হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে নারী ও পুরুষ

প্রকাশিত: ১০:২২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২১

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে নারী ও পুরুষ

পুলক ঘটক

বাংলদেশের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং বলেছে যে, রাষ্ট্র এমন কোন আইন প্রণয়ন করবে না যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের কোন আইন থাকলেও তা বাতিল হয়ে যাবে। এখানে ঘোষিত মৌলিক অধিকারের প্রথমটিই হচ্ছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” দ্বিতীয়ত: বলা হয়েছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।” তৃতীয়ত: “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।”
সমান অধিকার দূরে থাক, বাংলাদেশের হিন্দু আইন অনুযায়ী পিতা-মাতার সম্পত্তিতে পুত্র সন্তানের উপস্থিতিতে কন্যা সন্তানের বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। পুত্র সন্তান না থাকলে কন্যা সন্তান প্রয়াত পিতার সম্পত্তি ভোগ-দখল করতে পারে মাত্র। কিন্তু নিরঙ্কুশ মালিকানা (অর্থাৎ বিক্রয়, দান কিংবা হস্তান্তরের অধিকার) পায় না। সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা চলে যায় প্রয়াত ব্যক্তির পৌত্র, প্রপৌত্র, ভাই, ভাস্তে কিংবা অন্য কোন পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছে। শুধু পিতার কেন, স্বামীর সম্পত্তিতেও নিরঙ্কুশ উত্তরাধিকার নেই স্ত্রীর। তাদের অধিকার কেবল ভরণ-পোষণ লাভ কিংবা সম্পত্তি ভোগ-দখল করার মধ্যে সীমিত। সংবিধান চালু হওয়ার পরও হিন্দু সমাজের প্রথাগত বিধান বহাল রয়েছে এবং এসব বিধানমতেই বিজ্ঞ জজ সাহেবরা রায় প্রদান করছেন। বিচারকরা সংবিধান মানছেন না, মানছেন প্রচলিত প্রথা। বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য তার জীবদ্দশায় এই বৈষম্যমূলক হিন্দু আইন সংস্কারের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু কতিপয় রক্ষণশীল হিন্দু নেতার বাধার মুখে তিনি সফল হননি।
নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক উত্তরাধিকার আইনের পক্ষে সাফাই গাইতে রক্ষণশীল হিন্দুরা সংবিধান প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার যুক্তি তুলে ধরেন। তারা বলতে চান যে, হিন্দু আইন তাদের ধর্মের অঙ্গ। হিন্দু আইনের নিয়ন্ত্রণ তাদের ধর্মের নিয়ন্ত্রণ। আসলে রক্ষণশীলদের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ হিন্দু আইন কোনও কঠোর ধর্মীয় বিধি নয়। এই আইন কেবল আঞ্চলিক ও সামাজিক প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাছাড়া সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে “নৈতিকতাসাপেক্ষ” করা হয়েছে। কারও প্রতি বৈষম্য করা কিংবা কাউকে তার সহজাত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনমতেই নৈতিক বলে বিবেচিত হতে পারে না। ধর্মে কাউকে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারার বিধান থাকলেও “রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন” হিসেবে সংবিধান এর প্রতিবিধান করবে- এটাই স্বাভাবিক। পুত্রকে হত্যা করে তার মাংস দিয়ে অতিথি সেবা কিংবা পৃথিবীর কোন সমাজের প্রথা অনুযায়ী অতিথির মনতুষ্টির জন্য নিজ স্ত্রীকে তার বিছানায় পাঠানোর মধ্যে “ধর্মীয় মাহাত্ম্য” খুঁজে দেখা যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইন ও নৈতিকতা তাকে সমর্থন করতে পারে না। সভ্যতার আদিকাল থেকে চলে আসা সুবিশাল ধর্মীয় সাহিত্যের ক্রমবিবর্তনটা যারা বোঝেন না কিংবা বুঝেও যারা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারা বহাল রাখতে চান তাদের মতের সাথে আধুনিক ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কোন মিল নেই।
