হিমালয়কন্যার হাসি

প্রকাশিত: ২:৫৭ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৮

হিমালয়কন্যার হাসি

সৌমিত্র দেব

বন্ধুবর মুসা ইব্রাহিম এভারেষ্ট বিজয় করেছেন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে এখন পত পত করে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। তার আগে আরো তিন জন ভারতীয় বাঙ্গালী হিমালয়ের চুড়ায় আরোহন করলেও বাংলাদেশীদের মধ্যে তিনিই প্রথম। এমনকি সারা পৃথিবীতে প্রথম বাঙ্গলী মুসলমান হিসেবে তিনি এই কৃতিত্ত্ব লাভ করেছেন। মুসার সঙ্গে আমার কিছু কাজ করার অভিজ্ঞাতা আছে। বিখ্যাত পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জল ,মুসা ইব্রাহিম ও আমি মিলে একটি ভ্রমন কাহিনী সংকলন প্রকাশ করেছিলাম। নাম ছিল “ভ্রমনের খেরোখাতা”। তা ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস ইনিসটিউটের সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর কোর্স করতে গিয়ে মুসাকে আমার সহপাঠি হিসেবে পেয়েছিলাম। সেই মুসার বিজয়ে আমি আনন্দিত। তবে তার থেকে অন্তত পাঁচ বছর আগে আমি এভারেষ্ট ছুয়ে এসেছিলাম। এখানে সেই গল্পই বলছি।
২০০৫ সালের মে মাসে হঠাৎ করে হিমালয় কন্যার দেশ নেপালে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। তার মাত্র দুমাস আগে ফিরেছি আমেরিকা থেকে। পত্রিকা অফিস থেকে ছুটি পাওয়া কঠিন। কিন্তু সেটা পাওয়া গেল। বাধা আসলো পাসপোর্ট থেকে। মেয়াদ উত্তির্ণ হবার আগেই পাসপোর্টের পাতা শেষ হয়ে গেছে। কি আর করা! ছুটলাম পাসপোর্ট অফিসে। সাংবাদিক পরিচয় কাজে লাগলো। সহজেই এক দিনের মধ্যে নতুন পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম। নির্ধারিত দিনে আমাদের যাত্রা শুরু হলো।

বিমানবন্দরে সংবর্ধনা
আকাশ থেকে হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ দেখতে দেখতে নামলাম ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। ঢাকা থেকে আকাশ পথে কাঠমন্ডু যেতে সময় লেগেছে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট। তখনও যুবক বিকেল। সন্ধ্যা কখন আসবে তার ঠিক নেই। কসমিক এয়ার আকারে ছোট বলেই হয়তো এই সময় লেগেছে। বড় বিমানের আরও কম সময় লাগতো। আমরা একে একে সবাই রানওয়ে ছেড়ে বিমানবন্দরের দিকে এগুলাম। কসমিক এয়ারের ভেতরটা আমরা ক’জনই একেবারে মাতিয়ে রেখেছিলাম। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের আমন্ত্রণে নেপাল যাত্রী আমরা। আমাদের সঙ্গে টিম লিডার হিসেবে আছেন নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড এনটিবি’র বাংলাদেশী পিআরআর এবং গ্যালাক্সি হলিডেজের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ গোলাম কাদির। ৮ সদস্যের এই টিমে অন্যান্যের মধ্যে আছেন আল সিরাজ ট্রাভেলসের মো. নাজিরুল ইসলাম, ব্যাক্সিট্রেড-এর মো. জিয়াউল হক, জার্নি