অনলাইন ডেস্ক
আমদানি মূল্য ও খুচরা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে এই বিশাল পার্থক্যের কারণেই দেশীয় হেলমেট উৎপাদক ও বড় আমদানিকারকদের অভিযোগ, মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য অত্যাবশ্যক এই সুরক্ষা সরঞ্জামের আমদানি মূল্যায়নে শুল্ক কর্তৃপক্ষ যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না।
তাদের অভিযোগ, শুল্ক কর্তৃপক্ষের এই ব্যর্থতার ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিং বাড়ছে, সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং দেশী উৎপাদক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এক জ্যেষ্ঠ রাজস্ব কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, কর কম দেওয়ার জন্য আসল দামের চেয়ে কম দাম ঘোষণা করার প্রবণতা, অর্থাৎ আন্ডার-ইনভয়েসিং এখনও হেলমেট আমদানির ক্ষেত্রে একটি ‘বড় চ্যালেঞ্জ’।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৮ লাখ ৭৫ হাজার মোটরসাইকেল হেলমেট আমদানি হয়েছে। এসব হেলমেটের মোট ঘোষিত মূল্য ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। সে হিসাবে, প্রতিটি হেলমেটের গড় আমদানি মূল্য ৩ ডলারেরও কম। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে প্রতিটি হেলমেটের দাম দাঁড়ায় ৩৭০ টাকার মতো।
গত বছর আমদানি করা হেলমেটের বেশিরভাগই এসেছে ভারত থেকে। এর পরিমাণ ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৩৮৪টি। এরপর রয়েছে চীন। দেশটি থেকে এসেছে ২ লাখ ২৩ হাজার ২৯৩টি হেলমেট। এছাড়া ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান থেকেও অল্প পরিমাণে হেলমেট আমদানি করা হয়েছে।
শুল্ক বিভাগের নথি অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা প্রতিটি হেলমেটের গড় ঘোষিত মূল্য ৩ দশমিক ০২ ডলার, আর চীন থেকে আমদানি করা হেলমেটের মূল্য মাত্র ১ দশমিক ৯৬ ডলার।
তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, একই ব্র্যান্ডের হেলমেট মডেল ও মানভেদে ১ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আমদানি তথ্য বলছে, ভেগা, স্টিলবার্ড, গ্লাইডার্স, অ্যাক্সর, টেলিশ ও এরোস্টারসহ কয়েকটি ভারতীয় ব্র্যান্ডের হেলমেট প্রতিটি আড়াই থেকে ৩ ডলার মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এসব হেলমেট স্থানীয় বাজারে ১ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চলতি বছরের মে মাসে নারায়ণগঞ্জভিত্তিক নিউ নেশন অটোমোবাইলস ভারত থেকে ৭ হাজার ২৩৬টি গ্লাইডার্স হেলমেট আমদানি করেছে। এগুলোর প্রতি ইউনিটের ঘোষিত মূল্য ছিল ২ দশমিক ৫২ ডলার। শুল্ক নির্ধারণের জন্য কাস্টমস প্রতি ইউনিটের মূল্য ৩ ডলার ধরে হিসাব করে।
আমদানি নথি অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ শুল্ক, কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) যোগ করার পরও প্রতিটি হেলমেটের দাম ৬০০ টাকার কম হওয়ার কথা। কিন্তু একই ব্র্যান্ডের হেলমেট স্থানীয় বাজারে ১ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
যোগাযোগ করা হলে নিউ নেশন অটোমোবাইলসের স্বত্বাধিকারী নুরুল হক বলেন, আমদানি মূল্য কত টাকা ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা দেখে ওই পণ্য বাজারে আনতে মোট কত খরচ হয়েছে তা বোঝা সম্ভব না।
তিনি বলেন, ‘এলসি কমিশন, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক ও ভ্যাট যোগ করলে প্রতিটি হেলমেটের খরচ ৮০০ টাকার বেশি পড়ে। আমরা পাইকারদের কাছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করি। কয়েক হাত পার হয়ে এসব হেলমেট খুচরা বিক্রেতার কাছে যায়। ফলে দাম আরও বেড়ে যায়।’
তিনি বলেন, ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দামের হেলমেটগুলোই বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের চর্চা এখন ব্যাপকভাবে চলছে এবং নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করছে।
এসএমকে ও স্টাডসসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হেলমেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরসের উপপরিচালক রোকন সরকার বলেন, কর ফাঁকি দিতে কিছু ব্যবসায়ী হেলমেটের মূল্য কম দেখানোর কারণে নিয়ম মেনে আমদানি করা প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘কিছু আমদানিকারক একটি হেলমেটের মূল্য দেখাচ্ছে মাত্র আড়াই ডলার। অথচ আমরা প্রকৃত মূল্য প্রায় ১৫ ডলার ঘোষণা করি এবং সেই অনুযায়ী কর ও ভ্যাট দেই।’
