হাঁটু ব্যথার চিকিৎসা

প্রকাশিত: ১২:০৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০১৬

হাঁটু ব্যথার চিকিৎসা
এসবিএন হেলথ ডেস্কঃ হাঁটু ব্যাথার চিকিৎসা সম্পর্কিত আলোচনা।
কেস স্টাডি -১

রেহানা বেগম একজন গৃহিণী, বয়স ৫৫ বছর, ঢাকায় নিজের বাড়িতে ২য় তলায় থাকেন। ৬ তলার ছাদের ওপর গাছ লাগিয়েছেন।

সকালে ও সন্ধ্যায় নিয়মিত গাছ পরিচর্যা করেন। গত ২ সপ্তাহ ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে ও নামতে কষ্ট হয় ও হাঁটুতে ব্যথা করে, ফলে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠতে পারছেন না।

কেস স্টাডি -২

কহিনুর বেগম স্কুল শিক্ষিকা, নিয়মিত স্কুলে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন ৪-৫টি ক্লাস নিতে হয়। কিছুদিন আগে থেকে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই হাঁটু ব্যথা করে, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না।

খানিকক্ষণ বসে থাকলে আবার কিছুক্ষণ দাঁড়াতে পারেন, এমনকি নিচে বসা, নামাজের মতো করে বসতে কষ্ট হয়।

এই ২ জন রোগীই হাঁটুর ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ বা অস্থিসন্ধির ক্ষয়জনিত রোগে ভুগছেন, আসুন জেনে নিই ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ কী? হাঁটুতে ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ কেন হয়? আধুনিক চিকিৎসা কী?

‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ কী

‘অস্টিওআথ্রাইটিস’ অস্থিসন্ধির ক্ষয়জনিত রোগ। আমাদের অস্থিসন্ধি বা জয়েন্ট এক ধরনের নরম কাভার দিয়ে আবৃত থাকে যাকে মেডিক্যাল ভাষায় কারটিলেজ বা নরম হাড় বলে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটুর ব্যবহারের ফলে কারটিলেজগুলো ক্ষয় হতে থাকে, জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির মার্জিন অমসৃণ হয়ে যায় জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির গ্যাপ কমে যায়।
ফলে জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি নাড়াচাড়া করতে ব্যথা অনুভূত হয় এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিস বিভিন্ন জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে হতে পারে-

* কবজি বা রিস্ট জয়েন্ট

* হিপ জয়েন্ট

* হাঁটু বা নি জয়েন্ট

* সারভাইক্যাল স্পাইন বা ঘাড়ের হাড়

* লাম্বার স্পাইন বা কোমরের হাড়

হাঁটু আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ওজন বহনকারী জয়েন্ট বিধায় হাঁটুতে ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ বেশি হয়ে থাকে, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ৫০ এর অধিক বয়সের বেশিরভাগ মানুষ হাঁটুর ব্যথায় ভুগে থাকেন, এর অন্যতম কারণ ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’।

হাঁটুতে ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ কেন হয়

* বয়সজনিত অস্থিসন্ধির ক্ষয়

* আঘাতজনিত কারণ বা জয়েন্ট ইনজুরি

* ওবেসিটি বা অধিক ওজন

* মাংসপেশির দুর্বলতা

* জেনেটিক বা বংশগত

* অস্থিসন্ধির অস্বাভাবিকতা বা ম্যালফরমড জয়েন্ট

* অস্থিসন্ধির দুই অস্থির মধ্যখানের সাইনভিয়াল ফ্লুইড শুকিয়ে গেলে

* পেশাজনিত কারণে। যারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করেন, বেশি বেশি সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করেন বা অমসৃণ জায়গায় হাঁটাচলা করেন তারা সাধারণত এই রোগে বেশি ভুগে থাকেন।

কাদের বেশি হয়

৫০-এর অধিক বয়সের মানুষের বেশি হয়। মহিলা ও পুরুষ উভয়েরই হয় তবে পুরুষের তুলনায় মহিলারা বেশি ভুগে থাকেন।

কী উপসর্গ দেখা দেয়

এটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, বয়স ও কাজের ওপর নির্ভর করে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

* হাঁটুতে ব্যথা

* হাঁটু ফুলে যাওয়া

* চলাফেরার সময় বেশি ব্যথা করে কিন্তু বিশ্রামে থাকলে ব্যথা কম হয়

* বসা থেকে উঠতে গেলে ব্যথা পায়

* সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা বা উচু-নিচুতে হাঁটাচলা করতে ব্যথা পায়

* নামাজের মতো করে বসতে পারেন না

* টয়লেটে নরমাল কোমড ব্যবহার করতে পারেন না

* অনেক ক্ষেত্রে জয়েন্টের আকৃতির পরিবর্তন হয়ে বাঁকা হয়ে যায়

* জয়েন্টের মুভমেন্ট কমে যায়

* হাঁটু ভাঁজ করার সময় ঘর্ষণের শব্দ হয় যাকে মেডিকেল ভাষায় গ্রেটিং সেন্সেশন বলা হয় ।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীর বয়স, রোগের ইতিহাস ও ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশনের মাধমেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব, এরপরও কিছু প্যাথলজিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল টেস্ট করার প্রয়োজন হয় ।