প্লাস-এর তৌফিক রহমান, স্কাইসেইল ট্রাভেল-এর আশিক আল মাহমুদ, গাংচিল ট্যুরিজমের এম মনিরুজ্জামান মাসুদ, দৈনিক মানবজমিন-এর ফিচার সম্পাদক আনজীর লিটন ও আমি। সম্প্রতি সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নেপালে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে করে তাদের পর্যটন শিল্প হয়ে পড়েছে হুমকির সম্মুখীন। বিদেশী পর্যটকদের মনের উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য নেপাল সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিভিন্ন দেশের ট্যুর অপারেটর ও মিডিয়া পার্সনদের প্রতি তারা নেপাল দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিষয়টি দেখা শোনা করছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের এই ৬ জন ট্যুর অপারেটর ও ২ জন সাংবাদিকের এবারের নেপাল সফর। আমার বিস্ময় ছিল, ভিসা ছাড়াই কিভাবে নেপাল বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম। কয়েক কদম এগুতেই বুঝতে পারলাম আমাদের জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে। এয়ারপোর্টের ভেতরে অপেক্ষমাণ এনটিবি’র স্টাফরা আমাদেরকে ঘিরে ধরলো। এনটিবি’র মনোগ্রাম লাগানো হলুদ রঙের উত্তরীয় একে একে পরিয়ে দিলো আমাদের গলায়। রীতিমতো সংবর্ধনা। অন্য যাত্রীরাও সোৎসাহে আমাদের পিছু পিছু ছুটে এলো। কিন্তু একটু পরেই যখন বুঝতে পারলো কপালে প্রাপ্তিযোগ নেই, তখন তাদের নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হলো। এনটিবি’র কর্মকর্তারা ভিসা প্রাপ্তিসহ অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করায় বেশ দ্রুত সব ঝামেলা সেরে বেরিয়ে পড়তে পারলাম। এনটিবি’র করপোরেট সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের অফিসার বৈকুণ্ঠ প্রসাদ আচার্য আবির্ভূত হলো আমাদের সার্বক্ষণিক গাইড হিসেবে।

হোটেল ক্রাউন প্লাজা
কাঠমন্ডু শহরে আমরা প্রথমেই উঠলাম ফাইভ স্টার হোটেল ক্রাউন প্লাজায়। সেখানেও আমাদের জন্য আরেক দফা সংবর্ধনা অপেক্ষা করছিল। এনটিবি’র উর্ধতন কর্মকর্তা উজ্জ্বলা ঢালীসহ বেশ কয়েকজন আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। তারা আমাদের দিকে করজোড়ে ‘নমস্তে’ বলে এগিয়ে এলেন এবং আগের মতোই তাদের রীতি অনুযায়ী পরিয়ে দিলেন উত্তরীয়। পরিচয়পর্ব সেরেই আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিলেন। ৭ থেকে ১৪ জুলাই টানা ৮ দিনের টাইট সিডিউল। রাতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো হোটেল সংলগ্ন ক্যাসিনোতে। সেখানে আমাদের সাথে নৈশভোজে অংশ নিলেন এনটিবি’র উজ্জ্বলা ঢালীসহ নেপাল ট্র্যাভেলার পাবলিকেশনের এমডি মিসেস বাচ্চু শেকা, ক্রাউন প্লাজার সেলসম্যানেজার ভারত যোশী ও কসমিক এয়ারের জেনারেল ম্যানেজার মি. লরেন্স কেসি লিউ। বাচ্চু শেকা একজন জাঁদরেল মহিলা। নেপালের