৭মে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য

প্রকাশিত: ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২২

৭মে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য

ড. প্রণব কুমার পান্ডেঃ

২০০৬-২০০৭ সময়কাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে।

কারণ ২০০১ থেকে ২০০৬ এর সময়কালীন বিএনপি সরকারের শেষের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত করবার বিএনপির বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে সেনা বাহিনী সমর্থিত এক বিশেষ ধরনের সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মোটামুটি ভাবে গ্রহণযোগ্য থাকলেও বিএনপি’র সময়কালে প্রথমে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানো এবং পরবর্তীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে একেবারে বিতর্কিত করে তুলে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে দেশে সহিংসতা শুরু হয়। তারই ফলশ্রুতিতে সেনা সমর্থিত এক বিশেষ সরকার গঠন গঠিত হয় দেশে। প্রথমদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এই সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকলেও পরবর্তীতে ক্ষমতার মোহ তাদেরকে গ্রাস করতে শুরু করে। তারা নির্বাচন অনুষ্ঠানের ম্যান্ডেট নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে থাকে। সবচেয়ে বড় যে ভুলটি তারা করেছিল সেটি হল বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করা।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তারিখে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনৈতিক দলগুলো মনে করেছিল যে তারা কিছুটা সময় নিয়ে দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। এ কারণেই তাদের দায়িত্ব নেবার পর থেকে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে থাকে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অসুস্থ বৌমাকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর থেকে তৎকালীন সরকার নির্বাচন পরিচালনার পরিবর্তে বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেই সময় বারবার দেশে আসতে বাধা দেয়া হয়। একই সাথে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেশ থেকে বাইরে পাঠাবার পাঁয়তারা করা শুরু করা হয়। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও শেখ হাসিনা দেশে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে জোর করেই তিনি দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তিনি তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করে দেশে আসার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন।
তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ৭ই মে সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে তার পা রাখেন। প্রথমদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে জনগণের মধ্যে শঙ্কা থাকলেও তিনি এটি প্রমাণ করেন যে সৎ সাহস থাকলে যে কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব। তিনি যখন ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তখন বিমানবন্দর প্রায় জনশূন্য ছিল। কিন্তু তাঁর পৌঁছানোর খবর ছড়ানোর সাথে সাথে বিমানবন্দর এলাকা লোকালয়ে পরিণত হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নেই তাদের প্রিয় নেত্রীকে অভিবাদন জানানোর জন্য। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ২০০৭ সালের ৭ মে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন কারণ ঐ দিন শেখ হাসিনা যদি দেশে আসবার সাহস না দেখাতেন তাহলে হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস অন্যভাবে লিপিবদ্ধ হত। তিনি সে দিন প্রমাণ করেছিলেন যে রাজনীতিতে সততা এবং দৃঢ়তা থাকলে যে কোন সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশে ফেরা যায়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী যেমন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে ২০০৭ সালের ৭ মে বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
তবে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন ২০০৭ সালের ৭ মে কেন বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হিসেবে বিবেচিত হবে? এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হবার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথমতঃ এই দিন যদি শেখ হাসিনা দেশে না ফিরতেন তাহলে তৎকালীন সরকার বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হত বাংলাদেশে। তারা যদি শেখ হাসিনাকে ভয় দেখাতে সক্ষম হতো তাহলে সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে তারা আস্তে আস্তে রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য করতে পারতো। দ্বিতীয়তঃ শেখ হাসিনা জোর করে সেদিন দেশে ফিরে এসেছিলেন বিধায় তৎকালীন সরকার বুঝতে পেরেছিল যে তারা যেটি করতে যাচ্ছে সেটি হয়তো সঠিক নয়। বাংলাদেশের মাটিতে বিরাজনীতিকরণ নীতি বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন। তৃতীয়তঃ সে দিন যদি শেখ হাসিনা না ফিরতেন তাহলে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো না এবং সেনা সমর্থিত সরকার আরো অনেকদিন বাংলাদেশের মাটিতে শাসন করতো। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধুলিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারতো।
চতুর্থতঃ শেখ হাসিনা সে দিন দেশে ফিরে না আসলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বার আরেকটি সম্ভাবনা তৈরি হতো। আমরা জানি যে শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা কঠিন। যদিও সেই সময়ে প্রিয় নেত্রীর অনুপস্থিতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে বিভিন্ন ধরনের ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করবার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি সফল হয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা যদি সে দিন দেশে ফিরতে না পারতেন তাহলে সেটি কত দিন অটুট থাকতো তা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এছাড়া সেই সময় সেনা-সমর্থিত সরকারের চাপেই হোক বা না হোক আওয়ামী লীগের মধ্যে সংস্কারপন্থী একটি দল আওয়ামী লীগকে ভাঙ্গার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে সুসংগঠিত রাখা এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসবার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে গুরুত্ব অপরিসীম।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে শেখ হাসিনা যদি সেই দিন দেশে না ফিরতেন তাহলে হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস ভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ হতো। শেখ হাসিনা সেদিন দেশে ফিরে আসার ফলে তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের ওপর নির্বাচন অনুষ্ঠানের চাপ বাড়তে থাকে এবং পরিশেষে তারা বাধ্য হয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আস্থা রাখে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না আসলে বাংলাদেশ যে উন্নতি অর্জন করেছে তা অর্জন করা কখনই সম্ভব হত না। আমরা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অপশাসন প্রত্যক্ষ করেছি। কিভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার করে বিরোধী রাজনীতিকে ধূলিসাৎ করবার প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়েছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে। আমরা দেখেছি কিভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের উপর আঘাত করা হয়েছে। কিভাবে সকল সেক্টর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছে শেখ হাসিনা যদি যেদিন দেশে ফিরতে না পারতেন তাহলে এই উন্নয়ন অর্জিত হত না এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের পুরো ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো।
১৯৮১ সালের ১৭ মে যেমন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে পালিত হয়, ঠিক তেমনিভাবে ২০০৭ সালের ৭ মে একিই রকম গুরুত্ব দিয়ে পালন করা উচিত কারন এই দিনটির গুরুত্বও বাংলাদেশের ইতিহাসে অপরিসীম। ২০০৭ সালের ৭ মে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক কালো অধ্যায় থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা শুরু করে। গত ২০০৯ থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে যে উন্নয়ন অর্জন করেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। যারা এক সময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে বর্ণনা করতো, তারাই আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল কিংবা এশিয়ান টাইগার হিসেবে প্রশংসা করছে। এগুলোর কোন কিছুই অর্জিত হতো না, যদি না সেনা সমর্থিত সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ২০০৭ সালের ৭মে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে না আসতেন। আর এই কারনেই ৭মে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করা উচিত।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর