হীরামতি ও তার রাঁধুনীকাল

প্রকাশিত: ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৮

হীরামতি ও তার রাঁধুনীকাল

আকমল হোসেন নিপু

বাড়িটার সামনে এসে থমকে যায় হীরামতি বানু, গোয়ালপাড়ার হীরামতি। তার কাছে বাড়ির দৃশ্যটা অচেনা লাগেÑ গমগম করা বাড়িটি কেমন নিথর, ঝিমধরা, কোনো জনমানুষের চলাচল তার চোখে পড়ে না। শীতকালের পাতাঝরা ডালপালার শরীর নিয়ে নানাজাতের গাছ লাল রঙের টিনের চারচালা একটি ঘরকে বুকে আগলে যেন দাঁড়িয়ে।… হীরামতির আলাদা কোনো পরিচয় আছে কিনা, এটা গ্রামবাসী এখন আর মনে করতে পারেনা। কবে থেকে এই গোয়ালপাড়ায় হীরামতিকে দেখা গেছে, সেটাও কারো মনে আছে কিনা, সেটা জানা রীতিমত অনুসন্ধানের বিষয়। যদিও বছর দুতিন ধরে এই হীরামতি গোয়ালপাড়ার মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচিত। একসময় তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে অনেকে কথা বলেছে। কিন্তু আগের মত মজা করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলার সময়টি আর এখন নেই। যদিও হীরামতির এ নিয়ে মাথায় কোনো বাড়তি যন্ত্রণা নেই। কোনো কিছুতেই তার যায় আসে না। সে বুঝে তার যা কাজ, তাই করা। Ñ‘কে আমারে হীরা জহরত কইলো, না কামলা বেটি কইলো, তাতে আমার কি আসে যায়! আমি কাজের মানুষ। কাজ করি, খাই।’ লোকজন তাকে খোঁচা দিয়ে কিছু বললে এরকমই তার সাফ সাফ কথা।
গোয়ালপাড়াটাও মনে রাখার মতো এমন কোনো জায়গা নয়Ñ টিলামত পাহাড়ি জায়গায় একদিন ঘরহীন মানুষ এসে মাথা গুঁজতে ঘর তুলেছিল। নদীভাঙা মানুষ, দৈব-দুর্বিপাকে নিঃস্ব হওয়া মানুষ এসেছে। ঘর তুলেছে। কত জায়গার মানুষ এসেছে এখানে। তারা ঝোঁপ-ঝাড় সাফ করেছে। তারপর জঙ্গলেরই বেত-বাঁশ, ছন কেটে ঘর বানিয়েছে। সে অনেক পুরনো কথা। তাদের দেখাদেখি টিলার ভাঁজে ভাঁজে, টিলার নিচের সমতলে জায়গায় অনেক ঘর ওঠেছে। খড়ের ঘর, দুচালা টিনের ঘর এবং পাকা বাড়ি হয়েছে। মানুষ এসে ঘরদোর তুলে বসতি শুরু করলেও জায়গাটি উঁচুনিচু টিলাভূমি হওয়ায় তার পাহাড়ি চেহারা কখনই হারিয়ে ফেলেনি। আর হয়তো এই টিলা টিলা ভাবটির কারণেই একদিন গোয়ালপাড়াটা বাইরের লোকজনের নজরে পড়ে যায়। জায়গাটা শহরের কাছে। তবু কোনো কোলাহল নেই। হয়তো সে কারণেই একদিন যেখানে মানুষ সামান্য আশ্রয়ের জন্য বনের পশুর আক্রমন হতে পারে, সেই ভয়কে তুচ্ছ করে ঘর তুলেছিল। সেই স্থানটিতে বাগানবাড়ি তৈরির কথাটি অনেকের মাথায় ঠাঁই করে নেয়। শান্ত, চুপচাপ টিলার চূড়ায় ঘর। আর সেই ঘরের চারদিক জুড়ে নানাজাতের গাছপালা। সেই গাছে পাখির উড়াউড়ি, বাসা, ডাকাডাকি…।
এমন একটা মনটানা জায়গার তথ্যটা সাইদ আলির কানে গিয়েও পৌছে। তথ্যটা হাওয়ায় ভেসে গিয়ে কানে ধাক্কা লেগেছিল। নাকি কেউ এরকম একটি জায়গার কথা তাকে বলেছিল, অথবা নিজেই এরকম একটা জায়গা খোঁজতে খোঁজতে পেয়েগিয়েছিলেন, সেটা নিশ্চিত নয়। তবে গ্রামবাসী কিছুদিন এভাবেই বলেছে, সাইদ আলি প্রথম যেদিন ভোট চাইতে এলাকায় আসেন। আসার পর এলাকার গঠন প্রকৃতি দেখে তার খুব পছন্দ হয়ে যায়। সে সময়ই নাকি নিকটজনের কাছে তিনি এরকম একটি স্থানে বাগানবাড়ি তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। যেখানে অবসরে একটু বিশ্রাম নেওয়া যায়। দুচারটা ঘন্টা কোলাহাল মুক্ত থাকায় যায়। সারাটা মাস টানা কাজের এত তীব্র চাপ থাকে যে, অর্থ-বিত্ত বৈভব সবকিছুকেই ক্লান্তিকর লাগে। আবার এই অর্থ-বৈভবের পিছে না ছুটলে নাকি শান্তিও মিলেনা। কেমন দলছুট, পানসে লাগে নিজেকে। সাইদ আলির নিকটজনের কাছে এরকম কথা শুনে গোয়ালপাড়া তখন আনন্দে তা তা থৈ থৈ করে নাচতে কোমর বাঁকিয়েছিল (সাইদ আলি তাদের নির্বাচনী এলাকার সন্তান হলেও এই ভোট চাওয়ার আগে কবে এলাকায় এসেছিলেন, কিম্বা আদৌ কোনোদিন তিনি তার গ্রামের বাড়ি জলবাহারের বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন, অথবা কারো সাথে কথা বলেছেনÑ সেটা কেউ মনে করতে পারেনা। ভোটের একটা নিজের প্রকৃতি আছে, বা ছিল। যারা এলাকায় পড়ে থাকে। কমবেশি মানুষের সুখেদুঃখে কাছে থাকে। সেরকম লোককেই তারা ভোটে দাঁড়াতে দেখেছে। কিম্বা ভোট দিয়েছে। এই প্রথম তারা এমন একজনকে দেখলো, যাকে এর আগে আর দেখেনি। তবে সাইদ আলির প্রভাব পরিচিতির কথাটি শুনে তাদের এলাকায় তার ভোট চাইতে আসাকে লোকজন আনন্দের সাথেই নিয়েছিল)। অর্থাৎ সাইদ আলি তাদের এলাকায় শুধু ভোট চাইতেই আর আসবেন না। তিনি এলাকার স্থায়ী লোক হয়ে যাচ্ছেন। এটা তাদের জন্য একটি সম্মানেরও বিষয়। শুরুর এই বিষয়টি যদিও এখন আর অনেকেরই স্পষ্ট মনে নেই। দরকারও হয়তো নেই। শেষমেশ গোয়ালপাড়ায় সাইদ আলি বাগানবাড়ি করেছেন, এতেই গোয়ালপাড়ার মানুষ খুশি। এর কারণ সাইদ আলির সুবাদে গোয়ালপাড়া এখন অনেক আলোচিত, পরিচিতÑ তার আগসের সুবাদে এলাকার জমিজমার দামও বেড়ে গেছে। প্রতিবেশী হিসেবে মানুষ সাইদ আলির ধারেকাছে ভিড়তে না পারলেও তারা বৈষয়িক হিসাব দিয়ে আত্মতৃপ্তি খোঁজে। তারা মনে করে সাইদ আলির পায়ের ছোঁয়া পেয়েই গোয়ালপাড়ার মাটি সোনার খনি হয়েছে। এলাকার জমি এখন সোনার দামে বিক্রি হচ্ছে।
তবে এতে কিছু বিড়ম্বনাও বাড়ে এলাকায়। সাইদ আলি যখন তার বাগানবাড়িতে আসেন, সেসময় পুলিশ নিরাপত্তা রক্ষা করতে বাগানবাড়ির আশপাশে লোকজনকে ভিড়তে দেয় না। এতে গোয়ালপাড়ার মানুষ সব সময় কিছুটা সন্ত্রস্ত্র থাকে। তাদের সরল সহজ জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হয়। যে মানুষগুলো ইচ্ছেমত বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্বভাব, তাদেরকে এখন আজাইরা এইসব নিয়ম মানতে হয়। তাদের গরু-ছাগল বাগানবাড়ির আশপাশে গেলে চৌকিদার ধরে নিয়ে যায়, পেটায়। কারো কিছু বলার থাকে না। এই গরু-ছাগল উদাম বনে বনে চরে বেড়িয়েই এতদিন বেঁচেছিল। সেই গরু-ছাগলকে নিয়মের রশিতে আটকে থাকতে হয় সারাদিন।
সাইদ আলির ক্ষমতা নিয়ে ততোদিনে গোয়ালপাড়ার মানুষের ধারণা পোক্ত হয়ে গেছে। তারা দেখেছে, বাগানবাড়িতে যারা আসেনÑ তারা দেশের অনেক বড়সরো মানুষ। যাদের কথায় দেশ চলে (এরকমটিই তারা সবসময় শুনে আসছে)। তারা বাগানবাড়ির লোকজনের কাছে এও শুনেছে, এখানে যারা আসে। তাদের একেকটি গাড়ির দামই নাকি চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখ, কোনোটার দাম নাকি কোটি টাকারও বেশি। গোয়ালপাড়ার মানুষ তখন তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব নিয়ে বসে। যারা সম্পত্তির কারণে গ্রামে একটা ওজন নিয়ে ভারি চালে চলেন, তার বুঝতে পারে এখানে আসা কারো কারো একটি গাড়ির দামই হবে না সবকিছু বিক্রি করে। সেখানে সামান্য একটা গরু-ছাগল কি-না বাগানবাড়ির গা ঘেঁষে চলবে, সেটা মেনে নেওয়া কঠিনইতো হবে! তা সুন্দরও দেখায় না। লোকজনের অবাধ চলাচলের আর কোনো সুযোগই নেই। সকল সময় তাদের একটা ভীতির মধ্যে থাকতে হয়।
তবে তাদের ভীতিটা বেড়েছিল আরো পরে, যখন বাগানবাড়ির আয়তন ও সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য আশপাশের আরো জায়গার প্রয়োজন দেখা দেয়। আলী আহমদ, মরিয়ম বেগম, নারায়ন দেবÑ এদের জায়গাটা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রথমে এরা তাদের জায়গা বিক্রি করবে না বলে ঘাইগুই করে (জায়গাটা যেহেতু তাদের এবং আপাতত জায়গাটা বিক্রিরও প্রয়োজন নেই। সেকারণে তারা বিক্রিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই পারে)। কিন্তু সেটা বেশিদিন ধোপে টিকে না, দেখা গেল একদিন পুলিশ এসে আলী আহমদকে ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে কারণটা জানতে পারেনি গ্রামবাসি। থানায় যাওয়ার পর জানানো হয়, তার ছাগল বাগানবাড়ির ভিতরে ঢুকে অনেক ফুল-ফলের গাছ নষ্ট করেছে। গাছ নষ্ট করা গুরুতর অপরাধ। আলী আহমদ যখন বলে, ‘স্যার, আমারতো ছাগলই নেই।’
কেউ একজন মুখের উপর বলে দিলেন, ‘না থাকুক। এতে কিছু যায় আসেনা। মামলার জন্য ছাগল থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই।’
তবে আলী আহমদের কাছে বিষয়টি কিছু সময় পরে সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়Ñ এই ছাগলটাগলের গাছ নষ্ট করা আসলে কিছু না। যখন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিজ আহমদকে থানায় আসতে দেখা যায় (কারণ মফিজ আহমদ সাইদ আলির নিকটজন বলে ততদিনে এলাকায় চাউর হয়ে গেছে)। মফিজ আহমদ এসে বলে যে, ‘আলিসাবকে তোমার জায়গাটা দিয়ে দেও। বড় মানুষ। খায়েশ করেছে। বোঝইতো এদের অনেক ক্ষমতা। খামোকা ঝামেলায় জড়িয়ে শুধু লোকসানেই পড়বে। আমি চেষ্টা করবো ভালো দাম আদায় করে দিতে।’
জমি দিতে আপত্তি না থাকার কথা জানানো হলে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই ছাগলের মামলা ডিশমিশ হয়ে যায়। আলী আহমদ চেয়ারম্যান মফিজ আহমদের মোটর সাইকেলের পিছনে বসে বাড়ি ফিরে আসে। এতে তার কিছুটা ওজনও বাড়ে। সাইদ আলির নিজের লোক, আবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মোটর সাইকেলের পিছনে বসে যখন সে গ্রামে আসে। সবাই তার দিকে বড় বড় চোখ তুলে তাকায়। যাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তাকে কিনা চেয়ারম্যান বাড়ি এনে পৌছে দেয়। চোখ অবাক হওয়ারইতো ঘটনা। এরপর আর বাকি জমির মালিকরাও কোনো আপত্তি তুলেনি। আপত্তিতো দূরের কথা, সাইদ আলির প্রতিনিধি মুঠ ভরে যা টাকা দিয়েছেÑ তাতেই তারা সন্তোষ্ট থেকেছে। জমির দাম যাই থাক, তা গোনবারও প্রয়োজন পড়েনি। …
তবে বাগানবাড়ির বর্ধিতকরণ প্রকল্পে কিছু জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এতে সব মানুষই যে নাখোশ হয়েছেÑ এমনও না। দেখতে দেখতে মূল সড়ক থেকে গোয়ালপাড়ায় ঢোকার রাস্তাটি পাকা হয়ে যায়। রাস্তাটি কারা পাকা করছে, এ নিয়ে কেউ প্রশ্নও তুলতে পারেনি। তোলবার দরকারটাই বা কি! তারা দেখেছে সরকারি গাড়ি এসেছে। ঠিকাদার এসেছে। বালি-পাথর এসেছে। একদিন পিচ গলিয়ে রাস্তায় ঢালা হয়েছে। রাস্তা চকচকে হয়ে ওঠেছে। যে রাস্তা বৃষ্টি দিলে ছোটবড় গর্তে ভরে ওঠতো। জুতা পায়ে দিয়ে চলাফেরা করা যেত না, কাদাপানিতে থকথকে থাকতো রাস্তা। সে রাস্তা এখন চোখের সামনে তিমি মাছের মত তেলতেলে পিঠ দেখায়, বুক দেখায়।

…এই পাকা রাস্তা দিয়ে যখন দামি দামি গাড়ি আসে, মন্ত্রী-এমপি আসে, নানা স্তরের রাজনীতিবিদরা আসেনÑ মানুষ তখন গোয়ালপাড়ার নির্জনতার কথাটি একবার মনে করতে পারে। কিরকম ঝোপঝাড়ে ঠাসা ছিল এলাকাটি। আশপাশের গ্রাম থেকে দিনদুপুরেও কেউ এদিক দিয়ে একলা যেতে সাহস পেত না। এই সেদিনও ঘরের চালে, বাড়ির আম-জাম গাছের ডালে এসে বসেছে বাঁদরের দল, হনুমান, কতজাতের বন্য জন্তু। আর বনের ভেতরে দেখা যেত ভালুক, খুপি বাঘ, অজগরÑ আর হরিণতো ছিল বেশুমার। হরিণের ডাক, পাখির ডাকÑ চেনা অচেনা কতজাতের বন্য জন্তু যে দেখা যেত, সেটা একালের ছেলেমেয়েরা নামই শুনেনি। দেখতে দেখতে সেই পরিবেশটা কেমন যে বদলে গেল: মানুষের কাছে এটা একটা ভেলকিবাজির মত।
গোয়ালপাড়ায় সাইদ আলির বাগানবাড়িও কম ভেলকি দেখায়নি। আব্দুল মতলিব মহালদার বৈঠকি আলাপে বলেন, ‘আগে বড়লোকদের বাড়ির সামনে বুঝছো একটা বৈঠক ঘর ছিল। কেউ বলতো টঙ্গি ঘর। মেহমান আইলে এই টঙ্গি ঘরেই বইতো। এরপর দেখতে দেখতে ঘরের মাঝেই ড্রয়িং রুম অইলো। এখন আর ড্রয়িংরুমে পোষায় না। এখন বড়লোক অইলে একটা বাগানবাড়ি থাকতে অয়।’
তবে তার এই কথার চেয়ে গুরত্বপূর্ণ যেটা হল, গোয়ালপাড়ার মানুষ দেখলো দিনে দিনে বাগানবাড়ি আলাদা একটা রোশনাই নিয়ে সবার চোখের সামনে উজ্জ্বল হচ্ছে। নানা ধরণের লোক আসেন, তারা ফিতা দিয়ে ভিটা মাপেন। এরপর একদিন ট্রাক বোঝাই হয়ে ইট-বালি-সিমেন্ট-পাথর আসে। কামলারা হইচই করে বাংলো ঘর বানায়, হাওয়াখানা বানায়, পুকুরঘাট বাঁধে, বাগানের ভেতরের রাস্তা পাকা করে, রঙিন টিন দিয়ে সমাবেশের জায়গা বানায়…। সাইদ আলি শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবারে রাতে গোয়ালপাড়ার বাগানবাড়িতে এসে ওঠেন। এসময় বাগানবাড়ির লোকজনের অনেক ব্যস্ততা। হীরামতি বানু গোয়ালপাড়ার লোকজনকে বলেছে, ‘সার আইলে কামলাদের অতো কাজ করতে অয় না। সারর জুতা, চার কাপ, এটা ওটাতো টাইটুই মারা মাইনষেই করে। বুঝিনারে ভাই দুনিয়ার খেলা, যারার বাসাত তিন চাইরটা কামলা খাটে, এরাও সারর সামনে কামলাগিরি করে। তারার কান্ড দেখি আমরারই লইজ্জা লাগে।’
হীরামতি বানু আসলে এক সময় বাগানবাড়ির খোলা জানালার মত কাজ করেছে। গোয়ালপাড়ার মানুষ হাড়গিলের মত হা করে থাকত, কখন হীরামতি বাইরে আসে। তার কাছ থেকে শুধু বাগানবাড়ি কেন, দেশ-দুনিয়ার অনেক কথাই শুনতে পেরেছে তারা। নতুন নতুন কথা শুনতে তাদের মজাই লাগতো। কেননা এই কথাগুলো হাটেমাঠে পাওয়া যায় না।
হীরামতির কাছেই শোনা, সাইদ আলি বাগানবাড়িতে আসলেও তিনি রাতে সেখানে থাকতেন না। এখানে খাওয়া দাওয়া করে শহরে চলে যেতেন। সেখানে গিয়ে সার্কিট হাউসে থাকতেন। মানুষ তখন সার্কিট হাউস নিয়ে একপশলা কথা বলে। সার্কিট হাউস দেখতে কেমন, সেখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কেমন, কারা কারা সেখানে থাকেন। যদিও এই রহস্যের জাল ছেঁড়বার সাধ্য নেই হীরামতির। সেতো আর কোনোদিন সার্কিট হাউসে যায়নি। তার যাওয়ার দরকারই বা কি! সার্কিট নিয়ে জানা না জানা নিয়ে অবশ্য গোয়ালপাড়ার মানুষের কিছু যায় আসেনা, তাদের গ্রামে সাইদ আলি নিয়মিত আসা যাওয়া করছেনÑ এতেই তারা খুশি। খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণগুলোর মধ্যে আছে, সাইদ আলি বাগানবাড়ি তৈরির কারণে গোয়ালপাড়ায় বিদ্যুৎ এসেছে, গ্যাস এসেছে, টেলিফোন এসেছে। রাত-বিরেতে ঘনঘন পুলিশ টহল থাকার জন্যে চুরি-চামারিও তেমন একটা নেই। রাস্তার একটু চটকা ওঠলেও পরদিন গাড়ি এসে গালা-সুরকি ঢেলে দিচ্ছে। কেন চটকা ওঠলো এ নিয়েও রীতিমত মাথা চুলকানো গবেষণা করা হয়েছে।

…হীরামতির মনটা ভালো নেই। যে বাড়িতে এতদিন ঝলমলে আলোর চটক ছিল। সে বাড়িটি এখন কেমন মরা বাড়ির মত। মনে হয় যেন এইমাত্র কাউকে কবরে রেখে এসে সবাই শোকে কাতর। কদিন আগেও এমন অবস্থা ছিল না। সাইদ আলি বরং এই কদিন বাগানবাড়িতে থেকেছেন। লোকজনের ভিড়ে বাড়ি দিনরাত গমগম করেছে। স্যার তাদের বলতেন, ‘কিছুদিনের জন্য অবসর নিছি, বুঝছো। এই নির্বাচনটা হয়ে গেলেই আবার সবকিছু দেখবে আগের মত হয়ে গেছে। আমরা যে উন্নয়ন করেছি। মানুষ আমাদেরই আবার দেশ চালানোর ম্যান্ডেট দিবে।’
হীরামতির এতসব মাথায় ঢুকে না, ঢুকবার কোনো কারণও নেই। এতকিছু ঢুকতে হলে মাথার ভিতর প্যাচপোচ থাকতে হয়। প্যাচ হজম করার শক্তি লাগে। সে কাজের মানুষÑ তার কাজটা হচ্ছে স্যারের (সাইদ আলির) পছন্দমত রান্নাবান্না করা। হীরামতি বানু এভাবেই বলতো, ‘সারতো দেশে বিদেশে ঘুরে কুরমা পোলাও খাইতে খাইতে ফেডাপ। এখানে আইলে এই ছোট মাছর ঝাল তরকারি, আমের বউলের টেঙা, ঝোল দিয়া দেশি মুরগির মাংশ… এসব খাইতে চায়। আর এসব আমার হাতে পাক না অইলেতো তার মুখেই ওঠে না।…একদিন সার আইছইন বুঝছো, আর আমার জ্বর। মাথা তুলবার উপায় নাই। কালুর মা, আর এক অফিসারের বউ রান্না করি দিব কইলো। সার খাইতে রাজিই অইলো না।’…হীরামতি বানু তার এই রান্নার তারিফ যে সে তার নিজের মুখেই বলছে, তা নাÑ সাইদ আলিও বিভিন্ন জায়গায় রান্নার গপ ওঠলেই বলেন, ‘যাই কও। হীরামতির হাতে জাদু আছে। যাই রান্না করে সেটাই স্বাদ লাগে। একেবারে খাঁটি বাঙালি খাদ্যের মজাটা পাওয়া যায়।’
সাইদ আলির এই সামান্য কথা হীরামতিকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে উন্নীত করে। তখন সাইদ আলিকে ঘিরে মৌমাছির মত যারা থাকতো, তারা কোনোভাবে হীরামতি বানুর নজরে আসার চেষ্টা করেছে। তারা হীরামতির জন্য দামি শাড়ি, এটাসেটা নিয়ে আসতো। কেউ নগদ টাকা মুঠ করে তার হাতে তুলে দিতে চাইতো। কিন্তু হীরামতি সেটা কখনই গ্রহণ করেনি। সে কখনও এসব ছুঁয়েও দেখেনি। টাকা পয়সা দিতে চাইলে আরো ক্ষ্যাপে গেছে। পরে অনেকেই জেনে যায়, হীরামতির নানাপদের জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার প্রতি আসক্তি আছেÑ এটা জানার পর কতজাতের দেশী-বিদেশী জর্দা যে তার রান্নাঘরের তাকিয়ায় এসে জমা হতে শুরু করে! প্রথম প্রথম হীরামতি বানু সরল সহজভাবেই এসব গ্রহণ করতো; কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার মাথাটা খুলে যেতে থাকে। সে বুঝতে পারে, যারা তাকে পান-জর্দা দিয়ে খুশি করতে চায়। তারা তাকে দিয়ে সাইদ আলির কাছে বিভিন্ন কাজের বায়না পাঠাতে চাইছে। এটা হীরামতির খুব অপছন্দ। সে তখন থেকে জর্দা নিতে বেঁকে বসে। তার সাফ কথা, ‘সার আমার রান্না পছন্দ করইন। আমার কাম পাক করা। আমি এর বাইরে আর কুনতা পারতাম না। আমারে কইয়া লাভ নাই। সার শেষে আমার উপর রাগ করবা।’ তাতেও হীরামতি বানুর আসন তাদের কাছে খুব একটা নড়চড় হয়নি। কোনো কারণে যদি হীরামতি চটে যায়, আর সাইদ আলির কাছে কারো বিরুদ্ধে কিছু বলে। তাহলে বাগানবাড়িতে ঢোকা তার জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।

…বানের জলে ভাসা পানির মত, কিম্বা শুকনো পাতা উড়তে উড়তে কোথাও আটকে যাওয়ার মত হীরামতি বানু একদিন এসেছিল গোয়ালপাড়ায়। আজ, এ মুহূর্তে তার সেই সময়টির কথাই বেশি মনে পড়ছে। কিভাবে, কি করে যেন একদিন এই গোয়ালপাড়ায় এসে থিতু হয়েছে সে। হীরামতির তখন নিজের মত করে পা ফেলবার এক টুকরো মাটি নেই। বাপ-মা সেই কবে মরেছেন। মামার বাড়িতে থেকে বড় হয়েছে। গরীবের মেয়ে বড় হলে যা হয়, দশ হাত খাবলা খাবলি করে। মামারাতো মহা দুশ্চিন্তায়। কখন যে ঘটে, বলাতো যায় না। এক সময় মামারা এক আতুর লোকের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দায় সেরেছেন (অবশ্য এ জন্য হীরামতি বানু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জনের সাথে আলাপে বলেছে, তার মামাদেরও কিছু করার ছিল না। তাদেরই দিনরাত কামকাজ করে যে আয় রোজগার, তাতে তাদের দিন চলে না। এরমধ্যে মাথার উপর একজন যুবতি মেয়ে মানুষ রেখে তাদের তেমন স্বস্তি ছিল না। আতুর হোক, তবু তার মাথার উপরতো নিজের বলে একটা ছায়া হল। মামাদের উপর তাই সে কখনই রাগ দেখায়নি। সবকিছুকেই সে তার কপাল বলে মেনে নিয়েছে)। কিন্তু কপালে বোধহয় তার স্থায়ী পুরুষ মানুষ ছিল না। সেই আতুর লোকটা একদিন হুট করে মরে গেলে, তার আর নিজের বলে কিছু থাকেনি। মামাদের কাছেও আবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তার। সে নিজের মত করে বাঁচবে, এমন একটা তাড়না তাকে দিনরাত তাড়া করে। সেই তাড়া থেকেই ঘরের বাইরে পা ফেলা। যদিও এ পা ফেলাটা ছিল আরেকটি ঘটনাচক্র।

