হাম-রুবেলা প্রতিরোধ ক্যাম্পেইনে বরাদ্দকৃত অর্থ-বন্টনের নীতি কেন প্রশ্নবোধক

প্রকাশিত: ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০

হাম-রুবেলা প্রতিরোধ ক্যাম্পেইনে বরাদ্দকৃত অর্থ-বন্টনের নীতি কেন প্রশ্নবোধক

— খছরু চৌধুরী

বাঙালি জাতির বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের আজ শেষ দিন। ভোরের সূর্য উদয় থেকে ২০২১ সাল শুরু। ২০২০ সালটা অনেক বিষাদের। বৈশ্বিক মহামারী করোনার ছোবলে বিশ্বের অনেক মানুষই আপনজন হারিয়ে একেবারে নিঃশ্ব হয়ে বেঁচে আছেন। নতুন কিছু শব্দযোগ হয়েছে আমাদের সামাজিকতায়। সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধি, কোয়ারান্টাইন, আইসোলেশন, শাট ডাউন, লকডাউন,রোগপ্রতিরোধ ইত্যাদি। ২০২১ বছরটা কেমন হবে এটা কেউ জানেনা। তবে, মানুষের প্রকৃতি বিরোধী কার্যক্রম যে পৃথিবীর বারোটা বাজিয়ে চলছে এ’ তো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দেখলে বুঝা যায়। শুধু করোনাভাইরাসই নয়, এন্টার্কটিকা অঞ্চলের ভারী বরফ গলার কারণে নতুন ধরণের অনেক অসুখই এই পৃথিবীতে হানা দেবে – এমন ভবিতব্য বিজ্ঞানী মহলের। ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্নটা হলো – বিশ্বনেতাদের এই সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি বা কৌশল কি?

দেশে ১৯ ডিসেম্বর থেকে হাম-রুবেলা রোগ প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২০ পালন করা হচ্ছে। সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগের নেতৃত্বে এই কর্মসূচি জানুয়ারির ৩১ তারিখ পর্যন্ত চলবে। কর্মসূচির অধীনে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সের প্রায় সোয়া তিন কোটিরও বেশী শিশু টিকা গ্রহণ করবে। প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে এত বিশাল কর্মযজ্ঞ দেশে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন। সকলের জানা থাকা দরকার – বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সাফল্য কিন্তু রোগপ্রতিরোধী কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে। শুনতে অপ্রিয় হলেও রোগপ্রতিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত কর্মী ও সক্রিয় অংশ গ্রহণকারী জনগণকে যে চরম অবহেলা করা হয়, হাম-রুবেলা টিকাদানের অর্থ বন্টনের হিসাব দিয়ে ইহার যৎকিঞ্চিত নমুনা উপস্থাপন করব।

হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণকারীদের কর্মবিভাজনের স্তর অনুযায়ী ডিজিএইচএস থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মীদের জন্য প্রতি দিনের বাজেট বরাদ্দ – জাতীয় ও বিভাগীয় কর্মকর্তা/কর্মীর ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মীর ১৬০০ টাকা, উপজেলার কর্মকর্তা/কর্মী ১০০০ টাকা এবং ইউনিয়নের সুপারভাইজারদের ১৮০ টাকা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের টিকাদানকারী মূল কর্মী ও টিকাদানের কাজে সক্রিয় সহযোগিতাদানকারী স্বেচ্ছাসেবীর জন্য ১৮০ ও ৮০ টাকা। উল্লেখ্য যে, উক্ত টিকা প্রদানের কর্মসূচির সফল বাস্তবতায়নের জন্য সরকার প্রতি ইউনিয়নে ২৭ জন করে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করেছেন। এই বরাদ্দটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যাঁরা মূল কাজ করে এবং সক্রিয় সহযোগিতা করেন তাঁদের বরাদ্দ অপ্রতুল ও সর্বনিম্ন। পক্ষান্তরে, কাজের গুণগত মান যাঁরা দেখা শুনা করবেন তাঁদের বরাদ্দ আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো – যাঁরা মূল কাজ করবেন ও কাজের গুণগত মান তদারকি করবেন তাঁরা হলেন প্রজাতন্ত্রের নিয়মিত বেতনভাতা ভোগী কর্মচারী। এবং কাজের স্বার্থে ও কাজের পদ্ধতিগত কারণে নিয়োজিত শ্রমিকদের পরিশুদ্ধ নাম দেয়া হয়েছে স্বেচ্ছাসেবী। এই বিজয়ের মাসে মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে যদি প্রশ্ন করি – প্রশাসনের এসির নীচে থাকা যে আমলাতন্ত্র – যাঁরা স্বেচ্ছাসেবী নামের শ্রমিকদের নাস্তা (কার্যত: মজুরী) ৮০ টাকা নির্ধারিত রেখে জাতীয় কর্মসূচির নামে জাতীয় লুটপাটের বাজেট বরাদ্দ করেন – তাঁরা কি আদৌ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বলে কোনো বস্তুর ধার-ধারেন? কিন্তু এই অনিয়মের বরাদ্দ-পাতি নিয়ে প্রশ্ন করবে কে? এ প্রসঙ্গে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সংসদ বক্তৃতার সংশয়োক্তি মনে পড়ছে – “আওয়ামী লীগ একটি মাল্টিক্লাস পার্টি। আমি তার নামের আগে কৃষক শ্রমিক লাগিয়েছি বৈকি, কিন্তু তার চরিত্র এখনো বদলাতে পারিনি – রাতারাতি তা সম্ভবও নয়। আমার দলে নব্য ধনীরাও আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় তাদের লুটপাটের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমি তাদের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাকশাল করেছি – যদি এই ব্যবস্থা সফল করতে ব্যর্থ হই এবং আমার মৃত্যু ঘটে, তাহলে দলকে কব্জা করে এরা লুটপাটে আরও উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে। এমনকি, স্বাধীন বাংলাদেশের মূলমন্ত্রে শত্রু পক্ষের চরিত্র ও নীতি অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ এর চরিত্র ও নীতি পাল্টে ফেলতে পারে। যদি তা হয় তাহলে সেটিই হবে আমার দ্বিতীয় মৃত্যু। সেজন্য আগেই বলেছি, আমার দল, আমার অনুসারীদের হাতে যদি আমার দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে, তাহলে দীর্ঘকালের জন্য বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যেতে হবে। কবে ফিরবো জানিনা।” আসলে, এমন ধরণের লুটপাট, রাস্ট্রের কোন সেক্টরে নেই – সে ভাবনাও এখন দুর্ভাবনা ছাড়া অন্যকিছু নয়।

এমন বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? এই প্রশ্ন সকলের কাছে।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট এবং স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদ এর সাংগঠনিক উপদেষ্টা।

ছড়িয়ে দিন