকের পাশাপাশি- সঙ্গীত নৃত্য আর ছোটদের অনুষ্ঠানের ছবিও দেখেছি বিটিভির সেই মনিটরে। আমাদের সময়ের তুমুল জনপ্রিয় শিল্পী সোলস-এর (পরবর্তীতে রেনেসাঁ) নকীব খানকে দেখি সেই মনোহরা হাসি দিয়ে গীটার হাতে গান করছেন- ‘একক সঙ্গীতানুষ্ঠান’-এ। একাধারে, গীতিকার, সুরকার, বাদক, গায়ক, উপস্থাপক- কী নন তিনি! আমাদের চাটগাঁইয়া ফোয়া! আমরা অহংকার অনুভব করি নকীব খানসহ আইয়ব বাচ্চু, তপন চৌধুরী, পার্থ বড়ুয়া, পিলু খানসহ আরো অনেক অনেক শিল্পীদের জন্য। বিশেষত- শেফালি ঘোষ, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব তো ইতিহাস গড়েছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান নিয়ে।
আমাদের প্রিয় ভাবী প্রজ্ঞা লাবনীকে দেখেছি মুনমুন সেনের সাথে। অনুষ্ঠানের নামটির উল্লেখ না থাকলেও ধরে নিয়েছি- ওটা মুনমুন সেনকে নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। প্রজ্ঞা লাবনী অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন নিশ্চয়ই। আরেকটি ছবিতে কেয়া চৌধুরীকে দেখি সাহিত্যিক শওকত ওসমানের সাথে। তাতে কেয়া চৌধুরীও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন নিশ্চয়ই।
‘বড় বাড়ি’ সিরিজ নাটকে কেয়া’পার মত সিনিয়র শিল্পীকে পেয়েছিলাম আমার স্ত্রীর ভূমিকায়। সেই সময়ে কেউ কেউ মনে করতেন- কেয়া চৌধুরী আমার বাস্তব জীবনের স্ত্রী বুঝি 😊 ! ফ্যামিলি টাইটেলে (চৌধুরী) মিল থাকায় কিছুটা গোল বেধেছিল আসলে! বছর কয়েক আগে মানিকগঞ্জের ‘পারইল’ গ্রামে দেখা হয়েছিল একটি অনুষ্ঠানে। মজা করে- ‘আমার স্ত্রীর’ গল্পটি বলেছিলাম উনাকে। কেয়া’পা বললেন- মার খাবেন কাওসার 😊 !
প্রজ্ঞা লাবনী আর কাজী আরিফকে নিয়ে অসাধারণ একটি স্মৃতি আছে আমার। ’৯২ কি ’৯৩ সালের কথা। আমাদের চলচ্চিত্র-গুরু আলমগীর কবিরের কর্ম এবং জীবন নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলাম সেই সময়ে। প্রামাণ্যচিত্রটির শিরোনাম ছিল ‘প্রতিকূলের যাত্রী’। সেই ফিল্মের ধারা বর্ণনা দেবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ভাবী আর আরিফ ভাইকে। টেলিফোনে যোগাযোগ করার সময় সাবধান করে বলেছিলাম- আমি কিন্তু আপনাদের জন্য কোন ‘সম্মানি’ দিতে পারবো না; এমন কি আপনাদের গাড়ির তেলের পয়সাটাও নয়। টাকা নেই আমার কাছে। সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় যদি ধারা বর্ণনায় ভয়েস দেন তাহলেই কেবল আসবেন স্টুডিওতে!
পুরানা পল্টনের ‘রিদম’ স্টুডিওতে উনারা দু’জন এসে কোন সম্মানি ছাড়াই ভয়েস দিয়েছিলেন বিনা ওজরে! উনাদের ‘কোয়ালিটি’ নিয়ে কথা বলার কোন সুযোগ আমার অন্তত নেই। অসাধারণ করেছিলেন দু’জনেই। আজো সেই ফিল্মটি দেখতে পারেন আপনারা- ইউটিউবে (প্রতিকূলের যাত্রী Counter Image) । উনাদের দু’জনের স্নেহ-ভালোবাসার কাছে আমি ঋণী হয়ে আছি সারাজীবনের জন্য।
তিনটি ছবিতে তিনজন আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীদের নিয়ে স্মৃতিচারণা করা হয়েছে ওই মনিটরে। পণ্ডিত রবি শংকর, হেমন্ত মুখার্জি এবং চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। এই তিনজকে ঘিরে যারা সেদিন ছবিগুলো আলোকিত করেছিলেন- তাদের কেউ কেউ আজ আর নেই। যেমন- মোস্তফা কামাল সৈয়দ, মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, আতিকুল হক চৌধুরী, কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী……। আমি তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের তৎকালীণ মহা পরিচালক হারুন অর রশিদকে আমি শ্রদ্ধাসহ ধন্যবাদ জানাই- আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭-মার্চের ভাষণের ছবিটি যথযথভাবে বিটিভির দেয়ালে উপস্থাপনের জন্য। দুই এবং তিন নম্বর স্টুডিও থেকে বেরিয়ে হাতের বাঁয়ের দেয়ালে বিশাল সাইজের এই ছবিটি দৃষ্টি কাড়ে সবার। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে হত্যাকারীরা বঙ্গবন্ধুকে সব জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে শালপ্রাংশু এই মানুষটির যে ছবি গাঁথা হয়ে আছে তাকে মুছে ফেলার সাধ্য কার!
সত্যজিৎ রায়কে দেখা গেল বঙ্গবন্ধুর পাশে। অন্য একটি ছবিতে- চিত্র নায়িকা ববিতা এবং শাবানাকে দেখি বঙ্গবন্ধুর অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। অনেক আবেগময় দু’টি ছবি।
জানি, আমার এই লেখাটি লম্বার চাইতেও অনেক বেশী লম্বা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু স্মৃতি বলেই কথা! যাঁদের নিয়ে যা কিছু লিখেছি- সেগুলো না লিখে পারলাম না! সত্তর এবং আশির দশকের বিটিভি আমাদের ঋণী করে রেখেছে তার কর্ম দিয়ে।
ঋণের চাইতেও অনেক বড়ো যেটা- সেটা হল, আমাদের হৃদয়টি আমরা বন্ধক রেখেছি বিটিভির সেই সময়ের কাছে। সেই সময়ের কথা এলেই আমরা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। উপায় নেই! মানুষের মন তো তার নিজের কথায় চলে না। মনের, হৃদয়ের- নিজস্ব একটা গতি-প্রকৃতই আছে; যার কাছে মানুষ অসহায়। অজয় চক্রবর্তীর সেই গানটি আছে না- ‘যত পাহারাই দাও মন পালাবে……’!
পালাতে চাইলে পালাক! ধরে যেখানে রাখতে পারবো না- সেখানে পালিয়ে যেতে দেওয়াটাই মঙ্গল! চলুন, তারচেয়ে বরং স্মৃতিটুকুই ধরে রাখার চেষ্টা করি। ওটাই সম্বল।

ছড়িয়ে দিন