ট্যুরিজমের উন্নয়নের জন্য তার রয়েছে একাধিক প্রকাশনা। এর মধ্যে আছে নেপাল ট্রাভেলার, নেপাল ট্রাভেল এন্ড ট্রেড রিপোর্টার ও নেপাল টিভি গাইড। নৈশভোজের টেবিলগুলোর সামনেই আছে বিনোদন মঞ্চ। সেখানে জনপ্রিয় হিন্দি ও নেপালি গানের তালে তালে নাচছে তরুণ-তরুণীরা। ভারত যোশী বললেন, নেপালে হিন্দির আগ্রাসন খুব বেশি। এমনকি যারা মাওবাদী রাজনীতি করে তারাও চীনপন্থী নন। ভারতপন্থী। ভারতের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্য থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা নেপালের নেই। নেপালিদের সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল তাদের সবার চেহারা হবে মঙ্গোলয়েড। কিন্তু আমার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় বিভিন্ন জাতির সাথে মিশ্রণের ফলে তাদের চেহারা এখন বাঙালিদের মতোই। তাদের বর্ণমালার উচ্চারণ, সংখ্যা এমনকি অনেক শব্দও একেবারে বাংলার মতো। শুধু কথ্যরীতি ভিন্ন। বাংলা আর নেপালি ভাষার এই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য যে হাজার বছর আগেও ছিল তার প্রমাণ হচ্ছে চর্যাপদ। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন এই বৌদ্ধগান মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উদ্ধার করেছিলেন নেপাল রাজদরবারের পুঁথিশালা থেকে। খাওয়ার টেবিলেই কসমিক এয়ারের লরেন্স লিউর সাথে কথা হলো। তিনিও বললেন নেপালের মূল আয় হচ্ছে ট্যুরিজম আর কৃষি। ট্যুরিজমের উন্নয়নের জন্য কসমিক এয়ার সব ধরনের ছাড় দিচ্ছে। দিয়েছে বাইওয়ান গেটওয়ান ব্যবস্থা। অর্থাৎ এক টিকিট কিনলে আরেকটি টিকিট সেখানে ফ্রি পাওয়া যাচ্ছে। নেপালে প্রাইভেট এয়ার লাইন আছে অনেকগুলো। পাহাড়ি পথের কারণে সেখানে বাস বা ট্রেনের চাইতে এয়ার রুটের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। খাবার টেবিলে দেখলাম ওদের খাদ্যাভ্যাস আমাদেরই মতো। সুতরাং নিশ্চিন্ত। নৈশভোজ শেষ হবার আগেই একটা প্রস্তাব পেলাম, আমাদেরকে জুয়া খেলতে হবে। আমি সম্মত ছিলাম না। কিন্তু যখন শুনলাম যে খেলা না জানলেও অসুবিধা নেই, আমাদের প্রত্যেকের জন্য ২ হাজার ভারতীয় রুপির কুপন সৌজন্য হিসেবে দেয়া হচ্ছে ক্যাসিনোর পক্ষ থেকে। তখন আর আপত্তি করলাম না। জো আপসে আয়া উয়ো হালাল হ্যায়। রীতিমতো আনাড়ি হয়েও সেখানে ৮শ’ ভারতীয় রুপি অর্থাৎ নেপালি টাকায় প্রায় ১২৪০ টাকা আয় করলাম। মধ্যরাত পর্যন্ত জুয়া খেলে বিজয়ীর বেশে ফিরে গেলাম ক্রাউন প্লাজার আলিশান বিছানায়।

ভক্তপুর ও নাগরকোট
ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৪২৩ ফুট উঁচুত হচ্ছে কাঠমন্ডু উপত্যকা। শুধু রাজধানী কাঠমন্ডু শহর নয়, এর পার্শ্ববর্তী দুটি ঐতিহাসিক শহর ভক্তপুর ও পতন এই উপত্যকারই অংশ। কথিত আছে একটি মাত্র গাছের একটি খণ্ড থেকে একটি মণ্ডপ তৈরি হয়েছিল। সেই কাষ্ঠ মণ্ডপ থেকেই কাঠমন্ডু নামটি এসেছে। পরদিন আমরা এনটিবি’র গাড়িতে করে প্রথমে গেলাম স্বয়ম্ভুনাথের মন্দিরে। সেখানে বিশাল বৌদ্ধমূর্তি ছাড়াও বুদ্ধের স্মৃতিরক্ষার জন্য রয়েছে জাদুঘর। প্রচুর বিদেশী পর্যটকের ভিড়। ইংল্যান্ডের একদল ছাত্রছাত্রী মন্দির প্রাঙ্গণকে মাতিয়ে তুলেছে। তারা বললো, ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে নাকি বাংলাদেশের নাম জেনেছে। সেখান থেকে গেলাম কাঠমন্ডুর পার্শ্ববর্তী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর ভক্তপুরে। সেখানে আছে অনেক মন্দির ও প্রাচীন রাজবাড়ি। সেগুলো বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভক্তপুর রাজবাড়িতে এখন রীতিমতো সেনাবাহিনী পাহারা দিচ্ছে। একটি মন্দিরে আছে কামসূত্রের ভাস্কর্য সিরিজ। রাজবাড়ির ভেতরে বড় বড় দীঘি। সেগুলোতে ছাতার মতো ফণা তুলে আছে পিতলের সাপ। সেখানে দেখলাম পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্যাগোডার একটি নয়াটোপলা মন্দির। এ সবই এখন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ। এক সময় এখানে দল বেঁধে হিপ্পিরা আসতো। হরেকৃষ্ণ হরে রামসহ অনেক হিন্দি সিনেমার শুটিং এখানে হয়েছে বলে আমাদের দোভাষী গাইড জানালেন। ভক্তপুরের আকর্ষণীয় এলাকা দরবার স্কয়ারে কিছুক্ষণ ঘুরলাম। তারপর সেখান থেকে আরেকটু ভেতরে আমরা গেলাম তিব্বতিদের কাছে। চীন তিব্বত দখল করে ফেলায় তারা অনেকেই এখন নেপাল ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। দেখলাম তাদের থানকা তৈরির কাজ। থানকা হচ্ছে এক ধরনের সূক্ষ্ম শিল্প। শিল্পীরা গভীর মনোযোগে তাদের চারুকর্মের মধ্য দিয়ে সেখানে বৌদ্ধধর্মের দর্শন ও নানা কাহিনী ফুটিয়ে তোলেন। এরপর ভক্তপুর থেকে আমরা চলে গেলাম নগরকোটে। কাঠমন্ডু শহর থেকে পূর্বদিকে ৭ হাজার ১৩৩ ফুট উঁচু স্থান হচ্ছে এই নগরকোট। উঁচু পাহাড়ের শীর্ষদেশে এরকম পাকা রাস্তা ভাবাই যায় না। এ পথেরই একটি শাখা চলে গেছে চীন পর্যন্ত। ক্লাব হিমালয়ে আমাদের রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা হলো। ক্লাব হিমালয় হচ্ছে ছবির মতো সুন্দর একটি রিসোর্ট। সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন এর পরিচালক শুভ্রকেশী মিত্ররাজ ভট্টরাই। অত্যন্ত রোমান্টিক মনের মানুষ। তিনি আমাদের সঙ্গে কোনো সঙ্গিনী না থাকায় খুব আক্ষেপ করলেন। রুমে ঢুকে জানালা খুলতেই নয়ন সার্থক হয়ে গেল। পাহাড়ের এতো রূপ! একে ভাষায় ফুটিয়ে তোলা সত্যিই কষ্টকর। ক্লিশে উপমা ব্যবহার করে এর অপমান করার কোনো মানেই হয় না। মিত্ররাজ বললেন, যদি আকাশে মেঘ না থাকে তাহলে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হবো। আর কপাল ভাল থাকলে সূর্যোদয় তো আছেই। কিন্তু আমাদের কপাল ভাল ছিল না। মেঘে ঢাকা আকাশের কারণে সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় কোনোটাই