অনলাইন ডেস্ক
বিশ্ব রাজনীতি যখন জলবায়ু সংকট, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক জোটের কারণে দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে, তখন নর্ডিক দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নরওয়ের অসলোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলন সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
একসময় ভারতের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত দেশগুলো এখন নয়াদিল্লির বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের মে মাসে সুইডেন ও নরওয়ে সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই সফরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অসলোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলন। এটি কেবল একটি নিয়মিত ইউরোপ সফরের অংশ ছিল না; বরং ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে নর্ডিক অঞ্চলকে নতুন গুরুত্ব দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল।
এর কয়েক মাস আগেই, ২০২৬ সালের মার্চে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের ভারত সফরের সময় দুই দেশ ডিজিটালাইজেশন ও টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কৌশলগত অংশীদারিত্বে পৌঁছায়। পরে মে মাসে সুইডেনের গথেনবার্গে ভারত-সুইডেন সম্পর্ককে বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করা হয়।
একই সময়ে নরওয়ের সঙ্গে ‘গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ গড়ে তোলে ভারত। শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন মোদি।
বার্তাটি ছিল সুস্পষ্ট, ভারত এখন নর্ডিক অঞ্চলকে ছোট অর্থনীতির একটি প্রান্তিক গুচ্ছ হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তি, জলবায়ু কার্যক্রম, সামুদ্রিক বিষয় এবং কৌশলগত বৈচিত্র্যায়নের ক্ষেত্রে উচ্চ-মূল্যের অংশীদারদের একটি সমষ্টি হিসেবে দেখে।
এই উদ্যোগ রাতারাতি শুরু হয়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে, প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন একটি ফোন কলের মাধ্যমে সম্প্রসারিত ভারত-ডেনমার্ক সবুজ কৌশলগত অংশীদারিত্ব পর্যালোচনা করেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, প্রধানমন্ত্রী মোদি এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের ফাঁকে নয়াদিল্লিতে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেটেরি ওরপোর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং উভয় পক্ষ কোয়ান্টাম, ৬জি, নবায়নযোগ্য শক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার ওপর জোর দেয়।
২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে ভারত-নর্ডিক কূটনীতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, যা ‘সবুজ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ হিসেবে উন্নীত হয়; পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পায় ফিনল্যান্ড।
প্রধানমন্ত্রী মোদির সাম্প্রতিক নর্ডিক কূটনৈতিক উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই নিহিত: এটি আর বিচ্ছিন্ন বা অনিয়মিত কূটনীতি নয়, বরং একটি সুসংগঠিত, পর্যায়ক্রমিক ও নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত কাঠামোবদ্ধ সম্পর্ক।
কেন নর্ডিক দেশগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ?
এর তাৎক্ষণিক কারণটি খুবই সহজ। জনসংখ্যার দিক থেকে নর্ডিক দেশগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও তারা পুঁজি, উদ্ভাবন, মানদণ্ড নির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে। সমগ্র নর্ডিক অর্থনীতির সম্মিলিত আকার বর্তমানে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ২০২৪ সালে নর্ডিক দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে; ৭০০-এর বেশি নর্ডিক কোম্পানি ভারতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং প্রায় ১৫০টি ভারতীয় কোম্পানির ওই অঞ্চলে উপস্থিতি রয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