বাংলাদেশে সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে এই ভূখন্ডে হিন্দু আইন প্রচলিত ছিল। সংবিধানের ১৪৯ অনুচ্ছেদে “সকল প্রচলিত আইনের কার্যকরতা অব্যাহত থাকিবে” বলা হলেও তা “এই সংবিধানের বিধানাবলীসাপেক্ষে” করা হয়েছে। এখানেই সংবিধানে পূর্বোক্ত মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার প্রশ্নটি জড়িত। কারণ ২৬(১) অনুচ্ছেদে মৌলিক আধিকারের “বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে” বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ধর্র্মের কারণে কোন প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে ২৮ অনুচ্ছেদে। সুতরাং সংবিধানের সাথে প্রচলিত হিন্দু আইনের সংগতি নেই। দেশের কোন নাগরিক এখন পর্যন্ত হাইকোর্টে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেনি এবং হাইকোর্ট থেকেও এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ বা দিক নির্দেশনা আসেনি। ফলে এক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের সংকট রয়েই গেছে।
এ অবস্থায় পিতা-মাতার সম্পত্তিতে কন্যার স্বাভাবিক উত্তরাধিকারের স্থানটি দখল করেছে যৌতুকের মত একটি সামাজিক ব্যাধি। যৌতুক নিবারণে আইন হয়েছে। কিন্তু সম্পত্তিতে মেয়েদের সম-অধিকার দিয়ে এখন পর্যন্ত আইন প্রণয়ন করা হয়নি। স্পষ্টতই বলা যায়, রাষ্ট্র অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণ করছে হিন্দু মেয়েদের প্রতি। এর বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠা সময়ের দাবী। কিন্তু দেখা গেছে হিন্দু সমাজের কথিত প্রগতিশীলরা এ ব্যাপারে মিনমিনে উচ্চারণে কথা বলেন। এর কারণ ধর্মীয় নয়, বরং অর্থনৈতিক। আইনের দ্বারা সম্পত্তির বণ্টন ব্যবস্থা পুনঃনির্ধারণ করলে সমাজের চিত্রটাই পাল্টে যাবে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সাথে সাথে সামাজিক ক্ষমতায়ন ঘটবে। গ্রাম্য নারীরও আত্মমর্যাদাবোধ বাড়বে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ থাকবে না। একটি নারী-পুরুষ সমঅধিকার ভিত্তিক সুষম জীবন-সংস্কৃতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাবে সমাজ। সংগত কারণেই নারী-পুরুষ সমঅধিকার ভিত্তিক আইন প্রণীত হলে তা কায়েমী স্বার্থে আঘাত করবে। তাই হিন্দু আইন সংস্কারের প্রশ্নে সমাজের প্রগতিশীল শক্তি সোচ্চার না হলেও প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুরা যথেষ্ট বিরুদ্ধ-সচেতন। ঘরোয়া আলোচনায় কতিপয় হিন্দু নেতা অকপটে স্বীকার করেন, “রাজনীতিতে আমরা প্রগতিশীল, কিন্তু ঘরের ব্যাপারে আমাদের রক্ষণশীল হতেই হবে।”অপরাধীও তার আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু না কিছু যুক্তি খাড়া করে। হিন্দু মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার দেয়ার বিপক্ষে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে, বাংলাদেশের হিন্দু মেয়েরা সাম্প্রদায়িক আঘাতের বড় টার্গেট। হিন্দু মেয়ে অপহরণ, জোরপূর্বক বিবাহ এবং ধর্মান্তর এখানে নিত্যনৈমেত্তিক ঘটনা। এ অবস্থায় হিন্দু মেয়েদের হাতে সম্পত্তি দিলে সম্পত্তি আত্মসাতের লোভে তদের বলপূর্বক কিংবা অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে ধর্মান্তরিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। এ বিষয়ে বলতে হয়:
প্রথমত: আমাকে যদি কেউ বলে যে তোমাকে ধর্ম দেব, সমাজ দেব, পরকাল দেব কিন্তু তোমার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, ইহজাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ, স্বাধীনতা তথা মনুষ্যত্বের স্বীকৃতি কেড়ে নেব -তবে আমি সহজেই ইহজাগতিকতাকে বেছে নেব। আমার মনে হয় পুরুষ মাত্রই আমার দলে যোগ দিতে প্রস্তুত আছেন। কিন্তু এখানে মেয়েদের কথা আলাদা। তাদের উপর সহজেই নানা ধরণের পৈশাচিক যুক্তি চাপিয়ে দেয়া যায়। ঘরে সম্পত্তি থাকলে চোর-ডাকাত আসে, আক্রমণের ভয় থাকে -এ কথা সত্য। তাই বলে আমি কোন প্রকার সম্পত্তির অধিকারী হব না, চোরের ভয়ে মাটিতে ভাত খাব- এ যুক্তি যারা দেখাচ্ছেন তারা