সেগুলো হল-

* এক্স-রে- এক্স-রের মাধ্যমে জয়েন্টের গ্যাপ কতটুকু আছে, কারটিলেজের ক্ষয়ের পরিমাণ এবং অনেক ক্ষেত্রে জয়েন্ট মার্জিনে কিছু নতুন হাড়ের সৃষ্টি হয় যাকে অস্টিওফাইট বলা হয়।

* ম্যাগনেটিক রিজনেন্স ইমেজিং (এম আর আই)- এটি একটি রেডিও ওয়েভ যা অতিশক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্রের মাধ্যমে জয়েন্ট, কারটিলেজ, লিগামেন্ট, ছাড়াও হাঁটুর জয়েন্টের অন্যান্য নরম টিস্যুর অবস্থান জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এটি রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে।

* বোন মিনারেল ডেনসিটি (বি এম ডি)- এর মাধ্যমে অস্থির মধ্যকার উপাদানের ঘনত্ব বোঝা যায় এবং অস্টিওপোরোসিস আছে কি না তা নির্ণয় করা যায়।

* প্যাথলজিক্যাল টেস্ট- বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে, যেমন-

* সেরাম ইউরিক এসিড

* রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর টেস্ট

* সিআরপি

* সেরাম ক্যালসিয়াম লেভেল

* এন্টি সিসিপি ইত্যাদি

যদি জয়েন্ট ফুলে থাকে, সে ক্ষেত্রে জয়েন্ট ফ্লুইড অ্যানালাইসিস করার প্রয়োজন পড়ে।

চিকিৎসা

এটি যেহেতু অস্থিসন্ধির ক্ষয়জনিত রোগ অতএব হাড়ের ক্ষয় সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয় কিন্তু চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথা নিরাময় ও অস্থিসন্ধির মুভমেন্ট স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।

এতে রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপনে কোনো কষ্ট থাকে না। কনজারভেটিভ বা মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা

* মেডিকেশন বা ওষুধ

* এনএসাওআইডিএস বা মেডিসিন দিয়ে

* ডায়েটরি সাপ্লিমেন্ট- যেমন গ্লুকোসামিন হাইড্রোক্লোরাইড, কন্ড্রোটিন সালফেট, ক্যালসিয়াম, হায়ালুরনিক এসিড ইত্যাদি।

* ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা

এটি আধুনিক ও পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াবিহীন চিকিৎসা পদ্ধতি। বয়স্ক লোকদের যেহেতু এ রোগ বেশি হয় সেহেতু ওষুধের ব্যবহার যত কম করা যায় তত ভালো, তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কারণ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়।

বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হবে। অস্টিও-আরথ্রাইটিস অব নি জয়েন্ট চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসক বিভিন্ন রকম মেথড ব্যবহার করে থাকেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

* ম্যানুপুলেশন থেরাপি

* আলট্রা সাউন্ড থেরাপি

* শর্ট-ওয়েভ ডায়াথারমি

* ইন্টার ফ্যারেনশিয়াল থেরাপি

* লেজার থেরাপি

* থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ

* স্ট্যাটিক সাইক্লিং ইত্যাদি

এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থেকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে।

* ইন্ট্রা-আরটিকুলার ইনজেকশন

মেডিকেল ভাষায় ডিস্ক-সাপ্লিমেনটেশন বলা হয়। আমাদের হাঁটুর অস্থিসন্ধিতে এক ধরনের সাইনোভিয়াল ফ্লুইড থাকে। বয়স ৪০-এর ওপর হলে যেমন অস্থি বা হাড়ের ক্ষয় হয় তেমনি সাইনোভিয়াল ফ্লুইড ও শুকিয়ে যায়; সে ক্ষেত্রে ইন্ট্রা-আরটিকুলার ইনজেকশন দেয়া হয়, তবে ইনজেকশন দেয়ার ক্ষেত্রে রোগীর ডায়বেটিস, উচ্চরক্তচাপ কিংবা কিডনি ডিজিজ আছে কিনা তা দেখতে হবে এবং থাকলে অবস্থা অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এটি অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে।

* সার্জিক্যাল চিকিৎসা

সাধারণত দেখা যায় শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীই ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমেই ভালো থাকেন, তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে। যেমন- জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট বা আরথোপ্লাস্টি।

অপারেশনের আগে ও পরে রোগীর পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হয় ।

সতর্কতা

* জয়েন্টকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে। বিশেষ করে তীব্র ব্যথা থাকা অবস্থায় ৫-৭ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।

* দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবেন না কিংবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকার মধ্যে বিশ্রাম নিতে হবে।

* সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা কম করতে হবে।

* উচু-নিচু জায়গায় হাঁটাচলা কম করবেন।

* অধিক ওজনের রোগীদের ক্ষেত্রে শরীরের ওজন কমাতে হবে।

* ব্যথা বেশি থাকা অবস্থায় টয়লেটে হাইকোমড ব্যবহার করবেন কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর স্বাভাবিক কোমড ব্যবহার করবেন।

* ব্যথা বেশি থাকা অবস্থায় নামাজ চেয়ারে বসে পড়বেন কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে পড়বেন।

* হাঁটা-চলার সময় জয়েন্ট সাপোর্টের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এসিস্টিড ডিভাইস বা অরথসিস ব্যবহার করতে হবে।

যেমন- নি ব্রেস, নি ক্যাপ, ওয়াকিং এইড বা স্টিক ইত্যাদি।

লেখক : চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালটেন্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ঢাকা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com