হয়তো বা অতিকথন

প্রকাশিত: ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

হয়তো বা অতিকথন

 

আকমল হোসেন খোকন

 

*মোড়াইল

*নড়াইল

*সরাইল

*তাড়াইল

যদি উচ্চারণ হয় মোড়াই লো, নড়াই লো, সরাই লো, তাড়াই লো- তাহলে এগুলো ক্রিয়াপদ ; আর যদি উচ্চারণ করি মোড়াইল্, নড়াইল্, সরাইল্, তাড়াইল্- তাহলে এগুলো স্থানের নাম, বিশেষ্য পদ। আপনাকে যদি প্রশ্ন করি, কোথাও লিখিত বা মুদ্রিত আকারে শব্দগুলো দেখলে আপনি কোন উচ্চারণে এগুলো পড়বেন? আপনি নিশ্চয়ই উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ এটা সম্ভব নয়। কেবল বাক্যে ব্যবহৃত হলেই পদগুলোর ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক পরিচয় স্পষ্ট হবে, নচেৎ নয়।

 

হুমায়ূন আহমেদ যখন বলেন- “তারা বড় আনন্দ করে।” বোর্ডে চক/ মার্কার দিয়ে বাক্যটাকে লিখে আমি শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করি- বলতো ‘বড়’ মানে কী? প্রশ্ন শুনে ছাত্রছাত্রিরা প্রায়শই বোকা হয়ে যায়। ভাবে, স্যারের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? এটা একটা প্রশ্ন হলো?

উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি কিন্তু তাকিয়ে থাকি ওদের দিকে। কেউ একজন হয়তো বলে- স্যার, ‘ব্যাপক’। এবং বলে এমনভাবে, যে, সবার মুখের কথাটাই ও বললো।

কিন্তু বলার পরই বুঝতে পারে, ওর বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন।

কেউ একজন সাথে সাথেই হয়তো বলে, স্যার ‘বড়’ মানে ‘অনেক’। কেউ বলে- ‘বড়’ মানে ‘প্রচুর’।

আমি বলি- এই বাক্যে স্ট্রেস একটা বড় জিনিস। তুমি যখন ‘তারা’র ওপর জোর দেবে, তখন ‘বড়’র মানে যা হবে, তুমি যখন ‘বড়’র ওপর জোর দেবে, তখন ‘বড়’র মানে তা হবে না। আবার ‘আনন্দ’র ওপর জোর দিলে ‘বড়’র মানে আরেকটা হবে। আবার ‘করে’র ওপর জোর বেশি বা কম দেয়ার ওপরও ‘বড়’র মানে পরিবর্তন হতে পারে। স্বরের সঙ্গে সুর যোগ করলে আবার অন্য মানে দাঁড়াবে। আবেগ যুক্ত করলে আরো আরো মানে দাঁড়াবে।

বিশ্বাস না হয় নিজেরাই আমার সঙ্গে সঙ্গে বাক্যটা নানাভাবে উচ্চারণ করে দেখো।

সমস্ত ক্লাস তখন ফ্রিজ হয়ে যায়।

 

বাংলা ভাষার এইরকম অদ্ভূত প্রয়োগবৈচিত্র্য আর চমৎকারিত্ব দুনিয়ার কয়টা ভাষায় আছে বলুন? যে কোনো বিদেশি বিভাষি নতুন একটা শব্দকে অর্থ জেনে বা না জেনে বাংলা ভাষা গ্রহণ করতে পারে ; পারে তার আত্তীকরণ যোগ্যতার কারণে, অসম্ভবপ্রায় শোষণক্ষমতার কারণে। একটা বাংলা কিংবা হিন্দি শব্দকে ইংরেজি ভাষা আত্তীকরণ করবে তো দূরের কথা, পাদটীকাসমেত ব্যবহার করার ক্ষমতাও রাখে না। গ্রিক আর লাতিন থেকে শব্দসম্ভার সাজিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করা খানদানি ভাষাটার কী সীমাবদ্ধতা দেখেন! তাদের বনেদিপনা যদিও জগতবিদিত ; আমি বলবো আভিজাত্য ইংরেজিকে বিশুষ্ক করে তুলেছে – গ্রহণ-বর্জনের অভ্যেসটাই ইংরেজি ভাষা করে উঠতে পারে নি।