দেখতে পারলাম না। তবে কপাল খারাপই বা কি করে বলি, ওই দুটো ছাড়াও যে দৃশ্যগুলো দেখেছি তা তো আর আগে কখনো দেখিনি। গিরিশৃঙ্গগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের রং এর গায়ে কি রকম ভেঙে ভেঙে পড়বে। নেপালের পথে পথে সেনাবাহিনী। নগরকোটের দুর্গম শিখরে গাড়ি নিয়ে গিয়েও দেখেছি সেখানে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ চলছে। শুধু পুরুষ নয়, প্রচুর পরিমাণে নারী সেনাও রয়েছে। গোর্খা সৈন্যের খ্যাতি এমনিতেই বিশ্বজোড়া। তারপরেও গাইড বৈকুণ্ঠকে বললাম, পথে-ঘাটে এরকম সেনাদের চেহারা দেখলে তো পর্যটকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। যদি পর্যটন শিল্পের ভাল চাও সৈনিক ভাইদের ব্যারাকে পাঠাও। বৈকুণ্ঠ বললো, সেনারা পর্যটকদের সহযোগিতা করতেই সদা প্রস্তুত। তাদের নামানো হয়েছে সন্ত্রাস ও মাওবাদী উগ্রপন্থা দমনের জন্য।

মনোকামনা
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই নগরকোট থেকে বিদায় নিলাম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। পূর্ব নির্ধারিত ভ্রমণ নির্দেশিকা অনুযায়ী আমরা গেলাম খরস্রোতা ত্রিশুলী নদীর পারে। সেখান থেকে আমাদের র‌্যাফটিং করার কথা। উদ্দাম তারুণ্য এই দুঃসাহসিক র‌্যাফটিং-এর মধ্যে তীব্র আনন্দ খুঁজে পায়। কিন্তু পাহাড়ি ঢলের কারণে বৈকুণ্ঠ আমাদের জীবনের ওপর ঝুঁকি নেয়ার এই খেলায় অংশগ্রহণে বারণ করল। দড়িটানা ঝুলন্ত ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে আমরা নদীর বিক্রম দেখলাম। তারপর নদীর পারেরই একটি চমৎকার রিসোর্টে আমাদের দুপুরের আহার সারলাম। নাম রিভার সাইট ¯িপ্রং রিসোর্ট। লোকালয়হীন গহীন অরণ্যে এত সুন্দর আয়োজন ভাবাই যায় না। যেহেতু তার কথা শুনে র‌্যাফটিং-এ নামিনি সে কারণে বৈকুণ্ঠ আমাদের নিয়ে গেল মনোকামনা পূরণে মনোকামনার মন্দিরে। এ আমাদের জন্য এক বিশাল অভিজ্ঞতা। হাজার হাজার ফুট উঁচুতে এই মনোকামনা মন্দির। কথিত আছে নেপালের এক রাজা এই মন্দিরে পুজো দিয়ে তার কামনা অনুযায়ী ফল পেয়ে ছিলেন। হাতি-ঘোড়ায় চড়ে তাকে অনেক কষ্টে হয়তো তখন চড়াই-উৎরাই পার হয়ে সেখানে পৌঁছুতে হয়েছিল। ক্যাবলকারে চড়ে এখন সহজেই মানুষ সেখানে যেতে পারে। বিদেশীদের বিনিয়োগে ও কারিগরি দক্ষতায় সেখানে নামানো হয়েছে অনেকগুলো ক্যাবলকার। চুম্বকের আকর্ষণে তারে ঝুলতে ঝুলতে এই গাড়ি চলে যায় মনোকামনার স্টেশনে। মাটি থেকে বিমানদূরত্বে এভাবে যাওয়াটা খুবই রোমাঞ্চকর। সঙ্গী ট্যুর অপারেটরদের কেউ কেউ মালয়েশিয়ায় এধরনের গাড়ি চড়েছেন। মনোকামনার মন্দিরে এলাহী কাণ্ড। হাজারও ভক্তের ভিড়ে পুজো চলছে। চলছে পশুবলি। বৈকুণ্ঠ চট করে তার কপালে তিলক এঁকে নিলো। তবে ক্যাবলকারে এতো উঁচুতে উঠে গেলেই সবাই মন্দির পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না। মন্দিরের পথ আরও উঁচু। সঙ্গীদের মধ্যে কেউ কেউ ক্লান্ত থাকার কারণে মন্দির পর্যন্ত আর যেতে চায়নি। তাদেরকে নিচে বসেই বিশ্রাম নিতে হয়েছে। মনোকামনা মন্দিরে গিয়ে আর কিছু না হোক অন্তত ক্যাবলকারে চড়ার বাসনা আমাদের পূর্ণ হয়েছে। সে কারণে আমরা বারবার করে বৈকুণ্ঠকে ধন্যবাদ জানালাম।

