‘হিজড়া’- আমাদের মতোই মানুষ

প্রকাশিত: ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২২

‘হিজড়া’- আমাদের মতোই মানুষ

শামীমা চৌধুরী
রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আজ কাজের খুব চাপ। পরপর কয়েকটি মিটিং আছে।

নিবিষ্ট মনে কাজ করছে কম্পিউটার অপারেটর মারুফ। দৌড়াদৌড়ির মধ্যে রয়েছে জনিও। বসদের রুমে চা দেয়া, টেবিল পরিষ্কার করা, ব্যাংকে যাওয়া-কতো কাজ তার। তবে তাদের চলা ফেরার ভেতরে মেয়েলি ছাপ বেশি। তাই সহকর্মীরা খানিকটা বাঁকা চোখে তাকায়। এতে তারা অসহায় বোধ করে। কিছুটা ভয়ে ভয়েও থাকে।
মাস্টার রোলে বা দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করে তারা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে এই দু’জনকে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে স্থায়ী পদে নিয়োগ দেয়া হবে। মারুফ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা পাস করা। আর জনি হোসেন অষ্টম শ্রেণি পাস করেছে। তবুও মারুফ আর জনি হোসেন হিজড়া হিসেবেই পরিচিত। দুর্ভাগ্য তাদেরকে ‘হিজড়া’ পরিচয় এনে দিয়েছে।
সকলের অবহেলা আর উপেক্ষার পাত্র ছিল তারা। তাদের ভাগ্য আজ বদলে দিয়েছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মো. আবদুল জলিল। তার এই নিয়োগ সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিজড়াদের অন্তর্ভুক্তির স্বীকৃতি। হিজড়া প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, “পরিবার থেকে নির্বাসিত এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো পেটের দায়ে যৌনকর্মী বা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালায়। অমানবিক জীবন যাপন করে। তারা অচ্ছুৎ, পৃথিবীতে যেন তাদের কেউ নেই। তৃতীয় লিঙ্গের বা বৃহন্নলা মানুষের শারিরীক গঠনে কিছুটা ব্যতিক্রম আছে কিন্তু অস্বাভাবিকতা নেই। তাদের দুরবস্থার কথা জানার পর আমি ডেকে এনে এখানে কাজ দিয়েছি। যোগ্যতানুযায়ী তারা কাজ পাবে। এই দৃষ্টান্ত আমি রেখে গেলাম”।
সমাজের এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এখন বোঝে তারাও মানুষ। মারুফ আর জনি মনে করে, নাচ গান আর ভিক্ষাবৃত্তি তাদের জন্য সম্মানজনক পেশা হতে পারেনা। তারাও মানুষ। আর এ কারণে তারা পড়াশুনা করেছে। আগে মেয়েদের মতো পোশাক পরতো। এখন পরেনা।
মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই হিজড়া সম্প্রদায় ছিলো। হরমোনগত সমস্যার কারণে তাদের এ পরিবর্তন। না পুরুষ, না নারী, একসময় তাদের সংসার ছেড়ে চলে যেতে হয়। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। তবে বেসরকারি সূত্রমতে, এই সংখ্যা লাখের বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিজড়ারা জন্মগ্রহণ করে পুরুষ হিসেবে। ধীরে ধীরে শারিরীক পরিবর্তন হয়ে তারা পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায়। পরিচয় সংকটে ভোগে।
অনেকে যৌনাঙ্গ অপারেশন করিয়ে ফেলে। এদের ভেতর নারীর রূপটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। কেউ আবার নারী ও পুরুষ, উভয় রূপেই থাকে। তবে তারা নারী বা পুরুষ কোনটিই নয়। বেশিরভাগ হিজড়া হিন্দু ধর্মের প্রতি অনুরাগী। পূজা অর্চনা করলেও ধর্মীয় স্থানে এদের যাওয়াটা কেউ স্বাভাবিকভাবে নেয় না। তাই তারা নিজেদের ঘরেই পূজা অর্চনা করে থাকে। এদের মধ্যে মুসলিম ও খ্রিস্টানও আছে। আবার কেউ কেউ হিন্দু মুসলিম দুই ধর্মই পালন করে। তবে হার খুবই কম। হিজড়ারা শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। তারা একা থাকতে চায়না। প্রত্যেক হিজড়ার রয়েছে একজন গুরু বা গুরু মা। ঘর থেকে বেরিয়ে হিজড়া জীবনের নিয়ম শৃংখলা হিজড়ারা গুরুমার কাছ থেকে শেখে।
পেছনে পড়া এ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি পর্যায়ে রয়েছে অর্থ বরাদ্দসহ বেশ কিছু বিশেষ ব্যবস্থা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা যায়, ২০১২-২০১৩ র্অথবছর পাইলট র্কমসূচি হসিবেে ঢাকা, চট্টগ্রাম, দনিাজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, বগুড়া এবং সলিটেসহ ৭টি জলোয় এ র্কমসূচি চালু করা হয়। ২০১২-২০১৩ র্অথবছরে বরাদ্দ ছলিো ৭২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। ২০১৩-২০১৪ র্অথবছরে আরও ১৪টি জলোয় এই র্কমসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। ২০১৩-২০১৪ র্অথবছরে ২১টি জলোর জন্য মোট বরাদ্দ ছলি ৪ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৬শ’ টাকা। ২০১৪-২০১৫ র্অথবছরে এখাতে মোট বরাদ্দরে পরমিাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে পরমিাণ বড়েে ৮কোটি টাকা। এভাবে প্রতবিছর বরাদ্দরে পরমিাণ বাড়ছে এবং ২০২১-২০২২ র্অথবছরে মোট বরাদ্দকৃত র্অথরে পরমিাণ ৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া সরকারি পর্যায়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আরও বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে স্কুলগামী তৃতীয় লঙ্গিরে শক্ষর্িাথীদরে শক্ষিতি করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৪ স্তরে উপবৃত্তি উল্লখে করার মতো। এ র্কমসূচরি আওতায় প্রাথমকি স্তরে জনপ্রতি মাসকি ৭শ’ টাকা, মাধ্যমকি স্তরে জনপ্রতি ৮শ’ টাকা, উচ্চ মাধ্যমকি স্তরে ১ হাজার টাকা এবং উচ্চ শক্ষিার ক্ষত্রেে জনপ্রতি মাসকি ১ হাজার ২ শত টাকা হারে উপবৃত্তি দয়ো হচ্ছ।ে সরকার অক্ষম ও অসচ্ছল হজিড়াদরে জন্য বশিষে ভাতা চালু করছে।ে ৫০ বছর বা তর্দূধ বয়সরে অক্ষম ও অসচ্ছল হজিড়াদরে জনপ্রতি মাসকি ৬০০ টাকা হারে ভাতা দয়ো হচ্ছ।ে ৫০ দনিে বৃত্তমিূলক প্রশক্ষিণরে মাধ্যমে র্কমক্ষম হজিড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতাবৃদ্ধি ও আয়র্বধনমূলক র্কমকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে তাদরে সমাজরে মূলস্রোতধারায় আনার চষ্টো চলছ।ে প্রশক্ষিণোত্তর র্আথকি সহায়তা হসিাবে প্রত্যকেকে ১০ হাজার টাকা করে দয়ো হচ্ছ।ে
কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। কড়া মেকআপ দিয়ে আর পোশাক সুন্দর পরে, অদ্ভুত সাজ পোশাক করে হিজড়ারা চলাফেরা করে। তাদের বেশির ভাগের হাতে থাকে ফোন। এদের পেশা বলতে বিশেষ ভঙ্গিতে হাততালি দিয়ে গণপরিবহন, রাস্তাঘাট, বাজার কিংবা বাসায় বাসায় ঘুরে ঘুরে টাকা পয়সা জোগাড় করা। এছাড়া, নবজাতক পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচ গান করেও তারা পয়সা উপার্জন করে থাকে। কেউ কেউ যৌনকর্মী হিসেবেও কাজ করে, যা সামজের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