তার মামার গ্রামের কাজী হারিছ উদ্দিন তার একমাত্র মেয়ের সাথে বিয়ের সময় কাজের জন্য একজন মহিলা দিতে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করছিলেন। কি করে যেন হীরামতির কথা তার কানে গিয়ে পৌঁছে। কাজী হারিছ উদ্দিন গ্রামের একজন মোটামুটি সম্পদশালী মানুষ। প্রচুর জমিজমা আছে। দশজন তার কথা শুনে। সমাজে তার মান্যিগন্যি অবস্থা। তার মেয়ে পরের বাড়ি গিয়ে ঝিগিরি করবে, এটা হয়না। তার জায়গা জমি চাষ করেই জীবিকা চালায় হীরামতির মামারা। হারিছ উদ্দিন একদিন তার মামাদের বলেন, ‘হীরামতিতো এখন একলা থাকে। তাই না রে। এক কাজ কর না। তাকে জিগা সে আমার মেয়ের লগে যাইবোনি। পরে না হয় কোথাও তারে জমি জমা দিয়া ঘরদোর বানাই দিমুনে!’
মামারা প্রথমে কিছুটা কাঁইকুই করলেও হীরামতির কানে যখন কথাটা যায়, সে ধুম করে প্রস্তাবটি গ্রহণ করে ফেলে।Ñ‘মামু, তোমরা না কইরো না। আমি যাইমু।’
যেই কথা, একদিন কাজী হারিছ উদ্দিনের মেয়ে রুশনা বেগমের সাথে সেও চলে আসে গোয়ালপাড়ায়। গোয়ালপাড়া আসার পর সে আর পিছনের দিকে ফিরে তাকায়নি, এখানকার গাছ-লতাপাতা, মাটির গন্ধের সাথে যেন তারও দেহের ঘ্রাণ মিলেমিশে যায়। কাজী হারিছ উদ্দিন যদিও পরে তাকে বলেছে,Ñ‘তুই চাইলেই তরে আমার জায়গার উপর ঘরবাড়ি বানাই দিমু। বুঝচস। আমারে সময় মত কইস।’ হীরামতি বানু বিশ্বাস করে, হারিছ উদ্দিনের যে জমি জমা। তাতে তাকে এক টুকরা জমি দিতেই পারে।
কিন্তু হীরামতি বানু নিজের মত করে এক টুকনো জমি, কেন জানি এরকম কোনো সাধ তার হয়নি। সেরকম কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। সে রুশনা বেগমের সাথে এসে গোয়ালপাড়ারই একজন হয়ে যায়। গোয়ালপাড়ার প্রায় প্রতিটি মানুষের সাথেই তার একধরণের পরিচয় তৈরি হয়েছে। সে যে রুশনা বেগমের সাথে কাজের লোক হয়ে গোয়ালপাড়ায় এসেছে, অনেকের কাছে তার সে পরিচয়টা থাকলেও এ নিয়ে কেউ কোনো কথা তুলে না। অথবা এমনও হতে পারে, কারো সেটা মনেই পড়ে না। এখানকার মাটি ও মানুষের প্রতি একরকমের মায়া পড়ে যায় তারও। রুশনা বেগমের শ্বশুড় হানিফ মহালদার তার বাড়ির উঠোনের একপাশে এক টুকরো ঘর তুলে থাকে নিজের মত থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এতেই সে খুশি। তার ঘরে সে একাই সবকিছু। তারও যেন এখানে শিকড় গজায়, শিকড় ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত গোয়ালপাড়ায়।
সে যখন এখানে আসে, তখনকার গোয়ালপাড়া আর এখনকার গোয়ালপাড়ার মধ্যে কত পার্থক্য। সে এসে দেখেছে, টিলায় টিলায় ঠাসা গাছ-গাছালি। সন্ধ্যা হলেতো কথাই নেইÑ দিনের বেলায়ও অনেক স্থানে রাতের মত থকথক করা অন্ধকার। ঝিঁঝিপোকার কান ঝিমঝিম করা শব্দ। কিছু চেনা, কিছু অচেনাÑ এমন পাখির ডাক। সন্ধ্যা হলেই নিঝুম পুরীর মত ডুবে যেত গোয়ালপাড়া,- তাও সেটা বেশিদিন আগের কথা নয়। গাছপালা ফাঁকফোকড়ে দেখা যেত টিমটিম করা কেরোসিন বাতি, কেউ বা টর্চ লাইট জ্বেলে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি গিয়েছে। কিম্বা শহর থেকে বাড়ি ফিরেছে। প্রথম প্রথমতো খুব ভয় করতো হীরামতি বানুর। রাতের বেলা পেশাবে ধরলেও ভয়ে ঘর থেকে বের হত না, ভোর হওয়ার জন্য কী অপেক্ষা। যদিও একসময় আর সেই ভয় থাকেনি। রাতের গোয়ালপাড়া আর দিনের গোয়ালপাড়ার মধ্যে তার কাছে কোনো পার্থক্য থাকেনি।
হয়তো ভয় রেখে চলা তার পক্ষে কঠিনও ছিল। হীরামতি হাওয়ায় ভাসা খড় টুকরো হলেও সে চোখে পড়ার মতই একজন। তামারঙের শরীর থেকে যে কারোই চোখ না ফেরানোর টান ছিল (এখনও বয়স হওয়া ছাড়া তেমন একটা বদলায়নি)। ধীরে ধীরে যখন সে গোয়ালপাড়ার একজন হয়ে ওঠে, তাতে তার কাছে ভেড়ার মানুষের কমতি হয়নি। নানা ছুতোয় কাছে ভেড়া, শরীর নিয়ে রং তামাশা করা, সুযোগ পেলে গায়ে হাত দেওয়াÑ হীরামতির কাছে শাকভাতের মত হয়ে ওঠেছিল। তবু শাকভাত হলেও, নিজেকে বাকলের আড়ালে গাছের শাঁসের মত নিরাপদ রাখার চেষ্টাও কম করেনি। সব সময় যে পেরেছে, তাও নয়।
শুরুতে খুব বেশিই খারাপ লাগত। আতুর মানুষটার ঘরে থাকার সময়ও এরকম পরিস্থিতি সে মোকাবিলা করেছে। কেউ কেউ নানা সাহায্য সহযোগিতার ছুঁতোয় তার দিকে এগিয়ে এসেছে। মাথার উপর তবু একজন থাকায়, সেসময় কেউ শরীরে হাত দেবার সাহস দেখায়নি। এখন সেই মাথার ছাতাটাও নেই। হুট করে যে এখান থেকে বেরিয়ে যাবে, সে সাহসটুকুও করতে পারে না। রুশনা বেগমের বাবা তাকে জমি দিয়ে সেখানে ঘর তুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানেওতো সে একলাই একজন।…হীরামতি এতদিনে বুঝে গেছে, সে তার ইচ্ছাকে খুন করতে পারে। কিন্তু তার শরীরকে গোপন করতে পারবে না। যেখানেই যাবে তার শরীরটাওতো সঙ্গে যাবে। আর নিজের শরীরটাকেওতো সে ভালোই জানে। যারতার নজর পড়াটাই স্বাভাবিক। সেতো দেখছেই, গোয়ালপাড়ার উঠতি মরদই না, বউ-বাচ্চা আছে; এমন মর্দারাই তার দিকে তাকিয়ে বেশি লালা ঝরায়। উঠতি মরদদের ভেটকিভাটকি মেরে তাড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু বুড়ো হাবড়াদের তাড়ানো কঠিন, এদের গাঁয়ে একটা অবস্থান আছে। সামাজিক পরিচিতি আছে। সালিশ-বৈঠকে কথাবার্তা বলে। এদের বিরুদ্ধে কোনো কথা তুলে বিশ্বাস করানো কঠিন। সে ভেসে আসা মেয়ে, উল্টো তাকেই দুষবে সবাই।

…সেই সময়টাকে মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে হীরামতি বানুর। চোখের সামনেই রুশনা বেগম কেমন আলুথালু হয়ে স্বামীর আদর খেত। রুশনা বেগম বয়সে তার আর কত ছোট হবে, এই বছর দুই/তিন। রুশনার এমন ঢলাঢলি দেখে তার শরীরের ভেতর আরেক হীরামতি চঞ্চল হয়ে উঠেছে, ঝড়ের মত রক্ত নেচেছে। আর হীরামতি সেই ঝড়ের কবলে পড়ে কেমন দুমড়ে মুচড়ে আবার মাথা তুলে দাঁড়ানো গাছের মত উঠে দাঁড়িয়েছে। সে কিছুতেই এমন ঝড়ের কাছে ধরা দিবে না।
তবু দুএকবার উল্টোঝড়ের কবলে যে পড়েনি সে, তাও নয়। ঝড় থেকে নিজের শরীরকে মুক্ত করার একটা লড়াই ছিল। কিন্তু পরে মনে হয়েছে, তাতে মুক্ত হবার তেমন জোর ছিল না। রুশনা বেগমের এক ভাসুর (যার নাম হায়দার আলী, বিবাহিত ও তিন সন্তানের জনক) যখন তাকে লুঠ করতে চেয়েছে, সে তার হাতের থাবায় কেমন নরম হয়ে লুঠ হয়েছে। শুধু এই ভাসুরই নয়Ñ গোয়ালপাড়ার আরো দুএকজনের কাছ থেকে শরীর আলগা করতে পারেনি। কখনও তার শরীর খুলে ধরার দৃশ্যটি ভাবতে গিয়ে সে একলা একলাই হেসে ওঠে। তাদের বাড়ি থেকে দিনের বেলায়ও মাঝে মধ্যে মোরগ ধরে নিত শেয়াল। শেয়ালের মুখে ঝুলে থাকা মোরগটি তখন কখ কখ কখ কখ ডাকছেই। ঝোপের ভেতর শেয়ালটি ঢুকে গেলে সবকিছু নীরব। সেও এমন পরস্থিতিতে পড়েছে একাধিকবার। টিলার ঝোপঝাড়ের সরু, জনমানবহীন, অন্ধকারময় পথ ধরে চলার সময় চেনাজানা কেউ পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। হীরামতি বানু কোনো কিছু বোঝার আগেই তাকে টেনে হিচেড়ে নিয়ে গেছে ঝোঁপের ভেতর। সে হাত পা ছুঁড়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে ছাড়াতে পারেনি (ঘটনার পর তার মনে হয়েছে, নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে যে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ দরকার, তা সে কি করেছিল! তার শরীরেতো জোরের কমতি ছিল না।) তখন তাকে শেয়ালের মুখে ঝুলে থাকা মুরগির মতই মনে হয়েছে তার। একই সাথে নিজের অসহায়ত্ব তাকে যেমন কাতর করতো, তেমনি দৃশ্যটি ভেবে হাসিও পেত। তবে সে এরকম ঘটনা নিয়ে কাউকে অভিযোগ করেনি। যতটা সম্ভব এরকম ঘটনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলেছে। সে ধরেই নিয়েছিল, তার যে কোনো শিকড় বাকড় নেই। এটা গোয়ালপাড়ার মানুষ এতদিনে জেনে গেছে। সে যদি কারো নামে ধর্ষণের অভিযোগ আনে, তাতে সকলের আঙুল তার দিকেই উঠে আসবে। সকল দোষই তাকে দিবে সবাই। নিজে থেকে কারো কাছে যায়নি সে, এটাও যেমন ঠিক আছে। আবার এটাওতো ঠিক, সেতো হাতের জোরে কাউকে ঠেকায়নি। একধরণের অসহায়ত্বে কিম্বা নীরবতায় ধরা দিয়েছে। তার শরীর কি এরকম কাউকে গোপনে আশা করে থাকতো! হীরামতির নিজেকেই তখন তার অচেনা, অন্য নারী মনে হত।

…অনেকদিন পর যখন সালামত মুন্সি আর হীরামতি খুব কাছ ঘেঁষে বসার সামাজিক একটা অধিকার পেয়ে গেছে। সালামত মুন্সি তখন সব সময় টুপি পরে, চুল-দাঁড়িতে পাক ধরেছে। হীরামতির অটুট শরীর থাকলেও মেয়ে বিয়ে দিয়ে নাতি-নাতল পাওয়া সালামতের দিকে কেউ আর সন্দেহের চোখ তুলে তাকায় না। সকলেই মনে করে বুড়া মানুষ এমনি এমনিই হয়তো হীরামতির সাথে বসে গপসপ করে সময় কাটায়। আবার গোয়ালপাড়ার মানুষের কাছে ভালে মহিলা বলে তার একটা পরিচিতি আছে। প্রকাশ্যে, কিম্বা তার আচরণে এমন কিছু ঘটেনি। যে কেউ বলতে পারে সে খারাপ মেয়ে মানুষ। ততদিনে আর হীরামতিরওতো সেই বয়স নেই। হীরামতি প্রায়ই এখন মজা করে সেই সময়ের কথা বলে,Ñ‘কিগো মুন্সি। মনে আছেনি আগর কথা। মুরগির মত টানতে টানতে যে জঙ্গলে ঢুকতা। অখন কিতা জানে চায়নানি। একটা দিনওতো জুতমত কিচ্ছু করতায় পারলায় না। খালি কুস্তিকাস্তিই সার।’
সালামত মুন্সির বয়স হলেও, হীরামতির কাছে এলেই সে যেন জোয়ান মরদÑ তার মন, শরীর চনমনে হয়ে ওঠে, রসে টসটস করে। যদিও তা প্রমাণের মত শারীরিক জোর তার নেই।Ñ‘কঅ চাই। একটা দিন তরে কইয়া রাজি করানো গেছে। আর শরীরটা অখনওতো আত্তির মত। টানতে টানতেই জান বাইর অই যাইতো।’
হীরামতি বানু যেন থকথকে কোন বিষাদের অতল থেকে বেরিয়ে আসে তখন…‘আমি শিকর নাই, কুনতা নাই এক মানুষ। বোঝোনা মুনসি ভাসতে ভাসতে কোনখান থাকি কোনখানে আইছি। আমারও একটা মন আছিল, শরীর আছিল। কিন্তু যদি ডাকলেই ধরা দিতাম। অতদিনে আমারে মরা মুরগির মতন শিয়াল কুত্তায় লুঠেপুটে ছুবড়া বানাই দিত।…বুঝছো, দাঁত কিড়িমিড়ি খাইয়া নিজেরে যতটা পারি সেইপ রাখছি।…তাও পারলামনি, তুমি যখন শইরলে হাত দিছো, আমি আর আমার মাঝে থাকতে পারতাম না।’…
তারা তখন সেই আদিম তাড়নার সময়টিকে জিবের নিচে রেখে পানসুপারি চিবুয়। সালামত মুন্সি গোয়ালপাড়ায় এখন একজন সাব্যস্তের মানুষ। বিচার-সালিশে হরহামেশাই ডাক পড়ে তার। হীরামতির কাছে তার আসা যাওয়া অনেকে দূর থেকে চোখ তুলে তাকালেও, এ নিয়ে কিছু বলার আছে বলে মনে করে না। কেউ হয়তো একটু ঠাট্টা-মশকরা করতে পারে। তবে হীরামতি এখনও যে চেহারা-সুরত নিয়ে গোয়ালপাড়া দাপিয়ে বেড়ায়, তাতে যুবকদের বুক কেঁপে ওঠাটা অস্বাভাবিক না।
হীরামতি বানু বলে, ‘দেখলাতো কাজীর বেটির লগে আইছলাম। হেই বেটির পুরি বিয়া দিয়া এখন নাতি নাতলও পাইয়া গেছে। আমি অও একলাই আছি।’
‘এটাতো তর লাগিই অইছে। কতজনইতো তরে বিয়া করত চাইছে। তুই রাজি অইলে না।’ সালামত মুিন্সর কথায় হাসে হীরামতি।
‘তাতো জানিই। তোমরার মতন যারা আছলায়, তারাতো আমার শরীরটারেই দেখতায়। আমিতো বুঝতাম। এরলাগি আর ঝামেলায় যাইতে চাই নাই। যদি ছুবড়া করি রাস্তাত ফালাই দেও।’
তার বুক থেকে কোনো দীর্ঘশ্বাস বের হতে শুনেনি সালামত মুিন্স। তবে এরকম কথাবার্তার সময় কেমন থমথমে হয়ে যেত হীরামতিÑ এতে বোঝা যেত তার বুকের ভেতর কোথায় একটা ঝড় আছে, ঝড়ের তান্ডব আছে। যা সেই শুধু নীরবে হজম করতো, কাউকে সে ঝড় কখনই ছুঁতে পারেনি।

হীরামতির সন্তান-সংসার না থাকলেও একদিক দিয়ে তার দিনকাল খারাপ কাটেনি। রুশনা বেগমের শ্বশুড় তাদের বাড়ির দক্ষিণপাশের বরন্ডি ঘেঁষে তাকে যে ঘর বানিয়ে দেন। সারাদিন রুশনাদের ঘরে কামকাজ করলেও সে নিজের মত ঘুচিয়ে সেই দুচালা টিনের ঘরে অন্তত রাতটা কাটাতো। এখানে কেউ তার ওপর নজরদারি করতো না। এই নিজের মত করে থাকার স্বাদটা সে বেশ উপভোগ করে। তাছাড়া বাড়ির বরন্ডির ভেতর ঘর হওয়ায় কেউ আর রাতবিরেতে এখানে এসে জ্বালা-যন্ত্রনা করতে পারে না। মনের ভেতরে যত আকুলিবিকুলি থাকুক, কেউ এসে না চাতানোর কারণে সে বেশ নিশ্চিত মনেই ঘুমুতে পারে।…তবে শুরুতে একলা থাকার সময়টিতে তার বেশ ডরভয়ই লাগতো। রাত হলে যেন টিনের চালে মানুষ হাঁটছে, এমন পায়ে চলার শব্দ হত। তাছাড়া টুংটাং, ঠুসটাস শব্দতো সারাক্ষণ একটা না একটা কিছু আছেই। রাত যত গভীর হয়েছে, এরকম শব্দ বড় হয়ে কানে বেজেছে। পরে সে জেনেছে, এই শব্দগুলো ছিল আসলে বাঁদর আর হনুমানদের কান্ড। এরা এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছুটে যত। কখনও কখনও ঘরের চালে নেমে এসে ঘরের ভেতরে থাকা লোকজনকে ডর দেখাতো।
হনুমান বা বাঁদর যে শুধু রাতের বেলাতেই এমন কান্ড করতো তা নয়Ñ এরা দিনের বেলায়ও কাউকে একলা পথ চলতে দেখলে মুখ ভ্যাংচি দেওয়া, গাছের শুকনো ডাল মট করে ভেঙে ছুঁড়ে মারা, এসব দুষ্টুমি ছিল সকলের গা সওয়া। সে এর আগে গাছে বাঁদর দেখেনি। তাদের গ্রামের মাঝেমধ্যে বুড়ো মত একটা লোক দড়িতে বেঁধে বাঁদর নিয়ে যেত। সে বাঁদরের নাচ দেখাতো। বাঁদরকে কলা খাওয়ার কথা বললে বাকল ছিলে কলা খেত। লাফ দিতে বললে বুড়োর হাতের লাঠির ওপর দিয়ে লাফ দিতো। কখনও কখনও বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ভ্যাংচি দিত। হীরামতির কাছে গাছে বাঁদর বা হনুমান দেখার অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। তাই প্রথম প্রথমতো সে একলা কোথাও বেরুতোই না। কিন্তু যখন দেখলো, সাধারণতো তাদের সাথে লাগালাগি না করলে তারা কখনই কারো প্রতি বিরূপ আচরণ করত না। আর বাঁদর বা হনুমান দেখলেই মানুষগুলোর কি যে হত, সে বুড়ো-জোয়ান বা শিশু যেই হোক। খামোকা তার দিকে ঢিল ছুঁড়বে, না হয় জিব বের করে ফাজলামো করবে। হীরামতি এসব করতে কাউকে দেখলে মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠেছে, ‘কি অইলো। খাউজারনি তর। বাদরামি না করলে মাইনষর ছাও মনে অয় না!’

তার মনে পড়ে, একটা হনুমান তখন প্রায় দুপুরবেলায়ই তার ঘরের চালে এসে বসে থাকতো। রুশনার শ্বাশুড়ি খোদেজা বেগম হীরামতিকে ঠাট্টা করে বলতেন, ‘হীরা, তর বইনারি আইছেরে।’ তারা কেউ যদিও হনুমান বলতো না, সকলেই বলতোÑ দিঘলেঞ্জি। হয়তো লম্বা লেজের কারণেই এমন নামকরণ ছিল।…হীরামতি বুঝতো না, এই দিঘলেঞ্জিটা কেন দুপুর হলেই তার ঘরের চালে এসে বসে থাকতো। সেটাও সে জানতো না, এটা পুরুষ না নারী। সে যদিও কোনোদিন এই দিঘলেঞ্জিটার সাথে কোনোপ্রকার উৎপাত করেনি।
পথ চলতে গেলে আচমকা চোখের সামনে পড়ে যেত দুএকটা চঞ্চল হরিণ। হরিণের ভীরু, গভীর, চঞ্চল চোখের দিকে তাকালে কেমন মায়া পড়ে যেত তার। ইচ্ছা করতো হরিণের নরম শরীর আকড়ে আদর করতে। তার খুবই খারাপ লাগতো যখন গোয়ালপাড়ার মানুষ দল বেঁধে বেড় দিয়ে উৎসবের মত হরিণ ধরে জবাই করে মাংশ ভাগবাটোয়ারা করে নিত। তাদের ঘরেও প্রায়ই এমন হরিণের মাংশ এসেছে। কেন জানি সে কখনই সে মাংশ মুখে দিতে পারেনি। কেন যেন মনে হত, এমন সুন্দর একটা বনের প্রাণি, যে কারো সাতে পাঁচে নেই। তার মত বনে বাদাড়ে ঘুরে ফিরছে। মানুষের সাথে তার কোনো শত্র“তা নেই। আর এই মানুষ কিনা, তাকে মেরে তার মাংশ দিয়ে ভোজ করে।
অদ্ভূত লাগতো তার, যখন পথ চলতে শরীরে হাত পড়তো কারো। কেউ টেনে নিতে চাইতো ঝোঁপের দিকে। তখন এই হরিণগুলোর ছবিও ভাসতো তার চোখের সামনে। সে একদিন খিলখিল করে হেসে রুশনার শ্বাশুড়িকে বলেছিল, ‘মাইনষের মাংশ যদি মাইনষে খাইতো। তাইলে এতদিনে আমারেও ধরা হরিণের মত খাইয়া ফালাইতো মাইনষে।’
হীরামতির অবাকই লাগে, কেমন হঠাৎ করেই সবকিছু পাল্টে গেলÑ সেই সময়টাকে তার কেমন ঝড়ের মত মনে হয়। যেন পাশ ফেরাতে না ফেরাতেই দিন আর রাতের তাফাত। চারদিকে গাছপালা কাটার ধুম। যে যেভাবে পারে, বিশাল বিশাল গাছ কেটে ফেলে। ঝোপঝাড় বলতে আর কিছুই থাকে না। একেকটি টিলার উপর পাকা ঘরবাড়ি উঠতে থাকে। ঘর তোলার একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এক সময় গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে ঝকঝক করে রোদে হেসে ওঠে চালের টিন। এখন দিনের বেলা অন্ধকারতো দূরে থাক, রাতের বেলাই কেমন ফাঁকা ফাঁকা আঁধারÑ পথ চলতে তাঁরার মিটিমিটি চোখে পড়ে। কতদিন জোনাক পোকার ঝিলমিল দেখেনি হীরামতি।
আর হঠাৎ করেই যেন উধাও হয়ে গেল সেইসব বাঁদর, হনুমান কিম্বা হরিণ। থাকবেইবা কি করে, তারা থাকতে গেলেতো গাছবৃক্ষ লাগে, ঝোঁপঝাড় লাগে। এই বনের প্রাণীগুলো যে তাদের শরীর একটু আড়াল করবে, সে অবস্থাই রইলো না। পাখির ডাক নেই, ঝিঁঝিঁপোকা আগের মত ডাকে না। গোয়ালপাড়া মানুষে মানুষে গিজ গিজ করে ওঠলো। তবে এখনও টিলার ভিতরের দিকে কিছু বাঁদরের দেখা মিলে। পথ হারিয়ে দুএকটা পিচ্চি হরিণ জনপদে নেমে আসে। এতে হীরামতি বানুর দেখা সেই সময়টি আর ফিরে আসেনা। কেবল সেই সময়টিকে তারা মনে করতে পারে।

তবে সাইদ আলি যখন এই গোয়ালপাড়ায় বাগানবাড়ি তৈরির উদ্যোগ নেন, তখন থেকে আবার একটু একটু করে গাছপালা বাড়তে থাকে এলাকায়। দেখতে দেখতে বাগানবাড়ির ন্যাড়া টিলা গাছে গাছে ভরে ওঠে। গাছগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো বেশিদিনের না। গোয়ালপাড়ার মানুষ দেখলো, কারা কারা এসে নানাজাতের গাছের চারা এনে বাগানবাড়ির বিভিন্ন স্থানে লাগিয়ে দিচ্ছে। শুধু চারা লাগিয়ে দিয়েই তারা তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। এক দুদিন পর এসে গাছের সেবা শুশ্র“ষা করেছে। কোন গাছে পানি দরকার, তার গোড়ায় লোক লাগিয়ে পানি ঢেলেছে, কোন গাছে পোকার আক্রমন, সে গাছে ওষুধ ছিটিয়েছে। কোনো গাছের গোড়ায় আগাছা আছে কিনা, তাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। কোনো গাছের চারা মরে গেলে সেদিনই আশপাশের কোনো নার্সারি থেকে চারা এনে খালি স্থানে লাগানো হয়েছে। সাইদ আলি যেদিন বাগানবাড়ি আসতেন, তার আগের দিন এমন তৎপরতা বেশি দেখা যেত।
তার একটা প্রভাব পড়েছিল গোয়ালপাড়ায়ও। গোয়ালপাড়ার মানুষ তাদের খালি ভিটা, খালি জমি যেখানেই পেরেছে গাছের চারা লাগিয়েছে। দেখতে দেখতে চারদিকে ছোট বড় নানাজাতের গাছের দেহ-কান্ড মাথা তুলেছে। মাঝে মাঝে আশপাশের বাড়ির লোকজনকে ডেকে সাইদ আলি গাছ লাগানোর উপকারের কথা বলতেন। গোয়ালপাড়ার মানুষ তার কথা অমৃতবচন বা শিরধার্য্য মনে করেছে কিনা, সেটা অন্য বিষয়। তবে গাছ যে উপকারি সেটা মানতে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না। তাদের জন্য গাড়িতে করে গাছের চারা না আসলেও, তারা শহর থেকে ফেরার পথে হাতে ঝুলিয়ে দুচারটা চারা নিয়ে এসে লাগিয়েছে। মাঝেমাঝে বন বিভাগের লোকজন এসে খালি টিলায় গাছ লাগানোর কথা বলেছে (তবে এতে বনের বুনো চেহারাটা আর হীরামতি বানুর চোখে ফিরে আসেনি)।
শুধু গাছ লাগানোই নয়, দেখতে দেখতে বাগানবাড়ির ভেতরের দিকে একটি বাংলো তৈরি হয়ে যায়। টিলার নিচে স্থায়ীভাবে টিন দিয়ে বানানো হয় প্যান্ডেল। অন্য একটি টিলায় বানানো হয় বৈঠক খানা। আর গোয়ালপাড়ার মানুষ দেখলো এই কাজগুলো তদারকি করতে রাত নাই দিন নাই চেনা-অচেনা কত ইঞ্জিয়ার, ঠিকাদার আসা যাওয়া করছে। দিন কয়েকে একেবারে মূল সড়ক থেকে বাগানবাড়ির ভেতরের রাস্তা তক পাকা হয়ে গেল (লোকজন অবশ্য এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। টাকা থাকলে যে কেউ যা খুশি করতে পারে, এটা তার ইচ্ছা)। বাগানবাড়ির ভেতরেতো সবাই যেতে পারে না, যাদের যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তারা বাইরে এসে তাদের চোখ জুড়িয়ে যাবার বিবরণ দিয়েছে। এই বিবরণের মধ্য দিয়েই যতটুকু সৌন্দর্য্য পাওয়া যায়, ততটুকু গিলেই লোকজন নিজেদের তৃপ্ত করেছে। সেইসাথে নিজেদের কৌতুহলও বেড়েছে (তবে সাইদ আলি সরকারের একজন কেউকেটা ধরণের লোক হলেও বাগানবাড়িটাতো তার নিজের টাকায় কেনা, এটা জানে লোকজন। এখানে সরকারের লোকজন সব সময় আসা যাওয়া করে, এ নিয়ে একটা নীরব কানাঘুষাও গোয়ালপাড়ার মানুষের মধ্যে আছে। তবে সেটা অই ফিসফিসানি পর্যন্তই)। গোয়ালপাড়ায় বাগানবাড়ি হওয়ায় সারা গ্রামের মানুষ খুশি না হোক, কিছু মানুষতো খুশি হয়েছেই। তারা এই সুযোগে সাইদ আলির কাছে ভেড়ার নানা ফন্দি পেয়েছে। কেউ কেউ যে লাভবান হচ্ছে, সেটা গোয়ালপাড়ার মানুষের চোখের সামনেই ঘটছে। সুবিধা যারা পেয়েছে, বা যাদের কোনো বিষয়েই কোনো মাথা ব্যথা নেই, কাজ আর খাওয়া নিয়েই ব্যস্তÑ তারা সকলেই মনে করে সাইদ আলির বাগানবাড়ি গোয়ালপাড়ার জন্য একটি মর্যাদার বিষয়। এখানে স্থায়ী কিছু বাসিন্দা আর কাঠচোর ছাড়া তেমন কেউ আসতো বলেও তারা মনে করতে পারে না। আর এখন কিনা দেশের বাঘা বাঘা নামীদামী লোকজন ছুটে আসছেন গোয়ালপাড়ায়। শুধু যে দেশী লোকজনই আসেন, তা নাÑ সাইদ আলি যখন এখানে আসেন। তখন বিদেশের লোকজনও তার কাছে এখানে ছুটে আসেন। বাগানাবাড়ি গোয়ালপাড়ার জন্য মর্যাদার বিষয় না, উটকো ঝামেলা এ নিয়ে কেউ আর বিতর্কে যেতে চায় না। দরকারটাই বা কি, বাগানবাড়ি কারো পছন্দ না হলেও শুধু বাগানবাড়ির জন্য তারা পাকা সড়ক পেয়েছে, বিদ্যুতের সংযোগ পেয়েছে, যেখানে শহরের অনেক স্থানে গ্যাস যায়নি, সেখানে এলাকায় গ্যাস এসেছে, এসেছে টেলিফোন। না চাইতেই এতটা সুযোগ তাদের হাতের নাগালে এসেছে, সেটাতো অই সাইদ আলির জন্যেই। তাই সে কিভাবে বাগানবাড়ির জমি পেল, কার টাকায় বা জিনিসপত্রে বাংলো বানালো, কে এসে গাছ লাগালো, অথবা কোন লোক এসে সাইদ আলির বিদেশী গাভির ওলানে দুধ আসলো কি আসলো না, তা পরখ করলোÑ তারা এ নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। বরং, লোকজন মজাই পায়, যেদিন তার বিদেশী গাভিটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। শহর থেকে একজনের পর একজন পশু চিকিৎসক ছুটে আসতে থাকেন। বাগানবাড়ির পাহারাদার নিয়ামত আলির কাছ থেকে লোকজন পরে শুনেছে। কেউ এসে গাভির পা টিপে, কেউ গাভির গোবর নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকে। কেই পকেটের রুমাল বের করে গাভির জিবের লালা মুছে, চোখের অশ্র“ মুছে। একজন ডাক্তার কিনা সারারাত গাভির কাছে কাটিয়ে দেন। পরে সকালবেলা যখন গাভিটি ওঠে দাঁড়ালো, সবার মুখে সে কি হাসি (গাভিকে সুস্থ না করেওতো উপায় ছিল না। নিয়ামত আলিই লোকজনকে জানিয়েছে, এই গাভিটি স্যারের বড় প্রিয়। যতবার আসেন, সময় করে একবার না হলেও গাভিটির কাছে যাবেন। তার গায়ে হাত দিয়ে আদর করবেন। নিয়ামত আলি বলে যে, গাভিটির কোনোকিছু হলে স্যার অফিসারদের আস্ত রাখতেন না। অফিসে বসে ফ্যানের হাওয়া খাওয়া বের করে দিতেন)! পারলে স্যারের পায়ের কাছে বসে সবাই আদর খাওয়া বিড়ালের মত মিউ মিউ করে! স্যারের সামান্য খুশিমুখের কথাটা শোনার জন্য কানটা বড় হতে হতে পুরো ঘর জুড়েই যেন ছড়িয়ে পড়ে।