বান্ধিপুরে এক রাত্রি
মনোকামনার মন্দির থেকে আমরা অনেক দুর্গম পথ পেরিয়ে পৌঁছুলাম বান্ধিপুর। বৈকুণ্ঠ জানালো সম্ভবত আমাদের আগে আর কোনো বাংলাদেশী সেখানে যায় নি। অনেক দূরে গাড়ি রেখে বেশ কিছু পথ হেঁটে আমাদের যেতে হলো বান্ধিপুর মাউন্টেইন রিসোর্টে। সেখানে কম লোকেরই আগে যাতায়াত ঘটেছে। তবে পরিবেশ খুব চমৎকার। শহর থেকে দূরে প্রকৃতির এত কাছে এরকম মনোরম স্থান আর হয় না। সেখানে একটু বিশ্রাম নিয়েই আমরা বেরুলাম আশপাশের গ্রাম, বাজার ও মানুষের জীবনযাত্রা দেখতে। দেখা গেল সেখানে হাসপাতাল, স্কুল সবকিছুতেই আছে রোটারি ক্লাবের অর্থায়ন। বাজারে আছে ছোট ছোট হোটেল। সেখানে খুব কম ভাড়ায় থাকা যায়। নেপালিরা নৃতাত্ত্বিকভাবে প্রধানত দুইভাগে বিভক্ত। একভাগে আছে আর্য বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তারা হলেনÑব্রাহ্মণ, ছেত্রী, ঠাকুরী, দামাই, কামি, সার্কি। এদের মধ্যে আবার মুসলমানরাও পড়ে যান। অন্যদিকে আছে মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। এদের মধ্যে আছে তামাঙ, শেরপা, লেপচা, লিম্বু, রাই, গুরুং, মগর এবং নেওয়ার। বৈকুণ্ঠ জানালো নেওয়ারী ভাষায় নারীকে ল্যাসি বলে। হয়তো বাংলায় যা লাস্যময়ী ওই ভাষায় তা ল্যাসি হয়েছে। তবে আমাদের মতো বুভুক্ষু পুরুষ অভিযাত্রী দলের কাছে শব্দটি খুব মুখরোচক হয়ে গেল। আমরা অবাক হলাম নেপাল সরকার কিভাবে এই অজপাহাড়ি এলাকা ও অনুন্নত গ্রামসর্বস্ব বান্ধিপুরকে আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে গড়ে তুলেছে। বান্ধিপুরে আছে নেপালের সর্বোচ্চ গুহা। সেখানে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নেপাল সরকারের চেষ্টার অন্ত নেই। সে রাতটি আমরা বান্ধিপুর মাউন্টেইন রিসোর্টে কবিতা আবৃত্তি, গান আর পানের মধ্য দিয়ে কাটালাম।

ফিস টেইল লজ
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমাদের গাড়ি পৌঁছলো নেপালের আরেকটি বৃহত্তম শহর পোখারায়। সেখানে থাকার ব্যবস্থা হলো ফিস টেইল লজে। শহরের ভেতরেই আছে বিশাল ফেওয়া লেক। সেই লেক পার হয়ে যেতে হয় ফিস টেইল লজে। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত বহু ব্যক্তিত্ব থেকেছেন। ইংল্যান্ডের রাজপুত্র চার্লস থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর পর্যন্ত। প্রচুর বিদেশী পর্যটকের ভিড়। পোখারার ওই ফেওয়া লেকে নৌকা ভ্রমণ করলাম। দেখলাম ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেইন মিউজিয়াম। সেখানে