হাজি মোহাম্মদ ফজলুর রহমান ও তাঁর কাচ্চি বিরিয়ানি

প্রকাশিত: ৬:৫৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২১

হাজি মোহাম্মদ ফজলুর রহমান ও তাঁর কাচ্চি বিরিয়ানি

মাস্টারশেফ ইউএসএ-কানাডা-অস্ট্রেলিয়া, হেল’স কিচেন, নিদেনপক্ষে টিএলসি চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠান দেখেন না, আমার চেনাজানা এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। সাদা অ্যাপ্রন, হাতে গ্লভস আর মাথায় টক ব্লশ বা শেফদের ঐতিহ্যবাহী টুপি পরিহিত বিদেশি শেফদের খাবার ঘরে বসে চেখে দেখা যাবে না জেনেও, গোগ্রাসে তাদের রন্ধনপ্রণালী গিলতে থাকি আমরা। বাংলাদেশের কুকিং শোগুলোকে সেই তুলনায় নেহাত নিরামিষ মনে হতে থাকে। ভোজনবিলাসী হিসেবে বাঙালি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। শুধু খেতে নয়, খাওয়াতেও ভালোবাসি আমরা। তবু কেন জানি রান্নার বেলায় গর্ডন রামসে, জেমি অলিভার কিংবা উলফগ্যাং পাকের মতো উদাহরণ দেয়ার মতো কারো পরিচয় জানি না আমরা।

 

বিরিয়ানি খেতে কার না ভালো লাগে ,আর তা যদি হয় সেই নবাবি স্বাদের তাহলেতো কথাই নেই । কালে কালে বয়ে গেছে কত দিন, কত বছর, কত যুগ। আধুনিক এই সময়ে হরেক রকম খাবারের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় হলেও তুর্কী-মোঘল আমলের কাচ্চি বিরিয়ানি এখনো রাজত্ব করছে সমানে। পুরোনো দিনের সেই মনভোলানো কাচ্চি এখনো যারা বাংলাদেশের মানুষকে খাইয়ে যাচ্ছেন তাদের একজন হাজি মোহাম্মদ ফজলুর রহমান। তার পরিবার ৮৭ বছর ধরে কাচ্চি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত! নবাববাড়ির অন্যতম প্রধান শেফ প্রয়াত হাজী ইসমাঈল রহমান এর বড়ো ছেলে। হাজী ইসমাঈল রহমান হলেন সেসব মাস্টারশেফ এর একজন, যার রান্না কাচ্চি,পাক্কি, মাটন আকবরি, মাটন জাহাঙ্গীরি, শাহী জর্দা, জালি কাবাব, মুতানজান লাবাবদার পোলাও, মুর্গ মুসাল্লাম বা আদি মুসাম্মাম ইত্যাদি অসংখ্য সুস্বাদু খাবার এখনো পুরনো ঢাকার আবাল বৃদ্ধ বণিতার মুখেমুখে ফেরে।

শাহজাহানী পোলাও, গালৌতি কাবাব, গোরাক কাবাব, নারাংগি পোলাও, জাফরানি কোফতা পোলাও, কালিয়া চাশনিদার এরকম অসংখ্য খাবার রয়েছে, যার নাম হয়ত অনেকেই এখন জানেন না। আনার বা ডালিম, এমনকি আম হতেও যে পোলাও হতো, সেকথাও হয়তো আজ অনেকেই জানেন না। আমাদের আজকের দিনে অনেকেই ভাবেন যে, জয়ফল, জয়িত্রি, হলুদ বা রসুন ছাড়া হয়তো খাবার ই রান্না হবে না। কিন্তু এটিও একটি ভুল ধারণা।

মধ্যপ্রাচ্যের মতোই উপমহাদেশের মুসলিম খাবারেও এক সময় শুকনো ও তাজা ফল, বিভিন্ন পদের বাদাম, কিসমিস, এপ্রিকোট ইত্যাদির ব্যবহার ছিল। এখনো সেই ধারার রান্না, অল্প কিছু মানুষ করেন, যাদের মাঝে মাস্টার শেফ হাজী ফজলুর রহমান অন্যতম, বলতে গেলে, অনন্য। যার রান্না পছন্দ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশ ও বিদেশের অসংখ্য মানুষ।

 

৬৬ বছর বয়সী ফজলুর রহমানের কাচ্চি ইতিহাসের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে যে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক স্মৃতি সম্মাননার পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধী পুরস্কার পেয়েছেন। ফজলুর রহমান এখন ঢাকার মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করেছেন। কোম্পানির নাম দিয়েছেন ‘মাস্টারশেফ হাজি মোহাম্মদ ফজলুর রহমান ক্যাটারিং’।

প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে সর্বোচ্চ (৫০,০০০) লোকের খাবার ক্যাটারিং করার অভিজ্ঞতা। প্রতিষ্ঠানে রয়েছে অনেক প্রশিক্ষিত কর্মী, যারা মান সম্মত খাবার তৈরি করতে সক্ষম। মাস্টারসেফ হাজী ফজলুর রহমান ক্যাটারিং সর্বনিম্ন ১৬ জনের খাবারের অর্ডার গ্রহণ করে থাকে। যে কোন অনুষ্ঠানের মাত্র একদিন আগে অর্ডার করলে, অর্ডারকৃত খাবার তাদের মোহাম্মদপুর বসিলা, ঢাকায় অবস্হিত নিজস্ব ক্যাটারিং থেকে খাবার তৈরি হয়ে, তাদের নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে খাবার গ্রাহকের লোকেশনে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্হা রয়েছে ।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তারাও অনলাইন ভিত্তিক অর্ডার গ্রহন করছেন । তাদের “মাস্টারসেফ হাজী ফজলুর রহমান ক্যাটারিং” নামে একটি ফেসবুক পেইজ রয়েছে । গ্রাহকরা চাইলে সেখান থেকে তাদের পছন্দমত যেকোন খাবার অর্ডার করতে পারেন।

করোনার সময় ফজলুর রহমানের ক্যাটারিং সার্ভিস বেশ থমকে ছিল। লকডাউনের সময় কর্মী সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনেন তারা। এখন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আগস্টে মোট কর্মী দেখা গেছে ২২ জন।

শুরুতে শুধুমাত্র বড় বড় অনুষ্ঠানের অর্ডার নিলেও এখন ব্যবসায়িক কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে ছোট অর্ডারও (সর্বনিম্ন ১৬ জন) তারা নিচ্ছেন।

ইসমাইল মিয়া মারা যাওয়ার আগে ফজলুর রহমানকেও দক্ষ করে গড়ে তোলেন। এখন ফজলুর রহমান তার দুই ছেলে মোহাম্মদ শফিকুর রহমান এবং মোহাম্মদ আশিকুর রহমানকে দিয়েছেন ক্যাটারিং সার্ভিসের দায়িত্ব।

সাধারণ কাচ্চি আর ফজলুর রহমানের কাচ্চি তৈরির প্রক্রিয়া প্রায় একই হলেও পার্থক্য গড়ে দেয় একটি ‘গোপন’ রেসিপি। সেই রেসিপির রহস্য ফাঁস করতে চাইলেন না তার বড় ছেলে শফিকুর রহমান। ৩২ বছর বয়সী এই যুবক হাসতে হাসতে বলেন, ‘একটা তো পার্থক্য আছেই। আব্বু মূলত আমাদের দিক নির্দেশনা দেন। কোনটা বেশি হচ্ছে, কোনটা কম তিনি সেটি পরখ করেন। আর মূল রেসিপির দিকে নজর রাখেন, যেটি তিনি শিখেছেন আমার দাদার থেকে। এখন আমরাও পারি।’

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930