তবে এর গভীর আকর্ষণ শুধু পরিমাণে নয়, বরং মানের মধ্যেই নিহিত। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও)-এর গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, সুইডেন দ্বিতীয়, ফিনল্যান্ড সপ্তম, ডেনমার্ক নবম এবং নরওয়ে বিংশতম অবস্থানে রয়েছে; একই সঙ্গে নরওয়ে অবকাঠামো সূচকে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের ইউরোপীয় ইনোভেশন স্কোরবোর্ড ২০২৫-এ ডেনমার্ককে ছাড়িয়ে, সুইডেন আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে উদ্ভাবনী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ভারতের জন্য, যা এখন উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তারকে পরিচ্ছন্ন প্রবৃদ্ধি ও উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটাতে চাইছে, এই সংমিশ্রণটি বিরল এবং অত্যন্ত মূল্যবান। সরবরাহ-শৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগ, প্রযুক্তির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং আস্থাভিত্তিক অংশীদার খোঁজার বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নর্ডিক দেশগুলো ভারতের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতারই প্রতিফলন-উচ্চমানের প্রকৌশল দক্ষতা, সবুজ শিল্প জ্ঞান, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা।
সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সমাপ্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়, অন্যদিকে ভারত-ইএফটিএ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (টিইপিএ) ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। অসলো শীর্ষ সম্মেলন স্পষ্টভাবে ভারত-নর্ডিক সম্পর্ককে এই দুটি বাণিজ্য কাঠামোর সাথেই যুক্ত করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে, টিইপিএ-র একটি যৌথ লক্ষ্য হলো আগামী ১৫ বছরে ভারতে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এবং ১০ লাখ প্রত্যক্ষ বা সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
অন্য কথায়, নর্ডিক অঞ্চল এখন ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্প এবং ইউরোপের পুঁজি, বাজার ও উন্নত সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত সেতু হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
উন্নত প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতিতে নতুন সহযোগিতা
এইখানেই সম্পর্কটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুইডেন ভারতের সবচেয়ে বহুমাত্রিক নর্ডিক প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নতুন ভারত-সুইডেন কৌশলগত অংশীদারিত্বের আওতায় উভয় পক্ষ পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক লেনদেন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ৬জি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, টেকসই খনন, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। এতে একটি ভারত-সুইডেন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা করিডর চালু করা হয়েছে, যৌথ উদ্ভাবন অংশীদারিত্বকে উন্নীত করা হয়েছে এবং একটি নতুন যৌথ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভারতের জন্য সুইডেন গুরুত্বপূর্ণ শুধু ধারণার উৎস হিসেবে নয়, বরং শিল্পভিত্তিক গভীরতার কারণে-বিশেষ করে টেলিকম, উন্নত উৎপাদন, সবুজ শিল্প এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালে ভারত-সুইডেন পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, এবং সুইডিশ কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই ভারতে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন স্থাপন করেছে, যার মধ্যে হরিয়ানায় অবস্থিত ‘সাব’-এর কার্ল-গুস্তাফ কারখানাও রয়েছে।
ডেনমার্ক নর্ডিক অঞ্চলে ভারতের সবচেয়ে পরিণত সবুজ অংশীদার হিসেবে অবস্থান করছে। ২০২০ সালে গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চালুর পর থেকে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে প্রতীকী পর্যায় থেকে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে অসলোতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন আবারও এ অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন, যেখানে জলবায়ু, নতুন প্রযুক্তি, এআই, প্রতিরক্ষা, স্টার্টআপ এবং একাডেমিক বিনিময়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উভয় পক্ষই বারাণসীতে ‘স্মার্ট ল্যাবরেটরি অন ক্লিন রিভার্স’ প্রকল্পকে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশগত সহযোগিতার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
ডেনমার্কের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালে গঠিত ‘গ্রিন ট্রানজিশন অ্যালায়েন্স ইন্ডিয়া’ আগের ‘উইন্ড অ্যালায়েন্স ইন্ডিয়া’ এবং ‘গ্রিন ফুয়েলস অ্যালায়েন্স ইন্ডিয়া’-এর ওপর ভিত্তি করে ভারতের জ্বালানি রূপান্তরে ডেনিশ কোম্পানিগুলোকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে। জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে শিল্পক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বাস্তব রূপান্তরে যেতে চাইলে ভারতের জন্য এ ধরনের অংশীদারিত্বই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যে দেশের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে ভারত
এক্ষেত্রে নরওয়ের কাছ থেকে ভিন্ন ধরনের কিছু সুবিধা পাচ্ছে ভারত । ২০২৬ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অসলো সফর ছিল গত ৪৩ বছরে কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম নরওয়ে সফর, এবং এর ফলাফল ছিল উল্লেখযোগ্য: একটি সবুজ কৌশলগত অংশীদারিত্ব গঠন, নরওয়ের ইন্দো-প্যাসিফিক ওশানস ইনিশিয়েটিভে অন্তর্ভুক্তি, মহাকাশ, স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল উন্নয়নে চুক্তি, এবং সবুজ শিপিং, বন্দর, মহাসাগরীয় শক্তি, কার্বন ক্যাপচার, সার্কুলার অর্থনীতি ও মেরু গবেষণায় আরও সুস্পষ্ট সহযোগিতা। ভারত ও নরওয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর আওতায় ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিষয়ে তৃতীয় দেশগুলোতে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে।
এর পাশাপাশি, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নরওয়ের সরকারি পেনশন তহবিল (গ্লোবাল) ভারতীয় পুঁজিবাজারে প্রায় ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে নরওয়ে এখন আর কেবল একটি সীমিত বা বিশেষায়িত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি উৎস, সামুদ্রিক জ্ঞানভিত্তি এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রভাব বিস্তারের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
এদিকে, ফিনল্যান্ড ভারতের জন্য নর্ডিক অঞ্চলে ফ্রন্টিয়ার ডিজিটালাইজেশনের প্রধান অংশীদার হিসেবে দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে হেলসিঙ্কির সঙ্গে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদারিত্বে ৫জি, ৬জি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, টেকসই উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষ একটি ডিজিটালাইজেশন বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ, ইউনিভার্সিটি অব ওউলু এবং ভারতীয় ৬জি অ্যালায়েন্সের সঙ্গে যৌথ ৬জি টাস্ক ফোর্স গঠন এবং ২০২৬ সালে ভারতে ওয়ার্ল্ড সার্কুলার ইকোনমি ফোরাম সহ-আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
আইসল্যান্ডের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও তা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। অসলোতে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্ট্রুন ফ্রস্টাদোত্তিরের বৈঠকে ভূ-তাপীয় শক্তি, মৎস্যসম্পদ, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং আর্কটিক গবেষণাকে কেন্দ্র করে আলোচনা হয়। পাশাপাশি ভারত-আইসল্যান্ড সহযোগিতা কাঠামোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জৈবপ্রযুক্তি, মৎস্য ও আর্কটিক বিষয়কে প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারত যদি এই দেশগুলোকে আলাদা আলাদা খণ্ড হিসেবে না দেখে, বরং একই বৃহত্তর ধাঁধার পরিপূরক অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে তা হবে কৌশলগতভাবে অধিক বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত।
নিরাপত্তা, আর্কটিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা
এই সম্পর্কের একটি কঠিনতর কৌশলগত দিকও রয়েছে, যা অবমূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। সমগ্র নর্ডিক অঞ্চল এখন ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত: ২০২৩ সালের এপ্রিলে ফিনল্যান্ড এবং ২০২৪ সালের মার্চে সুইডেন সদস্যপদ গ্রহণ করে, যা ইউরোপীয় ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভারত কোনও জোট রাজনীতিতে প্রবেশ করছে না, এবং তা করা উচিতও নয়। তবে ভারত এমন একগুচ্ছ অংশীদারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যাদের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার স্থিতিশীলতা, সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্ব ইউক্রেন যুদ্ধের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অসলো শীর্ষ সম্মেলনে এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে: ভারত ও নর্ডিক দেশগুলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অবৈধ সামুদ্রিক কার্যক্রম, নাবিকদের নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা উপাদান সরবরাহে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। সুইডেনের দ্বিপাক্ষিক কর্মপরিকল্পনায় পৃথকভাবে সাইবার সংলাপ জোরদার করা, প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন বৃদ্ধি এবং ভারতের প্রতিরক্ষা করিডরগুলোতে সুইডিশ বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্কটিক এই সম্পর্ককে আরও একটি মাত্রা যোগ করেছে। ভারত ২০০৮ সাল থেকে নরওয়ের স্ভালবার্ডে হিমাদ্রি গবেষণা কেন্দ্র পরিচালনা করছে, ২০১৩ সাল থেকে আর্কটিক কাউন্সিলে পর্যবেক্ষক মর্যাদা পেয়েছে এবং ২০২২ সালে তার আর্কটিক নীতি বিজ্ঞান, জলবায়ু, সামুদ্রিক সহযোগিতা, সংযোগ ও শাসন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গঠন করেছে। অসলোতে নর্ডিক নেতারা আর্কটিক কাউন্সিলের ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোতে ভারতের অব্যাহত অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং মেরু গবেষণা, জলবায়ু ও পরিবেশগত বিষয়ে আরও গভীর সহযোগিতার সমর্থন দিয়েছেন।
এটি কোনও লোকদেখানো প্রকল্প নয়। ভারতীয় কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করেছেন যে, আর্কটিকে পরিবর্তন ভারতের মৌসুমি বায়ু এবং বৃহত্তর জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, নর্ডিক দেশগুলো একসঙ্গে ভারতকে তিনটি ক্ষেত্রেই সংযুক্ত করে- ইউরোপ, আর্কটিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক। এমন সমন্বিত সুবিধা খুব কম অংশীদার গোষ্ঠীর মধ্যেই দেখা যায়।
যে অংশীদারিত্ব ভারতের কৌশলগত পরিসরকে সম্প্রারিত করে
নর্ডিক সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য হলো এটি ভারতের কৌশলগত কর্মপরিসরকে আরও বিস্তৃত করে। এই দেশগুলো বড় শক্তিগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ না করে বরং ভারতকে ইউরোপীয় বাজার, আর্কটিক শাসনব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি জোট এবং মানদণ্ড নির্ধারণ সংক্রান্ত আলোচনায় প্রবেশের অতিরিক্ত পথ তৈরি করে দেয়। তারা একই সঙ্গে সংস্কারকৃত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছে, এনএসজি-তে ভারতের আবেদনকে সমর্থন জানিয়েছে এবং তৃতীয় দেশগুলোতে উন্নয়ন সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে ভারতের সঙ্গে কাজ করার ক্রমবর্ধমান ইচ্ছা দেখিয়েছে।
সমষ্টিগতভাবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে, নর্ডিক অঞ্চল এখন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’-এ পরিণত হচ্ছে-যেখানে নাটকীয়তা কম, কিন্তু কৌশলগত মূল্য অত্যন্ত বেশি।
এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী মোদির সাম্প্রতিক নর্ডিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। নর্ডিক দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ শুধু তাদের আকারের কারণে নয়; বরং তারা ভবিষ্যতের কৌশলগত অর্থনীতির সংযোগস্থলে অবস্থান করছে- সবুজ শিল্প, পরিচ্ছন্ন নৌপরিবহন, উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা, আস্থাভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল, মেরু গবেষণা এবং স্থিতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ভারত এখানে নিয়ে আসে তার স্কেল, বাজার, মানবসম্পদ এবং উন্নয়নগত প্রয়োজন; আর নর্ডিক দেশগুলো নিয়ে আসে প্রযুক্তি, পুঁজি, জলবায়ু সক্ষমতা এবং কৌশলগত আস্থা।
নয়াদিল্লি যদি এই পরিপূরকতাকে দ্রুত বাস্তবায়নে রূপান্তর করতে পারে, তবে ইউরোপের উত্তরাঞ্চল এই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে ফলপ্রসূ সম্প্রসারণগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
নর্ডিক সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য হলো এটি ভারতের কৌশলগত কর্মপরিসরকে আরও বিস্তৃত করে। এই দেশগুলো বড় শক্তিগুলোর বিকল্প না হয়ে বরং ভারতকে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের অতিরিক্ত পথ তৈরি করে তার বৈশ্বিক পরিসরকে শক্তিশালী করে। সূত্র: দ্য পাইওনিয়ার
লেখক: ভারতীয় রাজ্যসভার সংসদ সদস্য, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত; এখানে উপস্থাপিত মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.