নিজেরা কি এটা মানেন? বরং সম্পত্তি হারানোর ভয়, এমন কি সম্পদের কারণে প্রাণহানির ভয় সত্ত্বেও মানুষ সম্পদের অধিকারী হতে চায়। নিজের নিরাপত্তার জন্যই তার সম্পদের প্রয়োজন হয়। সম্পদের মালিক হলে ব্যক্তি তার জান-মাল রক্ষার পদক্ষেপ নিজে থেকে গ্রহণ করে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে বাংলাদেশের হিন্দু মেয়েরা নিরাপত্তাহীন এ কথা সত্য। কিন্তু তাদের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বড় কারণ তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। কর্মজীবী নারীর আর্থিক নিরাপত্তা থাকায় সমাজে ও পরিবারে তারা অনেক বেশী স্বাধীন এবং নিরাপদ। রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে যে কোন অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার সাহস ও শক্তি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী মেয়েরাই রাখে। একটি মেয়ে চাকরি করলে তার ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টি হবে এবং সে ক্ষেত্রে তার প্রতি ভিন্ন সম্প্রদায়ের যুবকদের নজর পড়তে পারে- এই ভয়ে কি হিন্দু মেয়েদের চাকরি করতে দেয়া হবে না? হিন্দু ঘরের মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করলে, সঙ্গীত-কলায় সমৃদ্ধ করলে তথা সংস্কৃিত সম্পন্ন করলে সে মানসিক সম্পদে সমৃদ্ধ হবে এবং সেক্ষেত্রে তার উপর কোন ভিন্ন ধর্মীয় যুবকের দৃষ্টি পড়তে পারে। এই কারণে হিন্দু মেয়েদের অশিক্ষিত, রুচিহীন, সংস্কৃতিহীন করে রাখতে হবে- এটা কি যুক্তি হল?
দ্বিতীয়ত: প্রতিক্রিয়াশীলরা যে অজুহাতটি দেখায় তা নেহায়েত মিথ্যা। আসলে পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা হলে হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তরিত করা কঠিন হবে। কারণ ধর্মান্তরিত হলে সে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। হিন্দুর ধর্মীয় আইন এবং রাষ্ট্রীয় আইন উভয় বিধানেই এর নিশ্চয়তা দেয়া আছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আইনের বিধান হচ্ছে, একবার কোন ব্যক্তি ধর্মান্তরিত হলে এরপর সে তার নতুন ধর্মের পারিবারিক আইনের দ্বারা পরিচালিত হবে। এখানে উল্লেখ্য, ১৮৫০ সালে বৃটিশ সরকার Cast Disabilites Removal Act নামে একটি আইন পাস করে। এই আইন পাস হওয়ার পর এবং এই আইন রদ হওয়ার পূর্বকাল পর্যন্ত কেউ ধর্মান্তরিত বা জাতিচ্যুত হওয়ার কারণে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না। এই আইনকে ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনও বলা হয়। সমালোচনা আছে যে ধর্মান্তর উৎসাহিত করার জন্য এই আইন করা হয়েছিল। এই আইনটি ১৯৭৩ সালের ৮ নং আইন দ্বারা রদ করা হয়েছে এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে তা কার্যকর দেখানো হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে ধর্মান্তর দ্বারা উত্তরাধিকারের উপর হিন্দু আইনের প্রতিক্রিয়া বলবত হয়েছে। ধর্মান্তরিত হলে এখন কেউ উত্তরাধিকার লাভ করে না। গাজী শামছুর রহমান তার হিন্দু আইনের ভাষ্য গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
তৃতীয়ত: মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার দিলে তাতে তার ধর্ম যায় না, সমাজ যায় না এবং পরকালও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কারণ প্রচলিত হিন্দু আইন সনাতন ধর্মের আবশ্যিক শর্ত নয়। এ আইন সম্পূর্ণ প্রথাগত ও অঞ্চলভিত্তিক। অ্যামেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিন্দুরা বসবাস করেন। তারা সেই সব দেশের প্রচলিত আইন ও বন্টন ব্যবস্থার ভিত্তিতে সম্পত্তির অধিকার লাভ করেন। ভারত উপমহাদেশেও হিন্দু আইন সর্বত্র এক রকম নয়। ভারতের কোন কোন স্থানে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিদ্যমান। সেসব ঘরানার প্রথাগত আইন অনুযায়ী মেয়েদেরই সম্পত্তিতে অগ্রাধিকার। অথচ তারাও