তখনও হীরামতি বাগানবাড়িতে ঢুকতে পারেনি। আর দশজনের মত বাগানবাড়ির অন্যান্য কর্মচারি এবং যারা বাগানবাড়িতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে, তাদের মাধ্যমে বাগানবাড়ি সম্পর্কে নানা কথা শুনেছে। এসব কথা শুনে শুনে তারও কৌতুহলের সীমা ছিল না। ইচ্ছা করতো চৌকিদারের চোখ ফাঁকি দিয়ে একবার বাগানবাড়ির ভেতরটায় চক্কর দিয়ে আসতে। চাইলে যে পারতো না, এমনও না। কিন্তু সে সাহস আর হয়নি। হীরামতি ভেসে আসা নারী হলেও ততদিনে গোয়ালপাড়ায় নিজের মত সামান্য হলেও ইজ্জত সম্মান হয়েছে। লোকজন কিছুটা হলেও খাতিরজমা করে কথা বলে। তার মত এক নারীর জন্য এটাই বা কম কিসে! সে কারো বাজে কথা শুনে তার এ অবস্থানটাকে হারাতে চায় না। চৌকিদার যদি আকথা, কুকথা বলে, মানসম্মানের কথা চিন্তা করে সে আর অমুখো হয়নি। তাই বাগানবাড়ির ভেতর মহল এক রহস্যভূবন হয়ে থাকে তার কাছে।
সাইদ আলি সে সময়টি পর্যন্ত বাগানবাড়িতে এসে খাওয়ার কথা চিন্তা করেননি। সাইদ আলি এলাকায় সফরে এলে কোনো না কোনোভাবে একটা ফাঁকফোকর বের করে তার বাগানবাড়িতে যেতেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বাগানের কাজটাজ দেখে ফিরে যেতেন। বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার নিয়ামত আলি হীরামতিকে জানিয়েছে, ‘স্যার যে বাড়িতে আসেন বোঝছো। এটা অইলো সরকারি সফর। স্যারের লাগি সার্কিট হাউসে সরকারি বাবুর্চি রান্নাবান্না করে। স্যার নিজের বাড়িত কতদিন যে খাওয়া দাওয়া করছইন না। আল্লাই জানেন!’
কিন্তু কিভাবে যে সাইদ আলির কানে হীরামতি বানুর কথা গিয়ে পৌছে, সেটা এখনও হীরামতির কাছে একটি রহস্য। হয়তো বাগানবাড়িতে আসার সুযোগে এলাকার কেউ সাইদ আলিকে বলতে পারে হীরামতি বানুর রান্নার কথা। আর যদি কেউ সেটা জানায়ও, তা ভুল জানায়নি। গোয়ালপাড়ায় ছোটখাটো অনুষ্ঠান হলে কেউ আর বাইরে থেকে বাবুর্চি আনার কথা চিন্তা করে না। মাছ-মোরগতো কথাই নেই। এক দুইটা খাসি হলেও হীরামতি বানু তার মত করে সামলে নিতে পারে। সামলে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, রান্না করেই শেষ। আসলে তার রান্নার স্বাদটাই অন্যরকম। যারা তার হাতের রান্না প্রথম খেয়েছে, তাদের জিবে এই রান্নার স্বাদ অনেকদিন থাকার কথা। এ কথাটাই সাইদ আলির কানে গেছে। আর রান্নার কথা কানে গেলে সাইদ আলি বসে থাকার লোক নন। বলা যায়, তিনি একজন ভোজন রসিক মানুষ। ‘টেবিলে কয়েকপদের রান্না দেখলে খুব খুশি হন স্যার। খাইতেও পারেন জোয়ান মাইনষের মত।’Ñকেয়ারটেকারের কাছে এরকম কথা বহুবার শুনেছে হীরামতি বানু।
তাই যখন তাকে সাইদ আলির বাগানবাড়িতে যেতে বলা হল, গোয়ালপাড়ার মানুষ চমকে ওঠেছিল। তারা হীরামতি বানুর দোষের কোনো আলামতই মনে করতে পারলো না। এরকম কারো সাথে ঝুট-ঝামেলায় না জড়ানো মানুষ আবার কি করলো! হীরামতি বানুরতো গলায় পানি নেই, একেবারে শুকিয়ে কাঠ। যে পা গোয়ালপাড়ার উচুনিচু টিলা দাপিয়ে বেড়ায়, সে পায়ে সমান মাটিতে পা ফেলারও জোর নাই। যেন এখন সামান্য বাতাস দিলেই সে কাত হয়ে পড়ে যাবে। তিরতির বাতাসে দোল খাওয়া গাছের পাতার মত কাঁপতে কাঁপতে থাকে। হানিফ মহালদারের বাড়িতেও একটা থমথমে অবস্থার সৃষ্টি হয়। হীরামতির কোনো দোষত্র“টি হলে তার কিছুটাও তাদের ওপর বর্তাবে। সেতো এখন একঅর্থে তাদের পরিবারেরই লোক। আর সাইদ আলি হচ্ছেন ক্ষমতা ও সম্পদ দুইদিক দিয়েই প্রতিপত্তিশালী। তার এখন যা কিছু করার সুযোগ আছে।
এরকম টানাপোড়নের ভেথরেই এক সময় সাইদ আলির সামনে হাজির হল হীরামতি বানু। সাইদ আলি মুদৃ হাসি ছড়িয়ে বলেন, ‘এই তোমাদের হীরামতি। তা দেখতে শক্তপোক্ত আছেতো মনে হয় (উপস্থিত লোকজন তার এ কথায় মৃদু হাসে। তারা এ কথার কি অর্থ করেছে, তা অবশ্য বলা মুশকিল)। হীরামতি তোমার এত গুন শুনি। তুমি বাগানবাড়িতে থাকবা। আমারে একটু পাকসাক করে খাওয়াইবা। তোমার পাক বুলে খুব স্বাদের অয়।’ হীরামতি বানু কোনো কথাই বলে না। মাথা নিচু করে মেঝের দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে সাইদ আলির কথা শুনে। তার শরীর দিয়ে যেন এখন গড়িয়ে যাচ্ছে কুলকুল করা একটা ছোট নদী, আর তাতে ভেসে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা করছে তার। কিন্তু সে ভেসে যেতে পারছে না। নদীর মধ্যে গাছের গুড়ি বা পাথরখন্ডের মত সে স্থির। সে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলেই যেন বাঁচে। সাইদ আলি বললেন, ‘তুমিতো শুনেছি একলা মানুষ। কাল থেকে তুমি বাগানবাড়িতে চলে আসো।’
হীরামতি বানু কোনো মতে কামরা থেকে বেরিয়ে আসতেই তার মনে হয়েছে, এত বাতাস চারদিকে,- আহ! সে প্রানভরে শ্বাস নিতে নিতে নিজের ঘরের দিকে ছুটে যায়।
সাইদ আলিতো হীরামতিকে বাগানবাড়িতে চলে আসার জন্য নির্দেশই দিয়ে দিলেন। কিন্তু হীরামতি চাইলেইতো আর আসতে পারে না। সে থাকে হানিফ মহালদারের বাড়িতে। সে অর্থে হীরামতি হানিফ মহালদারের নিজের লোক। হীরামতি পরে অনেককে বলেছে ‘স্যারতো কইয়াই খালাস। কিন্তু আমি যে আরেকজনের বাড়ি থাকি। এটার যেন কোনো দামই নাই। কি যে সমস্যায়ই না পড়লাম গো…। তাছাড়া বুঝইতো আমি অইলাম ডিগরা ছাড়া বাছুর। ইচ্ছামত এতদিন ছুইটা বেড়াইছি। এমন সায়েবি বাড়িঘর আমার ধাতে সয় না।…কী যে সমস্যা বুঝছো, এরা অইলো বড় মানুষ। তারার কথায় কত সাবসুবা উঠে আর বয়। আমিতো অইলাম বুটা ছাড়া পাতা। এরার লগে খাপ খাওয়াই কেমনে!’…
সমস্যাও হল, হানিফ মহালদার বেঁকে গেলেন।Ñ‘ও তো আমার নিজের লোক। এখনতো সে আমাদের পরিবারের একজন। সে আরেকজনের চাকরানি অওয়ারতো কথা না।’ কিন্তু একদিন হানিফ মহালদারের বাড়িতে অনেক গণমান্য লোক এসে হাজির। তারা বলেন,Ñ‘আমরা জানি, হীরামতি আপনার লোক। তারতো চাকরিরও দরকার নাই। সে যে বাগানবাড়িতে অন্য কাজের লোকের মত খাটবে। ঘটনা সেটাও না। কিন্তু সমস্যাটা হল সাইদ সাহেব তার রান্নার কথা কিভাবে যে শুনছেন। আমরার অনুরোধ এখন কিছুদিনের জন্য হলেও তাকে আপনার এই রাঁধুনিকে ধার দেন।’
হানিফ মহালদার কি আর করবেন, এই বড় মানুষদের তিনি কিভাবে ফিরিয়ে দেন। এরাতো তার বাড়িতে এরকম প্রস্তাব নিয়ে আসারই কথা না (পরে গোয়ালপাড়ার কারো কারো সাথে কথা বলার সময় বলেছেন যে, আমার তখন সেই জমিদারি আমলের কথা মনে পড়ছিল বুঝছো। জমিদারের ইচ্ছা হল, আর কিছু করার নাই। ডাক পড়লে যার যা আছে তাই নিয়ে জমিদার বাড়ির দরোজায় হাজির। হীরামতিরেও ছাড়তে হল। আমরা সাধারণ মানুষ যে কত অসহায় সেদিন আরেকবার বুঝলাম। তার ইচ্ছাপূরণ না করলে কখন যে কিভাবে ফাঁসিয়ে দেন, তারতো ঠিক নাই। আর ছাগলে গাছ খাওয়ার কথাটাতো সবার মনে আছে। যদিও এই গাছ খাওয়ার বিষয়টা হয়তো সাইদ সাহেব নাও জানতে পারেন। তার এখন শুভানুধ্যায়ীর তো অভাব নাই)।

হীরামতি বানুর বাগানবাড়িতে ঢোকার খবরটি দ্রুতই গোয়ালপাড়ায় চাওর হয়ে গেল। সে সময়টাও ছিল বাগানবাড়িকে ঘিরে নানারকম উত্তেজক খবরে ঠাসা। যাই বাইরে প্রচার হত, তার একটা বড়লোকি গন্ধ ছিলÑ এই বড়লোক বলতেতো আর হানিফ মহালদারের মত কিছু জায়গাজমি, কিছু বাড়ি, গরু-মোষ, শুধু এইসব না। এসবতো আছেই, তার সাথে দামি দামি গাড়ি, দামি দামি মানুষের নামধাম জড়িয়ে। গোয়ালপাড়ার খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সবকটি খবরই বিস্ময়কর। যা শুনে, তাতেই তাদের চমকে ওঠা। হীরামতি তাদের কাছে খবর পৌছানোর একটি খোলা জানালা হয়ে ওঠে। তার কাছ থেকেই তারা বাগানবাড়ির ভেতরের বিভিন্ন খবর জানতে পারে।
হীরামতি বানু যদিও সেরকম মহিলা নয়, যে এক কথা দশকান করেই তবে ঘুমুতে যায়। বরং তার পেট থেকে কথা বের করা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু এক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। কারণ হচ্ছে, সে বাগানবাড়িতে যাই দেখছে, তাতেই বিস্মিত হচ্ছে। আর বিস্ময়ের অভিজ্ঞতা কারো কাছে না বলা পর্যন্ত যেন পেট ফুলে ফেঁপে ওঠে। দম ফেলা কষ্টকর হয়ে পড়ে। হীরামতি তাই নিকটজন কারো না কারো কাছে তার নতুন দেখা ঘটনা, বিষয়ের বিবরণ দিলে সেটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টা শুধু গোয়ালপাড়াতে সীমাবদ্ধ থাকলে কথা ছিল, আশপাশের গ্রাম, এমন কি শহর পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়েছে। আসলে সে সময়টিতে, যখন সাইদ আলির ক্ষমতা নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন ছিল না। লোকজনতো এভাবেই বলতো, ‘আইন আবার কি! তিনি যা মুখে বলেন তাই আইন।’… বাগানবাড়ি নিয়ে সে সময়টিতে তখন নানা কথা, নানারকম উল্টোসিধা প্রচারণাও ছিল। গোয়ালপাড়ার মানুষ আসলে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সাইদ আলি, তার পরিবার, আত্মীয়স্বজনÑ এদের উত্থানের মহড়া দেখছিল; আর চমকে চমকে তাদের চোখ ছানাবড়া হচ্ছিল।
হীরামতি হয়তো একজনের কাছে বললো, রাত হলে রঙিন আলো জ্বলে ওঠে সারাবাড়িতে। কিন্তু কদিন পর শোনা গেল লোকজন বলাবলি করছে, বাগানবাড়িতে রাত হলে লালনীলবেগুনি রঙের আলো ফুটে নানা জায়গায় বসানো চকমকি পাথর থেকে। তখন আর বিদ্যুৎবাতি জ্বালানোর দরকার পড়েনা। এমন রঙিন আলোতে আর লোকজনের চেহারা চেনা যায় না। কে যে কোথা থেকে আসে, কোন পথ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তা কেউই বলতে পারে না (যদিও আলোর ঘটনাটা এরকম ছিল না)। দিনে দিনে বাগানবাড়িটি সকলের কাছে এক চরম রহস্য ও কৌতুহলের কেন্দ্রে পরিণত হয়। দিনে বা রাতে একবার বাগানবাড়ি সম্পর্কে নতুন কোনো কিছু না জানতে পারলে যেন কারো পেটের ভাত হজম হয়না। কারো চোখে ঘুম আসেনা।

…এই সময়টিতে সাইদ আলি সম্পর্কিত নানা কথাও লোকজনের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু সেটা ছিল খুবই গোপনে। কারণ ভয়তো ছিলই, যদি কোনোভাবে তার বা তার অনুগত কারো কানে যায়, তাহলে নির্ঘাত ঝামেলায় পড়তে হবে। কি দরকার বাপু, খামোকা নাক ঘষে ছাল তোলার!
সাইদ আলি বাগানবাড়ি তৈরির সময় অনেক বড়লোক ঠিকই। অনেক ক্ষমতা তার পাঁচ আঙুলে। যে আঙুলই নাড়া দিবেন, তাই কথা বলবে। তবে দূরেরতো কেউ নয়Ñ তার বাপ-দাদা সম্পর্কে গোয়ালপাড়ার বয়স্ক অনেকেই ভালো জানেন। না জানার মত কোনো বিষয়ও না, তিনিতো এদেশেরই লোক। কেউ কেউ মজা করে বলে, ‘বাঙালর পুয়া না! মিয়া খাঁ অইলেই কি!’
গোয়ালপাড়ার মানুষ এখন মনে করতে পারে, একবার গোয়ালপাড়ার টিলার ওপর ছনখলায় আগুন ধরে গেলে খলসা থেকে শত শত মানুষ ছুটে এসেছিলেন। এর একটা কারণও ছিল, এই খলসা, বা আশাপাশের গ্রামের মানুষ তখন শীতকালে গোয়ালপাড়ার গভীর পাহাড়ের দিকে ছন কাটতে আসতেন। কেউ রোজ কামলা হিসেবে ছনখলার মালিকের জায়গায় কাজ করতেন। কেউবা নিজের ঘরের চাল ছাওয়ার জন্য সরকারের খাস জমি থেকে ছন কেটে নিতেন। মানুষের মনে পড়ে যায়, সাইদ আলি বাবা রহিম আলিও ছিলেন সেরকম একজন। বাড়ির জন্য ছন কেটে নিতে আরো অনেকের সাথে তিনিও গোয়ালপাড়ার দিকে আসতেন। এটা এক দুইদিনের কথা নয়, বছরের পর বছরের কথা।
তবে এ নিয়ে তেমন একটা কথা কেউ বলে না, হয়তো এর কিছু কারণও থাকতে পারে। এর একটা হতে পারে, আজকে গোয়ালপাড়ায় মহালদার বা বড়লোক হিসেবে যাদের পরিচিতি। তাদের বাপ-দাদারাও এমন কাজ করেছেন। আবার বড়লোকদের এমনও কেউ এখনও বেঁচে আছেন, যারা নিজেরাই এমন কাজ করেছেন। তারা হয়তো মনে করতে পারেন, সাইদ আলির বাবা কি করতেন, তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে তাদেরও বগলের তলের গন্ধ বেরিয়ে আসবে। আরো একটা কারণ হতে পারে, সাইদ আলিরা যেভাবেই হোক আজকে দেশে-বিদেশে সম্মানী মানুষ। তার সাথে সাথে গোয়ালপাড়ারও নামধাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন এসেছে। এলাকার জমি জমার দাম বেড়েছে। তারা এরজন্য কৃতজ্ঞতাটুকু জানাতেই যেন রহিম আলিকে নিয়ে আর কচলানোর পথে যায় না। লোকটাতো চুরিচামারি করেনি। কাজ করে ছেলেদের পড়ালেখা করিয়েছে, যেকারণে আজ সাইদ আলিরা একটা পর্যায়ে এসে পৌছেছে। সাইদ আলির বাবার নাম তখন অনেকে শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করে। তারা আর মানি লোকটার মানকে তেতো করে তুলতে চায় না।
তবে মনে মনে অনেকেই ক্ষুব্ধ, অন্তত গোয়ালপাড়ায় যাদের একটা অবস্থান আছে। এই অবস্থাটা একদিনে তৈরি হয়নি। অনেকদিনে হয়েছে। যাদের কথা কখনও কখনও গোয়ালপাড়ায় আইন। সে লোকগুলোকে সাইদ আলি একবার ডেকেও বলেনি, কেমন আছেন আপনারা! বরং উল্টো তাদের সম্পর্কে নানা কথা নাকি প্রায়শই বলাবলি করেন। এরা সরকারি টিলাটালা দখল করে আছে। এদের উচ্ছেদ করা দরকার। তার এক পাহারাদার ইদ্রিছ বেশ রসিয়ে বলেছে কথাটা। সাইদ আলি নাকি বলেছে, ‘এসব কাঠুরিয়াদের বাড়ির দিকে ভিড়তে দিওনাতো। এরা বাড়ির জিনিসপত্রের কোনো কদর বুঝবে না।’…এরকম কথাটা প্রচার পাওয়ার পর স্বভাবতই গোয়ালপাড়ার মানুষ মনে কষ্ট পেয়েছে। কাঠুরিয়া কথাটা দুএকজনের বেলা হয়তো মিছা না, কিন্তু তারমত মানুষের পক্ষে ঢালাওভাবে এরকম বলাটা কি ঠিক হল! তাছাড়া তিনিতো ভদ্রলোক মানুষ। তার মুখে এরকম কথা বেমানান। কাঠুরিয়া হওয়াতো কোনো দোষের কিছু না। কাঠ কেটে খাওয়াতো একটা পেশা। তার কথা ঠিক-বেঠিক যাই হোক, এটাতো সত্য সাইদ আলির তাদের কাউকে পাত্তা দেওয়ার দরকার নাই। এজন্য কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি তাদের মধ্যে অবহেলার একটা চাপা ক্ষোভও আছে। কেউ কেউ চাপা ঠোঁটে বলে,Ñ‘এত বাড় ভালা না।’

…হীরামতি যেদিন বাগানবাড়ির কেয়ারটেকারের কাছ থেকে প্রথম রান্নাঘরের দায়িত্ব বুঝে নেয়, ঘটনাক্রমে সেদিন সাইদ আলি তার শহরে এসেছিলেন। কাজের ব্যস্ততায় তার বাগানবাড়িতে আসার কথা ছিল না। কিন্তু কেউ হয়তো তার কানে হীরামতির রান্নার কথাটা মনে করিয়ে দেয়। আর তাতেই তিনি সফরসূচি ওলটপালট করে দিলেন। সিদ্ধান্ত নেন রাতে বাগানবাড়িতে খেয়ে তবে ঢাকায় ফিরবেন। ঢাকাতো আর বেশি দূর না, মাত্র কয়েক ঘন্টার পথ।…কথাটা শুনেই হীরামতির হাত পা কাঁপতে শুরু করে। সেতো জানে, তার হাতে এমন কোনো জাদু নেই। কারো কাছে তেমন কিছু শিখেনি। সে নিজের মত করেই রান্না বান্না করে। সেই রান্নাই কারো কারো হয়তো ভালো লাগে। সাইদ আলির কাছে সেটা কতটুকু ভালো লাগবে, এ নিয়েই তার যত দুশ্চিন্তা। ভয়ে তার বুক সারাক্ষণ ধক ধক করে।
সে যত দ্রুততায় সম্ভব খাশির মাংশের ভুনা, ছোট মাছের চচ্চড়ি, আলুভর্তা রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে দেয়। সাইদ আলি যখন তার সঙ্গের অতিথিদের নিয়ে খেতে বসেন, তখন হীরামতির জান বেরিয়ে যায়Ñ এমন ধুকপুক অবস্থা। বিদ্যুতের পাখা মাথার উপর ভনভন করে ঘুরলেও তার শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে। সে শুনেছে, সাইদ আলি খুব মেজাজি মানুষ। যদি রান্না জিবে না লাগে তা হলে রেগেমেগে কাঁই হয়ে যাবেন। সে মনে মনে আল্লা আল্লা করে। মান সম্মান রাখার মালিক আল্লাহ। … তবে বেশি সময় এই ছটফটানির মধ্যে কাটাতে হয়নি, খাবারের টেবিল থেকেই হীরামতির ডাক আসে। হীরামতির অবস্থাতো তখন আরো খারাপ, ডেকে নিয়ে যদি বলেন, ‘এসব কি রেধেছো। এসব মানুষের খাবার না গরুর খাবার!’
সে বিড়ালের মত ভীরু পা ফেলে মাথায় ঘোমটা দিয়ে কোনো রকম খাবার ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হয়। সাইদ আলি মিট মিট করে হাসছেন (যদিও সে সময়টিতে হীরামতির এই হাসি বুঝবার মত পরিস্থিতি ছিল না, কিম্বা সেদিকে তাকিয়ে ছিল কিনা, কে জানে)। এক সময় সাইদ আলি বলেন, ‘এই মেয়ে, তোমার হাতে কি জাদুটাদু আছে। যা খাই সেটাইতো ভালো লাগে।’ মুহূর্তেই হীরামতির শরীর যেন পাখির পালকের মত হালকা হয়ে যায়। সাইদ আলির জিবকে সে স্বাদ দিতে পেরেছে, এটা শোনার পর সে মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল জীবনের সেরা কাজটি সে করে ফেলেছে (তার জীবনেতো খুব বেশি চাওয়া পাওয়া নেই, এরকম একটু আধটু প্রশংসা পেলেই জনম সার্থক)। হীরামতিতো এক হাওয়ায় ওড়া একটা পাতা মাত্র। যার নিজের বলতে একটা জীবনই, সে কিনা সাইদ আলির মত মানুষকে সন্তোষ্ট করতে পেরেছে, এটা কি কম বড় কাজ (সে মুহূর্তে তার মনে পড়ছিল, যখন সে মহালদার বাড়িতে তাদের ছেলের বউয়ের সাথে কাজ করতে এসেছিল। সে রান্নাটান্না তেমন পারতো না। আর ভালো কিছু রান্না করা, সেটা শেখারও সুযোগ ছিল না। মামাদের যেখানে চারটা ভাত যোগাড় করতেই হিমশিম অবস্থা। সেখানে মাছ-মাংশ রান্না!…আবার যে আতুর লোকটার সাথে তার বিয়ে হল, সেখানেওতো একই অবস্থা। সে অর্থে দূর থেকে কোরমা-পোলাওয়ের ঘ্রাণ নিয়েই হীরামতি বেড়ে ওঠেছে। গোয়ালপাড়ায় আসার পর মহলাদারের স্ত্রী বকাঝকা করেই তাকে রান্না করতে শিখিয়েছে। মহিলাটা খারাপ ছিল না। মায়ের মতই আদর করে বকতো, ‘মেয়ে মানুষ। রানতে পারবো না। এটা কেমনে অয়!’)! সে মুহূর্তে রুশনার শ্বাশুড়ি খোদেজা বেগমকে খুব মনে পড়ে তার। মহিলাটি যদি তাকে হাতে ধরে রান্না না শেখাতো, তাহলে এত বড় স্বীকৃতিটা তার কপালে জুটতো না। পরদিন হীরামতি নিজেই দোকান থেকে এক প্যাকেট মোমবাতি, এক প্যাকেট আগরবাতি কিনে নিয়ে আসে। সে সন্ধ্যার সময় বাড়ির পূবদিকে মহালদারবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে খোদেজা বেগমের কবরের দেওয়ালে মোমবাতি ও আগরবাতিগুলো জ্বালিয়ে দেয়। গোয়ালপাড়ার মানুষ নীরবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এই ধরণটি দেখে। তবে এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোনো কথা বলে না (কেউ যদি আড়ালে কিছু বলেও থাকে। সেটা হীরামতির জানার কথা নয়)।
সে রাতে হীরামতি আর বাগানবাড়ি যায়নি। সে রাতেই সালামত মুন্সি আসে হীরামতির ঘরে। সালামত মুন্সি হীরামতির ঘরে আসা যাওয়াটা বাড়ির বা আশপাশের লোকের কাছে এখন আর তেমন কৌতুহলের কিছু না। এটা হয়তো দশ-পনেরো বছর আগে হলে কিছুটা সমস্যা হত। এখন হীরামতির বয়স হয়েছে। যদিও তার শরীর এখনও কোনো কোনো যুবতীর চেয়ে কম না। অনেককে এখনও তার এই যে শরীর টানে, সেটা হীরামতি ভালোই বুঝে (এরা রসিয়ে টসিয়ে কথাবার্তা বলে তাকে পটাতে চায়)। কিন্তু সে এ ফাঁদে পড়তে চায় না। তবে সালামত মুন্সি ঘরে এলে তার গায়ে টায়ে হাত দেয়, এটাকে সে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। এর হয়তো একটা কারণ যে, এই সালামত মুন্সির কাছে তার শরীরটাতো আর গোপন কিছু নয়। কতবার এই মুন্সি তাকে জঙ্গলের ভিতর টেনে নিয়েছে।… সে দৃশ্য এখনও মনে পড়লে তার হাসি লাগে। লোকটা তাকে জড়িয়ে ধরা থাকা অবস্থাতেই লুঙ্গিটুঙ্গি ভিজিয়ে ফেলতো। মুুন্সি ঘরে এলে খামোকাই এসব প্রসঙ্গ টেনে এনে সে মজা করে। মুন্সিও যেন কিরকম শিশুর মত কাতর চোখ মেলে হীরামতির মজা দেখে।
কিন্তু সেদিন কেন জানি মুন্সি ঘরে আসার পরই তার বুক ভেঙে কান্না আসছিল। অথচ এরকম মুহূর্তে তার উৎফুল্ল থাকার কথা। সাইদ আলি তার রান্নার প্রশংসা করেছেন। যে লোক দেশ-বিদেশে কত লোকের হাতের রান্না খেয়েছেন। কোথাও নাকি এমন স্বাদ হয়নি। মুন্সি যখন তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে, সে কান্নাটা তখন আর কান্না থাকেনি। কেমন একটা ভালো লাগার মত অনুভূতি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিন হলে যে মুন্সি শরীরে হাত দিলে আপত্তি না করলেও খামোকা হলেও গা মোচড়ামুচড়ি করে। সে এ মুহূর্তে তার কিছুই করে না। মুন্সির বয়ষ্ক হাতের চাপে নিজের শরীরটাকে সে ছেড়ে দিলে মুন্সিরও কি হয়, দীর্ঘদিন যে শরীরে কোনো সাড়া নেইÑ সেই শরীর ঝড়ের মত জেগে ওঠে। হীরামতি এক ভয়ংকর মেঘের কুন্ডলি যেন, সারা গোয়ালপাড়া লন্ডভন্ড করে তবেই তার শান্তি! মুন্সিকে সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে যেন নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে চায়।…বেশ পরে যখন ঝড় থেমে গেছে, তাদের দুজনকেই তখন অচেনা মানুষ বলে মনে হয়। অনেকদিন পর এমন একটা আকস্মিক ঝড়ের কবলে তারা পড়লেও, যেহেতু এরকম পরিস্থিতি তাদের দুজনের কাছে নতুন নয় বলে তারা দুজনই একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে মৃদু হাসে। তাদের চারপাশের বাতাসে তখন মাংশভূনার ঘ্রাণ, পাখির কিচিরমিচির।…