 

আমরা কিন্তু সেই পথে হেঁটেছি বহুকাল। আমাদের বাঙালিয়ানার সাথে হয়তো গরিবিয়ানাটাও প্রকট ছিল চিরকাল – তাই অন্যের কাছ থেকে নিয়ে চলার ব্যবস্থাটা সবসময়ই আমাদের রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের জাতিগত ও মজ্জাগত কিছু সংস্কার-বিশ্বাস-দায়ও তো ছিল ; প্রতিবেশীকে, পাশের জনকে নিয়ে চলতে হবে – এই শিক্ষা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। তাই অন্যকে দিই এবং অন্যের কাছ থেকে নিই। এটা আমাদের আভিজাত্যে ঘা বসায় না। এটা আমাদের প্রতীতি ও আস্থায় রয়েছে হাজার বছর ধরে। সেকারণে আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি – পৃথিবীর যে কোনো জাতির ভাষাকে আমরা বাংলায় প্রয়োগসিদ্ধ ধরে নিতে পারি। ফরাসি, ডাচ, ওলন্দাজ, পারশিয়ান বা ইংরেজরা সশরীরে যেমন প্রবেশ করে কিছু শব্দ রেখে গিয়েছে, একই প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো জাতি না এসেও তাদের শিল্প-সাহিত্য-ব্যবসা-বাণিজ্য-জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসার করতে গিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে লাখো-কোটি শব্দ। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই ‘পরিভাষা’ হিসেবে সেসব শব্দ প্রতিদিন বাংলায় প্রবেশ করছে, বাংলা সেসব শব্দকে বৈমাত্রেয় ভাইটি পর্যন্ত ভাবছে না। যত্ন করে পাশের চেয়ারে বসাচ্ছে, আপ্যায়ন করছে, থাকতে দিচ্ছে যতদিন খুশি ততদিন।

 

বাংলা ভাষার এই সহনশীলতা আর সংবেদনশীলতা অনায়াসে একে বিশ্বে এক নম্বর ভাষার স্থান এনে দিতে পারতো। পারছে না আমাদের ভালবাসাহীনতার কারণে। ভাষার প্রতি প্রেম-ভালবাসা-দরদ কমে যাওয়ার কারণে। ভক্তি ভালবাসার মার্গীয় রূপটার নাম হচ্ছে শ্রদ্ধাবোধ। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকাটা খুব জরুরি। শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে চর্চা-প্রসার ঘটবে না। বাংলাদেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট্ট পরিসরে হলেও তো একটা করে শহীদ মিনার হতে পারতো, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও তা হয় নি ; হয় নি মূলত ঐ কারণে। আর একাত্তরে বর্বর পাকিস্তানিরা পরিকল্পনামাফিক একদিকে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীনিধনে নেমেছিল, অন্যদিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল অধিকাংশ শহীদ মিনারগুলো, পুড়িয়ে দিয়েছিল পাঠাগারগুলো, নির্মূল করে দিয়েছিল মেধাবী ও প্রগতিশীল মানুষগুলোকে।

 

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাংলা ভাষা শিক্ষা ও চর্চার জন্য আমাদের কোনো ব্যবহারিক করণ-কৌশল তৈরি করা হয় নি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য ভাষা শিক্ষার জন্য কিছু পদ্ধতি, নিয়ামক, কৌশল নির্ধারণ করা আছে, যা বাংলার ক্ষেত্রে নেই। আমি জানি এই কথাগুলো নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারার মতন। বাংলা ভাষার অনুরাগী ছাত্র এবং কালান্তরে শিক্ষক হয়ে এরকম কথা বললে- প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা তাহলে কী পড়াই-শেখাই? আমাদের বেতন নেয়াটা নীতিসিদ্ধ (হালাল) হচ্ছে তো?

 

মাতৃভাষা বাংলাকে আমরা আমাদের রক্তে বহন করে চলেছি। এর শিখন-পঠন-পাঠন হওয়া উচিৎ ছিল মুক্ত-অবার। সৃজনশীল পদ্ধতির নামে মাতৃভাষাকে আমরা সেই অবার উন্মুক্ত আকাশের তল থেকে সরিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে, শুধুই পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে, স্লাইডে, ল্যাপটপে, প্রোজেক্টরে। সন্তান তার মাতৃদুগ্ধ পান করবে স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় ; চিকিৎসাবিজ্ঞান যত উন্নতিই করুক না কেন, স্তন্যদানে কোনো টুলস বা ফর্মুলা দিতে যায় নি- ওটা তাদের এখতিয়ার মনে করে নি। শিশুরা ভাষা শিখবে তার পরিবার-পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে। খেলতে খেলতে হাসতে হাসতে গাইতে গাইতে। যেভাবে সে হাঁটতে ও দৌড়ুতে শেখে, ভাষা শিক্ষাটাও হবে সেরকম- আলো-বাতাস প্রাণায়ামরূপে। এখানে টুলস, মেথড আর ফর্মুলার কেরামতিতে তাকে পঙ্গু করে দেয়ার তো কোনো মানে নেই। যারা সৃজনশীল পদ্ধতির ধ্বজাধারী, তারা কেন ইংরেজিকে এর আওতায় আনলেন না, আমার বোধগম্য নয়। বোধকরি পেরে ওঠেন নি। আমি শুধু মাতৃভাষাকে ছেড়ে দিতে বলি। বাকি সব কিছু আপনারা সৃজনশীল করে পড়ান, শেখান, বোঝান- আপত্তি নেই। দয়া করে বাংলা-কে ছেড়ে দিন। এটা যে মাতৃভাষা। হাত-পা বেঁধে সাঁতার শেখানো বন্ধ করেন।

 

ফল তো নিশ্চয়ই দেখতে শুরু করেছেন আপনারা! দশ-এগারো বছর স্কুলে পড়ে কলেজে পড়তে এসে একজন শিক্ষার্থী বাংলায় দশটা শুদ্ধ বাক্য উৎপাদন করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে পঁচিশে পাঁচ পেতেও মাথার চুল ছেঁড়ে। আমাদের ভাষা শেখানোর যে ব্যবস্থা আমরা চালু করেছি, কোনো শিক্ষার্থীই বাংলায় একটা নির্ভুল দরখাস্ত লিখতে পারবে না। বাংলায় একটা প্রতিবেদন লেখার জন্য সরকারি দপ্তরে আজকাল একটা লোক পাওয়া যায় না। প্রতিদিন সরকারি-অসরকারি দপ্তরে, আদালতে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হাজার হাজার লাখ লাখ চিঠি-পত্র চালাচালি হয়, সেসব-ই ভুলের ভীষণ ভয়ানক ভ্রূকুটি। লজ্জায় মাথা কাটা যায়- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাড়িতে চিঠি পাঠাতে বন্ধুর সাহায্য চায়- কীভাবে ঠিকানা লিখবে সে জানে না।

 

এই শিক্ষাগুলো আমাদের শৈশবেও আমরা পরিবার থেকে পেতাম। আমাদের হাতের লেখা অনুশীলন, শ্রুতিলিপি, সাধারণ জ্ঞান চর্চা, আবৃত্তি করা, গল্পবলা ও শোনা, ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই অধিকাংশ শেখানো হতো, যেটুকু বাকি থাকতো সেটা স্কুলে যাওয়ামাত্রই পূরণ হয়ে যেতো। এখন তো চলছে ভুল বানানে, ভুল শব্দপ্রয়োগে, ভুল বাক্যগঠনে আজগুবি সব গল্প ফেঁদে উদ্দীপক তৈরি করে বাচ্চাদের তা গেলানোর মহোৎসব। এবং যা কিছু উত্তর চাওয়া হচ্ছে ; তার ভাবনার ও কল্পনার জায়গা থেকে, তা ঐ উদ্দীপকের আলোকে। বুঝতেই পারছেন জ্ঞান সমুদ্র থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে চৌবাচ্চায় ; উপরন্তু পরিয়ে দেয়া হয়েছে লাইফজ্যাকেট। দশ কেজি ওজনের একটা বাচ্চার পিঠে বারো কেজি বই আছে, কিন্তু মেধার লালন-পালন কই?

