২০৩০ সালের আগেই দেশ থেকে কুষ্ঠ রোগ নির্মূল করা হবে

প্রকাশিত: ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

২০৩০ সালের আগেই দেশ থেকে কুষ্ঠ রোগ নির্মূল করা হবে

২০৩০ সালের আগেই দেশ থেকে কুষ্ঠ রোগ নির্মূল করা হবে । এই লক্ষ্য অর্জনে ওষুধ তৈরী এবং বিনামূল্যে বিতরণ করার জন্য স্থানীয় ওষুধ কোম্পানীগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক ওষুধ কোম্পানী রয়েছে যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানী করে এবং তাদের ওষুধের মান খুবই ভাল।
তিনি বলেন, ‘তাই আমি তাদেরকে বিশেষায়িত ওষুধ তৈরী করার জন্য অনুরোধ জানাতে চাই যা কুষ্ঠ রোগীদের জন্য দরকার। এসব ওষুধ রোগীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করার ব্যবস্থা করুন যা দ্র্রুত আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
শেখ হাসিনা আজ সকালে প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য কুষ্ঠ উদ্যোগ’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলন ২০১৯ উদ্বোধন করছিলেন।
শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের আগেই কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় কুষ্ঠ কার্যক্রম জোরদার করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে, এ লক্ষ্যে আমরা যদি আন্তরিকভাবে কাজ করি, তাহলে আমরা লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের অনেক আগেই কুষ্ঠ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবো।
কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে সমাজের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুষ্ঠ রোগীদের সঙ্গে আচরণ করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী কুষ্ঠ আক্রান্ত লোকদের প্রতি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং নেতিবাচক মনোভাব পরিহার করার প্রযোজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি লোকজনকে বলতে চাই যে, তারা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাই, তাদেরকে দূরে ঠেলে দেয়া সঠিক নয়। কোন ব্যক্তির দেহে কুষ্ঠ রোগ সনাক্ত হলে, আপনাদেরকে সহানুভূতির সঙ্গে তার সঙ্গে আচরণ করতে হবে এবং তিনি যাতে সুস্থ্য হয়ে ওঠেন সে লক্ষ্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি খুবই জরুরি।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাপানের নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ডাব্লিওএইচও গুডউইল এ্যাম্বাসেডর ইওহেই সাসাকাওয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। কুষ্ঠ রোগ ও এর চিকিৎসার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত একটি প্রামাণ্য চিত্র অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক পর্যায়ে কুষ্ঠ রোগীদের দেহে রোগটি সনাক্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার জন্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুষ্ঠ রোগের কারণে প্রতিবন্ধী লোকদের উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্মসংস্থানের কোন বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চাকুরি থেকে অবশ্যই বাদ দেয়া যাবে না, বরং প্রতিবন্ধী লোকের জন্য একটি অনুকুল কাজের পরিবেশ সৃষ্ঠি করতে হবে।’

কুষ্ঠমুক্ত দেশ গঠনে তাঁর সরকারের দীর্ঘ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই রোগ নির্মূলে নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।

তিনি বলেন, ‘তখন সেই সব পদক্ষেপের সুফল হিসেবে ১৯৯৮ সালে দেশে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা প্রতি ১০ হাজারে একজনে নামাতে সক্ষম হয়েছিলাম। এর মানে আমরা ২০০০ সালের পরিবর্তে ১৯৯৮ সালের মধ্যেই এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছিলাম।’
শেখ হাসিনা বলেন, উত্তরবঙ্গ ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা বেশি। এই রোগের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আমাদেরকে ওই এলাকাগুলোতে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে এবং কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি আমরা এটা করতে পারি তবে, ২০৩০ সালের মধ্যেই আমরা একটি কুষ্ঠমুক্ত দেশ গড়তে পারব ইনশা আল্লাহ।’
তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালে ৩৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ কুষ্ঠ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসত। তবে, এই হার হ্রাস পেয়ে আট শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এটা তাঁর সরকারের একটি অনেক বড় অর্জন বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাঁর সরকার এই হারকে শূন্যে নামিয়ে আনতে চাইছে।
শেখ হাসিনা বলেন, কুষ্ঠরোগের বিরুদ্ধে সামাজিক বৈষম্য দূরের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য ব্রিটিশ সরকার প্রবর্তিত পুরনো আইন পরিবর্তন করে ২০১১ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কুষ্ঠ রোগীদের কারাগারের মতো কোন বাড়িতে আলাদা করে আটকে রাখার বিষয় নয়। তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে সমাজের অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং এই রোগমুক্তির জন্য চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আর কেউ যেন নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত না হয় আমাদের সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। তাই, জনসচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি এবং আমরা এ বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার ৫শ’ থেকে ৪ হাজার কুষ্ঠরোগী আক্রান্ত লোক সনাক্ত হচ্ছে এবং উপজেলা সদর হাসপাতাল ও কুষ্ঠ হাসপাতালগুলোতে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি তাঁর সরকারের বিশেষ অঙ্গীকার রয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তাদেরকে দূরে ঠেলে দিতে পারি না। তাদেরও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার আছে এবং আমরা তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ‘কানাকে কানা ও খোড়া কে খোড়া’ না বলার জন্য শিক্ষা দিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন ও আধুনিকায়ন এবং আইনের বাস্তবায়ন করছে। তাদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিবহন সুবিধা দিতে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পরে তিনি কুষ্ঠ রোগীদের জন্য দ্রুত বিশেষ আবাসন প্রকল্প গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, এই নির্দেশনার ফলে প্রতিবন্ধীদের জন্য গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরে বান্দাবাড়ি আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগ নিরাময় কার্যক্রমে অংশগ্রহনকারী সকল বেসরকারী সংস্থাকে তাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা এবং কুষ্ঠরোগী তথা কমিউনিটির সেবার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সচেতন। সরকার এবং এসজিওগুলোর অব্যাহত প্রচার কার্যক্রমের ফলে এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা, সিলেট ও নিলফামারী জেলায় সরকারের তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতাল কুষ্ঠ আক্রান্তদের চিকিৎসা ও সেবা সুবিধা প্রদান করছে। সর্বোপরি কুষ্ঠরোগ নিরাময়ে দাতা দেশগুলোর সহযোগিতায় অনেকগুলো এনজিও বিভিন্ন জেলায় হাসপাতাল ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের গৃহীত স্বাস্থ্য কার্যক্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনী কার্যক্রম এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব করেছে।
তিনি বলেন, মান এবং স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্র উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে এবং এরফলে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ টিকাদান কার্যক্রম বিশেষ সাফল্য অর্জন করেছে। আমরা পোলিও, হাম, রুবেলার মতো রোগ সম্পূর্ণভাবে নিরাময়ে সক্ষম হয়েছি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com