হিন্দু। নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী তাদের সমাজ চলছে। মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায়েও রয়েছে। আমাদের গ্রামের মেয়েরা যেমন বিয়ের পর বিদায়ের সময় গলা ফাটিয়ে কান্নাকাটি করতে করতে শ্বশুর বাড়ি যায়- এসব আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলেরাও তেমনি বিয়ের পর গলা ছেড়ে কেঁদেকেটে স্ত্রীর সংসারে চলে যায়। তাদের সমাজে সম্পত্তিতে স্বামীর নয়, স্ত্রীরই অধিকার। মজার বিষয় যে, ভারতের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানবিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে সেখানকার মাতৃতান্ত্রিক সমাজসমূহ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চেয়ে অগ্রবর্তী। মাতৃতান্ত্রিক কেরালা অন্যান্য প্রদেশের চেয়ে বেশী এগিয়েছে। অতএব, পিতৃতন্ত্র সমাজ উন্নয়নের কোন আবশ্যিক শর্ত এটা মনে করার কারণ নেই।
আদিকাল থেকেই ভারতীয় হিন্দু আইন দুটো প্রধান ঘরাণায় বিভক্ত। প্রতিটি ঘরাণার পন্ডিতদের মধ্যে আবার স্থুল, সূক্ষ্ম অনেক মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় বৈদিক সভ্যতার আদি (ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবকাল অর্থাৎ আদিম সাম্যবাদী সমাজের পরবর্তী স্তর) থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সমাজ যেমন ক্রমাগত বদলেছে তেমনি এসব বিধানকে ঘিরেও নানা বির্তক জন্ম নিয়েছে। বিধানগুলোর বর্তমান অবস্থা তাই ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের বহুবিধ পরিবর্তনের ফল। এসব বিধানে সময় ও আঞ্চলিকতার প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম প্রদেশ পন্ডিত জিমুৎবাহন প্রবর্তিত দায়ভাগ বিধান মতে চলে। ভারতের অপরাপর রাজ্য চলে মিতাক্ষরা বিধানে। এসব বিধানের মধ্যেও আবার ঘরানাগত তারতম্য আছে।
বাংলাদেশের দায়ভাগ বিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তার সম্পত্তিতে অন্যদের অধিকার (উত্তরাধিকার) জন্মে। কিন্তু মিতাক্ষরার যৌথ পারিবারিক বিধানে একজন শিশু জন্মমাত্র সম্পত্তির অধিকারী হয়। পরিবারের কারও মৃত্যুর জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় না। চার সদস্যের একটি মিতাক্ষরা যৌথ পরিবারে নতুন শিশু জন্ম নিলে সাথে সাথে ঐ পরিবারের সম্পত্তির ভাগিদার নবাগতসহ পাঁচ জনে পরিণত হয়। ফলে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভাগ কমে যায়। শিশুটির জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর সে ঐ সম্পত্তির বাটোয়ারাও দাবি করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল সেখানে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে শুধু ছেলেরা এবং মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে শুধু মেয়েরা সম্পত্তির অধিকার পায়।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা হিন্দু সমাজের এসব বিধানের অধিকাংশই সংবিধিবদ্ধ (codify) হয়নি। ফলে জমি-জমা ও সম্পত্তির বিচারকার্য পরিচালনায় নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্বতন কোন আদালতের রায়কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। সম্প্রতি ভারতে এসব ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আইনগুলো Codify করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ সম-অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে ভারতীয় হিন্দুদের হিন্দুত্ব ক্ষুণ্ণ হয়নি। কাজেই নিতান্ত পশ্চাদপদ প্রথাগত আইন ও বিধিগুলো সমাজে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। সনাতন ধর্র্মের প্রগতিশীল বৈশিষ্ট্যের সাথে এ ধরনের আইন সামঞ্জস্য রাখতে পারে না। সনাতন ধর্ম টেকসই, কিন্তু এর সমাজবিধিগুলো মোটেই টেকসই নয়। সমাজে সতীদাহ প্রথা ছিল। আজ চলে গেছে। এতে সনাতন ধর্মের কোন ক্ষতি হয়নি, বরং ধর্ম মজবুত হয়েছে। বাল্যবিবাহ না হলে একসময় মেয়েরা “অরক্ষণীয়া” হত। এখনকার শিক্ষিত হিন্দু সমাজ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দেয়া সমীচীন মনে করে না। কুল রক্ষার নামে “কুলীন বৃদ্ধের” শত নারী পরিগ্রহ করার কাহিনী এখন উপন্যাসে খুঁজে পেতে হয়। বিধবা বিবাহের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সমাজ তাও মেনে নিয়েছে, যদিও সংস্কৃতিটা খুব একটা চালু হয়নি। একসময় ছিল কেবল “ছুৎ মার্গ”। ধর্ম ছিল, বিবেকানন্দের ভাষায়, “ভাতের হাঁড়িতে।” তা থেকেও সমাজ অনেকখানি মুক্ত হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে সনাতন ধর্ম তার সত্যিকারের মর্যাদা ও মহত্ত ধরে রেখেছে। “যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে।……যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়, পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।” এই মহৎ সত্যের উপলব্ধি সনাতন ধর্মে সব সময় ছিল। নইলে এ ধর্ম টিকত না।
আজ যারা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের বিরোধিতা করছেন, পরিবর্তনশীল পৃথিবীর দাবি মেনে নিতে পারছেন না- তারা প্রকৃতপক্ষে সনাতন ধর্মের অস্তিত্বেরই বিরোধিতা করছেন। বর্তমান যুগে বর্ণাশ্রম ধর্ম বিলুপ্ত প্রায়। ব্রহ্মচর্য, গ্রার্হস্থ, বাণপ্রস্থ ও সন্নাস- এই চার আশ্রমের উপর হিন্দু সমাজ আদৌ কি দাড়িয়ে আছে? সাথে সাথে বর্ণধর্মের প্রাণ উড়ে গেছে, টিকে আছে খোলসটি। এ আলোচনা দীর্ঘ করার অবকাশ নাই। তবে পৌরাণিককালেরও আগে অর্থাৎ উপনিষদের যুগে দৃষ্টি দিলে বর্তমান হিন্দু আইনের যুগ বাস্তবতা মূল্যায়ন করা সহজ হয়।
হাজার বছরের সনাতন ধর্ম-সাহিত্যে আদিম বন্যতার নিদর্শন যেমন রয়েছে, তেমনি আদিমানবের সভ্যতা, উন্নত জীবনোপলব্ধি, ও তুরিয়ানন্দের বর্ণনায় পরিশীলীত আধুনিকতার উপস্থিতি আছে। ঈশ উপনিষদের বয়স ৭ হাজার বছর না ১০ হাজার বছর তা নিয়ে গবেষকদের মতভেদ আছে। তবে সে সময় যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটেছে এবং আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা বিলুপ্ত হলেও নতুন আর্থ-সমাজের সাথে তার টানাপড়েন শেষ হয়নি তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই উপনিষদের প্রথম মন্ত্রেই। “ঈশা বাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ। তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা মা গৃধ কস্যস্বিদ্ ধনম্।” -অর্থ হচ্ছে “এই গতিশীল বিশ্বে সবকিছুই ঈশ্বরের বাসের নিমিত্ত। ত্যাগের সাথে ভোগ করবে। কারও ধনে লোভ করো না।” বিশ্বের গতিশীলতার তত্ত্ব, ঈশ্বরের সর্বময়তা (অন্য অর্থে, ঈশ্বরের নামে সবকিছুর সামাজিক মালিকানা) এবং ত্যাগের সাথে ভোগ করার পরার্মশ আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেই পৃথিবীতে এসেছে- এ কথা ভাবতেও অবাক লাগে। এই মন্ত্রটি সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধী বলেন, আমি এই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, যদি সমস্ত উপনিষদাবলী ও সমস্ত শাস্ত্রাদি অকস্মাৎ ভস্মীভূত হয়ে যায় আর এই মন্ত্রটি রক্ষা পায়, তাহলে এই মন্ত্রটির জন্য হিন্দুধর্ম হিন্দুুদের মনে চিরদিন সজীব হয়ে থাকবে।” আবার বৃহদারণ্যক উপনিষদের এক স্থানে (৬ষ্ঠ অধ্যায়, চতুর্থ ব্রাহ্মণের ৬ষ্ঠ মন্ত্র) নারীর উপর আদিম বন্যতার নজির দেখা যায়, সা চেদস্মৈ ন দদ্যাৎ কামমেনামবক্রীণীয়াৎ সা চেদস্মৈ নৈব দ্যাৎ কামমেনাং যষ্ট্যা পাণিনা বোপহত্যাতিক্রামেদন্দ্রিয়েণ…। অর্থ হচ্ছে- যদি সেই স্ত্রী এই পুরুষকে কামনা না যোগায় তবে সে সেই স্ত্রীলোককে উপহারাদি দ্বারা বশীভূত করিবে। তাহাতেও যদি সে পুরুষের কামনা চরিতার্থ না করে তবে সেই স্ত্রীকে সে হাত বা লাঠি দ্বারা আঘাত করিয়া তাহাকে বশীভূত করিবে। আজকে হিন্দু সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কোন স্ত্রীলোককে আঘাত করিয়া বশীভূত করিবে, না কি জীবনের সকল ক্ষেত্রে ত্যাগের সাথে ভোগ করার আদর্শ ধারণ করবে?