এই রান্নার সুবাদে হীরামতি বানু বাগানবাড়িরই একজন হয়ে যায়। ক্বচিত দুএক সপ্তাহ বাদ যায়, নইলে সাইদ আলি বৃহস্পতিবার এলেই বাগানবাড়িতে এসে হাজির (হীরামতি বানুকে কেয়ারটেকারই তথ্য দেয় যে, স্যারের আসা যাওয়া করতেতো আর সমস্যা নেই। হুট করেই গাড়ি নিয়ে চলে আসতে পারেন। ধরো এই যে মাছ-মাংশ রান্না করছো, এটাওতো স্যার নিজের টাকায় কিনেন না। মাঝেমধ্যে শখ করে হয়তো কিছু একটা কিনলে কিনতে পারেন)। বৃহস্পতিবার এলে তাই হীরামতি আরেক মানুষ। তার সাথে কারো কথা বলার সুযোগ নেই। কোমরে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে শুধু কাজ আর কাজ তার। প্রথমে অবশ্য এরকমই কথা হয়েছিল, সাইদ আলি যখন বাগানাবাড়িতে আসবেন। তখনই সে ও বাড়িতে গিয়ে রান্নাবান্না করবে। কিন্তু, পরিস্থিতিটা আর সেরকম থাকেনি। কি করে যে হীরামতির রান্নার খুশবু ঢাকা শহরের বড় বড় দালানবাড়িতে গিয়ে ঢুকে যায়। আর এতে হীরামতির নিজের সময় বলতে আর কিছু থাকেনা। মাসের এমন কোনো দিন নেই, বাগানবাড়িতে সাইদ আলির আত্মীয়স্বজন, আত্মীয়স্বজনের আত্মীয়স্বজন, দলের লোকÑ কেউ না কেউ আসছেই। আর হীরামতি যখন একবার ঢুকে গেছে সেইখানে, তার আর না করা, বা ফেরারও উপায় নেই। শুরুতে সে রাতেরবেলা রান্নাবাড়া শেষে বাড়ি ফিরে আসতো। শেষের দিকে আর সে সুযোগ ছিল না। খালি খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলেইতো শেষ না, বাসনকুসন ধুয়ামোছা, গোছানোÑ এসব করতে করতে অনেক রাত। শরীরে আর কুলোতো না, রান্নাঘরে চাটাই পেতে শুয়ে পড়েছে।
আর এভাবে রান্নাঘরে ঘুমানোর বিষয়টি কি করে একদিন সাইদ আলির কানে যায়। তার জন্য থাকার আলাদা ঘর ওঠে। একদিন দেখা গেল ট্রাক গাড়ি বোঝাই হয়ে টিন আসে। সাথে মিস্ত্রি। কাঠের খুঁটি গেড়ে তাতে টুঙটাঙ করে টিন বসিয়ে দেওয়া হয়। আরেক গাড়িতে তার জন্য খাট, আলনা এসব আসে। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে যায়। ঘরের ভেতর বৈদ্যুতিক পাখা লাগে। হীরামতি কোনোদিন জাদু দেখেনি, তবে একদিনের মধ্যে এরকম কাণ্ড দেখে তার কেন জানি জাদুর কথাই মনে হয়েছে। জাদু ছাড়া একদিনের ভেতর এরকম ঘর, ঘরের ভেতর সাজ সরঞ্জাম আসা, এবং সে রাতেই পূর্ণ প্রস্তুত একটি ঘরে নিজের মত করে প্রবেশ করা কি করে সম্ভব হত! তবে পুরো ঘরটিই তাকে দেওয়া হয়নি, পাশের কামরাটি কেয়ারটেকার নিয়ামত আলিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই কামরার ভেতরে আবার এদিক ওদিক হবার দরোজাও রয়েছে। এতে সে ভেতরে ভেতরে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছে। মনের দিক থেকে হীরামতি এই সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে পারেনি। তবে মেনে নেওয়া না নেওয়ায় কারো কিছুতো যায় আসেনি। হীরামতির ইচ্ছা অনিচ্ছা, পছন্দ অপছন্দ আবার কার কাছে বলার ছিল, বা কে শুনেছে! এরফল যা হয়, তাকে সবকিছুই গিলতে হয়। নিয়ামত আলি লোকটাকে তার শুরু থেকেই ভালো লাগেনি। সব সময় তার সাথে কেমন গা লেপটা লেপটি ভাব। নানা ছুঁতোয় গায়ে হাত দেয়। হীরামতিতো মেয়ে মানুষ, সে তার এই পথচলার মধ্যে পুরুষ মানুষের খাসলততো কম দেখেনি। কিন্তু মুশকিল হল, সে একলা মেয়ে মানুষ, বাঁধন টাদন নাই। লোকজন তাকেই দুষবে শুরুতে। যেকারণে তাকে অনেক কিছুই ঠোঁট টিপে হজম করতে হয়েছে। অনেক কিছুই মাটিচাপা দিতে হয়েছে।
এই মন থেকে মেনে না নেওয়ার বিষয়টিও সে পুরোদমে চেপে যায়। আর যে কারণে মেনে না নেওয়া, সে আশংকাটির বাস্তবায়ন হতে একটি রাতও পার হতে পারেনি। যে রাতে হীরামতি বানু তার ঘরে ওঠে, সে রাতেই নিয়ামত আলি তার ঘরে ঢুকে। হীরামতির খাটের একপাশে বসে বলে,-‘তুমিই কওতো, বউ আছে। তবু বউ নাই। এমন করে কেমনে দিন চলে। কতদিন বউয়ের গন্ধ পাই না।’
হীরামতি কোনো কথা বলে না। সে নিথর চোখ মেলে নিয়ামত আলির দিকে চেয়ে আছে। লোকটার কাতরতা তাকে কিছুটা নরম করে। কিন্তু সে তার কথার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে না। সে জানে, নিয়ামত আলির বাড়ি অন্য জেলায়। বাড়িতে বউ-বাচ্চা আছে। বাগানবাড়িতে এত কাজ, তার ছুটি নেবার কোনো সুযোগই নেই। নিয়ামত আলিও তাকে বলেছে, দায়িত্ব বলে একটা বিষয় আছে না! এত বড় একটা লোক তার বিশাল বাড়ির দায়িত্ব দিল, এই নিয়েতো হেলাফেলা করা যায় না।
‘বুঝছো হীরামতি, আমিওতো মানুষ। তোমার লগে মাঝেমধ্যে একটু রঙ তামশা করি। আমারে তুমি খারাপ মনে করতা পারো। আমি কইলাম অতো খারাপ মানুষ না।’
তার এমন কথায় হীরামতির মন আরো নরম হয়। কেয়ারটেকার তার দিকে এগিয়ে আসলে সে কি করবে বুঝতে পারে না, তাকে কি ফেরানো উচিত। নাকি তার কাছে নিজেকে সঁপে দিবে এই মুহূর্তটিতে। এইসব ভাবনার ভেতরেই সে এক সময় নিয়ামত আলির বুকের মধ্যে নিজেকে দেখে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গা মুচড়ে ঝাড়া দিতেই নিয়ামত আলি বিছানা থেকে ছিটকে পড়ে। নিয়ামত আলির ছিটকে পড়া কাচুমুচু চেহারাটি দেখে হীরামতির হাসি লাগে। লোকটাকে তখন খুব অসহায় মনে হয় তার। ইচ্ছা করে টেনে তুলে। কিন্তু তার আগেই নিয়ামত আলি তার বিছানায় ওঠে আসে। হীরামতিতো মানুষ, নারীÑ এমন নিশিরাত, কিভাবে কেয়ারটেকারকে ফেরাবে তার মাথায় কোনো বুদ্ধি কাজ করে না।

হীরামতির তখনতো অনেক কিছুই দেখার কথা, শেখার কথা, জানার কথা। বাগানবাড়িটা তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন, তার সবকিছুই অচেনা। কেয়ারটেকার নিয়ামত আলি তাকে বাগানবাড়ির গলিঘুপচি হেঁটে দেখায়, অনেক ফাঁকফোকড়ের কথা বলে। সে শুরুতে অতো কিছু খেয়াল করেনি। সেই রান্না ঘর, পাকশাক এসবের মধ্যেই তার দিন কেটেছে। কিন্তু যেদিন বাইরের কোনো লোক আসেনা। সেদিন তার রান্নারতো চাপ থাকেনা। সময়টা অলস হয়ে পড়ে। আগে মহালদার বাড়িতে থাকতে যেরকম কাজ নাইতো টিলাবাড়ির পথে পথে বেরিয়ে পড়ো, এঘর ওঘর করে সময় কখন যে গড়িয়ে গেছে। টেরই পাওয়া যায়নি। এখন তার সে সুযোগ নেই। বলা যায়, যখন তখন বাগানবাড়ির বাইরে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞাই আছে। চাইলেই সে আর বের হতে পারে না। আগে সে কোথায়, কার বাড়ি ছিলÑ এটা এখন আর কোনো ফ্যাক্ট না। এভাবেই তাকে নিয়ামত আলি বলেছে। সাইদ আলির বাড়ির লোকের মান মর্যাদাটাই আলাদা। বাগানবাড়িটা গোয়ালপাড়ায় হলেও তার সম্মান গোয়ালপাড়ার অন্য সবার চেয়ে পৃথক (এ কথাটা যখন পরে সে গোয়ালপাড়ার মানুষকে বলেছে, তাতে বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হয়েছে। সকলে তখন সাইদ আলির বাবার সময়কালকে মনে করে ক্ষোভ না আফসোস প্রকাশ করেছেÑ সেটা বোঝা যায়নি। তবে বাগান বাড়ির সাথে তাদের যে অনেক দূরত্ব, এটা তারা বুঝে যায়। এতে দুধরণের কথাবার্তা শোনা গেছে, কারো কথাÑ ঠিক আছে বাবা। অতো বড়লোকের বাড়ির ধারেকাছে না যাওয়াই ভালো। আবার কেউ কেউ ঘুরিয়ে বলেছে, সময় এরকম সব সময় থাকবে না। তখন এই দাপট কই যায় দেখা যাবে)। সালামত মুন্সির সাথেও এখন তার দেখা হয় কম। এ লোকটার সাথে দেখা হওয়ার জন্যও তার বুকে একরকম আকুলতা আছে। কিন্তু উপায় নেই। যে বাড়িতে সে এখন ওঠেছে, সে বাড়ির মান সম্মান রাখাটাও তার কর্তব্যের মধ্যে পরে (মহালদারবাড়িতে গেলে সে সালামত মুন্সির সাথে দেখা করে। তখন সে এই কথাটাও বলে যে, ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, সেতো এখন বাগানবাড়ির মানুষ। বাগানবাড়ির ভালোমন্দ দেখাটাও তার কাজ)। হীরামতির এ আচরণকে অনেকে আবার বলেছে, হীরামতি আর আগের হীরামতি নেই। সে এখন অনেক বড়লোকের বাড়ির মানুষ। তার কথাবার্তা, চলনচালন সব পাল্টে গেছে (আসলে কিছু পাল্টেছে কিনা। সেটা হীরামতি নিজে অবশ্য টের পায় না। সে শুধু এটা বুঝেছে, সে এখন যা করছে। আগে সেরকম কিছু সে করেনি। নতুন কাজের ধরণের জন্য তার আচার আচরণ পাল্টে গেছে বলেই অনেকে এখন সেরকম মনে করছে)।
আর বাগানবাড়ির সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে সে শুধু চমকে ওঠেছে, চমকটা এই জন্য নয় যেÑ এরকম প্রাণী সে নতুন দেখেছে। এই প্রাণীগুলোকে বরং সে বনে মুক্তভাবে চলাচল করতে দেখেছে, যখন সে গোয়ালপাড়ায় প্রথম এসেছিল। পরে দিনে দিনে গাছপালা কমেছে। বনে জঙ্গল কমেছে। পরিবেশ বদলেছে, এই প্রাণীগুলোও কোথাও হারিয়ে গেছে। সে দেখে বাড়ির পূব পাশে টিন ও তারের জালের বেড়া দেওয়া একটি স্থানে বেশ কিছু হরিণ ছুটোছুটি করছে। নিয়ামত আলি বলে, এই গুলা অইলো মায়া হরিণ। স্যাররে দলের লোকজন কই থনে যেন যোগাড় করে এনে দিছে। স্যার আসলেই এখানে একবার ঘুইরা যায়।…
হরিণগুলো তাদের মায়াবী চোখ ঘুরিয়ে দেখে, বেড়াজালের ভেতর ছুটোছুটি করে। একবার এদিকে যায়তো, আরেকবার ওদিকে যায়। বড় মায়া লাগে হীরামতি বানুর। তার খুব ইচ্ছা করে হরিণগুলোকে বনে ছেড়ে দিতে। তারা ইচ্ছামত ঘুরুক। ঘাস চিবাক, হরিতকি খুটে খাক (তার তখন পুরনো দৃশ্যগুলো মনে পড়ে যায়। না পড়ে উপায়ও নেই। সে যখন গোয়ালপাড়ায় আসে, সেসময়টিতে প্রায় প্রতিদিনই এরকম একটা দুইটা হরিণের সাথে তার দেখা হয়েছে। লোকজন দেখলেই দ্রুত পায়ে বনের ভেতর গা-ঢাকা দিয়েছে)। নিয়ামত আলি তাকে নিয়ে বাগানবাড়ির ভেতরে ঘুরে।…এক খাঁচামত একটা ঘরে নিথর দাঁড়িয়ে আছে একটি ময়ূর…আরেকটা বড় খাঁচার মত একটা ঘরে বেশ কটা বাঁদর…আরেক জায়গায় দুটা অজগর সাপ বেড়ি পাকিয়ে ঘুমে…।…বাড়ির দক্ষিণ দিকে খোলামত জায়গা একটি লাল রঙের ঘোড়া দাঁড়িয়ে ঘুমুচ্ছে…। ঘোড়ার শরীর চুঁয়ে যেন চকচকে তেল গড়িয়ে পড়ছে।
হীরামতি বানু বুঝতে পারে না, এসব কবে কখন, কোন ফাঁকে গোয়ালপাড়ার বাগানবাড়িতে এসে ঢুকেছে। সে যত দেখে, তার বিস্ময় তত বাড়ে। নিয়ামত আলি যখন বলে, বোঝ, এসব কিন্তু স্যারে একটাও কিইনা আনেনি। দেখছো না বড় বড় স্যার আসে। এরা নানা জায়গা থাকি এসব যোগাড় করে এনে দিছে। হীরামতি বানু সাইদ আলি সম্পর্কে খুব কমই জানে। তার জানার দরকারও নেই। এসব তার মাথায় ঢুকে না। নিয়ামতের কাছ থেকে সাইদ আলির ক্ষমতার দৌড়ের কথা শুনে, আর রহস্যের সুড়ঙে ঢুকে।

বাগানবাড়িতে আসার পর হীরামতি বানুর ঘুম কমে গেছে। মাথার ভেতরটায় এতসব বিষয় এসে ঘুরপাক খায়। আগে তার এরকম ছিল না। যখন ঘুমাতো না, ঘুমাতোই না। আর ঘুমালে একেবারে নেতানো কাদা। বিছানায় লেপটে গেছে। আর এখন তার একবারেই উল্টো। বিছানায় যাওয়ার পর ঘন্টা যায়, এমন কি রাতও চলে যায়। তার আর ঘুম আসেনা। মাথার ভেতর হিজিবিজি কত কথা।…মায়া হরিণ, ময়ূর, বাঁদর, ময়না, টিয়ে,… আরো কত কিসিমের জিনিস…তার মাথার ভেতর এসব বিদ্যুতের পাখার মত ঘুরছেতো ঘুরছেই।
সে বুঝতে পারে না, এতদিন এত ভাবনা কোথায় ছিল। তার সেই আতুর লোকটার কথা খুব মনে পড়ে। রাত হলে যে লোকটা শরীরের কাছে কেমন কাতর দলার মত পড়ে থেকেছে। তখন অবশ্য হীরামতিরই কত বয়স, এই বারো-তেরো, বা তার এদিকসেদিক। মামারা তাকে কোথাও খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে চেয়েছেন। সেও মেনে নিয়েছে। যদিও লোকটাকে সে ভালো করে দেখেওনি। দেখার দরকারটা কি! সে আছে, লোকটাও আছে। এক চাটাইয়ে শোয়, মাঝেমধ্যে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে, টুকটাক কথাবার্তাও হয়Ñ এইতো। এই আতুর লোকটার কোমরের নিচ থেকে দুটি পাই অবস ছিল, কিভাবে সেটা হয়েছে, সে তা কোনোদিন জানতে চায়নি। জানারও কৌতুহল তৈরি হয়নি। লোকটা দুই হাতে ভর দিয়ে ব্যাঙের মত লাফিয়ে লাফিয়ে চলতো। হীরামতির সাথে বিয়ের আগে সে একা একাই যেতে পারতো। কিন্তু বিয়ের পর হীরামতির কাজ ছিল সকাল হলেই লোকটাকে কাঁধে নিয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে যে সড়কটি উপজেলা সদরের দিকে গেছে, সেই সড়কের যেখানে একটি বট গাছ আছে। সেখানে একটি খাটে বসিয়ে রাখা। পথচারি, বাসযাত্রী যে যেরকম পারে একটাকা, দুইটাকা করে তার সামনে মেলে রাখা থালার মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। এতে সারাদিনে যা পেত, তাই দিয়ে তাদের সংসারের জন্য চাল-ডাল যেটা মিলে, তা গ্রামের দোকান থেকে নিয়ে আসতো হীরামতি। যেদিন বাসগাড়ি চলতো না, কিম্বা টানা বৃষ্টি হত। সেদিন রোজগারও কম হত। অনেকদিন গেছে চুলাও বসানো যায়নি। সেইদিক থেকে হীরামতির কোনো সাধ আহলাদও ছিল না। সেতো বুঝেই গেছে, মামাদের হাড়ি পোড়া সংসারে কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এই আতুর লোকটারই বা কি করার আছে। সেতো তার সাধ্যমত যা করছে, তাই তার হাতে এনে তুলে দিচ্ছে (লোকটা যখন কবছর পরই মারা গেল, সে সময় হীরামতি কিছুটা অবাকই হয়েছিল। লোকটার সাথে কতোটা বছর থাকলো। অথচ লোকটার নামধাম কিছুই সে জানেনি। সবাই আতুর বলে তাকে ডেকেছে। আতুর বললেই সবাই চিনতো, তারও আর নাম জানার প্রয়োজন পড়েনি। এমন কি সে যেখানটায় বসতো, সেই জায়গাটার নামও পড়ে গেছে আতুরের ঘর। এটা এখন বাসের একটি স্টপেজ। বাসের কন্ডাক্টররাও আতুরের ঘর বললেই চিনে ফেলে। তার পরিচিতিটাও ছিল আতুরের বউ বলে)।
সেই লোকটাকে এই কদিন তার খুব মনে পড়ছে। লোকটা মাঝে মাঝে একটু ভালো খাবারের জন্য হা-পিত্যেশ করতো। কোরমা পোলাও এসব নাকি সে শুধু শুনেছেই। বলতো, ‘আমি যে বিয়া বাড়ি বা শিরনিতে যাইমু সেই অবস্থা নাই। নিজেও ঘরে কেমনে বানাই খাই, কও। সে সামর্থ্য কি আছে!’
অথচ এই বাগানবাড়িতে যে পরিমান খাদ্য নষ্ট হয়, তা খেয়েই তার মত তিন পরিবারের মানুষের দিন চলে যেত। এই লোকদের পোষা কুকুরের সামনে যে খাদ্য তুলে দেওয়া হয়, সেটাও তাদের মত পরিবারের লোকজনের কাছে স্বপ্নের বিষয়। এই নষ্ট হওয়া খাদ্যই আতুর লোকটার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই সামান্য উচ্ছিষ্ট পেলেই লোকটার আর কোনো আফসোস থাকতো না। মহালদার বাড়িতেও ভালো খাবার হয় না, এমন নয়। তবে তা হয় মেপেজোকে। লোকজনের হিসেব করে। নষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। বরং শেষে যারা খেত, তাদের পাতে সকল পদের খাদ্য পড়তোই না। তাই আর কারো কথা মনে পড়ার সুযোগ ছিল না হীরামতির।
কেয়ারটেকার নিয়ামত আলি যখন বলে ‘বুঝছস, এই যে খানাপিনার মালমশলা এসব কিন্তু স্যারের কিনা না। একেকদিন একেকজন খরচ দেয়। এটা স্যার জানইন কিনা জানিনা। জানলেও হয়তো বুঝাইতা চাইন তার অজানা।’
হীরামতি যখন বলে, ‘মাইনষে কেনে দিব। মাইনষর লাভ কিতা!’
Ñ‘দূর বোকা। এটাও এতদিনে বুঝলে না। স্যারের লগে একখান ফটো তোলার লাগি মাইনষর কত ট্রাই দেখছস না। আর স্যার একবার নাম ধরি ডাকলেতো আসমান পায়।’
Ñ‘তো, এর লগে মাছ-মাংশ কিনি দিবার সম্পর্ক কোনখানো।’
Ñ‘শোন, আমরা অইলাম মুর্খসুর্খ মানুষ। একপেট ভাত খাইলেই আর কুনতা লাগে না। মাইনষর আরো অনেক কিছু লাগে বুঝছো। বাড়ি লাগে গাড়ি লাগে কুত্তা লাগে ময়ুর লাগে হরিণ লাগে মাইয়া মানুষ লাগে…কতোতা লাগে…। আর এসব লাগলে টাকা পয়সাও লাগে। স্যার যদি খুশি থাকইনতো অনেককিছু করা যায়। কেউতো আমরার মতন রাস্তাত আছলা। স্যাররে বেচিয়া অখন দেখবায় বিশ তিরিশ লাখ টাকার গাড়ি দৌড়াইরা…।’
Ñ‘তো স্যারের অভাব কিতা, তাইন বিকি না বইলেইতো অয়। এই সামান্য মাছ-মাংশও মাইনষর খাওয়া লাগেনি।’
হীরামতি নিয়ামত আলির কথাবার্তা শুনে ঠিকই। কিন্তু কিছুই তার মাথায় ঢুকে না। সে চারদিকে চোখ ধাঁধানো রঙের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। তার চোখ থেকে ঘুম উড়ে যায়।

তবে ঘুম না আসার ফলেই কিনা, একটু একটু করে তার চোখ খুলতে থাকে। আর তার চোখ যত খুলে, ততই তার চমক বাড়ে। দেখে প্রায় রাতেই নতুন নতুন গাড়ি আসে। এদের কাউকে কাউকে সে দিনেও দেখেছে। তখন অন্য গাড়িতে তারা বাগানবাড়িতে আসে। এরা সবাই কমবেশি সাইদ আলির ঘনিষ্ট লোক।…রাত যত বাড়ে, বাংলোর একেকটি কামরায় জ্বলে ওঠে রঙিন আলো। লাল, নীলÑ বাহারি রোশনাই। রাতের নীরবতা বাজিয়ে ভেসে আসে নারীকন্ঠ।… নিয়ামত আলি বলেছে, ‘তুমি এসব সম্পর্কে কিছু জানতে চাইওনা, বুঝছো। এরা তোমার আমার মত ভাসাইল মানুষ না।… তারার কথায় দেখছো গাছ কাইত অয়, গাছ ওঠে।’
হীরামতিও নীরব থেকেছে, কি দরকার অতো বিষয় জানার। তার কাজ হচ্ছে পাকসাক করা। সে সাইদ আলির মন মত রান্নাটা করতে পারলেই বর্তে যায়। তবে তার খটকা লাগে, এই যে রাতের বেলা যারা আসে, তাদের সম্পর্কে কি সাইদ আলি কিছু জানেন! তিনিতো বাগানবাড়িতে কোনো রাতই কাটান না। এই রাত না কাটানোরও একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে নিয়ামত, ‘স্যার যে এখানে থাকবো। সিকিউরিটি কে দিবো! এর লাগি স্যার সার্কিট হাউসে থাকইন।’
হীরামতির মাথায় সিকিউরিটি, সার্কিট হাউসÑ এসব বিজলি পাঙখার মত ঘুরঘুর করে। তবে সে এইসব শব্দের মানেটা জানার চেষ্টা করে না। … হীরামতির মনে পড়ে (আসলে এতদিন বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিল। তা মনে পড়বার কোনো কারণও ছিল না। সেই কবে ছোটবেলা দাদির কাছে শোনা কথা। যাদের নিয়ে কথা, সেই তারাও আর বেঁচে নেই। তাদের বংশধরদের দুএকজন থাকলেও দেশ ছেড়েছে সেই কবে!), তার দাদি তাদের পাশের গ্রামে উঁচু ঢিবির মত একটা জায়গা দেখিয়ে বলতো।Ñ‘হীরামতি, এই উচা জায়গায় না জমিদার অদিত নারায়ন চৌধুরীর বাড়ি ছিল। তর দাদারা তখন কত ছোট। সেই সময়ের বাড়ি। এখনও বাড়িটা পুরা নিশ্চিহ্ন অইয়া যায় নাই। এই বাড়িতে শত শত লোক কাজ করতো। কে কোন দিকে আসছে। কোনদিকে যাইতো কেউ খোঁজই জানতো না। কত ধরণের খানাপিনা। একেক লোকের জন্য একেক পদের তরকারি। … অওযে লাল রঙের টিনের ঘর দেখছস। রাইত অইলে এই ঘরে বাইজি নাচ হত (বাইজি কি সেটা তখন বুঝেনি হীরামিত। এটুকু বুঝতো যে মহিলারা এখানে নাচতো। আরো পরে বাইজি কথাটা বুঝেছে। যদিও আলাদাভাবে বোঝার তেমন কোনো প্রয়োজন ছিল না)। কত দূর-দূরান্ত থেকে বাইজি আসতো। তখন নাকি রাইতের বেলা সারা এলাকায় ঘুঙুরের আওয়াজ ভাইসা বেড়াইতো।’
দাদি বলতো, …‘আমি শুনি নাই। তো শুনছি, অখনও নাকি কেউ কেউ রাইত অইলে ঘুঙুরের আওয়াজ পায় (এরকম কথা শোনার পর হীরামতি অনেক রাতে ঘুম না আসলে কান খাড়া করে রাখতো। এই বুঝি কোথাও ঘুঙুর বেজে ওঠবে! পাতা ঝরার শব্দও তখন মনে হত ঘুঙুরের ধ্বনি)। অখন যে ছাতির আলী চেয়ারম্যান বাড়ি বানিয়েছে (কারো কারো মতে দখল করেছে), তার লোকও বুঝছস এই লালঘরে থাকতে পারে না। দুএকবার নাকি ঘুমাইতে চাইছিল। সারা রাইত তারা মাইনষের কথা শুনছে, ঘুঙুরের আওয়াজ শুনছে, মাইয়া মাইনষের কান্না শুনছে। কঅ, এরকম শুনলে কেউ থাকতে পারে (এ কথাটা হীরামতির কিছুটা বিশ্বাসও হয়েছে। কেননা, সেতো নিজের চোখেই দেখেছে এ বাড়িতে কেউ থাকে না। দিনেদিনে দরজা জানালা ভেঙে পড়েছে)।’ … এ মুহূর্তে দাদির মুখটা খুব মনে পড়ে। সারা মুখ জুড়ে কতটা ভাঁজ। প্রতিটি ভাঁজেই যেন জড়িয়ে আছে নানা রককম কিসসা কাহিনী। তার চোখের সামনে ঝোঁপটা ভেসে ওঠে। নানা লতাপাতায় ঢাকা ইটের কিছু ধংসাবশেষ এখনও সেই ঝোঁপের ভেতর থেকে উঁকি দেয়। তার খুব ইচ্ছা করে অদিত নারায়ন চৌধুরীকে দেখতে। লোকটা কেমন ছিল। তার চালচলন, কিম্বা মানুষের সাথে তার কি রকম আচরণ ছিল!
তখনতো আজকালকার মত গাড়ি ছিলনা। সেই বাড়ির ঘাটে কি নৌকা বাঁধা থাকতো, সেই নৌকায় চড়ে অদিত নারায়ন চৌধুরী কোথায় যেতেন। আর কার কার নৌকা সেখানে ভিড়তো, নাকি এই ঘাটে আর কারো নৌকা ভিড়তো না। হীরামতি নিজেই অবাক হয়, এত বিষয় তার মাথায় কি করে আসে। যে চেনা জগতের বাইরে কিছু এতদিন ভাববার সাহসই পায়নি। কিন্তু এখন কিনা সাইদ আলির চেহারার পাশে একজন অদিত নারায়ন চৌধুরীকে বসিয়ে, কিম্বা মিলিয়ে দেখতে তার কোনো অসুবিধা হয়না! কেন যে তুলনা করে, তাও সে বলতে পারে না। তুলনা করার এই বুদ্ধিটা তার কি করে যে মাথায় এলো, সে নিজেও তা বুঝতে পারে না।
সে শুনেছে, তাদের আশপাশের সকল গ্রামই ছিল অদিত নারায়ন চৌধুরীর। লোকটার খুব প্রতাপ ছিল। তার দাদি বলতো, ‘তার কথায় বাঘে মইষে একঘাটে পানি খাইছে। কিন্ত মানুষটা হায়মান ছিল না। মাইনষের দুখ দরদ বুঝতো। সুবিধাঅসুবিধায় সাইহ্য করতো। নিজেরে জাহির করার কিছু আছিল না। অখন যে নয়া পয়সা অওয়ায় পোলা পাংরায় ফালাফালি করে। এতা দেখলে ঘিন্নাই লাগে।’
প্রত্যেক শীতের সময় একবার তার বাড়ির সামনে যাত্রাপালা হত। সে কি ধুমধাম, কত এলাকা থেকে যাত্রার দল আসতো। তার নিজেরও একটা দল ছিল। সেসময় নাকি পুরুষ মানুষ মেয়ে মানুষ সেজে অভিনয় করতো! কি অবাক করা কথা। হীরামতি একাই খিলখিল করে হেসে ওঠে, ‘অখনতো মাইয়া মাইনষের লাজশরম দূরের কথা। কাপড় খুইলাই নাচে!’ সপ্তাহদিন এলাকায় মানুষের আর কোনো কামকাজ ছিল না। কেউতো বাড়ি ঘরেই যেত না। এখানেই থাকা খাওয়া। এখানেই রাত কাটানো। এখানে আসা সবাই যেন এক ঘরের ছাওয়াল। হাসি ঠাট্টায় সময় কেটে গেছে। কতকিছুর মেলা বসে যেত। হাড়িপাতিল, বেতের জিনিসপত্র, কাঠের লাঙল, বাঁশের জোয়াল, মাছ ধরার পলো, খেলনা…। হীরামতি বানু এসব চোখে দেখেনি। সবই দাদি বা বুড়োদের কাছে শোনা। তবু সবই যেন তার চোখের সামনে ঝলমল করছে। তার বুকের ভেতর থেকে আফসোসের একটা লম্বা শ্বাস বের হয়।

যত দিন যাচ্ছে, তার মনটাও এই বাগানবাড়ির বাঁধন ছিন্ন করে বেরিয়ে যেতে ছটফট করে। সে প্রায়ই কেয়ারটেকারকে বলে, ‘আমি অইলাম গিয়া গাঁইট ছাড়া মানুষ, আমারে অমন সাজাইল বাড়িতে মানায়নি কঅ। অত পালিশ থাকা আমার ভালা লাগে না।’
সে সুযোগ পেলেই হরিণের খাঁচার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেন জানি এসময়টিতে খাঁচার ভেতর ছুটোছুটি করা হরিণের মতই মনে হয় তাকে। যার খোলা বনে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সে কিনা এখন শিকলে আটকা। হরিণের কাতর ভরাট চোখের দিকে তাকালে তার মনটা কেমন ভার, অস্থির হয়ে ওঠে। সে মহালদার বাড়িতে গিয়ে রোশনার স্বামীকে বলেছে, তাকে সেই বাড়ি থেকে মুক্তি দিতে। কিন্তু রোশনার স্বামী তার চোখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, যেন তার কিছুই বলার নেই। এতদিনে সে কিছুটা হলেও মানুষের হাবভাবের ভেতরকথাটা বুঝতে পারে। সাইদ আলির ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করা যে অসম্ভব, রোশনার স্বামী তার নীরবতা দিয়ে তাই বুঝিয়ে দিয়েছে।
হীরামতির আর কি করার থাকে। সে নিজের মত করে বাগানবাড়িতে পড়ে থাকে। প্রথমে সে শুনেছিল, সপ্তাহে এক দুইদিন সাইদ আলি শহরে এলে বাগানবাড়িতে আসবেনÑ তখন তাকে রান্না করে খাওয়াতে হবে। আর এখন সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্তই তাকে রাধতে হচ্ছে। কত লোকের আনাগোনা। সাইদ আলির আত্মীয়স্বজনের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। দেশের সব বড় বড় শহর থেকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ বেড়াতে ছুটে আসছে বাগানবাড়ি। এসেই হীরামতির খোঁজ, ‘তোমার কথা এত শুনেছি। জিবের লোভ আর সামলাতে পারলাম না। ছুটেই এসেছি।’ হীরামতি ঠোঁট টিপে হাসে। আবার এদের কেউ কেউ হীরামতির জন্য গিফট্ নিয়ে আসে। কেউ নিয়ে আসে দামি শাড়ি, কেউ তার পছন্দের নানারকম পানের জর্দা। কেয়ারটেকার নিয়ামত আলি লোকজনের কাছ থেকে এসব নিয়ে হীরামতির ঘরে এনে রাখতো। কিন্তু হীরামতি এসবের কিছুই ছুঁয়ে দেখেনি। সে নিয়ামত আলিকে শুনিয়ে দিয়েছে, ‘নিয়ামত ভাই, আমার এসবের কাম নাই। মাইনষেরে কইও এসব না আনতে। মাইনষে আমারে জিনিস দিবো কেন!’
নিয়ামত আলি অভিজ্ঞ মানুষ। সেতো আর হীরামতির মত সরল সোজা হিসাব করতে পারে না। সে জানে, এরা সব ‘পাওয়ারফুল লোক’। তাদের মুখের ওপর কথা বলা বারণ। হীরামতির চাকরি খোয়ানোর ভয় না থাকতে পারে, তারতো কোনো পিছটান নাই। কিন্তু নিয়ামতেরতো বউ-বাচ্চা আছে। বউ-বাচ্চার সাথে ছমাসে, নমাসে দেখা করতে না পারলেও তাদেরতো খাওয়া পড়ার যোগান দিতে পারছে। হীরামতি লোকজনের দেওয়া জিনিসপত্র সব নিয়ামত আলির হাতে তুলে দেয়, ‘নেও, তোমার বউ বাইচ্চারে দিয়া দিও।’
হীরামতি বানু প্রথমে এই গিফ্ট এর বিষয়টি প্রথম বুঝতে পারেনি। কিন্তু, যেদিন বাহার উদ্দিন নামে এক লোক তার হাতে নগদ এক হাজার টাকা তুলে দিয়ে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘স্যাররে তুমি খাওয়ানোর সময় এই কাগজটার মধ্যে একটা সাইন নিবে। স্যার ভোজনরসিক মানুষ। তুমি বললে স্যার না করবে না। তোমারে পরে আরো টাকা দিব।’
হীরামতি সেদিন থেকে সাবধান হয়ে যায়। সে বাহার উদ্দিনের মুখের ওপরই বলে দেয়, ‘ভাই, আমারে দিয়া এ কাম অইবো না। আমি পারবো না।’ বাহার উদ্দিন তার চোখের সামনে ফুটো বেলুনের মত চুপসে যায়। বাহার উদ্দিনকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথাটি বাগানবাড়িতে আসা যাওয়া করেন এমন লোকজনের মধ্যে প্রচার হয়ে যায়। যাদের মাথায় হীরামতিকে ব্যবহার করে সাইদ আলির কাছ থেকে সুবিধে নেওয়ার ধান্ধা ছিল, তারা এ পথটি বাতিল করে দেয়। তবে হীরামতি মাঝে মাঝে যেটা করতো, ভাত বাড়িয়ে দিতে দিতে কোন মাছটা কে এনে দিয়েছে, মাংশটা কে এনেছেÑ তার একটা বিবরণ দিত। সেটা কেউ তাকে বলে দেয়নি, স্রেফ নিজ থেকেই এ বলা। যদিও কে কি এনেছে, সেই নামটা তাকে বলতো কেয়ারটেকার (অনেক পরে সে বুঝেছে। মাছ-মাংশ এনে দেওয়া লোকজনের নাম যাতে সাইদ আলির কান পর্যন্ত পৌছায়, সেই ব্যবস্থা করেছিল নিয়ামত আলি। তার কাছে এদের নাম এমনভাবে তুলে ধরতো, মনে হত স্যারকে এরা এতো ভালোবাসে তাদের নিজের পুকুরের বড় মাছটা, ঘরের ছাগলটা, মোরগটা, সবজি-আনাজ সাইদ আলিকে না খাওয়ালে তাদের পেটের ভাত হজম হবে না। রাতের ঘুম হবে না। মানুষের এই ভালোবাসার টানটা সাইদ আলিকে জানানোর মাঝে তখন সে কোনো উদ্দেশ্য খোঁজে পায়নি। … যদিও এ প্রশ্নটিও তার মনে উঁকিঝুঁকি দিত, এরা এত বড়লোক! তাদের সবাইর বড় বড় পুকুর আছে, দিঘি আছে। হাঁস-মোরগ-ছাগলের খামার আছে। প্রতি সপ্তাহেই তারা গরু জবাই করে খায়!… নিয়ামত আলি তার এই প্রশ্নটিকে খানখান করে দিত, বড়লোক না অইলে পাইবো কই! দেখস না একেকদিন একেকটা গাড়ি নিয়া আয়!… সে সরলভাবেই তা আস্থায় নিয়েছে।
আর এই সুস্বাদু খাবার পরিবেশনের সময় সে দেখেছে, সাইদ আলি কেমন ঢোল কলমরি মত কাত হয়ে খেতেন। দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকেছে হীরামতি, কখন কিসের জন্য ডাক পড়ে। মাঝেমাঝে হীরামতিও আর হীরামতি থাকেনি, সে নিজেও বুঝতে পারতো না তার মধ্যে কি ধরণের পরিবর্তন এসে যেত। সাইদ আলি যখন জিব বের করে ভাত মুখে তুলতেন, তখন সেই জিব হীরামতির চোখের সামনে বিশাল হতে থাকতো। ক্রমশ লম্বা হতে হতে সেই জিবের ভেতর যেন আস্ত গোয়ালপাড়া, আস্ত হরিণ, গরু-ছাগল, মাছ, পুকুর, দিঘি, ফলপাকড়, গাছপালা সাঁ সাঁ করে এসে ঢুকতে থাকে। আর সাইদ আলি গপগপ করে তা গিলতে থাকেন। … হীরামতি এই গিলে খাওয়ার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে কতদিন মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। এই মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটিও গোপন থাকেনি। সাইদ আলির কান পর্যন্ত গেছে। তখন তাকে ডাক্তার দেখানোর কথা ওঠে। নিয়ামত আলি বলেছে, ‘বুঝছস, তরে দেখতে বাগানবাড়িতে এখন ডাক্তার আইব।’
হীরামতি বানু না করে দিয়েছে, তার ডাক্তারের প্রয়োজন নেই। সে হাসতে হাসতে বলে, ‘আমার অসুখ সারানোর ডাক্তার অখনও পয়দা নেয়নি। যেদিন নিব, কইমুনে।’

তবে সে সময় হীরামতির জন্য মানুষের ডাক্তার না আসুক। বাগানাবাড়ির একটি কুকুর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। লালচে রঙের হ্যাংলামত কুকুরটি সাইদ আলির খুব শখের। নিয়ামত আলি যখন তাকে এরকম তথ্য দেয়, তখন তার মনে হয়েছিলÑ বাড়ির কোন জিনিসটা স্যারের শখের নয়! বাঁদর বলো, হরিণ বলো, মেকুড় বলেÑ সবই তার শখের।
সাইদ আলি বাড়িতে না থাকলেও সেদিন একটার পর একটা গাড়ি আসে। গাড়ি থেকে নামতে থাকেন নানারকম পোষাক পড়া লোকজন। তারা নেমেইে ছুটে যান কুকুরটির কাছে। কেউ কুকুরের গলার কাছে হাত রাখেন, কেউ পেট টিপে দেখেন, কেউ পা তুলে কিছু একটা পরখ করেন, কেউ কুকুরের চোখের পাতা তুলে নেড়ে চেড়ে চোখের ভেতরটা দেখেন। আবার কেউ কুকুরটিকে আলতো নাড়া দিয়ে আদুরে গলায় ডাকেন ‘টম’ ‘টম’…। তাদের চেহারা বিষন্ন, যেন মেঘ থমথম করছে আকাশে। অথবা তাদের নিকটজন কারোর বড় অসুখ হয়েছে, এমনই কাতর, উদ্বিগ্ন অবস্থা।
কুকুরটি কারো প্রতি আলাদা কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না, সে মঝেমাঝে মুখ হা করে আইম ছাড়ে। তবে কুকুরটিকে ঘিরে লোকজনের এই কান্ডকারখানা দেখে হীরামতির পেটের ভেতর কুরুলা দিয়ে ওঠে হাসি। সে কোনোভাবেই পেটের ভেতর হাসিকে আটকে রাখতে পারে না।
হীরামতি ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানবাড়ির সবচেয়ে নিরিবিলি উত্তরপাশের সেগুন বাগানের কাছে ছুটে যায়। সেখানে গিয়ে গলগল করে বমি করেÑ শুধু বমিই না, সেই সাথে খিলখিল করা হাসি বমির মত গলা থেকে উগড়ে দিলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। নিয়ামত আলি লোকজনের পাশে থাকলেও হীরামতির সেগুন বাগানের দিকে দৌড়ে যাওয়া সে ঠিকই দেখেছে। সে এক ফাঁক করে হীরামতির কাছে চলে আসে। হীরামতি একাই তখনও হাসছে। তার এই একলা হাসি নিয়ামতকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করে।Ñ‘হীরামতির আবার অইলোটা কি। নয়া যৌবনে দেখা দিলনি।… সে জানতে চায়, ‘তর কি অইছে। অতো হাসছিস কেন।’
-‘না, এমনিই হাসছি।’
-‘মিছা কইছ না। কিছু একটা অইছে।’…তখনই সে কুকুরকে ঘিরে লোকজনের এই টিপাটিপির বিষয়টা জানায়। নিয়ামত আলি এবার নিজেও হাসে, তবে সেটা তাচ্ছিল্যের হাসি।-‘এটা তুই নয়া দেখছসতো, তাই তর হাসি পার। তুইও অমন বিছনায় পড়ি দেখ। দেখবেনে কত সাহেব তরেও আইয়া টিপাটিপি করের।’
টিপাটিপ হোক, আর ওষুুধের গুনেই হোকÑ দুতিনদিনের মধ্যেই টম সুস্থ হয়ে ওঠে। আবার গা ঝাড়া দিয়ে বাগানবাড়ির সীমানার মধ্যে মাথা উচিয়ে ঘোরাঘুরি করে। হঠাৎ ডেকে ওঠেলে মধ্যদুপুর বা রাত কেঁপে ওঠে। হীরামতির কাছে অবাক লাগে, বাগানবাড়ির মালিকের মতও কুকুরটার মেজাজ দেখে। সে মাঝেমধ্যে পরীক্ষার জন্য খাবার নোংরা করে দিয়ে দেখেছে, কুকুরটা মুখেও তুলেনি (হীরামতি শুধু বিয়ে বাড়িতেই নয়, এমনিতেও দেখেছে। যে ধরণের খাদ্য কুকুর মুখে তুলেনি, সেরকম খাদ্য নিয়ে মানুষের ছেলেপুলে কিরকম কাড়াকাড়ি করে। মারামারি করে। বিয়ে বাড়ির লোকজনের লাথিগুথা খায়)। বাগানবাড়ির বাইরে নিয়ে ছেড়ে দেখা হয়েছে, সে গোয়ালপাড়ার অন্য কুকুরদের সাথে মিশেনি। চুপচাপ বাগানবাড়ির ভেতরে চলে এসেছে। আর তখনই সে খেয়াল করেছে কুকুরের জন্য আলাদা সাবান, শ্যাম্পু, ক্রিম (এগুলোর আলাদা নাম সে নিয়ামতের কাছ থেকে শুনেছে)… সে তার অনেককিছুই চিনে না। আর কুকুরের এইসব জিনিসপত্র নিয়ে আসে কত চেনা-অচেনা মানুষ (নিয়ামত আলি তাকে বলেছিল, এই কুকুরটিও একজন স্যারকে দান করেছিল। তখন কুকুরটি এত বড় ছিল না। বাচ্চামত ছিল। স্যার সোফায় বসলে স্যারের পায়ের কাছে আসন নিয়ে ঘাড় তুলে বসে থাকত। তখন স্যার কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে কুকুরটির ঘাড়ের চুলে আলতো বিলি কাটতেন। এখন বড় হয়েছে, বাইরে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় বলে ড্রয়িং রুমে আর ঢুকে না)। কুকুরের এই জিনিসপত্র নিয়ে হীরামতি বানুর অনেক কৌতুহল। যেখানে বাগানবাড়িতে খাটা অনেক মানুষের পরিবারের লোকজন সব সময় দুইবেলা ভাত খেতে পারে না। সেই বাড়ির একটি ককুরের পিছনে যে খরচ হচ্ছে। তাতে তিন/চার জনের একটা পরিবারের চলে যেতে পারে। কত দামী দামী দেশী-বিদেশী তেলই না এনে দিচ্ছে লোকজন। হীরামতি বানুর এই কৌতুহল হয়তো আর বাড়তে দিতে চায় না বলে নিয়ামত আলি বরং তাকে মুখ ভ্যাংচি দিয়েছে, ‘তর দেখি নয়া নয়া খাউজানি। কে কার কুত্তারে তেল দিল না পাছাত লাথ দিল, এটা আমরার জানার দরকার কি। আমরা যার যেটা কাম সেটাই করি। এরবেশি জানার দরকার নাই।’

মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা ঘটে, যা তাকে হতবিহ্বল করে। সে এসব ঘটনা দেখে অভ্যস্ত নয় বলে অসুস্থ বোধ করে। সে বুঝতে পারে না, এরকম পরিস্থিতিতে তার কি করার আছে। সে ঘুম থেকে ওঠেই টের পেয়েছিল, বাগানবাড়িতে কিছু একটা হয়েছে। বাগানবাড়িতে সাধারণত রাতে বাইরের লোক খুব একটা থাকে না। এমন কি সাইদ আলির আত্মীয়স্বজন যারাই আসেন, তারা যত রাতই হোক খাওয়া দাওয়া শেষ করে হয় যার যার গন্তব্যে, না হয় সাইদ আলির গ্রামের বাড়িতে, অথবা সার্কিট হাউসে চলে যান। কাল রাত কিছু লোক থেকে গিয়েছিল, সেটা সে জানে। এ নিয়ে তার বাড়তি কোনো মাথা ব্যথা নেই। তার কাজ রান্না করা, সে সটাই করে (তবে কাল রাতে যে বাইরের লোক ছিল, সেটা নিয়ামতের দেরীতে ফেরা থেকেই বুঝতে পেরেছে। নিয়ামত এসে তার কক্ষে ঢুকে, তার শরীর ধরে নাড়া দিয়ে দেখেছে, জেগে আছে কিনা। হীরামতি জেগে থাকলেও নিয়ামতের ডাকে এখন সাড়া দিতে চায়নি বলে চুপ মেরে পড়ে থাকে। নিয়ামত কিছু সময় শরীরের এখানে সেখানে হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে চলে যায়)। সকালবেলা লোকজনের ফিসফাস শুনে তার ঘুম ভাঙে। তাতেও সে খুব একটা কান দেয় না। সে তার রান্নাবান্না নিয়ে পড়ে থাকে। যদিও প্রতিদিনের এই রান্নাবান্না নিয়েও বেশ ঝামেলা হয়েছে। সাইদ আলি কি করে যেন জেনে গিয়েছিলেন, হীরামতি এখন সবার জন্যই রান্না করছে। এটা তার আত্মসম্মানে লাগে। হীরামতিতো সবার রান্না করার জন্য না। সে বা তার বিশেষ কোনো মেহমান এলে সে রান্না করবে। সে যদি চাকরনকরের জন্যও রান্না করে, তাহলে অন্যের সাথে তার জিবের কোনো পার্থক্য থাকে নাকি! সেবার বেশ কায়দা টায়দা করে তাকে শান্ত করেছে সবাই (সেইসময় হীরামতির সাথে একটা গোপন চুক্তি হয়েছে বাগানবাড়ির লোকজনের, সে রান্না করবে ঠিকইÑ তবে কখনও সেটা যেন সাইদ আলির কানে না যায়। গেলেও যেন সে বলে, সে আর কারো জন্য রাঁধে না। সে নির্ভেজাল মানুষ। বাগানবাড়ির লোকজনের কথায় সায় দিয়েছে। তার ঝামেলায় জড়ানোর ইচ্ছা নাই। কাজ করার ক্ষমতা আছে, করে দিবে। এই কথা দশকানে বলবারই বা দরকার কি!)।… সেদিন বেশি সময় সে কান না পেতে থাকতে পারেনি, থাকার উপায়ইবা কি। বাড়ির মধ্যে ফিসফাস, লোকজনের ছোটাছুটি, সকলের মধ্যে একটা লুকালুকি ভাব।… হীরামতি কান খাড়া করতেই যেন বাতাস তার কানের কাছে নানা কথা জড়ো করে লাফ দিয়ে পড়ে। নিয়ামতকে সে জিজ্ঞেস করে, ‘এই বাটপার, কি অইছেরে। অত লুকালুকি কিয়ের।’…নিয়ামত অন্য সময় হলে নানারকম কথাবার্তা বলতো, রঙ-তামশা করত। কিন্তু এখন তার একটুও সময় নেই।Ñ‘পরে কইমু নে। এখন না হুনাই ভালা।’ বলে সে হীরামতির কাছ থেকে দ্রুত সরে যায়।
হীরামতি দেখে কিছু লোক একটা মানুষকে ধরাধরি করে কাঁধে নিয়ে আগে থেকে দাঁড় করানো একটা গাড়িতে তুলে। সে খেয়াল করে এই লোকগুলোকে চিনে কিনা, কিন্তু সে কারো চেহারাই আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। গাড়িটা চলে যাবার পর বাগানবাড়িতে যেন একটা স্বস্তির ভাব ফিরে আসে। যে নিয়ামত খানিক আগেও ছিল হন্তদন্ত, যার দম ফেলবার উপায় ছিল না। চেহারা ছিল মেঘছোপানো। হঠাৎ করেই যেন তার হাতে অফুরন্ত সময় চলে এসেছে। মেঘে কেটে গেছে। বাড়িটা সুনসান নীরবতায় ছমছম করে। নিয়ামত হীরামতিকে পেছন থেকে ঝাপটে ধরে বলে, ‘মুতি বিবি, এবার একমগ চা দেওতো, খাই।’
Ñ‘বাব্বা, এ যে জমিদারর নাতিপুতির আবদারগো। আগেতো ঘা-কুত্তার মেজাজ আছিল। অখন দেখি উল্টা। অইছে টা কি!’
Ñ‘অইবো আবার কি! আমরা অইলাম কুত্তাবিলাইর জাত। বুঝছস, মনিবর খাই। তার গান গাই। এরবেশি আমরার জানারও দরকার নাই, বোঝারও দরকার নাই।’
হীরামতি কিছুটা ক্ষেপে ওঠে।Ñ‘যাও, যাও। কওয়ার দরকার নাই। খাউজানি ওঠলে তখন নাকেমুখে তেল বাইয়া পড়ে। আর কিচ্ছু জিগাইলায়তো বেটাগিরি কথা।’
Ñ‘ধুর, রাগ করিস না। ঘটনাটা না হুনাই ভালা। খাইল যে বাড়ি গরম আছিল, তাতো জানসই। স্যারের কথা হুনে নাই বইলা এক ক্যাডাররে ধরে আনা অইছিল। সে লোকটা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ছে, বুঝছস। এখন স্যার শুনলেতো যারা এ কান্ড করছে, তাদের অবস্থা কেরাসিন অই যাইবো। স্যার আর যাই হোক খুনটুন পছন্দ করেন না।’
Ñ‘ওমা, কও কি। জানে মইরা যাইবোনি!’
Ñ‘চুপ, বেশি কথা কইছ না। কে থাকি কে হুনবো। পরে আমরারও সমস্যা অইবো।’
Ñ‘তা, মানুষটারে কি করছেগো।’
Ñ‘কি করবো আর, এখন শহরে নিছে, কোনো ক্লিনিক টিনিকে ভর্তি করবো।’
Ñ‘কেনে তার বাড়িঘর নাই। বউ বাইচ্চা নাই।’
Ñ‘বাদ দে এসব, এটা অইলো বড়লোকি কাজকারবার, আমরার এ নিয়া নাক লম্বা না করাই ভালা।’
ভালো, না মন্দ তা হীরামতির কাছে বিবেচনার চেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে, একটা লোক এরকম অসুস্থ হয়ে গেল, তার বাড়ির লোকজন জানতেই পারলো না। এটা কিরকম ঘটনা। তার চোখের সামনে সাদা রঙের গাড়িটি বারবার ভেসে ওঠে। সে রাঁধতে গিয়ে সহজভাবে আর রাঁধতে পারে না। কড়াইয়ে তেল ঢাললেই মনে হয়, বুঁদবুঁদ দিয়ে ভেসে ওঠছে একটা অচেনা মানুষের মুখ। আনাজ মাছ মাংশÑ সবকিছুকেই তার মনে হতে থাকে মানুষের শরীরের টুকরো টুকরো অংশ।…
তখন তার সেই রাতের কিছু ঘটনা মনে হতে থাকে। সে ঘুমুবার পর বাড়ির বাংলোর ঘরের দিক থেকে মানুষের ঘোঙানির শব্দ শুনেছে। কিন্তু তখন তার চোখে তন্দ্রার ঘোর, সে মনে করেছে হয়তো কোথাও শেয়াল-কুকুর ডাকছে। খেয়াল করলে বাগানবাড়ির আশপাশে প্রায় রাতেই এমন কান্নার মত, ঘোঙানির মত আওয়াজ শোনা যায়। তাই এই ঘোঙানিকে সেরকম কিছুই মনে করেছে।… হীরামতির কানে এখন সেই শব্দটিই বারবার বেজে চলছে (কিছুদিন পরে অবশ্য নিয়ামতই বিষয়টি তার কাছে খোলাসা করেছে। লোকটার কাছে অনেক টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। সে কথামত দিতে রাজি হয়নি। তাই তাকে ধরে আনা হয়েছিল। এরবেশি নিয়ামতও কিছু জানাতে পারেনি। তাছাড়া লোকটি বেঁচে আছে না, মরে গেছেÑ তাও তার জানা নেই। নিয়ামত অভিজ্ঞ মানুষ, স্পর্শকাতর কোনোকিছু নিয়ে ঘাঁটাঘাটি যে ঠিক না, সেটা সে ভালো বুঝে। সে চাকরিটা খোয়াতে চায় না।)।
এই ঘটনার পর থেকে হীরামতি ভেতরে ভেতরে কুচকে গেছে। সে এই বাগানবাড়িতে আর শ্বাস নিতে আরাম পাচ্ছিল না। কেন জানি, তার মনে হচ্ছিল এ যাবত সে যা রান্নাবান্না করেছেÑ তা তার ভেতর থেকে সহজভাবে হয়নি, জোর করে আনা। এই কথাটা নিয়ামতকে বলায় নিয়ামত সেটা উড়িয়ে দিয়েছে।Ñ‘তর মাথা খারাপ অইছেনি। এটাতো সামান্য একটা ঘটনা বুঝছস। লোকজনতো বরং স্যাররে একটা জিনিস দিতে পারলে, খাওয়াইতে পারলে খুশিই হয়।’ হীরামতি নিয়ামতকে এ মুহূর্তে হা করে গিলে।Ñ‘তর কাম পাক করা। পাক করার জিনিস কেমনে আইলো, কে দিল, এ নিয়া ভাববার দরকার কি!’ নিয়ামত আলীর কথাটাই হয়তো ঠিক আছে, তবু হীরামতির মন থেকে কোনোকিছুই ঝরে পড়ছে না। যেন আরও শেকড় মেলে পোক্ত হচ্ছে বিষয়গুলো।

অনেকদিন পর সালামত মুন্সিকে তার খুব মনে পড়ে, লোকটা সেই গোয়ালপাড়ায় আসার পর প্রথম পুরুষÑ যে কিনা দিনে একবার হলেও তার সাথে কথা বলার জন্য রাস্তার পাশে বসে থাকতো। শুরুতে সে অজানা-অচেনা মানুষ বলে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু দেখাশোনা হতে হতে লোকটার প্রতি তার মায়া পড়ে যায়। সেও একটু আধটু কথা বলে, কথায় কথায় রস লাগায়Ñ এতে তরুণ সালামত তার দিকে হাত বাড়ানো শুরু করে। সে সেই হাত যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে, তাতে এক ধরণের প্রশ্রয়ই ছিল। আর তাতেই লোকটা তার শরীরের দিকে এগিয়ে এসেছে, ঝোপঝাড়ে টেনে নিয়ে আদর করেছে (সে অর্থে নিয়ামত আলি তাকে একটুও টানেনি। এক জায়গায় থাকে বলে, সে নিয়ামতকে চাইলেও ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। আবার এ নিয়ে কথা বলাটাও ঝুঁকিপূর্ণ বলে তার মনে হয়েছে। সে মেয়ে মানুষ বলে লোকজন তার দিকেই আঙুল তুলবে। তাতে তারই দুর্নাম হবে)। সে বাগানবাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য ছটফট করে। অনেকদিন মহালদার বাড়িতেও যাওয়া হয়নি।
শেষমেশ গিয়েছিল, তাও মাস খানেক হয়ে গেছে। রুশনার এক ননদ বেশ খোঁচা মেরেই বললেন, ‘তুইতো অখন ভিআইপি মানুষগো। তর লগে দেখা করতে অইলে অখন আগেভাগে পারমিশন নেওয়া লাগে। আর কদিন বাদে টিকেট কাটা লাগবো।’
হীরামতি এই খোঁচাটোচাকে অতোটা পাত্তা দেয় না। সে চোটপাট বলে দেয়Ñ‘আপনারাইতো আমারে ভিআইপি না টিআইপি বানাইছন। আমি কি অই জেলখানায় যাইতাম চাইছি। একজন চাইলো, আপনারাও বাজারর জিনিসর মত দিয়া দিলা। আমার কি করার আছিল কওকা! আমার শিকড়বাকড় থাকলে এমন টানা হেচড়া চলতো। লাভতো আপনাররই। বড়লোকের লগে এক অছিলায় খাতির অইলো।’
এবার রুশনার ননদের গলা নরম হয়।Ñ‘কি করমু কঅ। এরকম একজন বড় মাইনষর লগে আমরা ঠেক্কর দিয়া পারমুনি। তার খাইশ অইছে। তখনতো বাধা দিলে শেষে ছাগল চুরি গরু চুরি কোন মামলা দিয়া যে জেলে পাঠাইতো, তার ঠিক আছেনি।’
সেদিন সারাবেলা সে মহালদারবাড়িতে কাটিয়ে এসেছে। সেখানে যতক্ষণ ছিল। তার মনে হয়েছে, সে বুক ভরে খোলা বাতাস নিতে পেরেছে। বাগানবাড়ি ও মহালদারবাড়ির মধ্যে সামান্য দূরত্ব মাত্র। একই বাতাস এলাকার উপর দিয়ে বয়ে বেড়ায়। কিন্তু এই দুই বাড়ির মধ্যে কত তফাত। বাগানবাড়ির বাইরের জগত আর ভেতরের জগতের মধ্যে কত পার্থক্য। বাগানবাড়ি চেনা মানুষকেও অচেনা করে দিয়েছে। যারা আগে তাকে দেখলে আগ বাড়িয়ে ঢঙ-তামশা করতো, সেই লোকগুলো এখন তাকে দেখলে কেমন দূরত্ব রেখে চলে। এমন কি সালামত মুন্সির সাথেও সেদিন তার দেখা হয়নি (এই দূরত্ব রাখার কারণটি সে আরো পড়ে জেনেছে। তার সাথে বাগানবাড়ির বাইরের লোকজনের মেলামেশা করার ক্ষেত্রে একটা গোপন নিষেধাজ্ঞা ছিল। এটা কেউ প্রকাশ্যে বলেনি, কিন্তু এমন দ্এুকজনের কানে কথাটা পৌছে দেওয়া হয়েছে। যাদের মাধ্যমে এলাকার সবাই জেনে যেতে পারে। সবাই জেনেও গেছে)। তবে সালামত মুন্সির সাথে দেখা না হওয়ায় তার খুব খারাপ লেগেছে। সে বুঝতে পারে না, লোকটার সাথে দেখা হলে, কথা হলে কেন তার ভালো লাগে। এই ভালো লাগার শিহরণটা সে কাউকেই বোঝাতে পারবে না, বলে বোঝানোর মত কেউ নেইইও তার। এমন কি সে সালামতকেও বলেনি। বরং তার সাথে শরীরের বোঝাপড়া থাকলেও সে এমনভাবে আচরণ করে, যেন সালামত বুঝে সে যে তার শরীরে হাতটাত দেয়, এটা সে পছন্দ করে না।
… হীরামতি হরিণ, ময়ূর, বাঁদরদের খাঁচার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। খাঁচাবন্দি এই বনের প্রাণীগুলোর ছটফটানি এখন যেন তার সমস্ত অস্তিত্বে তুমুল ঝড়ের মত। হীরামতি বানুর মনে হয় এই বন্যপ্রাণীগুলো খাঁচার মধ্যে আছে। আর সে আছে বাগানাবাড়ির বেড়ার মধ্যে। তার বেড়াটা বাঁদরদের খাঁচা থেকে একটু বড়, এই যা ব্যবধান। সওতো তাদের মতোই বন্দী একজন। তার খুব ইচ্ছা করে খাঁচার মুখ খুলে প্রাণীগুলোকে ছেড়ে দিতে।…সেসময় তার মাথার ওপর কোথাও কোনো একটা গাছের ডালে বসে একটা কোকিল অবিরাম ডাকছে। সেই ডাক আচড়ে পড়ছে গোয়ালপাড়ার বনে বনে। হীরামতির মনটা সেই বাঁধনহারা ডাকের মত বাইরে ছড়িয়ে পড়তে আকুল হয়ে ওঠে।
সে একদিন দুপুর বেলা বাগানবাড়ির ভেতর ডেকে নেয় সালামত মুন্সিকে। এটা পছন্দ হয়নি নিয়ামতের। দু কারণে নিয়ামত এরজন্য ভেতরে ভেতরে ফুঁসে ওঠেÑ এর একটা হচ্ছে, নির্দিষ্ট লোকজনের বাইরের কোনো লোক বাগানবাড়িতে ঢোকার ফলে বাগানবাড়ির নিজস্ব গোপনীয়তা ভেঙে পড়বে। দুই. হীরামতির পাশাপাশি এক সাথে থাকতে থাকতে হীরামতির শরীরের ঘ্রাণটাও এখন সে না দেখে বলে দিতে পারে। এতে হীরামতির জন্য তার রক্তে একধরণের চঞ্চলতা তৈরি হয়েছে। সে হীরামতিকে একবেলা না দেখলে মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে (হীরামতি যদিও এরকম কোনো তথ্য জানেনা, কিন্তু বাগানবাড়ির অন্যান্য কর্মচারিদের মাঝে এ নিয়ে বেশ রসালু ফিসফাস আছে)। নানা ছুঁতোয় শত ব্যস্ততার মধ্যেও একবার হীরামতির গা ঘেঁষে দাঁড়ায় সে। এই দেখার জন্য মনের ভেতর স্বতস্ফূর্ত একটা টান হয়ে গেছে। সেই হীরামতি কারো সাথে ঘনিষ্ট হয়ে কথা বলুক, সেটা মেনে নিতে পারে না নিয়ামত। হীরামতির সাথে তার বয়সের তেমন একটা পার্থক্য নেই। হয়তো দু এক বছরের ছোটও হতে পারে সে। এই বয়সের একজন মহিলার অনেকটাই বুড়িয়ে যাওয়ার কথা। এদিক দিয়ে হীরামতি সম্পূর্ণ পৃথক। হীরামতি এখনও ডবকা যুবতীর মতই ঝলমলে। হীরামতির শরীরের ঘ্রাণ নাকে আসা মাত্র চনমন করে ওঠে তামাম দুনিয়া, চারদিকের সমস্ত কিছু তার ভালো লাগতে থাকে (যদিও হীরামতি কখনই নিয়ামত আলিকে নিজ থেকে ডাক দেয়নি। সে যতটুকু ধরা দিয়েছে, সেটা তার অসহায়ত্বের কারণে। সে না পারছে নিয়ামতকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিতে, না পারছে চিৎকার করে কাউকে কিছু বলতে। তবু দু একবার বড়সাবের গোচরে আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। কারণ, নিয়ামত তাকে এতোটাই ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছে যে, যদি বিষয়টি বড়স্যারের কানে যায়, তাহলে তার চাকরিটা চলে যাবে। আর চাকরি গেলে বউ বাচ্চার মুখে কোনো খাবার সে তোলে দিতে পারবে না। হীরামতির মনটা নরম হয়ে গেছে, সেওতো তার মতই মজুর খাটা মুনিষ। তাছাড়া নিয়ামত তার ওপর এক ধরণের জোর খাটায় বটে, কিন্তু সেটা এমন না যে, নিয়ামত পুরোটাই গায়ের জোর খাটিয়ে তাকে দখল করে। এক্ষেত্রে হীরামতির প্রতিরোধটাও থাকে দুর্বল)। নিয়ামত তার বউকে হীরামতির পাশে দাঁড় করিয়ে তুলনা করে। বউয়ের বয়স হীরামতির চেয়ে অনেক কম হলেও, এখনই তাকে বুড়ি বুড়ি লাগে। বউ বলেই হয়তো তার কাছে ছুটে যায়, না হলে তাকে টানতো বলে তার মনে হয়না।
সালামত মুন্সি তার বয়সে অনেক বড়। তারপরও সে এখন এক ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে। তার মনে হয় লোকটা তার স্থির পুকুরে এখন ঢিল ছুঁড়ছে, তাতে যে ঢেউ ওঠছে তাতে পাড় ভেঙে না পড়লেও একটু একটু করে মাটি ধসে পড়বে। সালামত মুন্সি বাগানবাড়ির উত্তর দিকের দেওয়াল টপকে বেরিয়ে গেলে নিয়ামত ঝটপট হীরামতির কাছে এসে দাঁড়ায়।Ñ‘তুই এটা কি করছস। বাইরের লোকরে যে বাগানবাড়িতে ঢুকতে দিছস। স্যার শুনলে তর চাকরি থাকবো!’
Ñ‘ধূর, তর চাকরিরে ডরাইনি আমি। আমি কি চাকরি করতে আইছিনি অনো। ঠায় ঠিকানা নাই বাজারোর জিনিসর মত একজন আরেকজনের কাছে তুইলা দিছে। নাইলে এমুন খাচায় মানুষ থাকেনি। আমারে চাকরির ডর দেখাইয়া লাভ নাই।’
নিয়ামত আলি চমকে ওঠে, বাগানবাড়ির চাকরি পেলে যেখানে অনেকের হাতে চাঁদ-সূর্য পাওয়া হয়ে যায়, সেই চাকরি নিয়ে অমন তুচ্ছতা, এটা সে ভাবতেও পারেনা। সে সালামত মুন্সিকে নিয়ে হীরামতির ওপর একচোট নেওয়ার কথা ভেবে যতটা ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ ছিল, তার কিছুই সে প্রকাশ করেনি। যদি উল্টো সে বাগানবাড়ি ছেড়ে যায়, তাহলে সবদোষ পড়বে তার ওপর। উপরন্তু যতোটা খাতির টাতির হীরামতির কাছ থেকে পায়, তাও শেষ হয়ে যাবে। ভেতরে ধকধক করা যন্ত্রণা সে নিজের মধ্যেই পুষে রাখে।

…সেদিন চাঁদটা ফুটেছে তীব্র জোছনা ঢেলে। বাগানবাড়ির গাছের ফাঁকফোকর গলে ঝরছে চাঁদের আলো। পাহাড়ের দিক থেকে মৃদু বাতাস এসে গাছে গাছে ঝিরঝির নরম সুর তুলছে। বাগানবাড়ির ভেতরে উৎসবের রঙ, বাজনা…। সাইদ আলি সন্ধ্যার পরে বগানবাড়িতে এসেছেন, সাথে গাড়ির বহর। অনেক অতিথি। হীরামতির শ্বাস ফেলার সময় নেই। সেই দুপুর থেকে রান্নার কাজ শুরু হয়েছে। ২টা খাসি, ৫০টা মোরগ, ৪টা রুই মাছ। এসবই সাইদ আলির ভক্তরা দিয়েছেন। ভক্তদের উপস্থিতিতে বাগানবাড়ি সকাল থেকে গমগম করছে। সাইদ আলির কারণে আজ সবার মন ভালো। তারা হাত খুলে খরচ করছেন (হীরামতি রান্না করতে করতে নিয়ামতকে বলে যে, তার দাদি বলতো, অদিত নারায়ন চৌধুরীর বাড়িতে যেদিন মচ্ছব হত, তার সবটাই হতো জমিদারের নিজের পুকুরের মাছ, খামারের গরু-ছাগল-মোরগ, ক্ষেতের ধান, আনাজ-তরকারি দিয়ে। তার প্রশ্ন ছিল, স্যারের কিছুইতো নিজের কেনা বা নিজের জমিনের দেখলাম না)। লোকজনের এই খরচ করা দেখে সে যখন নিয়ামতকে বলতো, Ñ‘এরাতো স্যারের আত্মীয় কুটুম না। তারা এত খরচ করে কি জইন্যে!’
নিয়ামত একটু সাবধানি গলায় বলে।Ñ‘তরে কইছি না। তর কাম রান্না করা। এইসব জানার দরকার নাই। আমরা কামলা মানুষ, কাম করার লাগিই আমরার জন্ম। বেশি খোঁজাখুুজির দরকার নাই। এরমইধ্যে বাবা কত পলিটিকস আছে, এটা বুঝলেতো আমরাও পলিটিকস করতাম।’
হীরামতি বড় বড় চোখ মেলে নিয়ামতের দিকে তাকিয়ে তার ছুুঁড়ে দেওয়া কথাগুলো গিলে। তার অবাক লাগে, নিয়ামত এতকিছু বুঝে কি করে। এত জ্ঞান তার। নিয়ামতের কাছ থেকেই সে জেনেছে, উৎসবের কারণটা হচ্ছে স্যারের জন্মদিন। এটা নাকি স্যারও জানতেন না, তার ভক্তরা তার জীবন বৃত্তান্ত ঘাঁটাঘাঁটি করে জন্ম তারিখটা বের করেছেন। উৎসবের আয়োজনও তারা করেছে। নিয়ামত আলী বলে,Ñ‘স্যার খালি আওয়ার কথা দিছইন, এরবেশি কিচ্ছু জানইন কিনা কওয়া মুশকিল।’
সন্ধ্যার পরপরই বাগানবাড়ির তাঁবুঘরের নিচে উৎসব শুরু হয়। হীরামতি বানু রান্নাটা সন্ধ্যার দিকেই শেষ করে রেখেছে। যাতে চাইলেই খাবার পরিবেশন করা যায়। সেও এখন তাঁবুঘরের কাছে ঝাউগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে (হীরামতির কাছে অবাক লাগে, একটা লোক হাতে কালোমত একটা জিনিস মুখে লাগিয়ে কথা বলছে। তার নাই, কিচ্ছু নাই সেই কথা বেশ দূরে দূরে রাখা বাক্সে গিয়ে বড় হয়ে বাজছে)। সে উপস্থিত কিছু কিছু লোককে নিয়ামত আলির মাধ্যমে চিনেছে। এরা সাইদ আলি এলেই বাগানবাড়িতে এসে ভিড় করে (নিয়ামত আলি দূর থেকে আঙুল তোলে তোলে এভাবে তাকে চিনিয়েছেÑ এই লোক অইলা স্যারর দলের, এইন ইঞ্জিনিয়ার, এইন কন্টাক্টর, এইন ঢাকার বড় স্যার…)। এরা একেকজন সাইদ আলির হাতে বিরাট বিরাট ফুলের তোড়া তুলে দিচ্ছেন। সাইদ আলির সামনে রাখা টেবিল ফুলপাতায় ভরে ওঠছে (চকচকে কাঁচা পাতা দেখে হীরামতির মনটা খচখচ করে। ইস, যদি পাতাগুলো ছাগলগুলোকে দেওয়া যেত!…পরে সে নিয়ামতকে তার এই ইচ্ছার কথা বললে, সে মুখে হাত ঠেসে ধরেছে।…সাবধান, এই কথা কোনোদিন মুখে তুৃলিস না। জান কবজ করি ফেলবো মাইনষে…। হীরামতি সেদিন আচমকা বলে ওঠেছিল,Ñ‘তুই আরবার মানুষ দেখলি কই। এরাতো স্যারর ভক্ত। স্যার যদি কয় কাইত, তো কাইত। যদি কয় সোজা, তো সোজা। মানুষ অইলেতো ডাইনে বায়ে নড়িচড়ি বইতো)। একসময় ফুলপাতার আড়ালে ঢাকা পড়ে যান সাইদ আলি। তাকে দূর থেকে আর দেখা যায় না। তখন কেউ একজনকে ডেকে সাইদ আলি কি যেন বলেন, পর মুহূর্তেই দুই/তিন জন এসে ফুলের তোড়া টেবিল থেকে নামিয়ে নেয়।
…রাতের বাতাসে তখন কথা উড়ছে, অনেক লোকের কথা।…কেউ একজন বলছে, রবীন্দ্রনাথের কবিতার মত বলি এমন সন্তান তুমি জন্ম দিয়েছো মা, তুমি মহিয়সী, তুমি রতœগর্ভা… তোমার সন্তানের আলোয় আজ জগত ধন্য…। মুহূর্মুহু করতালিতে বাগানবাড়ি যেন হাওরের বিল, ঝাঁকঝাঁক শীতের পাখি একসাথে ডানা ঝাপটে উড়ছে (হাওর কথাটা কেন যে হীরামতির মনে এসেছিল। বলা যাবে না। সেটা দিঘিও হতে পারতো। সে দেখেছে অদিত নারায়ন চৌধুরীদের বাড়ির পুরনো দিঘিতে শীতকালে ঝাঁক ঝাঁক পাখি এসে বসতো। সেই পাখি যখন দল বেঁধে উড়ে যেত। তখন এরকমই করতালির মত শব্দ হত)।
একসময় কথাও বোধহয় ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে, অথবা ফুরিয়ে যায়, অথবা বাতাসে ভেসে বেড়ানো মাংশ-পোলাওয়ের ঘ্রাণ ক্ষুধার জন্তুটাকে উসকে দিয়েছে। হুড়মুড় করে কে কার আগে যাবে এমন লাফঝাঁপ দিয়ে সবাই গিয়ে খাওয়ার টেবিলে আসন দখল করে। সাইদ আলি এসে বসলে অন্যরাও আসন নেয়। খাওয়া শুরু করলে অন্যরাও খাবার প্লেটে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন কথা তেমন আর শোনা যায় না, খাওয়ার মৃদু সপসপ শব্দ সাপের ফনার মত হিসহিস করে সারা বাগানবাড়িতে।… হঠাৎ সাইদ আলি মাথা তুলে চাবা নাড়াতে নাড়াতে বলেন, ‘বুঝছো, দেশ-বিদেশ ঘুরে এটাসেটা খেয়ে মুখটা পানসে হয়ে গেছে। হীরামতির রান্না খেলে জিবটার মধ্যে স্বাদ ফিরে আসে।’ তিনি উপস্থিত কর্মকর্তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘রান্নার উপর কোনো জাতীয় পুরষ্কার টুরষ্কার কি আছে। থাকলে কও। হীরামতিরে এই পুরষ্কার দিয়ে দেই।’

খাওয়াদাওয়া শেষ হলে আস্তে আস্তে সবাই ওঠে দাঁড়ায়। অতিথিরা সবাই যারযার গাড়িতে করে চলে গেছেন (গাড়ির প্রসঙ্গে নিয়ামত আলি তাকে একবার বলেছে। যাদের নিজের গাড়ি নেই। তারা অন্তত ভাড়া করে গাড়ি নিয়ে আসে)। বাইরের লোকজন চলে গেলে সুনসান নীরবতায় ডুবে আছে বাগানবাড়ি। এখন হীরামতি বাড়ির কামলা-মুনিষদের রান্নাঘরের বারান্দায় সার ধরে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে। সবাই যখন খাওয়াতে মনযোগী, ঠিক এরকম মুহূর্তে সমস্ত এলাকা কাঁপিয়ে বাগানবাড়ির রাতের পাহারাদার জমির চিৎকার দিয়ে ওঠে। তার চিৎকারে রাতের নিথর স্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে ঝরে। যে যেভাবে পারে ভাতের প্লেট ঠেলে দিয়ে যেদিক থেকে শব্দ এসেছে, সেদিকে দৌড় দেয়। তারা দেখে বাগানবাড়ির অর্জুন গাছের নিচে মাটিতে পড়ে আছে জমির। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে ফেনা চুঁয়ে ঝরছে। তাকে ধরাধরি করে ঘরের বারান্দায় নিয়ে মাথায় পানি ঢালতে থাকলে কিছুক্ষণ পর তার হুঁশ হয়। জমির ভয় পেতে পারে, এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। বাগানবাড়ির সবচেয়ে গোঁয়ার বা সাহসী যাই বলা হোক, সেরকম বেপরোয়া ধরণের লোক সে। সেই জমির কিনা ভয় পেয়ে একেবারে দাঁতকবাটি লেগেছে। এটা সহজভাবে কেউ নিতে পারছে না। ঘটনাটির কথা ভাবতেই অনেকের গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। নিশ্চয় এমন কিছু ছিল, যা ভয়ঙ্করÑ না হলে জমির এভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারে না। অনেকক্ষণ মাথায় পানি ঢালা, বাতাস করার পর জমির চোখ মেলে। তার চোখ মেলা দেখে সবাই একসাথে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘কি অইছেরে জমির!’
জমির এমনভাবে চোখ বড় বড় করে তাকায়, যেন সে অদ্ভুত সব জন্তু দেখছে। এদেরকে যেন সে এর আগে আর কোথাও দেখেনি। অনেকক্ষণ ফেলফেল করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। একসময় ওঠে বসে, ‘আমি কই আছিরে!’
Ñ‘কেন, বাগানবাড়ি!’ সকলে সমস্বরে কথা বলে।
কিছু সময় ঝিম মেরে থাকে জমির।Ñ‘ও…।’
আরো কিছু সময় কাটিয়ে যখন তার চারপাশে ভিড় করা মুখগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে থরথর করে কেঁপে ওঠে। তাকে চেপে ধরে সবাই।Ñ‘কি অইছে জমির, বল না। এমন করছিস কেন!’
সে ধীরে ধীরে মুখ খুলে।Ñ‘বুঝছো, আমিতো খাড়াই খাড়াই আসমানের চাঁদ দেখছি। আতকা দেখি একটা মানুষ চাঁদর দিক থাকি নামতে আছে, নামতে আছে। আমার কাছে আওয়ার পর কি ভয়ানক চেহারারে ভাই। বিরাট বিরাট দাঁত, নখ…কয়, তরে খাইমু, তর বাগানবাড়ি খাইমু, সবাইরে খাইমু…কইয়াই আমার দিকে হাত বাড়াইছে… আমি না আর কিচ্ছু কইতাম পারি না।’…
জমিরের এই ঘটনাটি বাগানবাড়িতে নানারকম কথার জন্ম দেয়। কেউ কেউ বলে, এটা আসলে পুঙ্গার কাজ। এই টিলার মাঝেতো আগে বাপের ঠিক নাই, এমনসব জারজ সন্তানদের কবর দেওয়া হয়েছে। এদের প্রেতাত্মা এখন নানা চেহারা নিয়ে বাতাসে ঘুরছে, সুযোগ মত ভয় দেখাচ্ছে। কেউ একজন বলে, কিছুদিন আগেইতো একটা বেওয়ারিশ লোকরে বনের ভেতর কবর দেওয়া হয়েছে। এটা সেই লোকের কান্ডও হতে পারে। আবার কারো কারো কথা হচ্ছে, জমিরতো কাজের চাপে দিনে ঘুমাতে পারেনি। দুদিনের উজাগর থাকায় সে খামোকাই চোখে ভূত দেখেছে।
বিষয়টির যে যেভাবেই ব্যাখ্যা দিক, হীরামতির কাছে এটা মোটেই কোনো ভালো আলামত মনে হয়নি। সে নিয়ামত আলিকে বলেছে, ‘এটা ভালা লক্ষণ না। বাগানবাড়ির ওপর খারাপ কিছু আছে কইলাম।’
Ñ‘দূর, এটা কি তর আমার বাড়ি। স্যারেরা দেশ চালায়, তারার কথায় মইষে-বাঘে এক ঘাটে পানি খার। আর তুই কইরে তারার বাড়িত খারাপ কিছু অইবো। তর আর বুদ্ধিসুদ্ধি অইতো নায়।’
হীরামতি বুঝে তার আর বুদ্ধিসুদ্ধির অতো দরকার নেই। জীবনটাতো ঘাটে আঘাটে কাটিয়েই দিয়েছে। সে এদিন দুপুরে মহালদার বাড়িতে এসে বলে যে, Ñ‘আমারে আপনেরা ফিরাইয়া আনেন। আমার একটুও ভালা লাগছে না এইবাড়ি।’
রুশনা বেগমের স্বামী-ননদ-শশুড় কোনো কিছু হয়েছে কিনা, তা জানার জন্য জোরাজুরি করেন। এতদিন সে বাগানবাড়ির বিষয়ে মুখ খুলেনি। বিশ্বস্ততা তার অটুট ছিল। সে মহালদার বাড়ি সম্পর্কেও যেমন কোথাও কোনো খারাপ কিছু প্রচার করেনি (বলার মততো কত কিছুই থাকে। রুশনার ভাসুরের বদ খাসলতের কথাটাওতো সে দুই এক জায়গায় বলতে পারতোÑ মেয়ে মানুষ দেখলেই যার জিব লকলক করে। কিন্তু কোনো কিছুই সে কোথাও বলেনি)। তেমনি বাগানবাড়ি সম্পর্কে বলার কথার অভাব নেই। শুরুতে সে টুকটাক তার চমক লাগার বিষয় বললেও, পরে যখন তার নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাগানবাড়ির নি®প্রাণ নিয়ম কানুন, ভয়ানক হাবভাব সে দেখেছে। সে চুপসে গেছে।… সে তাদের চাপাচাপির এক পর্যায়ে বাগানবাড়িতে তার চোখে দেখা নানা ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে।Ñ ‘এরা মানুষ না, বুঝছইন। এরা খালি নিজরটা বুঝে। পশুর থাকিও বাদ। গা-র মাঝে খালি টাকাপয়সার গন্ধ।’

হীরামতি বানুর এই বিরক্তি মূলত গোয়ালপাড়ার মানুষের জন্য বাগানবাড়ির সম্পর্কে নানা তথ্য জানার নতুন একটি জানালা হয়ে ওঠে। এতদিন হীরামতি চুপ করে ছিল, কারো কিছু জানার সুযোগ ছিল না। মানুষ মুখিয়ে থাকতো, কখন হীরামতি নতুন কিছু এসে জানিয়ে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে হীরামিত ছিল গ্রামবাসীর কাছে বিস্ময়করভাবে নীরব। হঠাৎ করেই সেই হীরামতির মধ্যে বদল এসেছে। এখন সুযোগ পেলেই হীরামতি বাগানবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে এসেই শেষ না, সে সরবও হচ্ছে। যখন যা তার কাছে মন্দ মনে হচ্ছে, ঘনিষ্টজনদের কাছে তাই বলছে। তবে যাই বলে, তা সালামতই আগে জানে।
এর একটা কারণও হয়তো এই, সালামতও একলা মানুষ, হীরামতিও তাই। যে জোয়ান সালামতকে সে দেখেছে, সালামতের জ্বালা সহ্য করেছে। সেই সালামত তার সামনেই বিয়ে করেছে, সন্তানের জনক হয়েছে (সালামতের এই জ্বালাতনটা তার পছন্দ ছিল না, কিন্তু এক পর্যায়ে তাকে নিয়ে সালামতের কাঙালিপনা সালামতের প্রতি তাকে দুর্বল করে তুলে। সালামত যখন বিয়ে করে, তার বুকে কিরকম চনচন করা কষ্ট হয়েছেÑ সেটা সে সালামত বা কাউকেই বলেনি। নীরবে সে সময়টা পার করেছে। আর এওতো ঠিক, কে আর তাকে নিয়ে এত উচাটন হয়েছে। যেই হাত বাড়িয়েছে, গতরটা চেটেছে। সালামত খালি গতরটাই দেখেনি, মনটারও খোঁজ নিত মাঝেমধ্যে)। দেখতে দেখতে সেই সালামত মুন্সির বউ একদিন ঝট করে মরে যায়। মৃত্যুটা হঠাৎ করেই হয়েছিল। বুকে ব্যথা করেছে, তাকে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মারা যায়। হীরামতি তার গোপন কষ্টটা ভুলে গিয়ে সালামত মুন্সিকে তার কাছে ভিড়তে প্রশ্রয় দিয়েছে। এক সময় সালামত তাকে বিয়েরও প্রস্তাব দিয়েছে।Ñ‘দ্জুনইতো একলা মানুষ। রাজি হই যা।’
হীরামতি রাজি হয়নি।Ñ‘না, সালামত ভাই। একলা আছি, ভালা আছি। শেষকালো আর সংসার টংসার করি ঝামেলা বাড়াইতামনি! এমনিইতো দেখাশোনা ওর, মন্দ কিওর।’
হীরামতি অনেকদিন থেকেই লক্ষ্য করেছে, যখন সে সালামত মুন্সিকে নিয়ে ভাবে, তখনই তার মনটা হালকা হালকা লাগে। কথা বললে ফুরফুরে চড়–ই পাখির মত হয়ে যায় মন। এটা অবশ্য সালামতকে কখনই বলেনি। দরকার কি, এমনিতেই দুজনের দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছেÑ এটাইতো ভালো।
তবে সালামত ইদানিং হীরামতিকে কেমন মন মরা, বা বিষন্ন দেখছে। হঠাৎ হঠাৎই সে আনমনা হয়ে যায়। সালামত মুিন্স এই নিয়ে বেশ চাপাচাপি করে,Ñ‘হইছেটা কি তর। তর চেহারা খালি মরা মরা লাগে।’… হীরামতি এড়িয়ে যায়। এটাসেটা, অনেক কথাই বলে (সে কি করে বলবে, একটি অচেনা মানুষকে তার চোখের সামনে দিয়ে কয়েকজন লোক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। সেই মানুষটা বেঁচে আছে না মরে গেছে, সে জানে না।… তারপর দারোয়ানের মুর্ছা যাওয়া, দারোয়ানের চোখে দেখা বিবরণÑ এসবই তাকে ভেতরে ভেতরে অস্থির করে রাখে)। সালামত মুন্সি বুঝতে পারে, হীরামতি তাকে কিছু একটা লুকাচ্ছে। সে এই নিয়ে আর বেশি জোর খাটায় নাÑ বলতে যখন চাইছে না, তখন নাইবা বললো।
তবে হীরামতি সালামত মুন্সিকে বলেছে,‘আমি আর বেশিদিন বাগানবাড়িতে থাকবো না।’
Ñ‘কেন রে।’
Ñ‘না, মনে অয় আমার আর দরকারও পড়বো না।’
Ñ‘কেন, কেউ কিছু কইছে তরে।’
Ñ‘না, কেউ কিছু কয়নি ঠিকই। তবে মনে অয় বাগানবাড়ির মালিকের পরিবারে কোনো গন্ডগোল অইছে। সবাইরে খুব পেরেশান লাগে। এখন বাগানবাড়িতে আগে যারা আসতো তাদের আনাগোনাও কমে গেছে। লম্বা গাড়ির লাইন দেখিনা।’

