অনলাইন ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত এক ভয়াবহ ও অনিশ্চিত রূপ নিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার আশঙ্কায় পুরো অঞ্চল এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি ‘হরমুজ প্রণালি’ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য এই মহাপ্রলয় রুখতে তুরস্কসহ আন্তর্জাতিক মহলে নজিরবিহীন কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা কোনো পরমাণু স্থাপনায় সামান্যতম হামলাও চালায়, তবে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেবে। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ পুনর্নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক জলপথ আর কোনো দেশের জন্য খোলা হবে না।
বিবৃতিতে পাল্টা হামলার এক বিস্তারিত ছক তুলে ধরেছে আইআরজিসি। তাদের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী: ইসরায়েলের সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে ‘ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু’ করা হবে; মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্য জায়গা করে দিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকেও ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য করা হবে; এই অঞ্চলের যেসব কোম্পানিতে মার্কিন শেয়ারহোল্ডার রয়েছে, সেগুলোকেও ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
পুরো অঞ্চল যখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তুরস্ক। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যুদ্ধ থামাতে ও উত্তেজনা প্রশমনে এক বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন।
ফিদান ইতিমধ্যে আলাদা আলাদা ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির সঙ্গে কথা বলেছেন। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এবং একাধিক মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।
আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তুরস্ক একটি ‘টেকসই যুদ্ধবিরতি’ এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি মধ্যস্থতা ফর্মুলা তৈরি করার চেষ্টা করছে। তুরস্কের এই উদ্যোগকে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের বিস্তার রোধের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
এদিকে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ লিও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয় ও মানুষের দুর্ভোগকে ‘পুরো মানবজাতির জন্য কলঙ্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে হাজার হাজার মানুষের সামনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি চরম বিস্ময় ও হতাশার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। সংঘাতের শিকার নিরপরাধ মানুষের কান্নার সামনে আমরা নীরব থাকতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধের এই ক্ষরণ কেবল ওই অঞ্চলের মানুষের নয়, বরং পুরো মানবতার ক্ষতি করছে।’ তিনি অবিলম্বে সব শত্রুতা পরিহার করে শান্তির পথ প্রশস্ত করতে বিশ্ব নেতাদের প্রতি তার আবেদন পুনর্ব্যক্ত করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আইআরজিসি-র এই পাল্টা হুমকি সেই উত্তেজনাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি ইরান সত্যিই এই পথ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে পড়বে। একই সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ফলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশগত ঝুঁকিও পুরো অঞ্চলের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও রয়টার্স
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.