ধর্ম কোনটি? সমাজের বিধি বিধানই কি ধর্ম? না কি সত্য সুন্দরের প্রকাশ, আনন্দের পরম অভিব্যক্তিই ধর্ম? স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ”Religion is the manifestation of the Divinity already in man.” বিবেকানন্দ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিধিবিধান প্রণয়নে ধর্মের কর্তৃত্ব মানতেই রাজি নন। ধর্ম ও সমাজ সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে তিনি বলছেন, “Religion has no business to formulate social laws…. Social laws were created by economic conditions under the sanction of religion. The terrible mistake of religion was to interfere in social matters.” বিবেকানন্দ মনে করেন যা প্রগতির পরিপন্থী তাই পাপ এবং যা প্রগতির সহায়ক তাই পুণ্য। “Whatever retards the onward progress or helps the downward fall is vice; whatever helps in coming up and becoming harmonized is virtue.” কোন ধর্ম যদি সামাজিক বিধিবিধান হয়, আর তা যদি অপরিবর্তনীয় নয়- তবে সে ধর্মের অকাল মৃত্যু অবিশম্ভাবী। আপনি শিশুর গায়ে একটি স্থায়ী জামা পরিয়ে দিয়েছেন। শিশুটি বেড়ে উঠছে কিন্তু তার জামাটি বাড়ছে না- এরকম জামা তার গায়ে কতদিন থাকবে? সমাজকে জামা পরাতে চাইলে জামাটিও সমাজের সাথে স্থিতিস্থাপক হতে হবে। নইলে সমাজ সেই জামাটি ছুড়ে ফেলে দেবে। এটাই স্বাভাবিক। তাই এরকম ধর্মবিশ্বাসী মানুষ চাই যিনি বিবেকানন্দের মত সাহস করে বলতে পারেন, “যে ধর্ম বালবিধবার অশ্রু মোচন করতে পারে না, যে ধর্ম পিতৃমাতৃহীন অনাথের মুখে এক টুকরো রুটি তুলে দিতে পারে না সে ধর্মে আমি বিশ্বাস করি না।
আজ সমাজের সর্বত্র নারীর ক্ষমতায়নের দাবি। এসব দাবি অর্থহীন হবে যদি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান করা না হয়। নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষমতায়ন কিংবা স্বাধীনতা- সবকিছুর মূল হল অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল মানুষ সমাজ-জীবনের কোন স্তরেই ক্ষমতার স্বাদ পায় না। সম্পত্তিতে মানুষের ব্যক্তিমালিকানা স্বীকার করেও একজন নারীকে জন্মসূত্রে প্রাপ্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করলে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই থাকে না। পরিবারিক জীবনে থাকে পরাধীন। সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশের সাহস ও অভ্যাস কখনই তার গড়ে ওঠে না। জীবনযাপনে তার অবস্থান হয় প্রান্তিক ও ভঙ্গুর। এখানে ছোট ছোট কয়েকটি উপমা তুলে ধরা যায়।
স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির উপর জীবনসত্ত্ব বসিয়েছে বাসন্তী। বয়স ২৩ বছর। অতএব অতিসত্বর পরপারে গিয়ে এই অনাকাংখিত দখলদারিত্ব থেকে জ্ঞাতিদের মুক্তি দেবে এমন সম্ভাবনা উজ্জ্বল নয়। এ বয়সেই স্বামীকে খেয়েছে। এখন যদি সারা জীবন তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আগলে বসে থাকে তবে কার তা সহ্য হয়! সেই যুগ হলে স্বামীর চিতায় উঠিয়ে দিয়েই নিস্কৃতি মিলত। এখন উপায়! উপায় হচ্ছে বাসন্তীর দেহ ও মনের ঘুমন্ত কামনাকে জাগিয়ে তোলা, তাকে অসতী বানানো। যে পুরুষ এই কাজটি করবে তার হারানোর কিছুই নেই। কিন্তু বাসন্তী সব হারাবে। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সন্তানহীনা বিধবা যতদিন সতীত্ব নিয়ে বেঁচে থাকবে ততদিন স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করবে। কিন্তু সেই সম্পত্তি বিক্রি কিংবা হস্তান্তরে তার কোন অধিকার নেই। বিধবা মরে গেলে, পুনরায় বিয়ে করলে কিংবা সতীত্ব বিসর্জন দিলে তার প্রয়াত স্বামীর ভাই কিংবা অন্য উত্তরাধিকারীরা সেই সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার পাবে। অবশ্য আদালতের বিভিন্ন রায়ের দৃষ্টান্তে অসতীত্বের অপবাদে কোন বিধবার প্রতিষ্ঠিত জীবনস্বত্ত্ব কেড়ে নেয়া এখনকার দিনে আর সহজ ব্যাপার নয়।
আইন বিশারদ গাজী শামছুর রহমান হিন্দু আইনের ভাষ্যে লিখেছেন, বিবাহিত জীবনে নিজের শ্রমে যদি কোন স্ত্রী সম্পত্তি আয় করে, তবে সেই সম্পত্তির উপর স্বামীর নিয়ন্ত্রণ থাকে। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর যে কর্তব্য আছে, তাহা অবহেলা করিয়া বা তাহাতে শিথিল হইয়া স্ত্রী নিজস্বভাবে আয় করিতে যাহাতে ক্ষুব্ধ না হয়, সেইজন্য এই ব্যবস্থা। বিবাহিত জীবনে স্ত্রী অন্যের নিকট হইতে যে উপহার পায় তাহার উপরও স্বামীর নিয়ন্ত্রণ থাকে। উপহার পাইবার আশায় সে অন্যায়ভাবে কাহার উপর যাহাতে নমনীয় না হয় তজ্জন্য এই ব্যবস্থা।” কিন্তু স্বামীর জন্য একাধিক পন্তী, উপপত্নী বা পতিতা গমন পর্যন্ত একদম বৈধ। এতে স্বামীর দায়িত্বশীলতায় কোন ব্যত্যয় ঘটে না।
সুধীর বাবুর একমাত্র মেয়ে সুজাতার একটি চোখ দুর্ঘটনায় নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়েটি সুন্দরী নয়। কিন্তু বাবার বড় আদরের। লেখা-পড়া, কাজ-কর্ম কোন দিকেই তার দুর্বলতা নেই। মেয়ের বিয়ে নিয়ে বাবার বড় দুশ্চিন্তা ছিল। শেষমেষ বেশ ভাল ঘরেই বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্রকে স্বাবলম্বী করে দেয়ার জন্য এক দাগে ১২ বিঘা জমি লিখে দিতে রাজি হয়েছেন সুধীর বাবু। একমাত্র ছেলে জ্যোতিষ এজন্য যে কিছুটা বেজার হয়েছে তা তার হাবভাবে বেশ বোঝা যায়। কিন্তু কি করা যাবে। মেয়েকে তো আর তিনি জলে ভাসিয়ে দিতে পারেন না। আর জ্যোতিষটা আসলেই স্বার্থপর। মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পরও সুধীর বাবু তার জন্য বাড়ি, বাগান, পুকুর সব মিলে প্রায় ১৮ বিঘা জমি রেখে যাবেন। ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন তিনি। সুতরাং একমাত্র বোনের জন্য বাবা কতটুকু সম্পত্তি দান করবেন তা নিয়ে ক্ষোভ কেন? আসলে জ্যোতিষ নয়, বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে জ্যোতিষের বউ। জামাইকে বঞ্চিত করে সুজাতাকে সবকিছু দিয়ে দেয়ায় জ্যোতিষের শ্বশুড়-শ্বাশুরিও আপত্তি জানাচ্ছে। এরপরও বিয়ের আয়োজন ঠিক ঠিক এগিয়ে চলেছে। আর ২১ দিন বাকি। একমাত্র বেয়াই আর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বর আশির্বাদের মঙ্গল যাত্রায় রওনা দিলেন সুধীর বাবু। ফিরে এলেন লাশ হয়ে। সড়ক দুর্ঘটনায় তার জীবনাবসান হয়েছে। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে আরও বেশ কয়েক জন। ফলে বিয়েটা আটকে গেল এক বছরের জন্য। কালাশৌচ যে। এই সময়ের মধ্যে বিয়ে দিলে অমঙ্গল হবে। কিন্তু কবে হবে সে মঙ্গল অনুষ্ঠান? একে একে তিন বছর কেটে গেছে। একচোখ অন্ধ সুজাতা তার দাদা-বৌদির সংসারে ভালই আছে। পরাশ্রয়ে ভাল থাকা! পিতার মৃত্যুতে সব সম্পত্তির অধিকারী একমাত্র দাদা। বোনের অনাদর করে না। বিয়ে দেয়ার চেষ্টাও করছে। তবে ১২ বিঘা সম্পত্তির বিনিময়ে নয়।
যতিনের কোন ছেলে সন্তান নেই। ছেলের আশায় সন্তান নিতে গিয়ে চারটি মেয়ে পেয়েছেন। দু’ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আরও এক মেয়ের বিয়ে দেয়ার কথা জোরেসোরে চলছে। এমন সময় আকস্মিক পরপারের ডাক এসে গেল। সম্পত্তির বিলি-বন্টন, স্ত্রী কন্যাদের ভবিষ্যৎ কোন কিছুরই সুরাহা করার সময় পেলেন না। হিন্দু আইনের বিধান অনুযায়ী যতিনের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে সীমিতস্বত্ব লাভ করল তার বিধবা স্ত্রী। এই সম্পত্তি তিনি দান, হস্তান্তর কিংবা বিক্রি করতে পারবেন না। যতদিন বেঁচে আছেন ভোগ করতে পারবেন মাত্র। বিধবার মৃত্যু হলে তার অবিবাহিত মেয়ে দু’জনও ঐ সম্পত্তি ভোগ করতে পারবে। এরপর পাবে বিবাহিত মেয়েরা। তবে তারা কেউই পূর্ণাঙ্গ মালিকানা পাবে না। পূর্ণ মালিকানা শেষ পর্যন্ত চলে যাবে মৃত যতিনের ভাই কিংবা অন্য পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছে। এই হচ্ছে বাঙালি হিন্দু মেয়েদের অধিকারের সীমা।
মা রাজুকে (ছেলে) খেতে দিচ্ছেন এক গ্লাস দুধ, আর মিনাকে (মেয়ে) খেতে দিচ্ছেন আধা গ্লাস দুধ। কার্টুন চিত্র দেখেছিলাম যার নিচে লেখা হয়েছে, আপনার ছেলে ও মেয়েকে সমান অংশ দিন। এই বাক্যটি যেন সংবিধানের এবং তার উপরের চিত্রটা বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের। ছেলে ও মেয়েকে সমান অংশ দিয়ে সংবিধানের এ বাণীকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজটি আজও বাকি আছে। ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু সমাজে এক সময় মেয়েদের স্বামীর চিতায় পুরিয়ে মারার প্রথা প্রচলন ছিল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে বাংলা থেকেই এবং সে আন্দোলনের জয় হয়েছে। আজকের কোন গোড়া হিন্দুর সামনে যদি সতীদাহের কাহিনী তুলে ধরে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে নিন্দাবাদ করা হয় তবে সে অবলীলায় এরকম কোন ধর্মীয় বিধানের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। বলে, ওসব ধর্মীয় বিধান নয়, সামাজিক কুসংস্কার মাত্র। অথচ উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাজা রামমোহনের নেতৃত্বে যখন সতীদাহবিরোধী আন্দোলন জমে উঠেছিল তখন তৎকালীন হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল মহল ধর্র্মের ধোঁয়া তুলেই এর বিরোধিতা করেছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে বিধবা বিবাহের আন্দোলনের সময়ও একই চিত্র দেখা গেছে। শেষে প্রগতিশীলতার জয় হয়েছে, প্রতিক্রিয়াশীলতা পরাভব মেনেছে। আজও যারা হিন্দু মেয়েদের উত্তরাধিকার দেয়ার প্রশ্নে বিরোধিতা করছে তারাও পরাজিত হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ghatack@gmail.com.

ছড়িয়ে দিন