২০১৯ সালে স্বতন্ত্র লিঙ্গীয় পরিচয়ে হিজড়ারা ভোটাধিকার লাভ করে। এখন তারা তাদের পাসপোর্টে বা জাতীয় পরিচয়পত্রে লিঙ্গীয় পরিচয় হিসেবে হিজড়া উল্লেখ করতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে লিঙ্গীয় স্বীকৃতি লাভ করলেও এখনও তারা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। অধিকাংশেরই জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস নেই। করোনার টিকা নেয়ার ব্যাপারে তারা বেশ পিছিয়ে। রাজধানীর মান্ডা এলাকায় বসবাসকারী হিজড়া শ্রাবন্তী জানালেন, “একদিন মুগদা হাসপাতালে গিয়েছিলাম। নিবন্ধন অ্যাপে দেখা যায়, আমি একজন পুরুষ। আমি পুরুষ না, হিজড়া। কিন্তু অ্যাপে ওই অপশনটি নেই। আমরা করোনা টিকা নিতে চাই। কিন্তু আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। অনলাইনের নিবন্ধন আমরা বুঝিনা”।

হিজড়া সংঘের সভাপতি ইভান আহমেদ বলেন, “টিকা নিবন্ধন অ্যাপে পুরুষ ও নারীর ঘর আছে। কিন্তু হিজড়াদের কোনো ঘর নেই। স্বীকৃতি না থাকলে আমরা কীভাবে টিকা নেবো। অথচ হিজড়াদের ভেতর করোনা সংক্রমণ রয়েছে”।

প্রকৃতপক্ষে সরকার হিজড়াদের জন্য যে বরাদ্দ দিয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কীভাবে এটি জোগাড় করতে হয়, তাও তারা জানেনা। ফলে রাস্তায় বা গণপরিবহনে ভিক্ষা না করে উপায় থাকেনা তাদের। হিজড়ারা কারও ক্ষতি করেনা। এরপরও তাদের দেখলে মানুষ ভয় পায়। কারও ঘরে প্রবেশাধিকার নেই তাদের। তাদের বাসস্থানে মানুষ ঢিল ছোঁেড়। তারা যাবে কোথায়? তাদের মাঝে কেউ মারা গেলে গোপনে পুড়িয়ে ফেলতে হয় অথবা কবর দিতে হয়। জানাজানি হয়ে গেলে রক্ষা নাই।

আমাদের সমাজের তৃতীয় লিঙ্গের এ জনগোষ্ঠীর জন্য সহমর্মিতা, সহানুভূতি আরো বেশি করে চর্চা করা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে এ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ইচ্ছে করে হিজড়া হয়না। তাদেরও বাবা মা আছে। ভাইবোন আছে। তাদের পরিবারে ঠাঁই হয়না এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সবথেকেও তাদের কিছুই নেই। সবকিছু থাকার পরও তাদের সমাজের অপাংক্তেয়। এ নির্মমতা কতকাল বয়ে নিয়ে যাবে আমাদের সমাজ। এ রক্তক্ষরণ বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক ও মানবিক দায়বোধ থেকে হিজড়াদের স্বীকৃতি দিতে হবে আমাদের মন থেকে, যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে রাজশাহীর মারুফ ও জনি।

#
ফ্রিল্যান্স রাইটার।