পাহাড়িদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, জীবনযাত্রার নানা উপাদান সংরক্ষিত আছে। তাছাড়া দেখানো হয় এভারেস্টের ওপরে চমৎকার ডকুমেন্টারি ফিল্ম। দুই রাত ৩ দিনে পোখারার প্রধান সব দর্শনীয় স্থান ও হোটেলগুলো আমাদের পরিদর্শন করা হয়ে গেল। এর মধ্যে ফুলবাড়ি রিসোর্ট নামের যে হোটেল দেখলাম তা মনে হলো শুধু নেপাল নয় যেকোনো দেশের জন্যই একটি শ্রেষ্ঠ হোটেল। সেখানে একদিন আমরা দুপুরের খাবার খাই। রাতে আমাদের জন্য থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা। পোখারায় বাজার থেকে আমরা কিছু কেনাকাটাও করি। সুন্দর সময় দ্রুত শেষ হয়ে যায়। বৈকুণ্ঠ জানায়, আমাদেরকে ফিরতে হবে কাঠমন্ডু। তবে এবারে আর গাড়িতে করে নয়। বুদ্ধ এয়ারে চড়ে উড়ে গেলাম কাঠমন্ডুর দিকে।
এভারেস্ট ছুঁয়ে আসা
কাঠমন্ডুতে ফিরে আসার পর আমরা অপেক্ষা করছিলাম ভ্রমণ নির্দেশিকা অনুযায়ী সেই বিশেষ ক্ষণটির জন্য। মাউন্টেইন ফ্লাইটে এভারেস্ট। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ছুঁয়ে আসবো। শৈশবে পাঠ্যপুস্তকে হিলারি আর তেনজিং-এর এভারেস্ট বিজয়ের কাহিনী পড়েছিলাম। তাদের মতো হিরো হতে না পারলেও উড়োজাহাজে করে এতো কাছে থেকে আমাদের মতো এভারেস্ট দেখার সুযোগই বা ক’জন পায়! বুদ্ধ এয়ারে এই মাউন্টেইন ফ্লাইটে নাকি প্রত্যেক যাত্রীকে ১শ’ ১০ ডলার গুনতে হয়। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সৌজন্যে আমাদের জন্য সেটাও ফ্রি। পরদিন সকাল হতেই বৈকুণ্ঠ প্রসাদ আচারিয়া হাজির। তবে সে আমাদের একটা অনিশ্চয়তার কথা শোনালো। বললো, যদি আকাশের অবস্থা খারাপ হয় ফ্লাইট বাতিল হয়ে যেতে পারে। আকাশের অবস্থা খারাপ ছিল বলে নগরকোটে সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় কিছুই দেখতে পারিনি। পানিতে নেমে র‌্যাফটিং করতে পারি নি। এবার যদি মাউন্টেন ফ্লাইটও মিস হয় তাহলে দুঃখ রাখবো কোথায়! এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখলাম বেশ ক’জন যাত্রী বিষণœ বদনে বসে আকাশের সুস্বাস্থ্য কামনা করছেন। তবে বৈকুণ্ঠ আমাদের জন্য সুসমাচার বয়ে নিয়ে এলো। সে জানালো আমাদের ফ্লাইট হবে। বুদ্ধ এয়ারের ছোটখাটো পেটে আমরা চেপে বসলাম। আমার পাশের আসনে এক মঙ্গোলিয়ান চেহারার তরুণী। পেছনের সিটে ওর মা। সে জানালো নেপালি বা চায়নিজ নয়। তারা ইন্দোনেশিয়ান। মেয়েটি পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওদের পুরো পরিবারই অস্ট্রেলিয়ায় সেটেলড। নেপাল এসেছে মাত্র ২ দিনের সময় নিয়ে। টার্গেট হচ্ছে এই মাউন্টেন ফ্লাইট। বুদ্ধ এয়ার ধীরে ধীরে আকাশে উড়লো। পোখারা থেকে কাঠমন্ডু আমরা যে রকম ফ্লাইটে এসেছি। কিন্তু মিনিট ১৫ পরেই ছোট জানালা দিয়ে আমরা যেসব দৃশ্য দেখতে পেলাম এর সাথে আর কোনো আকাশ যাত্রার তুলনা হতে পারে না। এত কাছে থেকে হিমালয়ের গিরিশৃঙ্গ দেখা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এভারেস্ট যখন দৃষ্টিসীমার মধ্যে এলো তখন যাত্রীদের উল্লাস আর দেখে কে। সিটবেল্ট খুলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো যার যার জানালার পাশে। এভারেস্টের তুষারাচ্ছাদিত শরীরে রৌদ্রের আলো বিচ্ছুরণে মনে হচ্ছে যেন তাল তাল সোনা পড়ে আছে। আমাদের সবার হাতে তখন নানা মডেলের ক্যামেরা। সুন্দরী এয়ার হোস্টেস এ সময় আমাদের জন্য নিয়ে এলো আরেক লোভনীয় প্রস্তাব। দু’জন করে যাত্রীকে নিয়ে গেল ককপিটে একদম পাইলটের পাশে। পাইলট দু’জনও খুব উৎসাহী। একজন পুরুষ ও একজন নারী। তারা গাড়ি ড্রাইভ করার মতো সহজ ভঙ্গিতে প্লেন চালাচ্ছেন আর যাত্রীদের কাছে একজন গাইডের মতো এভারেস্টের বিভিন্ন দিক বর্ণনা করছেন। ৪৫ মিনিটের মধ্যে শেষ হলো আমাদের আকাশ ভ্রমণ। নামবার সময় প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয়া হলো একটি করে সার্টিফিকেট। তাতে ইংরেজি ভাষায় লেখাÑআমি এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে পারিনি কিন্তু হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করেছি তাকে।

যত কাণ্ড কাঠমন্ডুতে
এবার কাঠমন্ডুতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো হোটেল ডি অন্নপূর্ণায়। সেটাও একটা উন্নতমানের পাঁচতারা হোটেল। কাঠমন্ডুতে নেপাল অবস্থানের শেষ সময়টুকুও কেটেছে কর্মব্যস্ততায়। পশুপতি নাথের মন্দির দেখেছি। সেরা হোটেলগুলো পরিদর্শন করতে হয়েছে আমাদের। থামেলসহ নগরীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকাগুলো ঘুরেছি। রাতে খেয়েছি ক্যাসিনো আন্নায়। সেখানে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে নেপালের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে মতবিনিময় হলো। সময় করে বৃষ্টিতে ভিজে আমি আর আনজির লিটন বর্ষণসিক্ত কাঠমন্ডুর রূপ দেখেছি। ফিরে আসার আগের রাতে নেপালি চুলোতে শেষ নৈশভোজ। সেখানে হঠাৎ করে দেখা এককালে বাংলাদেশের মাঠে নেপালি খেলোয়াড় গনেশ থাপার সঙ্গে।

হিমালয়কন্যার হাসি
আমাদের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলো। সাত সকালেই এনটিবির কর্মকর্তারা হোটেল লাউঞ্জে এলেন আমাদের বিদায় জানাতে। যথারীতি বৈকুণ্ঠ আমাদের নিয়ে গেল বিমানবন্দরে। সেখানে ‘নমস্তে’ বলে দাঁড়িয়ে আছে বিমানবন্দরে কর্মরত এনটিবির এক সুন্দরী তরুণী। সে আর বৈকুণ্ঠ মিলে আমাদের সব কাজ দ্রুত এগিয়ে দিলো। দোতলায় উঠে শেষবারের মতো হাত নাড়লাম। বৈকুণ্ঠ চিৎকার করে বললো, ফির মিলেঙ্গে। মেয়েটি শুধু মিষ্টি করে হাসলো। প্লেন ছাড়ার পর মনে হলো মেয়েটির নামটাইতো জানা হলো না। পরক্ষণেই ভাবলাম, নাম দিয়ে কি হবে। ওতো এক হিমালয়কন্যা। আর নেপালকেও তো ডাকা হয় একই নামে। আমাদের নিয়ে উড়োজাহাজ ছুটে চললো বাংলাদেশের দিকে। পেছনে পড়ে থাকলো হিমালয়কন্যার হাসি। রৌদ্রকরোজ্জ্বল নেপাল।