সম্প্রতি প্রথম আলো’য় প্রকাশিত আনিসুল হক-এর “ছেলেমেয়ে কি পর হয়ে গেল” লেখাটার প্রসঙ্গ আনতে ইচ্ছে করছে। তিনিও তাঁর রচনায় প্রকারান্তরে আমাদের উদাসীনতার কথাই বলেছেন। ইংরেজি শিখলেই যে বাংলার চর্চা করা যাবে না, তা তো নয়, করা যায়, সে-চর্চা ফলপ্রসূও হয়, শুধু ভালবাসা-দরদটা থাকতে হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারটা পারিবারিক শিক্ষা-সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। উত্তরাধিকারসূত্রে আমরাই প্ররোচনা দিই শিশুকে আধুনিকায়ন-বিশ্বায়ন-যন্ত্রায়ণ করে গড়ে তুলতে। তাই স্বীয় সন্তানের বৈকল্যে কখনো কখনো পিতা-মাতা ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের সেই ছড়াটার মতো আত্মপ্রসাদ লাভ করেন- “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না”। আমি ইংরেজি পারি নি বলে ছেলেকে ইংরেজির জাহাজ বানাতে চাই। আমি গান গাইতে পারি নি বলে ছেলেকে দিয়ে গান গাওয়াতে চাই। আমি ছবি আঁকতে পারতাম না বলে, আমি চাই আমার ছেলে ছবিও আঁকতে শিখুক। এই রকমের আহ্লাদের বিপরীতে ছেলেটির কী অবস্থা দাঁড়ালো- সেই ভাবনাটি কি একবারও আমি আমরা ভাবছি?

 

প্রথম আলো’র আরেকটি লেখা আনু মুহাম্মদ-এর। তাঁর লেখার শিরোনাম- “জানার পথে ভাষার দেয়াল”। রাষ্ট্র ও সরকারসম্পৃক্ততার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে মাতৃভাষা বাংলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়ে ওঠে নি এখনো। তিনিও দাপ্তরিক ও আদালতের ভাষা হিসেবে ইংরেজির ব্যবহারে পীড়িত। সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতি নির্ধারণ, পরিপত্র তৈরি ও সরবরাহ করা হচ্ছে ইংরেজিতে। এনজিও কার্যক্রম, কনসালটেন্সি সব ইংরেজি। কোটি কোটি টাকার অর্থনীতির প্রতিদিনকার ভাষা ইংরেজি; এই ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করেই এসব কার্যক্রম চলে এসেছে পঞ্চাশ বছর। কিন্তু এভাবে তো চলতে দেয়া যায় না।

 

১৯৯৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা কারিকুলামে এবং সিলেবাসে পরিবর্তন আনা হলে বাংলায় ব্যবহারিক পঠন-পাঠনের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সে-ই সংকলনে “ভাষাভিত্তিক প্রশ্ন” নামে একটা বিষয় সংযোজন করা হয়, যার মাধ্যমে ভাষার প্রায়োগিক দিকগুলো আলোচনার পথ সুগম হয়ে যায়। আমরা বাংলা ভাষার শিক্ষকরা বাংলা’য় ‘ব্যবহারিক (Practical)’ প্রবর্তনের জন্য তারো আগে থেকে দাবি জানিয়ে আসছিলাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমন কিছু অধ্যায়/ পরিচ্ছেদ রয়েছে যেগুলোর জন্য ব্যবহারিক থাকাটা জরুরি। যুগের দাবিতেই সাহিত্যের বিশাল অংশকে সহজবোধ্য করার জন্যে অডিও-ভিজুয়াল ক্লাস পরিচালনা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রিকে কাব্য-ছন্দ-অলংকার সম্পর্কে সম্যক ধারণা হাতে কলমে শেখানো সম্ভব। প্রমিত উচ্চারণে আবৃত্তি শোনানো ও শেখানো সহজতর হতে বাধ্য। ব্যাকরণের তাত্ত্বিক ও জটিল অংশগুলোকে ব্যবহারিক ক্লাসে হাতে কলমে ও অডিও-ভিজুয়াল পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা যেতে পারে। বানান ও উচ্চারণের প্রমিত রূপ ব্যবহারিক ক্লাস ছাড়া কখনোই যথাযথভাবে শেখানো সম্ভব নয়। আর অসম্পূর্ণ শিক্ষা নিয়ে সেশন শেষ করে বলেই বাংলায় পাশ করার পরও শিক্ষার্থীকে কণ্ঠশীলনের দ্বারস্থ হতে হয়, আবৃত্তি সংগঠনগুলোর শরণাপন্ন হতে হয়। স্নাতক-স্নাতকোত্তর করেও শিক্ষার্থীকে ছুটতে হয় বিভিন্ন কোর্স আর ট্রেনিংয়ের পেছনে। পাঠ্য উপন্যাস ও নাটকের ক্লাসগুলো অডিও-ভিজুয়াল পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হলে শতভাগ সাফল্য পাওয়া সম্ভব। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক শাখার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক ক্লাস থাকলেও বাংলা’য় আজ পর্যন্ত ব্যবহারিক প্রবর্তনেরর কথা কেউ কল্পনাও করতে পারলেন না। উল্টো সৃজনশীল পদ্ধতির বাহানায় মাতৃভাষা চর্চাকে গলা টিপে মারার সমূহ ব্যবস্থাপনা জারি রাখা হয়েছে।