এটা কোনো এক শীতকালের কথা। বাগানবাড়ির এখানে সেখানে শালপাতা ঝরছে, ঝরছে সেগুন পাতা। খয়েরি রঙের পাতাগুলো মাড়িয়ে হীরামতিদের চলতে হয়। তাদের পায়ের নিচে মচমচ করে পাতা গুঁড়িয়ে যায়। শীতের বাতাস পাতাঝরা গাছে গাছে শিস তুলে। শীত বলেই কিনা বাগানবাড়ির বৃক্ষলতাও কেমন মরামরা।… নিয়ামতকে খুব বিষাদে ডুবে আছে বলে মনে হয় হীরামতির। যে লোকটা এই বাগানবাড়ি দাপিয়ে বেড়ায়, যার কথা বাগানবাড়ির কামলা-মুনিষ একেবারে দাগ খতিয়ানের মত মানে (এক্ষেত্রে একমাত্র হীরামতিই ব্যতিক্রম। যে সরাসরি সাইদ আলির নিয়োগ করা লোক হওয়ায় নিয়ামত তার উপর তেমন চোটপাট দেখাতে পারেনা। তবে এই হীরামতিওতো তার কবজায় ছিল বা আছেÑ এটাওতো সত্য কথা), সেই লোকটাও কেমন ঝিমমারা। হীরামতি তার এই মনমরা ভাবটার কারণ জানতে চাইলে নিয়ামত হয় চুপ থাকছে, নইলে এড়িয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে যেকোনো বিষয় নিয়ে সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতো, ঠাট্টা-মশকরা করতো, সে কিনা এখন চুপচাপ। হীরামতি দুএকবার জানার চেষ্টা করেছে, এটুকুই। সে আর এ বিষয়ে কথা বাড়ায়নি। সে নিয়ামতের সাথে বেশি ঘনিষ্ট হয়ে কথা বলতেও চায়না।
তবে কিছু একটা যে হয়েছে, হীরামতি সেইরকম একটা ভাংচুরের আভাস পেয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে সাইদ আলি আর বাগানবাড়িতে আসছেন না। তিনি না আসলে যা হয়, বাগানবাড়ি মরা বাড়ির মত হয়ে থাকে। যে লোকগুলো সাইদ আলি আসলে কে কার আগে তার সামনে পড়বে, কেউ যদি স্যার ডাকে, কেউ ডাকে আব্বাÑ কেউ তার পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সালাম করে, কেউ জুতা খুলে দেয়, জুতা বাড়িয়ে দেয় (হীরামতি দূরে দাঁড়িয়ে এই পরিস্থিতি দেখে মুখে আঁচল চেপে মিটিমিটি হাসে। তার এই হাসি একবার নিয়ামতের চোখেও পড়ে যায়। সেদিন নিয়ামত আলি তাকে বেশ সবক দিয়েছে।Ñ‘সাবধান, কারো সামনে এরকম হাসলে তর বারোটা কিন্তু বাজবো কইলাম! বড়লোকদের বাইরের দুনিয়া আর ভেতরের দুনিয়ায় অনেক ফারাক আছে বুঝছস! এরা সাপ অইয়া যেমন ছোবল দেয়, বাঘের মত গর্জন ছাড়ে, তেমনি বিলাইর মত মিউমিউও করতে পারে)। যে মানুষগুলো এই কান্ড করে, হীরামতির কাছে এই মানুষগুলো অনেক বড় মাপের। তার ভাবনার বেড়ে তাদের শরীর, চেহারা কিছুই কুলায় না। আর সাইদ আলির মত মানুষদের নিয়েতো সে কল্পনাও করতে পারে না। সে যখন বাগানবাড়িতে রান্নার জন্য ঢুকে, সেসময় সে সালামত মুন্সিকে বলেছিলÑ‘বুঝছো মুনসি, যে মানুষদের এতদিন আসমানের তারার মত ধরাছোয়ার জিনিস না জাইনা আসছি। সেই মাইনষের জন্য রানমু, ভাবছো বিষয়টা। আমারতো কইলজা শুকাই যাইবার অবস্থা।’
সেই মানুষটা বাড়িতে না আসায়, কেউ এসে এখন আর তার গরু, ছাগল, হাঁস-মোরগ, বাঁদর, হরিণÑ কোনো কিছুরই খোঁজ নিচ্ছে না। সাইদ আলির সামনে এই পশুদের জন্য কত মায়া মমতা ছিল তাদের। এই পশু-পাখির কোনো অসুখবিসুখ হলে কি দুশ্চিন্তা ছিল তাদের। এই লোকগুলো আর এ পথে আসেনা। নিয়ামত আলি কাল রাতে যখন তাকে খবরটা দেয়, কেন জানি তার মনটা বড় খারাপ হয়ে যায়। যে বাগানবাড়িতে সে এতদিন বন্দীর মত আছে বলে মনে করতো, বাগানবাড়ির জন্য কোনো মায়া অনুভব করতো না। সেই বাগানবাড়ির ঘটনাটিই তার বুকের ভিতর একটা মোচড় তোলে। নিয়ামত বলে যে, বাগানবাড়ির কালো গাভিটা কাল দিনেরবেলা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে শহরের পশু ডাক্তারকে ফোন করা হল, তিনি নাকি দেখছি বলে বিষয়টির প্রতি কোনো গুরুত্বই দিলেন না। পরে লোক পাঠিয়ে খবর দেওয়া হল, তারপরও তিনি নানা অজুহাত তুলে আর আসেননি। একটি ওষুধের নাম লিখে বললেন, ‘এইটা নিয়ে খাওয়াও।’…
Ñ‘জানস হীরামতি, এই ডাক্তর এই গাইর গোবর হাতে নিয়া নাকর মইধ্যে লাগাইছে। গন্ধ নিছে। টাইয়ের মাঝে গোবর লাগছে। আমি নিজে গোবর ধুইয়া দিছি।’
হীরামতি বানুর বোকা চোখ দুটো বড় হতে থাকে। সে বুঝতে পারে না। হঠাৎ করে কি এমন ঘটনা ঘটলো, যে মানুষটার চোখের সামনে পড়ার জন্য ছাগলের তিন বাচ্চার মত সবাই লাফ দিছে (ছাগলের তিন বাচ্চা কথাটাও নিয়ামত আলির। আলতু ফালতু লোকের ফাইফরমাশ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে এরকম মন্তব্য সে মাঝেমধ্যে করে), তারে নাকি এখন সবাই এড়িয়ে চলে।
নিয়ামত আলি হীরামতিকে বলে, ‘বুঝছসরে রান্দনি মাইয়া, আত্তি গাড়ায় পড়লে বুলে চামচিকায়ও ডুগডুগি বাজায়।’

এরমধ্যে একটি হরিণ মারা গেছে। নিয়ামত আলি ঘুম থেকে ওঠে হরিণ মারা গেছে শুনে কেঁদে ফেলে। আসলে হরিণের মৃত্যুর জন্য এ কান্না, নাকি বাগানবাড়ির প্রতি চেনাজানা লোকজনের এখন যে অবহেলা, সেইজন্য এ কান্না, হীরামতি তা নিশ্চিত হতে পারে না। তবে এমন মায়াভরা চোখের একটি হরিণের মৃত্যু তাকেও কষ্ট দিয়েছে। যখন মৃত হরিণটির চার পা বেঁধে দুজন মুচি কাঁধে ঝুলিয়ে হরিণটিকে টিলার জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো, সে সময়টিতে কেন জানি তার চোখে পানি জমে ওঠে (অন্য সময় হলে কেউ কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলতো। হরিণটি কার অবহেলা বা অনাদরে মারা গেল, এনিয়ে নানা শলাপরামর্শ হত। কিম্বা সাইদ আলির আত্মীয়স্বজনের কেউ হরিণের ছাল, কেউ শিঙ নিতে হয়তো কাড়াকাড়ি শুরু করতো)।…আর নিয়ামত কাজের লোক হলেও, সেতো অনেকদিন এই প্রাণীগুলোকে দেখাশোনা করেছে। যতœআত্তি করেছে। খাবার যোগার করেছে। খাবার দিয়েছে। তার মায়া লাগারইতো কথা। হয়তো এ কারণে গাছের শুকনো পাতার মতোই নিয়ামতের অবস্থা। একেবারে খরখরে। থমথমে। চেনা নিয়ামতকে অচেনা মানুষের মত দেখে হীরামতির মনটাও খারাপ হয়ে যায়।
Ñ‘নিয়ামত, কস না। কি অইছেরে। কেউর মুখে কোনো হাসি নাই। লোকজনও আসেনা। স্যারেরও খোঁজ নাই।’
নিয়ামত আলি নীরবে চোখ তুলে তার দিকে তাকায়, কোনো কথা বলে না। এতে তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। সে ধরে নেয়, কোথাও কোনো একটা গোলমাল হয়েছে।
…এবং তখনই তার মনে পড়তে থাকে, কিছুদিন ধরে সে খেয়াল করেছে যে লোকগুলো তার নজরে পড়ার জন্য সাতরকম ঢং করতো। পারলে ঘামের মত গলে গলে তার সাথে মিশে যায়। তারজন্য পানের নানারকম জর্দা, খয়ের এনে রান্নাঘরে দিয়ে গেছে। যদি রান্নাঘর পর্যন্ত কোনো কারণে আসতে না পারে, তাহলে সেটা নিয়ামত আলির কাছে দিয়ে বলেছে, বলিস আমি দিছি (শুরুতে দুএকজন শাড়ি এনেছিল, সে ফিরিয়ে দিয়েছে)।… হীরামতি বানু তাদের এই হাতখোলা দানের দিকে ফিরেও তাকায়নি। তার কোনো লোভ নেই। সে বলেও মাঝেমাঝে,Ñ‘কারজন্যি লোভ করবো কও। না আছে পুয়াপুরি, না খেশকুটুম। আর থাকলেই কি। পরের জিনিসের ওপর আমার লোভ থাকবোই কেন!’ তার এই নির্লোভতা দেখে অনেকেই কিন্তু অবাক হয়েছে। ছেলেসন্তান না থাকুক, তারপরও মানুষ মাগনা কিছু পেলে আর হুঁশে থাকে না। কি করে সেটা হাতিয়ে নিজের করে নিবে, সেজন্যে অস্থির হয়ে ওঠে।… যদিও হীরামতি বানুকে যারা আগে থেকে চিনে, তারা জানেÑ সে এরকমই। মহালদার বাড়িতে আসার পর থেকে সে নিজের করে নেওয়ার মত কতকিছুইতো পেয়েছে। জমিজমা, জোতজমিঅলা পুরুষ, ভালো কাপড়চোপর পিন্দনের সুযোগÑ সে এসবের কোনো সুৃযোগই নেয়নি। বরং সেই এক কাপড়ে নিজের মত নিজের একটা জগত বানিয়ে এই এতটুকু পথ পার হয়েছে। একটা সরলসোজা দেওয়াল ঘেরা ছোটখাটো একটা জগত। তবে বাইরের বলতে, সালামত যখন কিছু গোপনে তার হাতে তুলে দিয়েছেÑ কেন যে সে কখনই সেটা ফেরত দিতে পারেনি। সালামত দিতো বলতে এই পানের খয়ের, জর্দাÑ কোনো সময় একগাছা চুড়ি, মাথার কাঁটা… এতেই সে সালামতের প্রতি মুগ্ধ। তবে সে কখনই কিছু চেয়েছে কিনা, এটা সালামত মুন্সিও বলতে পারবে না। হীরামতি বানু সালামত মুন্সি কিছু এনে দিক, সেটা না চাইলেও মনে মনে যেন কারো কাছ থেকে কিছু পাওয়ার একধরণের আকাক্সক্ষা তার ছিলÑ না হলে সে ফিরিয়ে দিত না কেন! তবু মাঝে মাঝে কিছু না আনার জন্য সে বলেছে,Ñ‘এটা ঠিক না বুঝছো। তোমার বউ আছে তারেই দেও। ভাবি শুনলে মনটা খারাপ করবো।’
সালামত তার কথা শুনে হেসে ওঠেছে,Ñ‘ধুর, তরে যে কিছু দিছি। এটা জানলেতো। তুই আমারে অত কাঁচা পাইছসনি।’ সালামত মুন্সির প্রতি তার টানটা নিয়ে সে নিজেই অবাক হয়ে যায়। গোয়ালপাড়ায় আসার পর থেকে যে লোকটা তাকে সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছে। জনমানবহীন রাস্তায় বের হলেই লোকটা তাকে নিয়ে টানা হেচড়া করতো, এতে সে মনে মনে ভীষন ক্ষুব্ধ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কেন জানি কোনোদিনই সে সালামতের সাথে আচরণে কঠিন হতে পারেনি। মাঝে মাঝে পথ চলতে তাকে না দেখলে পথটাকেই খালি খালি লেগেছে। যেন পথের দুপাশে এত গাছপালা, ঝোঁপঝাড়Ñ তবু কোনো একটা জিনিস নাই।
বাগানবাড়িতে আসা লোকজন কিছু দিতে গেলে বরং তার মেজাজ খিচড়ে ওঠেছে।Ñ‘বান্দির পুতরার কোনো কাম নাই। খালি ধান্দা। লুটপাট করতো। কারে বেচতো, কারে মারতো।’
হীরামতির এই সরলীকরণে হেসে ওঠেছে নিয়ামত আলী।
Ñ‘কস কি! তারার কাজইতো এর পাও চাটা, ওর লেজ চাটা। এটাইতো তারার পুঞ্জি।’
হীরামতি বানু দেখেছে, সেই লোকগুলোর অনেকেই এখন তাকে দেখলে এমন ভাব করে যেন চিনেই না (যদিও এর আগে থেকেই কেউ কেউ তার হাবভাব বুঝে তাকে এড়িয়ে গেছে। তারপরও যারা তার সাথে নানা ছলছুতোয় ভিড়তে চেয়েছে, তাদের আচরণ এখন তাকে বিস্মিত করে)। এমনভাবে তাকায় যেন, এই প্রথম তাকে দেখেছে। হীরামতি বানুর এতে একটুও খারাপ লাগে না, বরং তার পেটের ভেতর থেকে যেন হাসি ওঠতে চায়।Ñ‘মানুষ এমন বিতলা অয় কেমনে। স্বার্থ না থাকলে খারাখারা বদলি যায়।’
নিয়ামত তার কথা শুনে হাসে,Ñ‘বাদ দে এরার কথা। এরা বড়লোক অইতো পারে। কিন্তু ইতর বুঝছস। এরা পয়মালর মত স্বার্থ ছাড়া এক কাইকও দেয় না। … আমরা ছোট মানুষ ঠিকই। যার নুন খাই কুকুরের মত তার লাগি জীবন ধরি দেই।’

হীরামতি বানু নিয়ামত আলির মত বাগানবাড়ির ক্ষেত্রে এতোটা নিবেদিত না, যতটা মহালদার বাড়ির প্রতি তার টান। বরং মনে মনে তার কিছুটা রাগও আছে। সেতো এখানে রাঁধুনির কাজ করতে চায়নি। তার কাজ করার দরকারও ছিল না। সে যেখানে ছিল, খুব খারাপ ছিল না। তার চাওয়া পাওয়ারও তেমন কিছু ছিল না। যে কারণেই হোক সে বাড়ির লোকগুলো তাকে আলাদা মায়া-মহব্বত করে, এটুকুতেই সে তৃপ্ত ছিল। সে মুক্ত পালক মেলে বনে বনে ঘুরতে পেরেছে, ইচ্ছা হলে মাঠের আইলে আইলে ঘুরে বেরিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট দায় তার নেই। তার যতটুকু কাজ করার, পারলে তার চাইতে কিছু বেশি করেছে। আর প্রায় সবদিনই সালামত মুন্সির সাথে তার দেখা হয়েছে, এটাসেটা কথা হয়েছে। বেশ মউজেই তার সময় কেটেছে। সেই খোলামেলা জগত থেকে বাগানবাড়িতে তাকে জোর করেই নিয়ে আসা হয়েছে। সে মনের দিক থেকে এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি।
তাকে বাগানবাড়িতে নিয়ে আসার জন্য সাইদ আলি সরাসরি কিছু বলেননি, এটা হয়তো ঠিক। কিন্তু তার ইচ্ছা হয়েছে, আর কেউ তাতে বাঁধা দিবে সে সাহস গোয়ালপাড়ায় কার ছিল (এখনও আছে কিনা, সেটা বলা মুশকিল)। মহালদারবাড়ির মানুষ নীরবে সেই মুহূর্তটিকে হজম করেছে (আবার এও হতে পারে, হীরামতিতো তাদের নিজের রক্তের কেউ নয়। এর সাথে তাদের মান মর্যাদার তেমন সম্পর্কও নেই। কি দরকার এরকম মানী, ক্ষমতাধর একজন মানুষের সাথে তাকে নিয়ে ঠেক্কর দেওয়ার। তারচেয়ে এরকম মানুষের সাথে যতটা পারা যায় সুসম্পর্ক রেখে চলাই ভালো, তাতে আখেরে লাভ হয়। কখন কোথায় কার সাথে লেগে যায়। তখন এদের সাথে সম্পর্ক আছে, এটাই আল টপাকানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট। তাই করেছে মহালদারবাড়ির লোকেরা। সালামত মুন্সি যখন তাকে এরকম একটা ব্যাখ্যা দেয়, তখন সেও মনে করেছেÑ হলে হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এই ক্ষমতাবান মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কি করার ছিল মহালদার বাড়ির লোকজনের)। লোকজন বুঝে ফেলে সাইদ আলি বা তার মত কারো ইচ্ছা বা প্রয়োজন হলে আর কারো কিছু করার নেই। হীরামতি বানু সেরকম একটা পরিস্থিতিতেই বাগানবাড়িতে ঢুকেছিল।
বাগানবাড়িতে ঢোকার পর সে বহুবার নানির কাছে শোনা অদিত নারায়ন চৌধুরীর বাড়ির সাথে বাগানবাড়ির আদলকে মেলানোর চেষ্টা করেছে (অদিত নারায়ন চৌধুরী সম্পর্কে যা শুনেছে, এর বাইরে কারো সম্পর্কে সেতো আর কিছু শুনেনি। যখনই তুলনা করার কিছু মাথায় এসেছে। এই নামটিই এসেছে প্রথম)। কিন্তু মেলাতে পারেনি। কোথাও যেন অনেক ফারাক। অদিত নারায়ন চৌধুরীরা কি করে সম্পদ বানিয়েছে, এত বড় বাড়ি, এত জমিজমার মালিক হয়েছেÑ এসব হীরামতি বানুর কাছে এক রহস্য। কেউ তাকে এ সম্পর্কে কিছু বলেনি। তার জানারও কোনো কৌতুহল ছিল না। সে চাঁদকে দেখে বড় হয়েছে, চাঁদের গভীর তত্ত্ব জানার তার দরকার পড়েনি। জানার সুযোগ বা তা বোঝার মত অবস্থাও তার নেই। তবে যখনই এই তুলনাটা তার মাথায় এসেছে, সে পার্থক্যটাকে অন্তত বুঝতে পেরেছে। নানি যেভাবে বলতেন, তাতে মনে হতÑ সে বাড়িতে কাজকর্মের, উৎসব-আনন্দের একটা স্বাভাবিকতা ছিল (এখানে যেমন সবকিছু একটা সাজানো সাজানো, মনের টান আছে বলে মনে হয়না। যারা আসে, তাদের লক্ষ্য থাকে সাইদ আলির নজরে পড়া। তাকে যেনতেনভাবে খুশি করা)। সেই বাড়িটাও একদিন শূন্য হয়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে। তবে সে শূন্য হওয়া আর ভেঙে পড়ার মধ্যে অন্যরকম কারণ ছিল। তারা নাকি আর দেশেই থাকেনি। দেশ ছেড়ে চলে গেছে। এই জমিজমা, ভিটেমাটি কোনো কিছুর দিকে তারা ফিরেও দেখেনি। নানি বলতো, দেখবে কি! সেই যে একবার তারা বেড়ানোর কথা বলে গ্রাম ছাড়লো। আর আসলো না! কেন জানি, সেই অদেখা মানুষগুলোর জন্য, অচেনা বাড়িটির জন্য মনটা হু হু করে ওঠে হীরামতি বানুর। যে বাড়িতে দিনরাত শতশত মানুষ মৌমাছির মত গমগম করেছে, কুকুর-বেড়ালও সে বাড়িটা ছেড়ে গেছে (যে বাড়িটা কখনও সে ভেতর থেকে দেখেনি, যে বাড়ির সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে বাড়িটার জন্য তার এই মন হু হু করা কষ্টে সে নিজেও কিছুটা বিহ্বল)।
উল্টো, যে বাড়িতে সে অনেকদিন থেকেছে, যে বাড়ির কর্তার মন ভরাতে (অথবা পেট ভরাতে) কিম্বা জিবের স্বাদ মেটাতে সে দিনরাত থেকে রান্নাবান্না করেছে, সেই বাগানবাড়ি নিয়ে তার মনে কোনো কষ্ট নেই। সে কখনই এই বাড়ির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি, বাড়িটার প্রতি মনের কোনো টান অনুভব করেনি। তার ওপর একটি কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার কিছু করার ছিল না বলে সে তা করে গেছে (তবে এটাও ঠিক, হীরামতি বাগানবাড়ির সাথে নিজের মনকে মেলাতে না পারলেও, সে কখনই তার কাজে ফাঁকি দিয়েছে বা অবহেলা করেছে বলে সে মনে করতে পারেনা। তার যতটকু করার নিজেকে উজাড় করেই করেছে)।
এখন নিয়ামত আলি যখন বাগানবাড়ির নানা দুঃসংবাদ এসে তাকে পৌছে দেয় (যেমনÑ আজ হরিণ মারা গেছে, কাল গাভি অসুস্থ, পরশু ময়ূরের ডানা ভেঙেছে…)। আর সেসব দুঃসংবাদ শুনে এখন কেউ আর ছুটে আসেনা। না সরকারি লোক, না বেসরকারি লোক। তাতে পশুগুলোর জন্য তর মনের ভেতর মেঘ জমে, তার ইচ্ছে করে পশুগুলোর বাঁধন খোলে বনের দিকে ছেড়ে দিতে। তবে বাগানবাড়ি বা তার মালিকের জন্য তার কোনো কষ্ট তৈরি হয়না। যদিও বিষয়টিতে সে অবাকই হচ্ছে। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোকÑ সেতো এ বাড়িতে বেশ কদিন নুন খেয়েছে। সে বুঝতে পারে না, এই কষ্ট না হওয়ার বিষয়টি কি নিমকহারামিতে পড়ে!
তবে একজনের জন্য তার মনটাতে খানিকটা আঁচড় লাগে। সে সাইদ আলির স্ত্রী রওশন আলি। মহিলাটি সাধারণত এ বাগানবাড়িতে আসতেন না। আসলে হীরামতির জন্য এটাসেটা নিয়ে আসতেন। তার নানারকম খবর সবর নিতেন। একবার বলেছিলেন, সে যদি রাজি হয় তাহলে তাকে ঢাকা নিয়ে যাবেন। একথা শুনে তিনদিন ঘুমাতে পারেনি হীরামতি বানু। যদি ঠিকই তাকে ঢাকা নিয়ে যান। সে এই বন জঙ্গল ছেড়ে কোথাও গিয়ে বাঁচবে না। তার এই যন্ত্রণা দেখে নিয়ামত তাকে আশ্বস্ত করেছিল, ‘তুই খামোকা ডরাইরে। ম্যাডাম খুব ভালা মানুষ। দেখবে তর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিচ্ছু করতা নায়।’
ঠিকই। সে এখান ছেড়ে কোথাও যাবেনা শোনার পর বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে। তর মন না চাইলে দরকার নাই।’ তখন রওশন আলিকে তার এত ভালো লেগেছিল, মনে হচ্ছিলো পা ছুঁয়ে একবার সালাম করে। কিন্তু সে আর সালাম করেনি। এখন সেই রওশন আলির মুখটা তার খুব মনে পড়ছে।

নিয়ামত আলিই বাগানবাড়ির সাথে তার যোগসূত্রের মাধ্যম, আর কারো সাথে তার কথাবার্তা বলার তেমন একটা দরকার পড়ে না। বাগানবাড়ির কাজের অন্য লোকগুলো যদিও তার দিকে ভিড়তে চেয়েছে, কিন্তু সে তাদের পাত্তা দেয়নি। এর কারণও আছে। সেতো এতোদিনে মানুষের চোখের ভাষা কিছু হলেও বুঝতে পারে। চোখের দিকে তাকিয়েই সে ধরে নেয়, তার দিকে কেন এত ঝোঁকাঝুকি। সে জানে, এদের লাই দিলে শুধু ঘাড়ে নয়, শরীরের পুরোটাতেই লাফাতে চাইবে (নিয়ামত আলীকে পাত্তা দিয়েইতো সে বুঝেছে, যদিও তাকে পাত্তা দেওয়া না দেওয়ার বিষয় ছিল না। তার সাথে তাকে মিশতেই হত, এখানে ইচ্ছা-অনিচ্ছার সুযোগ ছিল না)। সে এখানে এসে চোখে যা দেখেছে, তার অনেককিছুই সে বুঝতো না, যদি নিয়ামত আলি তাকে প্রতিটি ঘটনা আলাদা আলাদা করে খুলে না বলতো। এই নিয়ামত যখন পশুপাখির খারাপ খবরগুলো দেয়, তখন তার মনে হয় কোথাও বড় রকমের কোনো একটা গোলমাল হয়েছে। না হলে সাইদ আলির বাগানবাড়িকে হেলাফেলা করে, এই সাহস কারো হত না। সে কিছুটা অনুমান করতে পারে, সাইদ আলি হয়তো আর আগের জায়গায় নেই। তার ক্ষমতার যে উৎস, সেটা হয়তো কোনো কারণে হাত থেকে ফসকে গেছে। তার কথায় হয়তো এখন আর গাছের পাতা নড়ে না চড়ে না। গরু-ছাগলে তার কথায় এক জাগায় ঘাস খেলেও, বাঘে মোষে আর এক ঘাটে পানি খায় না (খেলেও একেবারে সেটা পোষা বাঘ আর মোষ। যাদের এক ঘাটে পানি খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই)। সাইদ আলির প্রতি লোকজনের দিনদিন হেলাফেলা তার এই অনুমানকে শক্তপোক্ত করে। হীরামতি নিয়ামতকে বলে, ‘মানুষ বড় আজব চিজরে ভাই। স্বার্থ থাকলে পাওর মাটি চাটিয়া চুটিয়া খায়। নাইলে দেখবায় চিনবারই পারের না।’
যত দিন যায়, বাগানবাড়ির সবকিছুই আছে। সেই দালানকোটা, সেই গাছপালা, সেই পুকুর, সেই শাল-সেগুনের মাঝ দিয়ে পাকা পথ। কিন্তু আগের সেই জৌলুসটা আর মিলেনা। কেমন যেন সবকিছু মলিন, কোনোকিছুতেই প্রাণ নেই। দেখতে দেখতে বাড়িটা সেই অদিত নারায়ন চৌধুরীর ভাঙা বাড়ির মত হতে চলেছে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে ঘরবাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা জমবে। দেওয়ালের চুনকাম খসে পড়বে। বটের চারা গজাবে দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে। তৈরি হবে আগাছার ঝোঁপঝাড়। সাপবিচ্ছু বাসা বানবে। হীরামতি বানুর মাথার ভেতর এখন এরকম একটি বাড়ির চেহারা ঘুরপাক খায়।
তবে তার একরম ভাবনা নিয়ে সে নিজেও মাঝেমাঝে দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। এই বাড়িটি নিয়ে কেন তার এত চিন্তাভাবনা। সেত এই বাড়িতে ছিল, এটা ঠিক। কিন্তু কোনো কিছুর সাথেতো সে মিশে যায়নি। তার এই ভাবনার কথা শুনে নিয়ামত আলি তাকে বলে, ‘এটারেই মায়া কয় বুঝছস। এই যেমন ধর। আমি ভালা করি বুঝি তুই আমারে পছন্দ করস না। আমি মানুষটা হয়তো ভালাও না। অভাবে স্বভাব নষ্ট। বাচার লাগি মাইনষের গোলামি করি। কিন্তু দেখ, এই খারাপ মানুষটারেও কিন্তু তুই একেবারে ধাক্কা দিবার পারিস না। এই যে একলগে থাকতে থাকতে কিছুটা অইলেও মায়া পড়ি গেছে।’ হীরামতি বানু বোকা চোখ মেলে নিয়ামতকে দেখে। তার এই কথাটাতো সে মিছা বলে উড়িয়ে দিতে পারে না। এটাতো ঠিক কথাই বলেছে। কতবার নিয়ামতকে এড়িয়ে চলার কথা চিন্তা করেছে। কিন্তু লোকটা যখন কাছে এসে বসে, নরমসরম কথা বলে। মনের দশ-পাঁচটা দুঃখের কথা বলে। তখন এই মানুষটার কষ্টটা তাকে কিরকম কাতর করে ফেলে।
সাইদ আলিতো কম আসেনই। বাইরের লোকজনের আসা কমে যাওয়ায়, সেও এখন মাঝেমধ্যে মহালদার বাড়িতে তার ঘরটিতে গিয়ে থাকছে। এই ঘরটিতেই সে খোলামেলা শ্বাস ফেলতে পারে। এখানে এলেই তার মনে হয়, তার নিজের একটা জগত আছে। নিজের একটা গন্ধ আছে। যা এই ঘরটিতে সবসময় ভেসে বেড়ায়। মহালদার বাড়িতে গিয়ে থাকার বিষয়টি অবশ্য নিয়ামত আলি ছাড়া কেউ জানেনা। জানাবারও দরকার নাই। কারণ এই নিয়ামত আলিইতো এখন বাড়ির সাথে তার যোগসূত্রের একমাত্র সেতু। হারীমতি বানুই নিয়ামত আলিকে বলেছিল,-‘এখনতো পাকশাকর ঝামেলা নাই। আমি মাঝেমাঝে বাড়িত গিয়া থাকি, কি কও!’
নিয়ামত কিছু সময় ঝিম ধরে বলেছে, -‘যাও, তবে কেউরে কওয়ার দরকার নাই। কেউ যদি জানে, আমি সামলামুনে।’
হীরামতি যেন কত বছর পরে খোলা শ্বাস নিতে পারছে, তার গলার কাছে এখন আর কোনো কফ থুথুর ঝামেলা নেই। ইচ্ছা হলেই বুক থেকে বাতাস বেরিয়ে আসতে পারছে, নির্মল বাতাস টেনে নিতে পারছে। এরপর সে কিছুদিন ধরে বলা যায়, মহালদারির বাড়িতে তার নিজের ঘরটিতে গিয়ে থাকছে। এরমাঝে একদিন সাইদ আলির আসার কথা শুনে নিয়ামত গিয়ে তাকে খবর দিয়েছে। সেও ছুটে এসেছে মুহূর্তের মধ্যে।
তবে শেষমেষ আর সাইদ আলি কি একটা জরুরি কাজে আসতে পারেননি। এরকম আগেও হয়েছে, সাইদ আলি আসবেন বলে খবর পাঠিয়েছেন। সারা বাগান পলকে যেন জেগে ওঠে। শুধু মানুষই নয়, বাড়ির গাছপালা, পশু-পাখিও যেন পালক নিয়ে ছটফট করে। কখন আসেন বাগানবাড়ির প্রাণ ভোমরা। এদিকে হীরামতি বানুর দম ফেলার উপায় নেই। সাইদ আলি বাগানবাড়িতে এলে চাপটা তার ওপরই বেশি পড়ে। রান্নার দখলতো একা থাকেই সামলাতে হয়। সাইদ আলি আবার ফ্রিজে (হীরামতি বানু যাকে কখনও বলে ফিরিজ, কখনও ঠান্ডার মেশিন) রাখা খাদ্য পছন্দ করেন না। তার সাফ কথাÑ‘এত দূর থেকে ছুটে আসি কি এই বাসি পচা খাবার খাওয়ার জন্য।’
যে কারণে যত কম সময়ের নোটিশেই সাইদ আলি বাগানবাড়িতে আসুন না কেন, তার জন্য টাটকা মাছ-মাংস, সবজি আসতে সময় লাগে না। মুহূর্তে মোবাইলে এখানে ওখানে ফোন করে সব জোগাড় হয়ে যায়। এটাও হীরামতির কাছে ভেলকিবাজির মত মনে হয়। সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আলুর বর্তা, শুটকির বর্তা, ছোট মাছের চচ্চড়ি, রুই মাছের মাথা আর মুগ ডাল দিয়ে মুড়িঘন্ট, গরুর মাংশের ভূনা পাক করে। দেখা গেল সাইদ আলি শেষমেশ খবর পাঠালেন তিনি আসতে পারছেন না। তখন এই খাবারদাবার সাইদ আলির চেলা-চামুন্ডারা গপগপ করে গিলেছে। এটা বহুদিনের ঘটনা।

সাইদ আলির না আসায়, হীরামতি প্রায় নিয়মিতই মহালদার বাড়ি বা নিজের ঘরটিতে গিয়ে থাকে। সেখানে গেলে যেন সে মন কেমন করা মুক্ত হওয়া পাখির মত উড়ার একটা স্বাদ পায়। তার দুটো কারণ, সে যদিও মহালদার বাড়ির কেউ নয়। কিন্তু রুশনা বেগমের বিয়ের সুবাদে এখানে আসার পর তার আপন বলতেতো এই মহালদার বাড়ির লোকজনই। তারাও তাকে নিজের ঘরের মানুষের মতই আদর করে (বাগানবাড়িতে দেওয়ার বিষয়টি অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম)। তার কিঞ্চিত চাওয়া-পাওয়ার যে বিষয় আছে, তাও তারা পূরণের চেষ্টা করে (সে অর্থে তারতো তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। এই বছরে এক দুবার আটপরি কাপড়। কিছু তেল-সাবান, পান-সুপারি…)। দ্বিতীয়, সালামত মুিন্সর সাথে মন খুলে কথা বলা যায়। বাগানবাড়িতে যাওয়ার পর যেমন সে বুঝতে পেরেছে, সালামত মুন্সির জন্য তার বুকের নরম জমিনে কোথাও মরমি একটা টান আছে। তার কাছে যাওয়ার, তাকে দেখার, কথা বলার একটা নীরব কষ্ট হীরামতিকে পীড়া দিয়েছে। তেমনি সে তার ঘরে এসে যখন সালামত মুন্সির সাথে মন খুলে কথা বলে, তখন সে টের পেয়েছেÑ এই কথা বলার মধ্যে যা কাউকে বলা যায় না, এরকম একটা সুখ আছে, মজা আছে। যেন এই বয়সেও সরিষা ফুলের চারপাশে মৌমাছির গুনগুন করে উড়ে বেড়ানোর একটা মৌতাত আছে, যা কেবল হীরামতি বানুই বুঝতে পারে, টের পায়। এটা অবশ্য আর কারো টের পাওয়ারও কথা না।
বাগানবাড়ির এই ছন্নছাড়া হাল নিয়ে কোথাও মেঘ ঘনীভূত হয়েছে কিনা, কিম্বা গাছের ডালপালা ভেঙে ফেলার মত কোনো ঝড় ওঠছে কিনাÑ এসব নিয়ে তার ভাববার তেমন কিছু নেই। সে এই বাগানবাড়িকে তার চেনা গ্রামের ভেতর অন্য গ্রাম মনে করেছে। যে গ্রামটিতে অনেকেরই আসা যাওয়ার সুযোগ আছে। তবে সেই গ্রামটির একজন হওয়ার তেমন সুযোগ নেই। তবে বাগানবাড়ির বাইরে অবস্থা যাই হোক। এই পরিবেশ তাকে বেশ ফুরফুরে করে। সদ্য পোষা পাখির খাঁচা ছেড়ে বেরুনোর উদ্দাম স্বাদ তাকে শিহরিত করে। কিন্তু যখন নিয়ামত আলি জানায়, বাগানবাড়ির সাদা ঘোড়াটি চুরি হয়ে গেছে। তাতে তার মনটি কিছু সময়ের জন্য হলেও কেঁপে ওঠে। তার যেন কোথাও খচ করে লাগে। এই বাড়িটি আর দশটা বাড়ি থেকে যতই আলাদা হোক। তবুতো সে এ বাড়িতে কিছুদিন ছিল। বাড়িটির জৌলুস, দাপট সবকিছু সে নিজের চোখে দেখেছে। যেখানে বাড়ির শাল গাছের একটি পাতা সীমানা ছেড়ে বাইরে উড়ে গেলে লোকজন কুড়িয়ে এনে দিয়ে গেছে। সেই বাড়ির সাদা ঘোড়া চুরি হওয়ার অর্থ কি! বাগানবাড়ির ক্ষমতাকে কেউ ভেঙচি দিচ্ছে। হীরামতি তার সরলসোজা মাথায় বুঝতে পারে, এই বাড়ির লোকজনকে কেউ আর এখন পাত্তা দিতে চাইছে না। তার খুব ভয় হয়। মনে হয় বড় একটা ঝড় ওঠবে। তাতে আগবাড়া গাছটাছ ভেঙে পড়বে।
সে আরো কষ্ট পায়, যখন নিয়ামত আলি বলে, ‘থানায় গিয়া যখন কইলাম চুরির কথা। তারা কয়, খুইজা দেখো, আছে হয়তো টিলাটালার খাঁজেটাজে।’
নিয়ামত আলি তখন হীরামতিকে বলে, ‘বুঝছো, আগে অইলে মুরিগ চোর, আন্ডা চোর সবটারে একঘন্টার মইদ্যে বাইন্দা ফালাইতো। ঘোড়াতো ঘোড়া, সুইটাও বাইর কইরা দিত। দিন বদলাইলে এরকমই অয়, বুঝছো হীরামতি বিবি।’
হীরামতি বানুর চোখে নানির সেই জমিদার বাড়িটি (অদিত নারায়ন চৌধুরীর বাড়ি) চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ধসে পড়া দালান, দেওয়ালে দেওয়ালে থকথকে শ্যাওলা, গজানো বটের চারা, সাপ-বিচ্ছুর বাসা, তক্ককের ডাক, স্যাঁতসেতে গন্ধ…। কিন্তু সে নিজের মত করেই একটা ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে যখন সালামত মুন্সিকে বলে, ‘বুঝছো, সেই জমিদার বাড়ির এমন দশা অইতে কতটা বছর লাগছে। দুই তিনটা পুরুষ মরার পর দেশে কি কয়, রায়ট না কি লাগলো আর তারা দেশ ছাড়লো। নাইলেতো তারা ভালাই আছিল। আর বাগানবাড়িটা দেখো, এই চোখের সামনে তৈরি অইছে। তা অইতে না অইতেই কেমন মরা মরা অই গেছে। বিদ্যুতের মত ঝিলিক দিয়াই নাই।’
সালামত মুন্সি হাসে, ‘জোয়ারের পানি বুঝছো, আইবো যাইবো। একটা কথা আছে না, অতি তরঙ্গ নদী বয়না বেশিকাল… এরারও অমন দশা অইছে…।’
হীরামতি বাইরে আসার পর তার কানে তখন অনেক রকমের কথা ভেসে আসতে থাকে। সে তো এতদিন অনেকটা বিচ্ছিন্ন মানুষ ছিল, গোয়ালপাড়ায় থেকেও গোয়ালপাড়ায় ছিলনা। বাগানবাড়ির বাইরে কি হচ্ছে, কি ঘটছে, তার কিছুই সে জানতো না।
বাগানবাড়ির বাইরে আসার পরই সে জানতে পারে, সাইদ আলির দল এখন আর ক্ষমতায় নেই। যেকারণে ক্ষমতার দাপটও নেই। এতদিন যা কামাই করেছেন, এখন সবকিছু গোছগাছ করছেন; তাই আর বাগানবাড়িতেও এসে সময় দিতে পারছেন না। হীরামতির মাথার ভেতর এতকিছু ঢুকে না। তার জানার আগ্রহও নেই সাইদ আলির দল কোনটা, বা তিনি কি করতেন। সে শুধু জানে, সাইদ আলিরা অনেক ধনসম্পদের মালিক। তাদের ঘরের জনে জনে গাড়ি আছে (এটা সে মিথ্যা শুনেনি। তাদের পরিবারের সকলের আলাদা আলাদা গাড়ি আছে। একেকটা গাড়ি একেক রঙের। একেকটা গাড়ি দেখতে একেকরকম)। টাকার বালিশে তারা সিঁথান দেয়, টাকার তোষকে ঘুমায় (সে যদিও বাগানবাড়ির থাকার ঘরে দুএকবার ঢুকেছে। বিছানার চাদর নেড়েচেড়ে দেখেছে। কিন্তু সেই বিছানা বা বালিশের নিচে কোনো টাকা পয়সা দেখেনি। বিষয়টি একবার নিয়ামতকে বললে, নিয়ামত হা-হা করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে।…তুই একটা আস্তা বোকা, কেউ টাকার বালিশ বানাই ঘুমায়। হয়তো টাকা বেশি আছে বইলা লোকজন মশকরা কইরা এরকম কথা উড়াইছে)। এরবেশি তার জানবার কোনো আগ্রহ নেই। সে যা শুনেছে, তা হলেও ভালো, না হলেও তার কিছু করার নেই। হীরামতি বানুর চাওয়াপাওয়ার জগত বলতেতো আর এমন কিছু না, যার জন্য কারো সাথে তার ঠোক্কর লাগতে পারে।…
এরকম সময়েই সে শুনেছে। লোকজন তাকে বলে যে, ‘শুনছি, সাইদ আলি অখন পালাইয়া আছইন। তারে নাকি পুলিশ খোঁজছে। এত ক্ষমতা, কই যে গেল। বুঝছো, মানুষ ক্ষমতা পাইলে অন্ধ অই যায়।’
সালামত মুন্সি বলে, ‘চা থাকি পেলা গরম অয় বুঝছস। হুনছি, সাইদ আলির আত্মীয়স্বজনের দাপটে কেউ এতদিন কথাই কইতে পারেনি।’…হীরামতি বানু এ নিয়ে কোনো কথা বলে না। সে কজনকেই বা চিনে, কে তার আত্মীয়, কে তার বন্ধু-বান্ধব। বাগানবাড়িতে যারা এসেছে, তাদের সকলকেই তার মনে হয়েছে আত্মীয়। আত্মীয় না হলে কেউ একটা মানুষের জন্য এরকম দিনরাত তার কাছেপিঠে পড়ে থাকে। সে সেই মুখগুলোকে কখনও ভালো করে চোখ তুলে দেখেওনি। তার দরকারও ছিল না। তার কাজটা ছিল রান্না করা, সেটা সে যতটুকু পেরেছে মন দিয়ে করেছে।
তার চোখের সামনে খানাপিনার জেল্লা, আবর্জনার স্তুপে ফেলে দেওয়া হাড়-মাংশ, মাছ-কাঁটা ভেসে ওঠে। আতুর লোকটার কথা খুব মনে পড়ে, Ñ‘মানুষটার এমন ভালা খাবারের জন্য বড় লোভ আছিল।’
তবে সে এই আফসোস বেশিক্ষণ ধরে রাখে না। সে যখন সেই আতুর লোকটার কাছে ছিল, অনেকটা বাগানবাড়ির মতই ছিল। লোকটার পাশে আছে, আবার পাশে নাইও বলা যায়। লোকটাকে যা পেয়েছে, তাই দিয়ে রান্নাবান্না করে খাইয়েছে। থাকলে নিজে খেয়েছে। কখনই এরজন্য আলাদা টান বোধ করেনি। তবে লোকটার কাছে ছিল বলেই হয়তো তার কিছু ইচ্ছার কথা সে শুনেছে। তখন লোকটার প্রতি মায়া পড়েছে। তাই মাঝে মাঝে সে এখন মনে করতে পারে লোকটার ইচ্ছার কথা। খুবই সামান্য ইচ্ছা। এই যেমন মাংস পোলাও খাওয়া। একটু ভালো মাছ তরকারি খাওয়া। সে মহালদারবাড়ি আসার পর ভালো খাওয়া দাওয়ার সাথে পরিচিত হয়েছে। কিন্তু সেই বাড়িতে খাদ্যের এতে অপচয় ছিল না। বাগানবাড়িতে আসার পর দেখেছে, কতরকমের অপচয়। এরা যা খায়, কখনও তার চেয়ে বেশি ফেলে দেয়। আর তখনই আতুর লোকটার কথা বেশি করে মনে পড়েছে তার।

…হীরামতি বানুর চোখটা বিস্ময়ে নিথর। কিছুটা ভয়ও পায় সে। সে নিশ্চিত হতে পারে না, কখন সাইদ আলি বাগানবাড়িতে এসেছেন। তিনি না এলে এত পুলিশ এল কোথা থেকে। এই কদিনতো বাগানবাড়ির ধারেকাছে পুলিশের দেখা মিলেনি। নিয়ামত আলির ওপর তার খুব রাগ হয়। সেতো তাকে জানাতে পারতো। তার সাথেইতো কথা হয়েছে। সাইদ আলি বাগানবাড়ি এলে, বা আসার খবর পেলে সে যেন তাকে আগেভাগে জানায়। হীরামতির কাজতো আর বাইরে ঘোরাফেরা নয়। সে রান্নাঘরে কাজ করবে, রান্নাঘরে কিভাবে গিয়ে ঢুকলো, তাতো আর কারো চোখে পড়ার কথা না। সে পড়িমরি করে মহালদার বাড়ি থেকে ছুটে এসেছে।
… কিন্তু সে যখন বাগানবাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে, পুলিশ তাকে ঢুকতে বাঁধা দেয়। এতে সে আরো বেশি বিস্মিত হয়। তার মনের ভেতর খোঁচা লাগে। বুকটা ধড়ফর করে। তাহলে কি সাইদ আলি আসেননি। অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছে। যার জন্য পুলিশ এসেছে বাড়িতে। সে চারদিকে ভীত খরেেগাশের মত চোখ তুলে তাকায়। চেনাজানা তেমন কাউকে সে দেখতেও পায়না। চেনা লোকদের না দেখে সে দিশেহারা বোধ করে। সে কি করবে, বুঝতে পারে না। একবার সে মিনমিন করে পুলিশের কাছে বলে, ‘আমি হীরামতি, বাগানবাড়ির রাঁধুনি।’ পুলিশ তার কথা কোনো আমলে নেয়না। এতেও সে আরো অবাক হয়। আগে সাইদ আলির সাথে যে পুলিশরা আসতো। তারা সুযোগ পেলেই রান্নাঘরের কাছেপিঠে এসে একনজর ‘রাঁধুনি’কে দেখে নিত। এর কারণ হয়তো ছিল যে, এই রাঁধুনির হাতের রান্না তারা খেয়েছে। জিবে লাগা এই রান্নার কারিগরকে দেখার একটা কৌতুহল থাকতেই পারে। অথবা না খেলেও যারা খেয়েছে, তাদের কাছ থেকে রান্নার সুনাম শুনে রাঁধুনিকে দেখার সাধ হতেই পারে। তখনতো যে সকল পুলিশ হীরামতি বানুর সাথে কথা বলেছে, তারা বেশ সমীহ করে কথা বলেছে। কেউ কেউ বেশ হাসিখুশি করে মজা করতো তার সাথে। কখনও সে দুচারজনকে রান্নাঘরের মধ্যেই ছোট টেবিলটিতে বসিয়ে নিজের হাতে ভাত তরকারি বেড়ে খাইয়েছে। সেই পুলিশ কিনা এখন তাকে চিনতেই পারেনা। তার মনটা, না বুকটা ভেঙে চুরমার হতে থাকে। Ñ‘মাইনষে এত ঘনঘন বদলায় কেমনে!’
এসময় কোথা থেকে নিয়ামত আলি তার কাছে ছুটে এসে বলে, ‘হীরামতি তুই এখন মহালদার বাড়ি চইলা যা। তরে বিস্তারিত পরে জানামু নে।’
হীরামতির মাথাটা একটু একটু করে খুলতে থাকে। বাতাসে ঘুরে বেড়ানো নানা কথা এখন তার কানের কাছে মাছির মত ভনভন করে। সে মহালদারবাড়িতে তখনই ফিরে যায় না। বাগানবাড়ির পাশেই ঝাকড়া একটি বটগাছের ছায়ায় নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। আরো অনেকে সেখানে দাঁড়িয়ে। তাদের কাউকে কাউকে সে চিনে। অনেককেই সে চিনে না।

সে দেখে সবার চোখের সামনে পুলিশ বাগানবাড়ি থেকে একটা একটা করে জিনিস বের করে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক কামলা লাগানো হয়েছে। এই কামলাদের সে আগে আর কখনও দেখেনি। তার চোখের সামনে একটার পর একটা নতুন চমক তৈরি হচ্ছে। সে তাতে সন্ত্রস্ত খরগোশের মত পথ হারিয়ে বিভ্রান্তিতে একবার এদিকে একবার ওদিকে ছোটাছুটি করে। লোকজনের মাথায় এখন চকচক করছে রূপালি টিন। খুব বেশিদিন হয়নিতো, নতুন টিন। সে টিন ট্রাকে তোলা হচ্ছে (এসময় তার অজান্তেই চোখ সজল হয়ে ওঠে। এই টিন কি তবে সে যে ঘরে থাকতো, সেই ঘরের!)। বাগানবাড়ির যে দিকটায় তার থাকার ঘর ছিল, দেয়ালের বাইরের দিকে হেঁটে সে সেদিকটায় গিয়ে দাঁড়ালে তার বুকটা খচখচ করে ওঠে। তার থাকার ঘরের দিকটা এখন কি রকম ফাঁকা ফাঁকা লাগে। দিনের আলো সেখানে খোলামেলা গড়াগড়ি খাচ্ছে। দেয়ালের বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, একদিন এখানে একটি ঘরছিল। সেই ঘরে হীরামতি বানু নামে একজন থাকতো। তার বুঝতে আর অসুবিধা হয় না, যে টিন সকলের চোখের সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা এই ঘরেরই টিন।
তখন কে একজন তার কানের কাছে ফিসফিস করে, ‘বুঝছস হীরামতি। এই টিন সরকারি আছিল বুলে। গরীব মাইন্ষরে দিবার লাগি সরকারে দিছিল।’… সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে খোদেজার মা দাঁড়িয়ে, বাগানবাড়ির পাশের বাড়িটি তাদের। পাশের বাড়ির হলে কি হবে! কোনোদিন বাগানাবাড়ির ভেতরে যাওয়ার সুযোগ তাদের ছিল না। সাইদ আলি বা তার পরিবারের লোকজানের আপত্তি ছিল কিনা, কে জানে! তবে নিয়ামত আলি তাদের বরাবরই নিষেধ করেছে। তার নিষেধ করার ধরণটাও ছিল বেশ নরম।Ñ‘শোনো, এটা বড়লোকের কাজকারবার। কখন বাগানবাড়ির কোন জিনিস যাইবো। খামোকা পয়লাই সন্দেহ করবো পাশের লোকজনরে। তার চাইতে বাবা এদিকে উঁকিঝুকি না দেওয়াই ভালা।’ নিয়ামত আলি মনের মধ্যে যাই রেখে একথাগুলো বলুক, তারা সেটাকে সহজভাবেই নিয়েছে।Ñ‘কথাটাতো মিছানা। কি দরকার শখের বাড়ি পিঠিত নিবার!’ আরশি পড়শি লোকজনও নির্লিপ্ত থাকার কৌশলটা আয়ত্ত করে নিয়েছিল। বাগানবাড়িতে কে আসলো, কে গেলÑ এতে তাদের যেন কিছুই আসে যায়না। তারা ডানেবামে না তাকিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেছে। সেই মানুষগুলো এখন অবশ্য কৌতুহল ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা যে যার মত দূরত্বে দাঁড়িয়ে বাগানবাড়ির কীর্তিকলাপ দেখছে।
চোখের সামনে শুধু হীরামতির থাকার ঘরের টিনই খোলা নেওয়া হয়নি, পশু-পাখির ঘর, পাহারাদারের ঘরÑ সবকটি ঘর থেকে টিন খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এখানে নীরব দর্শক হওয়া ছাড়া হীরামতি বানুর কিছু করার নেই। যদিও এই বাড়ির প্রতি তার এখনও তেমন কোনো টান তৈরি হয়নি, তবু সে যেহেতু একটা ঘরে থাকতো। বেশ কিছুদিন থেকেছে। সেই ঘরটা ভেঙে যাওয়ায়। ঘরের টিনের প্রতি এখন কেমন একটা মায়া লাগছে। ঘরের জায়গাটা খালি হয়ে যাওয়ায় কেমন শূন্য শূন্য লাগছে।
… হীরামতির বুঝতে আর বাকি নেই। তার বাগানবাড়ি পর্ব এখানেই শেষ। বাগানবাড়িতে আর যাওয়া হবে না, এটা মনে আসার পর কোথায় মনটা ভেঙে যাবে, নয়তো একটু ভারি হবে। তা না, মেজাজটা কেমন ফুরফুরে লাগে। তার মনে হতে থাকে, সে এখন পুরোপুরি মুক্ত একজন মানুষ। তার হাতে পায়ে কোনো বাঁধন নেই। সে এখন গোয়ালপাড়ার সেই পুরনো হীরামতি, হীরামতি বানু। এখানে কি ঘটছে, সেসবের অতোকিছু জানার আগ্রহও তার নেই।Ñ‘বড়লোকদের কাজ কারবারগো সোনা, এর মাথামুন্ডু আমি বুঝি না।’ তার সরলপাঠের কথা খোদেজার মার কাছে বলে সেখান থেকে সরে মহালদার বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে (এসময় তার নিজেরই অবাক লাগে বাগানবাড়ির মানুষের জন্য বুকের তলায় কোনো মায়া মমতা সে টের পায় না। তবে বাড়িটার জন্য, বাড়ির পশুপাখির জন্য তার বুকে এক ধরণের চিনচিনে কষ্ট বুঝতে পারে)।
সে বড় রাস্তা থেকে মোড় নিয়ে মহালদার বাড়ির দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে, সেখানে বটগাছের নিচে এসে কিছু সময় দাঁড়ায়। দেখে বাগানবাড়ি থেকে কিছু লোক আটকে থাকা হরিণ, বাঁদর, হনুমান, ময়না, টিয়ের খাঁচা এসব টেনে এনে গাড়িতে তুলছে। সে এই লোকগুলোর দুএকজনের চেহারা চিনতে পারে। এরাই একসময় বাগানবাড়িতে নানাজাতের পশু পাখি এনে দিয়েছে (এই তথ্য নিয়ামত আলি তাকে জানিয়েছে। পশুপাখির বেশিরভাগই এসেছে হীরামতির আসার আগে। তবে এরা মাঝেমধ্যে এসে এইসব পশুপাখির তদারকি করতেন)। হীরামতি বানু একা একাই বিড়বিড় করে, ‘কি বিচিত্র দুনিয়াগো। মানুষ যে কেমনে অতো সকাল সকাল বদলায়। যার নুন খাইলো, তার কইলজাত হাত দিতে একটুও সময় লাগলো না।’

হীরামতি বানু তখনও কিছুই জানে না, কেন হঠাৎ করে এরকম হয়ে গেছে সবকিছু। সামান্য কদিনের ব্যবধানে এরকম ওলটপালট, তার মাথায় কিছুই ঢুকতে চাইছে না। বাড়িটা কেমন যেন খালি খালি লাগে। কোথায় জৌলুস উপচে পড়েছে দিনের পর দিন। মানুষের হৈচৈ, কোলাহল। একটা বিয়ে বাড়ির উৎসব লেগে থাকতো, সেই বাড়িটা কিনা এখন মরা বাড়ির মত। সেগুন গাছের পাতাগুলো কেমন ফিসফিস করে। যেন এতদিন এই পাতাগুলোর নড়াচড়া কেউ বন্ধ করে রেখেছিল। যেন তারা প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে পারেনি।
হীরামতি বানু সালামত মুন্সির মুখের দিকে তাকায়। সালামত মুন্সি যখন বলে, ‘আমিও এই বড় মাইনষি খেলা বুঝিনা বুঝছস। কোন সময় যে কোন রাজা পাটো বয়। আর নয়া নয়া খেলা দেখায়। অও এক দুই বছর পরে দেখি, যে যায় লংকায় সেই অয় রাবণ। আমরা যে চেঙর পুত, সেই চেঙর পুতই থাকলাম। খামোকা চাটাচাটি করাই সার।’
হীরামতি বানু হা করে সালামত মুন্সির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে ঠিক বুঝতে পারে না, সালামত মুন্সির মাথা থেকে কি করে এরকম কথাবার্তা বের হচ্ছে। তার চোখের ভেতর, মাথার ভেতর বাগানবাড়ির নানাদিক ঘোলা জলের মত বলক দিয়ে ওঠে। #