তিনি বলেন, ‘এই কাজ করে কিছু আমদানিকারক হেলমেট আমদানির ওপর আরোপিত প্রায় ৬২ শতাংশ শুল্ক ও করের বড় একটি অংশ ফাঁকি দিচ্ছে। ফলে নিয়ম মেনে আমরা যারা ব্যবসা করছি, তাদের বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
রোকন সরকারের মতে, কম দাম ঘোষণা করার এই প্রবণতা একদিকে যেমন নিম্নমানের হেলমেটের বিস্তার ঘটাচ্ছে, অপরদিকে সরকারের রাজস্বও কমিয়ে দিচ্ছে।
এসিআই মোটরস আগে ইতালির প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড নোলান ও এক্স-লাইট হেলমেট আমদানি করত। সেগুলোর দাম ছিল ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে।
দ্রুত ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে দেশের বড় শহরগুলোতে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ৮০ হাজার। এর চার বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ২৫ হাজার।
একইসঙ্গে সড়কে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়কে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশেই হয়েছে মোটরসাইকেলে—মোট ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকি ছয় গুণেরও বেশি কমানো সম্ভব এবং মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
যেখানে অধিকাংশ ভেগা, স্টিলবার্ড ও গ্লাইডার্স হেলমেটের দাম প্রতি ইউনিট প্রায় ৩ ডলার ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে স্টাডস, এসএমকে ও গ্রাফিকের মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর দাম ৮ দশমিক ৫০ থেকে ৩০ দশমিক ৮০ ডলারের মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে এসব পণ্য সাধারণত ২ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হেলমেট আমদানিতে আন্ডার-ইনভয়েসিং একটি বড় সমস্যা।’
এনবিআরের মূল্যায়ন কমিটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আমদানি করা প্রায় ৯৫ শতাংশ হেলমেটের মূল্য প্রতি ইউনিট ৩ ডলার বা তার কম দেখানো হয়েছে। আরও ৪ শতাংশ হেলমেটের মূল্য ৩ দশমিক ৫০ থেকে ১৫ ডলারের মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ হেলমেটের মূল্য ১৫ থেকে ৩১ ডলারের মধ্যে দেখানো হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমদানিকারকরা যখন ৩ ডলার বা তার কম মূল্য ঘোষণা করেন, তখন মূল্যায়নের সময় আমরা সাধারণত ২০ থেকে ৫০ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য যোগ করি। এতে রাজস্ব ক্ষতির একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। যদিও আমরা জানি যে, এসব হেলমেটের প্রকৃত মূল্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি।’
খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের মতে, এর প্রভাব শুধু রাজস্ব ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সড়ক নিরাপত্তা ও দেশীয় পণ্য উৎপাদনেও এর ক্ষতিকর প্রভাব আছে।
সেফমেট হেলমেট উৎপাদনকারী আরএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পল বলেন, আমদানি করা হেলমেটের আসল দাম যদি কাস্টমস ছাড়ের সময় নির্ধারণ করা হতো, তাহলে স্থানীয় উৎপাদকরা উৎপাদন বাড়াতে পারতেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কোনো কঠিন কাজ না। কিন্তু বর্তমান শুল্ক কাঠামোর মধ্যে উৎপাদন বাড়িয়ে তেমন কোনো লাভ নেই। কারণ ভোক্তারা তখন আর আমাদের পণ্য কিনবেন না।’
হোন্ডা হেলমেট আমদানিকারক বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান জানান, যেসব ব্যবসায়ী নিয়ম মেনে চলেন না, তারা কম দামে বিক্রি করায় মানসম্মত ও সনদপ্রাপ্ত হেলমেট বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রবণতার কারণে সস্তা ও নিম্নমানের হেলমেট বাজারে ছেয়ে গেছে এবং সেগুলোর বিক্রিও বেশি হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে সনদপ্রাপ্ত পণ্য আমদানি করতে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’
আশেকুর রহমান আরও বলেন, ‘বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিতে হলে প্রতিটি আকার ও মডেলের জন্য একাধিক নমুনা জমা দিতে হয়। সেইসঙ্গে পরীক্ষা ও সনদ ফি জমা দিতে হয়। এর ফলে যারা নিয়ম মেনে আমদানি করেন, তাদের ব্যয় আরও বেড়ে যায়।’ তথ্য সুএঃ দ্যা ডেইলি স্টার
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.