 

আপনি পক্বকেশ বুদ্ধিজীবী- আপনি কি জানেন, আপনি যেসব পুস্তক ও সিলেবাসের আওতায় পড়াশোনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি দরদ অনুভব করছেন, সুযোগ পেলেই এর ওর ভুল ধরতে উদ্যত হচ্ছেন, স্কুলে আজকাল আর সেসব বই পড়ানোই হয় না। আধুনিকায়ন-বিশ্বায়নের নামে কোমলমতি শিশুকে ক্রমশ গেজেটমতি করে তৈরি করা হচ্ছে। এবং পরিণতির পূর্বাপর কোনো ধারণা না রেখেই আমরা অনুবর্তনে বিশ্বাসী। মাতৃভাষা বাংলার প্রসার-বিস্তার সর্বব্যাপী তখনই হবে- যখন একে মুক্ত-অবার আকাশের নিচে রাখা হবে। নদীমাতৃক বাংলাকে পদ্মা-যমুনা-মেঘনা-বঙ্গোপসাগরের জলোহাওয়া থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে তথাকথিত পণ্ডিতদের অ্যাকুরিয়ামে। কাঁচের ক্রাইম তাকে মেরে ফেলছে সকাল বিকাল।

 

সহস্র বছরের বাংলা ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে, আমাদের অধিকৃত উপজীব্যতা নিয়ে, দখলস্বত্ব নিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ঊনসত্তর বছর। একটা ভাষার গঠন-প্রকরণ-প্রয়োগ-কৌশল স্থিরীকৃত হতে এটা কম সময় নয়। কোটি কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যয় হয়েছে, হচ্ছেও প্রতিনিয়ত। বাংলা একাডেমি তো সমুখে দণ্ডায়মান কর্ণধার রয়েছেই, রয়েছে শিক্ষাবোর্ডসমূহ, এনসিটিবি, মাউশি, নায়েম, বিয়াম, ব্যানবেইস, মন্ত্রণালয় নামক আজদাহা সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ; এরা চাইলেই মাতৃভাষার প্রয়োগ-প্রসার-বিস্তার সর্বব্যাপী করে তুলতে পারে, পারতো, করে নি। সেই তাগিদটাই এরা ভেতর থেকে অনুভব করে না। আমি খুব নিরাবরণ না হলেও নিরাভরণভাবে বলতে পারি- সবাই যার যার চাকুরিটুকুই করেছে, ভালবাসে নি। মাতৃভাষা বাংলাকে যে ভালবেসেছে, সে হয়তো মরেছে, মরবেও আরো বহু বহু জন। কিন্তু বেঁচেওছে বহু বহু জন- বাঁচাতে চেয়েছে বহু বহু জনকে। সালাম-বরকত-রফিক-জব্বাররা বোধকরি উদাহরণ হিসেবে আজকের দিনে ম্লান হয়ে পড়েছেন! নইলে এতো দ্রুত আমরা তাঁদের ভুলে গেলাম কী করে? কেন মাতৃভাষা বাংলাকে ভাল না বেসে শুধুই বই পুস্তক প্রণয়ন করে গেলাম বছরের পর বছর? কেন শুধুই দায় সেরে গেলাম চিরটা কাল, আর লোভ-লাভ-খতিয়ানে সমর্পিত হলাম?

 

আকমল হোসেন খোকন : ইনচার্জ (কলেজ-দিবা শাখা) বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